মঙ্গলের পাতলা বায়ুমণ্ডলে থাকা কার্বন ডাই অক্সাইড ভেঙে অক্সিজেন উৎপাদন করে নজির গড়লেন বিজ্ঞানীরা। ভবিষ্যতের মানব অভিযান ও দীর্ঘমেয়াদি বসতি গড়ার পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।
মঙ্গলে অক্সিজেন বানিয়ে ফেললেন বিজ্ঞানীরা! এই প্রথম কোনও ভিনগ্রহে শ্বাসবায়ু উৎপাদন, কোন পদ্ধতিতে?
মানুষের মহাকাশ জয়ের ইতিহাসে একের পর এক মাইলফলক তৈরি হয়েছে। চাঁদে মানুষের পদচিহ্ন, মঙ্গলে রোভার অবতরণ, গ্রহাণু থেকে নমুনা সংগ্রহ—প্রতিটি ঘটনাই মানব সভ্যতার বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সাক্ষী। কিন্তু এতদিন একটি বড় প্রশ্নের উত্তর অজানা ছিল—পৃথিবীর বাইরে কোনও গ্রহে কি মানুষের ব্যবহারের উপযোগী অক্সিজেন তৈরি করা সম্ভব?
সেই প্রশ্নের উত্তর অবশেষে মিলেছে। মঙ্গলগ্রহের মাটিতে দাঁড়িয়ে সেখানকার বায়ুমণ্ডলের উপাদান ব্যবহার করেই অক্সিজেন উৎপাদন করে দেখিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এই কাজ করেছে নাসার একটি বিশেষ যন্ত্র, যার নাম ‘মক্সি’ বা MOXIE। এর পূর্ণরূপ Mars Oxygen In-Situ Resource Utilization Experiment।
এই সাফল্য শুধু একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নয়। ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানুষের বসতি স্থাপন, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা এবং নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের পথে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ অক্সিজেন?
মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন অপরিহার্য। পৃথিবীর মতো ঘন অক্সিজেনসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল মঙ্গলে নেই। সেখানে বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৯৫ শতাংশই কার্বন ডাই অক্সাইড। অক্সিজেনের পরিমাণ অত্যন্ত কম এবং তা মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য যথেষ্ট নয়।
ফলে ভবিষ্যতে যদি মানুষকে মঙ্গলে পাঠাতে হয়, তবে শ্বাস নেওয়ার জন্য বিপুল পরিমাণ অক্সিজেন সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে। শুধু তাই নয়, মঙ্গল থেকে পৃথিবীতে ফেরার রকেট উৎক্ষেপণের জন্যও বিশাল পরিমাণ অক্সিজেন প্রয়োজন।
পৃথিবী থেকে এত অক্সিজেন বহন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং প্রযুক্তিগতভাবে জটিল। তাই বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা ভাবছিলেন, মঙ্গলের স্থানীয় উপাদান ব্যবহার করেই যদি অক্সিজেন তৈরি করা যায়, তাহলে মঙ্গল অভিযানের খরচ ও ঝুঁকি অনেক কমে যাবে।
MOXIE কী?
MOXIE হল একটি পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি প্রদর্শনকারী যন্ত্র। এটি তৈরি করেছে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (MIT)। নাসার সহযোগিতায় তৈরি হওয়া এই যন্ত্রের মূল লক্ষ্য ছিল মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকে অক্সিজেন উৎপাদন সম্ভব কি না, তা যাচাই করা।
২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি নাসার Perseverance Rover-এর সঙ্গে মঙ্গলগ্রহে পৌঁছায় MOXIE। যন্ত্রটির ওজন প্রায় ১৫ কিলোগ্রাম। আকারে এটি একটি ছোট মাইক্রোওভেন বা টোস্টারের মতো।
প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য ছিল প্রতি ঘণ্টায় ৬ গ্রাম অক্সিজেন উৎপাদন। কিন্তু পরীক্ষার শেষ পর্যায়ে MOXIE ঘণ্টায় ১২ গ্রাম পর্যন্ত অক্সিজেন উৎপাদন করে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যের দ্বিগুণ।
কীভাবে তৈরি হল অক্সিজেন?
মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন আলাদা অবস্থায় খুব কম থাকলেও কার্বন ডাই অক্সাইডে বিপুল পরিমাণ অক্সিজেন আবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।
কার্বন ডাই অক্সাইডের রাসায়নিক সংকেত হল CO₂। অর্থাৎ একটি কার্বন পরমাণুর সঙ্গে দুটি অক্সিজেন পরমাণু যুক্ত থাকে।
বিজ্ঞানীদের কাজ ছিল এই অণুকে ভেঙে অক্সিজেনকে আলাদা করা।
MOXIE এই কাজ করেছে ‘সলিড অক্সাইড ইলেক্ট্রোলাইসিস’ (Solid Oxide Electrolysis) নামের একটি প্রযুক্তির সাহায্যে।
ধাপে ধাপে কীভাবে কাজ করে MOXIE?
প্রথম ধাপে যন্ত্রটি মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড সংগ্রহ করে।
এর জন্য ব্যবহার করা হয় বিশেষ ধুলোরোধী ফিল্টার। কারণ মঙ্গলগ্রহে ধুলোর পরিমাণ অত্যন্ত বেশি।
এরপর স্ক্রল পাম্পের সাহায্যে গ্যাসকে সংকুচিত করা হয়।
সংকুচিত গ্যাসকে প্রায় ৮০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়।
এই উত্তপ্ত কার্বন ডাই অক্সাইডকে একটি বিশেষ সেরামিক ইলেক্ট্রোলাইজার সেলের মধ্যে পাঠানো হয়।
সেখানে বৈদ্যুতিক প্রবাহের মাধ্যমে CO₂ অণুগুলি ভেঙে যায়।
ফলাফল হিসেবে তৈরি হয়—
অক্সিজেন আয়ন
কার্বন মনোক্সাইড
অক্সিজেন আয়ন পরবর্তীতে একত্রিত হয়ে আণবিক অক্সিজেন বা O₂ তৈরি করে।
এই উৎপাদিত অক্সিজেনের বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করে MOXIE নিজেই।
পরীক্ষায় দেখা যায়, উৎপাদিত অক্সিজেনের বিশুদ্ধতা ছিল প্রায় ৯৮ শতাংশ।
মোট কত অক্সিজেন তৈরি করেছে?
MOXIE তার কার্যকাল জুড়ে মোট ১২২ গ্রাম অক্সিজেন উৎপাদন করেছে।
শুনতে পরিমাণটি কম মনে হতে পারে। কিন্তু এটি ছিল প্রযুক্তি যাচাইয়ের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প।
এই পরিমাণ অক্সিজেন একজন মানুষের প্রায় তিন ঘণ্টা শ্বাস নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
বিজ্ঞানীদের কাছে মূল সাফল্য ছিল অক্সিজেনের পরিমাণ নয়, বরং মঙ্গলের পরিবেশে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা প্রমাণ করা।
মঙ্গলের বিভিন্ন পরিস্থিতিতেও সফল
মঙ্গলগ্রহের আবহাওয়া পৃথিবীর তুলনায় অনেক বেশি প্রতিকূল।
দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য বিশাল।
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গেও বায়ুমণ্ডলীয় ঘনত্বের পরিবর্তন ঘটে।
বিজ্ঞানীরা জানতে চেয়েছিলেন, এই পরিবর্তনগুলির মধ্যে MOXIE সমান দক্ষতায় কাজ করতে পারে কি না।
পরীক্ষায় দেখা যায়, সকাল, দুপুর, রাত—সব সময়েই যন্ত্রটি সফলভাবে অক্সিজেন তৈরি করেছে।
মঙ্গলের বিভিন্ন ঋতুতেও এর কার্যক্ষমতা বজায় ছিল।
এটি প্রমাণ করে যে প্রযুক্তিটি বাস্তব পরিস্থিতিতে ব্যবহারযোগ্য।
ভবিষ্যতের মানব মঙ্গল অভিযানে কী ভূমিকা?
