ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, অসুস্থ ধর্মেন্দ্রকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে কান্না করছেন দেওল পরিবারের সদস্যরা। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে উদ্বিগ্ন হয়েছেন অনুরাগীরা, এবং প্রশ্ন উঠেছে কীভাবে এমন গোপন মুহূর্ত ফাঁস হল।
হাসপাতালের নিস্তব্ধ পরিবেশকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে এক ভাইরাল ভিডিও। সেই ভিডিওতে ধরা পড়েছে বলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা ধর্মেন্দ্রের অচৈতন্য অবস্থা, তাঁর চারপাশে ভেঙে পড়া পরিবার, এবং চিকিৎসকদের টানটান তৎপরতা। এমন সংবেদনশীল মুহূর্ত কীভাবে বাইরে এল, কীভাবে তা সমাজমাধ্যমে ঝড় তুলল এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে চলচ্চিত্র মহল ও সাধারণ মানুষের মনে। পুরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য ক্ষোভ ও উদ্বেগ।
ধর্মেন্দ্র বলিউডের এমন এক অভিনেতা, যিনি তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনে কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। বয়সের ভারে নানান শারীরিক জটিলতা দেখা দিলেও, ভক্তরা সবসময় তাঁর সুস্থতা কামনা করেছেন। কিন্তু হঠাৎ এক রাতে তাঁর হাসপাতালের অন্তর্বর্তী দৃশ্য যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়, তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত, পরিবার-পরিজনের আবেগে ভরা, এবং এমন একটি মুহূর্ত যা মানুষের সামনে আসার কথা কখনওই ছিল না। তবুও ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে অতি দ্রুত।
ভিডিওতে দেখা গেছে, ধর্মেন্দ্র আইসিইউ র ভেতরে নিথর হয়ে শুয়ে আছেন। তাঁর শরীরে বিভিন্ন চিকিৎসা যন্ত্র বসানো হাইড্রোলিক বেড, মনিটরিং মেশিন, স্যালাইন, অক্সিজেন সাপোর্ট। তাঁর চারপাশে দাঁড়িয়ে সানি দেওল, ববি দেওল, প্রথম স্ত্রী প্রকাশ কৌর, নাতি-নাতনিরা। প্রত্যেকের মুখেই উদ্বেগ, অস্থিরতা আর অসহায়তার ছাপ। পরিবারের সদস্যরা চোখ লাল করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রকাশ কৌরের কান্না ভিডিওতেও স্পষ্ট বোঝা গেছে। এই দৃশ্য স্বাভাবিকভাবেই যে কোনও মানুষের মনে কষ্ট জাগায়, কিন্তু এখানেই বড় প্রশ্ন এত ব্যক্তিগত দৃশ্য কীভাবে বাইরে এল
দেওল পরিবারের তরফে বহুবার অনুরোধ করা হয়েছিল, তাঁদের পারিবারিক গোপনীয়তা সম্মান করা হোক। হেমা মালিনীও সংবাদমাধ্যমে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ভক্তদের উদ্দেশে জানিয়েছিলেন, ধর্মেন্দ্রের শারীরিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো ভুল খবর না ছড়ানো হোক, এবং চিকিৎসার সংবেদনশীল সময়টিতে তাঁদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় স্পেস দেওয়া হোক। কিন্তু এর পরেও এমন ভিডিও ফাঁস হওয়া যে অত্যন্ত গর্হিত, তা বলিউড মহল থেকে সাধারণ মানুষ সবাই একবাক্যে বলছেন।
ঘটনার তদন্তে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে জানান, ধর্মেন্দ্রের যে পরিচর্যাকারী বা কেয়ারটেকার তাঁকে দেখভাল করছিলেন, তিনিই নাকি এই ভিডিও ধারণ করেছেন। দায়িত্বে থাকা অবস্থাতেই গোপনে ফোনে ভিডিও রেকর্ড করেন তিনি। ঘটনাটি আরও গুরুতর হয় যখন জানা যায়, ভিডিওটি তিনি নিজেই সোশ্যাল মিডিয়ায় বা অন্য কোনও গ্রুপে শেয়ার করেন, সেখান থেকেই তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন মাধ্যমের হাতে। নিজের পরিচর্যা করা রোগী, তাও ফের আইকনিক অভিনেতা তাঁর এমন ব্যক্তিগত মুহূর্ত ফাঁস করা নিঃসন্দেহে নৈতিকতার চূড়ান্ত লঙ্ঘন।
পরিস্থিতি প্রকাশ্যে আসতেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। দেওল পরিবার তাঁদের তরফে অভিযোগ জানানোর পর তদন্ত শুরু হয়। সিসিটিভি ফুটেজ, কর্মীদের মোবাইল ব্যবহার, অ্যাক্সেস লগ সবই খতিয়ে দেখে প্রশাসন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অভিযুক্তকে চিহ্নিত করা হয়। পরে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এমন অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে এবং ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে দেওয়া ভিডিওটিকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। ধর্মেন্দ্রের ভক্তরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন এই বলে যে, তাঁর মতো বর্ষীয়ান অভিনেতার শেষ বয়সের অসুস্থতা নিয়ে এই ধরনের আচরণ অত্যন্ত অসম্মানজনক। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, কোথায় গোপনীয়তা, কোথায় মানবিকতা? ষাটের দশক থেকে যে মানুষ তাঁদের বিনোদন দিয়ে এসেছেন, তাঁর সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তগুলো এইভাবে জনসমক্ষে আসা কি নৈতিক?
