Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

শাহরুখ-সলমনের পর বলিউডের পরের ‘হার্টথ্রব’ হওয়ার দৌড়ে ছিলেন! হঠাৎ কোথায় হারিয়ে গেলেন নকুল কপূর?

একটি জনপ্রিয় গানেই রাতারাতি তারকা হয়ে উঠেছিলেন নকুল কপূর। বলিউডের নতুন হার্টথ্রব হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও হঠাৎই অভিনয় থেকে সরে যান তিনি। কেন হারিয়ে গেলেন এই অভিনেতা?

২০০০-এর দশকের শুরু। বলিউডে তখন শাহরুখ খান, সলমন খান এবং আমির খানের দাপট। তিন খানকে ঘিরেই মূলত তৈরি হচ্ছিল বাণিজ্যিক হিন্দি ছবির বড় অংশের বাজার। তাঁদের পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রিতে একের পর এক নতুন মুখও আত্মপ্রকাশ করছিলেন। কেউ টিকে গিয়েছিলেন, কেউ হারিয়ে গিয়েছিলেন সময়ের স্রোতে। আবার কেউ কেউ এমন জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন, যা দেখে মনে হয়েছিল, আগামী দিনে তাঁরাই হয়তো হয়ে উঠবেন বলিউডের বড় তারকা।

সেই সময়ের এমনই এক পরিচিত মুখ ছিলেন নকুল কপূর। দিল্লির এই তরুণ অভিনেতা মাত্র ২৩ বছর বয়সে বলিউডে পা রাখেন। তাঁর প্রথম ছবির গান জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকের নজরে চলে আসেন তিনি। সুদর্শন চেহারা, ‘চকলেট বয়’ লুক এবং পর্দায় সহজ উপস্থিতির কারণে খুব দ্রুত তরুণ দর্শকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন নকুল।

অনেকের কাছেই মনে হয়েছিল, বলিউডে নকুলের সামনে রয়েছে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই সম্ভাবনাময় শুরুর পরই আচমকা যেন অদৃশ্য হয়ে গেলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে বড় পর্দায় তাঁকে আর সেভাবে দেখা যায়নি। তার বদলে সম্পূর্ণ ভিন্ন জীবন বেছে নেন এই অভিনেতা।

‘আঁখ হ্যায় ভরী ভরী’-তে রাতারাতি জনপ্রিয়

২০০২ সালে মুক্তি পায় নকুল কপূরের প্রথম ছবি ‘তুম সে অচ্ছা কৌন হ্যায়’। দীপক আনন্দ পরিচালিত এই ছবিতে কিম শর্মা এবং আরতী ছাবরিয়ার সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন নকুল। ছবিতে তাঁর চরিত্রের নাম ছিল অর্জুন সিংহ।

ছবিটি মূলত তরুণ দর্শকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছিল। তবে সিনেমার গল্পের পাশাপাশি ছবির গানগুলিও সেই সময় যথেষ্ট সাড়া ফেলেছিল। বিশেষ করে ‘আঁখ হ্যায় ভরী ভরী’ গানটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

গানের জনপ্রিয়তার সঙ্গে নকুলের মুখও পরিচিত হয়ে যায়। তাঁর চেহারা এবং অভিনয়শৈলী তরুণ দর্শকদের নজর কাড়ে। রাতারাতি তিনি হয়ে ওঠেন বলিউডের নতুন ‘চকলেট বয়’।

সেই সময় নতুন অভিনেতাদের মধ্যে যে ধরনের চেহারা এবং ব্যক্তিত্বকে জনপ্রিয়তার অন্যতম উপাদান হিসেবে দেখা হত, নকুল তার সঙ্গে বেশ মানানসই ছিলেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর পরবর্তী ছবির দিকে নজর ছিল দর্শকদের।

অভিনয়ের আগে মডেলিং ও মিউজিক ভিডিয়ো

তবে সিনেমায় আসার আগেই ক্যামেরার সামনে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল নকুলের। একটি ঠান্ডা পানীয়ের বিজ্ঞাপনে কাজ করে প্রথম বড় পরিসরে পরিচিতি পান তিনি। এরপর মডেলিংয়ের জগতে পা রাখেন।