MOXIE-এর সবচেয়ে বড় গুরুত্ব এখানেই।
মাইকেল হেচ্টের হিসাব অনুযায়ী, চার জন মহাকাশচারীকে মঙ্গল থেকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন হবে প্রায় ২৫ মেট্রিক টন তরল অক্সিজেন।
শুধু শ্বাস নেওয়ার জন্যই এক বছরের অভিযানে প্রয়োজন হতে পারে আরও প্রায় এক মেট্রিক টন অক্সিজেন।
বর্তমান MOXIE এত বড় চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম নয়।
তবে প্রযুক্তিটি কাজ করে—এটাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
ভবিষ্যতে একই প্রযুক্তির বড় সংস্করণ তৈরি করা হলে মঙ্গলের মাটিতেই প্রয়োজনীয় অক্সিজেন উৎপাদন সম্ভব হতে পারে।
কত বড় যন্ত্র লাগবে?
গবেষকদের মতে, মানুষের ব্যবহারের উপযোগী সিস্টেমকে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ২ থেকে ৩ কিলোগ্রাম অক্সিজেন তৈরি করতে হবে।
তার জন্য প্রয়োজন হবে ২৫ থেকে ৩০ কিলোওয়াট নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ।
এটি বর্তমান MOXIE প্রোটোটাইপের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যবস্থা।
এই ধরনের সিস্টেম মহাকাশচারীদের আগমনের অন্তত এক বছর আগে মঙ্গলে পাঠাতে হবে।
সিস্টেমটি নিরবচ্ছিন্নভাবে অক্সিজেন উৎপাদন করে মজুত করবে।
তারপর মানুষ পৌঁছালে সেই মজুত অক্সিজেন ব্যবহার করতে পারবে।
এখনও কী কী চ্যালেঞ্জ বাকি?
MOXIE প্রযুক্তির সফলতা সত্ত্বেও মঙ্গলে মানুষের স্থায়ী উপস্থিতি এখনও অনেক দূরের লক্ষ্য।
বড় চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে রয়েছে—
পর্যাপ্ত শক্তি উৎপাদন
বিকিরণ থেকে সুরক্ষা
খাদ্য উৎপাদন
পানির জোগান
দীর্ঘমেয়াদি আবাসন
চিকিৎসা ব্যবস্থা
অর্থনৈতিক ব্যয়
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
এই সমস্যাগুলির কোনওটিরই পূর্ণ সমাধান এখনও হয়নি।
তবে অক্সিজেন উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা অতিক্রম করা গেছে।
কেন ঐতিহাসিক এই সাফল্য?
মানব ইতিহাসে এই প্রথম কোনও ভিনগ্রহে স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে মানুষের প্রয়োজনীয় একটি মৌলিক উপাদান তৈরি করা হয়েছে।
এটি শুধু প্রযুক্তিগত কৃতিত্ব নয়, মহাকাশ অনুসন্ধানের দর্শনকেও বদলে দিতে পারে।
এতদিন মহাকাশ অভিযানে পৃথিবী থেকে প্রয়োজনীয় সব কিছু বহন করতে হত।
MOXIE দেখিয়ে দিয়েছে, ভবিষ্যতে অন্য গ্রহের সম্পদ ব্যবহার করেই সেখানে বসবাসের উপকরণ তৈরি করা সম্ভব।
এই ধারণাকেই বলা হয় In-Situ Resource Utilization বা ISRU।
মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যৎ অনেকটাই এই ধারণার উপর নির্ভর করছে।
নতুন যুগের সূচনা
MOXIE এখনও মানুষের বসবাসের উপযোগী পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নয়। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত প্রদর্শনী। কিন্তু বড় সাফল্যের সূচনা প্রায়ই ছোট পরীক্ষার মধ্য দিয়েই হয়।
যে ভাবে ১৯০৩ সালে রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের কয়েক সেকেন্ডের উড়ান আধুনিক বিমান চলাচলের ভিত্তি তৈরি করেছিল, অনেক বিজ্ঞানীর মতে MOXIE-ও তেমনই একটি সূচনা।
মঙ্গলগ্রহে মানুষের স্থায়ী বসবাসের পথ এখনও দীর্ঘ। কিন্তু সেই পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা খুলে দিয়েছে MOXIE। এতদিন যা ছিল বৈজ্ঞানিক কল্পনা, তা এখন বাস্তব পরীক্ষায় সফল হয়েছে।
মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে তাই MOXIE-এর নাম চিরকাল একটি যুগান্তকারী প্রযুক্তি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মঙ্গল জয়ের স্বপ্নে নতুন অধ্যায়