এছাড়া একটি বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে এ রকম ঘটনা কেন এত সহজে ঘটে যেতে পারে? হাসপাতালের অভ্যন্তরে যে কাউকে যে কোনো কিছু রেকর্ড করতে দেওয়া উচিত নয়, বিশেষত আইসিইউর মতো সুরক্ষিত জায়গায়। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা আজ যেমন সুবিধা এনেছে, তেমনি মানুষের ব্যক্তিগত মুহূর্তের উপর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের যে আস্থা থাকে, এমন ঘটনা তা নড়বড়ে করে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে মোবাইল ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকা উচিত। অনেক দেশে আইসিইউ-তে ক্যামেরা-যুক্ত ডিভাইস সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। ভারতের বহু হাসপাতালেও এমন নিয়ম রয়েছে, তবে প্রয়োগে ঘাটতি থাকে। এই ঘটনা সেই ঘাটতির এক বড় উদাহরণ।
এই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বলিউডে আলোচনার ঝড় শুরু হয়েছে। বহু তারকারা সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কেউ বলছেন, এটা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ,” কেউ বা বলছেন, যে মানুষ জীবনভর মানুষকে ভালোবাসার বার্তা দিয়েছেন, তাঁকে এই ভাবে অসম্মান করা লজ্জাজনক।
অন্যদিকে, ধর্মেন্দ্রের স্বাস্থ্য নিয়ে নানা গুজবও ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। কেউ বলছেন তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক, কেউ বলছেন তিনি এখন স্থিতিশীল। তবে সত্যতা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। দেওল পরিবারও এ বিষয়ে এখনো কোনও অফিসিয়াল বিবৃতি দেয়নি। তাদের মূল দাবি, গোপনীয়তা বজায় রাখা হোক এবং ভুল খবর ছড়ানো বন্ধ করা হোক।
মানুষের এই আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া দেখেই বোঝা যায়, ধর্মেন্দ্র কেবল একজন অভিনেতা নন ভারতের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই কারণে তাঁর যেকোনো খবরেই মানুষের আগ্রহ প্রবল। আর সেই আগ্রহকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে দায়িত্বজ্ঞানহীন কিছু মানুষ, যারা ভাইরাল হওয়ার লোভে এই ধরনের কাজ করতে পিছপা হয় না।
এই ঘটনা আরও একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে এনে দিয়েছে সেলিব্রিটিদের ব্যক্তিগত জীবন কখনই সত্যিকার অর্থে ব্যক্তিগত থাকে না। হাসপাতালে থাকুক বা নিজের বাড়িতে, যে কোনও মুহূর্তে কেউ ক্যামেরা চালিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এই প্রবণতা সমাজকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? আমরা কি মানুষের দুর্বলতম সময়কে কনটেন্ট হিসেবে দেখছি? প্রশ্নগুলো সহজ নয়।
বাস্তবিকভাবে, এমন সংবেদনশীল ঘটনায় বেশি দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত ছিল সবারই হাসপাতালের কর্মীদের, প্রশাসনের, এমনকি দর্শকদেরও। সংবেদনশীল ভিডিও দায়িত্বহীনভাবে শেয়ার করা বা প্রচার করা মানুষের মর্যাদার পরিপন্থী।
ধর্মেন্দ্রের সুস্থতা সম্পর্কে ভক্তরা এখনো উদ্বিগ্ন। তাঁদের একটাই দাবি তাঁর প্রকৃত শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার ঘোষণা দেওয়া হোক, যাতে গুজব, ভুয়ো খবর ছড়িয়ে না পড়ে। পরিবার চাইছে, তাঁরা যেন শান্তিতে এই সময়টা কাটাতে পারেন।