১৯৯৮ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে একাধিক জনপ্রিয় মিউজিক ভিডিয়োতেও তাঁকে দেখা যায়। শিবানী কাশ্যপের ‘হো গয়ী হ্যায় মোহব্বত তুমসে’ এবং নুসরত ফতেহ আলি খানের ‘আজা মেরে ইয়ার’-এর মতো মিউজিক ভিডিয়ো তাঁর পরিচিতি বাড়িয়ে দিয়েছিল।

এই কাজগুলির মাধ্যমেই চলচ্চিত্র জগতের মানুষের নজরে আসেন তিনি। বিজ্ঞাপন, মডেলিং এবং মিউজিক ভিডিয়ো থেকে ধীরে ধীরে সিনেমার দিকে এগিয়ে যান নকুল।

তার পরেই আসে ‘তুম সে অচ্ছা কৌন হ্যায়’। প্রথম ছবিতেই জনপ্রিয় গান এবং তরুণ অভিনেতা হিসেবে নজর কাড়ায় নকুলের সামনে তৈরি হয় বড় সম্ভাবনা।

খেলাধুলার প্রতিও ছিল আগ্রহ

নকুলের ব্যক্তিত্বের আর একটি দিক ছিল তাঁর খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ। ১৯৭৪ সালের ১১ জুলাই দিল্লিতে জন্ম তাঁর। ছোট থেকেই খেলাধুলা এবং অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের প্রতি আগ্রহী ছিলেন তিনি।

তিনি ডাইভিংয়েও দক্ষ ছিলেন এবং জাতীয় স্তরে একাধিক শিরোপা জেতার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বাঞ্জি জাম্পিংয়ের মতো অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসেও আগ্রহ ছিল তাঁর।

অর্থাৎ অভিনয় তাঁর জীবনের একমাত্র আকর্ষণ ছিল না। পরবর্তী জীবনে তিনি যে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটবেন, তাঁর আগের জীবনযাপনের বিভিন্ন দিকেও তার কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

কেন আর বড় ছবিতে দেখা গেল না?

‘তুম সে অচ্ছা কৌন হ্যায়’-এর পর স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল যে নকুলকে আরও একাধিক হিন্দি ছবিতে দেখা যাবে। কিন্তু বাস্তবে তেমনটা হয়নি।

প্রথম ছবির পর তাঁর ফিল্মোগ্রাফি আর খুব একটা দীর্ঘ হয়নি। ২০০৫ সালে কানাডার টেলিভিশন সিরিজ ‘টার্মিনাল সিটি’-তে অভিনয় করেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে বিনোদন জগতের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কমতে থাকে।

কেন তিনি বলিউড থেকে দূরে সরে গেলেন, সেই বিষয়ে নানা সময়ে বিভিন্ন আলোচনা হয়েছে। তবে তাঁর নিজের তরফে এমন কোনও স্পষ্ট বক্তব্য সামনে আসেনি যে তিনি বলিউড ছেড়ে দেওয়ার নির্দিষ্ট কোনও কারণ হিসেবে একটি বিষয়কে দায়ী করেছেন।

তাই তাঁর অভিনয় জীবন থেমে যাওয়ার পেছনে ঠিক কী কারণ ছিল, তা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই।

news image
আরও খবর

মৃত্যুর গুজব ছড়িয়েছিল

অভিনয় থেকে দূরে চলে যাওয়ার পর বহু বছর নকুলকে নিয়ে কোনও খবরই প্রায় সামনে আসেনি। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নিয়ে মানুষের কৌতূহলও বাড়তে থাকে।

২০১৫ সালে আচমকাই সমাজমাধ্যমে তাঁর মৃত্যু নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও দাবি করা হয়, পথ দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। আবার কোথাও বলা হয়, দীর্ঘদিনের অসুস্থতার কারণে মারা গিয়েছেন তিনি।

গুজব এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে শেষ পর্যন্ত নকুল নিজেকেই বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে হয়।

সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টের মাধ্যমে তিনি জানান, তিনি জীবিত, সুস্থ এবং ভালো আছেন। সেই পোস্টের পরই তাঁর মৃত্যুর খবর যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, তা স্পষ্ট হয়ে যায়।

এই ঘটনার পর আবারও অনুরাগীদের নজরে আসেন তিনি। তবে একই সঙ্গে সামনে আসে তাঁর জীবনের আর একটি দিক—তিনি ইতিমধ্যেই বিনোদন জগতের ঝলমলে জীবন থেকে অনেকটাই দূরে সরে গিয়েছেন।