অভিযুক্ত পরিচর্যাকারীর গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে ঘটনাটি আপাতত আইনি পরিসরে প্রবেশ করলেও, এর পিছনে যে গভীর নৈতিক প্রশ্নগুলো উঠে এসেছে তা সমাজকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মূল্য, চিকিৎসার সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, এবং ডিজিটাল যুগে মানুষের মর্যাদা সবকিছুই এই ঘটনার মাধ্যমে সামনে এসেছে। যে কোনও মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হলে তিনি সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় থাকেন। সেই সময়ে তাঁর ব্যক্তিগত মুহূর্ত ও চিকিৎসা সম্পর্কিত দৃশ্য বাইরের দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়া শুধুই অনৈতিক নয়, মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল।
আজকের সোশ্যাল মিডিয়া-নির্ভর যুগে ফোন হাতে পাওয়া মাত্রই যেকেউ ভিডিও ধারণ করতে পারে। সমস্যা হলো, অনেকেই বোঝেন না যে প্রত্যেকটি মুহূর্ত ‘কনটেন্ট’ নয়। বিশেষ করে হাসপাতালের আইসিইউ, যেখানে রোগীর জীবন-মৃত্যুর লড়াই চলছে, সেখানে যে কোনও ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করা একেবারেই উচিত নয়। ধর্মেন্দ্রের ভিডিও ভাইরাল হওয়া তাই চিকিৎসা ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। হাসপাতালগুলির কি আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন কর্মীদের মোবাইল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকা উচিত কি? এগুলো এখন বড় আলোচনা।
দেওল পরিবারের ক্ষোভও স্বাভাবিক। তারা বহুবার অনুরোধ করেছিলেন যাতে পরিবারের গোপনীয়তা বজায় থাকে। তাঁদের আবেগ, যন্ত্রণার মুহূর্ত কেউ রেকর্ড করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেবে এটা তারা কল্পনাও করেননি। ধর্মেন্দ্রের অবস্থা দেখে উদ্বিগ্ন ভক্তরা স্বাভাবিক ভাবেই অনেক প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের প্রিয় অভিনেতার প্রকৃত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি কী, তা জানার আগ্রহ ছিল প্রবল। কিন্তু সেই আগ্রহকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া অনৈতিক ও নিষ্ঠুর।
এই ঘটনার মাধ্যমে মানুষের একটি ভুল ধারণাও সামনে এসেছে সেলিব্রিটিদের ব্যক্তিগত জীবন নাকি ব্যক্তিগত থাকে না। কিন্তু অসুস্থতা, চিকিৎসা, মানবিক দুর্বলতা এসব তো সবার ক্ষেত্রেই সমান সংবেদনশীল। ধর্মেন্দ্র শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি একজন মানুষ; তাঁরও ব্যক্তিগত জায়গা আছে। সেই জায়গাটাই লঙ্ঘিত হয়েছে সবচেয়ে নির্মম ভাবে। তাই অনেকেই বলছেন, ডিজিটাল যুগে আমাদের নৈতিকতা ও সংবেদনশীলতা নতুন করে শেখা প্রয়োজন।
আইন যে ব্যবস্থা নিয়েছে, তা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু এ ঘটনার শিক্ষাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের ব্যক্তিগত মুহূর্ত, বিশেষ করে চিকিৎসা সংক্রান্ত দৃশ্য রেকর্ড করা কিংবা শেয়ার করার আগে ভাবা উচিত আমি কি একজন মানুষের মর্যাদা নষ্ট করছি তাঁর পরিবারকে আঘাত করছি সমাজ কি এমন অমানবিকতা মেনে নেবে?
অবশেষে সবাই একটাই প্রার্থনা করছেন ধর্মেন্দ্র যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন। তাঁর পরিবার এই কঠিন সময় পেরিয়ে আরও শক্ত হোক। আর সমাজ যেন এই ঘটনাকে শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে বুঝতে পারে যে, মানুষের ব্যক্তিগত মুহূর্তের মূল্য কতটা বেশি, এবং তা রক্ষা করা কীভাবে আমাদেরই দায়িত্ব। এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সচেতনতা, নৈতিকতা এবং কঠোর নিয়ম সবই এখন সময়ের দাবি।