বলিউড ছেড়ে যোগ ও আধ্যাত্মিকতার পথে

অভিনয় জগত থেকে দূরত্ব বাড়ার পর নকুল নিজের জীবনকে অন্যভাবে সাজাতে শুরু করেন। যোগব্যায়াম এবং আধ্যাত্মিকতার প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে।

পরবর্তী সময়ে তিনি কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ভ্যাঙ্কুভারে চলে যান। সেখানেই যোগচর্চাকে নিজের পেশার সঙ্গে যুক্ত করেন।

একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বর্তমানে তিনি যোগশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ‘ডিভাইন লাইফ যোগ’ নামে একটি যোগকেন্দ্র পরিচালনার সঙ্গেও তাঁর নাম যুক্ত হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন দেশের মানুষকে যোগ শেখানোর কাজ করেন তিনি।

একসময় যে মানুষটির পরিচয় ছিল অভিনেতা এবং মডেল হিসেবে, পরবর্তী জীবনে সেই পরিচয় বদলে যায়। ক্যামেরার সামনে অভিনয় করার পরিবর্তে যোগচর্চা এবং আধ্যাত্মিক জীবনই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ব্যক্তিগত জীবন থেকেও দূরে রেখেছেন প্রচার

নকুল বরাবরই ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব বেশি প্রকাশ্যে কথা বলেননি। অভিনয়ের সময়ও তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি। পরবর্তী সময়েও সেই প্রবণতা বজায় রেখেছেন তিনি।

তিনি বিবাহিত এবং তাঁর দুই সন্তান রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরিবারকে সংবাদমাধ্যমের আলো থেকে দূরে রাখতেই পছন্দ করেন নকুল।

তাঁর সমাজমাধ্যমের অ্যাকাউন্টেও ব্যক্তিগত জীবনের কিছু ছবি এবং আপডেট দেখা যায়। তবে অতীতের মতো তারকাখ্যাতির আলোয় ফিরে আসার কোনও তাড়াহুড়ো তাঁর মধ্যে দেখা যায় না।

তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টের সর্বশেষ পোস্ট ২০২৫ সালের জানুয়ারির বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অ্যাকাউন্টটি ব্যক্তিগত হলেও কিছু পুরনো ছবি ও আপডেট এখনও দেখা যায়।

বলিউডের সেই ‘চকলেট বয়’ এখন কোথায়?

নকুল কপূরের গল্প তাই বলিউডের প্রচলিত তারকা-জীবনের থেকে বেশ আলাদা। মাত্র ২৩ বছর বয়সে প্রথম ছবিতে অভিনয় করে পরিচিতি পাওয়া, জনপ্রিয় গান দিয়ে রাতারাতি দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়া এবং তারপর ধীরে ধীরে ইন্ডাস্ট্রি থেকে দূরে সরে যাওয়া—সব মিলিয়ে তাঁর কেরিয়ার বেশ ব্যতিক্রমী।

তাঁর হাতে হয়তো আরও অনেক ছবির সুযোগ আসতে পারত। হয়তো তিনি আরও কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করে বলিউডে নিজের জায়গা শক্ত করতে পারতেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি অন্য পথ বেছে নিয়েছেন।

আজ তাঁর পরিচয় মূলত যোগচর্চা, আধ্যাত্মিকতা এবং ব্যক্তিগত জীবনকে ঘিরে। বলিউডের আলো থেকে অনেক দূরে থেকেও নিজের পছন্দের জীবনযাপন করছেন তিনি।

একসময় ‘আঁখ হ্যায় ভরী ভরী’-র মতো জনপ্রিয় গানের সঙ্গে যে মুখটি দর্শকদের মনে গেঁথে গিয়েছিল, সেই নকুল কপূর এখন আর সিনেমার পর্দায় নেই। তাঁর জীবনের গল্প মনে করিয়ে দেয়, জনপ্রিয়তা এবং তারকাখ্যাতির পথ সবসময় একজন মানুষকে একই জায়গায় আটকে রাখে না। কেউ কেউ সেই আলো ছেড়ে সম্পূর্ণ অন্য জগতকেই নিজের ভবিষ্যৎ হিসেবে বেছে নেন।

আর নকুল কপূর তাঁদেরই একজন।

Preview image