মঙ্গলগ্রহকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ নতুন নয়। বহু দশক ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, পৃথিবীর বাইরে মানুষের স্থায়ী বসবাসের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় জায়গা হতে পারে মঙ্গল। সৌরজগতের অন্য গ্রহগুলির তুলনায় মঙ্গলের দিনের দৈর্ঘ্য পৃথিবীর কাছাকাছি, সেখানে ঋতু পরিবর্তন হয় এবং মেরু অঞ্চলে বরফের অস্তিত্বও পাওয়া গিয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই লাল গ্রহকে ভবিষ্যতের ‘দ্বিতীয় পৃথিবী’ হিসেবে কল্পনা করা হচ্ছে।
তবে বাস্তবে মঙ্গলে মানুষের বসবাস গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন। পৃথিবী থেকে গড়ে প্রায় ২২.৫ কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রহে প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম পাঠানো ব্যয়সাপেক্ষ এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে জটিল। সেই কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলিতে মহাকাশ গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হয়ে উঠেছে ‘ইন-সিটু রিসোর্স ইউটিলাইজ়েশন’ বা স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার। অর্থাৎ, পৃথিবী থেকে সব কিছু নিয়ে না গিয়ে মঙ্গলে যা পাওয়া যাবে, তা দিয়েই প্রয়োজনীয় উপকরণ তৈরি করা।
MOXIE-এর সাফল্য এই ধারণাকে বাস্তব রূপ দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে শুধু অক্সিজেন নয়, মঙ্গলের স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে জ্বালানি, নির্মাণসামগ্রী, এমনকি পানীয় জলও তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মঙ্গলের মাটিতে থাকা বরফ গলিয়ে জল সংগ্রহের সম্ভাবনা রয়েছে। সেই জলকে ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনও উৎপাদন করা যেতে পারে।
মঙ্গলে বসতি গড়ার ক্ষেত্রে কী কী প্রয়োজন?
অক্সিজেন তৈরি হওয়া নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। তবে শুধু অক্সিজেন থাকলেই মঙ্গলে মানুষের বসবাস সম্ভব হবে না। তার জন্য আরও অনেক পরিকাঠামো প্রয়োজন।
প্রথমত, নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল অত্যন্ত পাতলা হওয়ায় সেখানে মহাজাগতিক বিকিরণের মাত্রা পৃথিবীর তুলনায় অনেক বেশি। দীর্ঘদিন এই বিকিরণের মধ্যে থাকলে মানুষের শরীরে ক্যানসার-সহ একাধিক জটিল রোগ দেখা দিতে পারে। তাই মঙ্গলে এমন আবাসন তৈরি করতে হবে যা বিকিরণ প্রতিরোধ করতে সক্ষম।
দ্বিতীয়ত, খাদ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা প্রয়োজন। পৃথিবী থেকে নিয়মিত খাদ্য পাঠানো বাস্তবসম্মত নয়। ফলে গ্রিনহাউস প্রযুক্তির সাহায্যে মঙ্গলের মাটিতে বা কৃত্রিম পরিবেশে শস্য উৎপাদনের পথ খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা।
তৃতীয়ত, নিরবচ্ছিন্ন শক্তির উৎস দরকার। MOXIE-এর মতো বৃহৎ অক্সিজেন উৎপাদনকারী যন্ত্র চালাতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে। মঙ্গলে সৌরশক্তি ব্যবহার করা গেলেও ধুলিঝড়ের কারণে তা সব সময় নির্ভরযোগ্য নাও হতে পারে। তাই ভবিষ্যতে ছোট আকারের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নাসার পরবর্তী পরিকল্পনা কী?
MOXIE-এর সফলতার পর নাসা এবং অন্যান্য মহাকাশ সংস্থা আরও উন্নত প্রযুক্তি তৈরির দিকে নজর দিচ্ছে। বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য, এমন একটি পূর্ণাঙ্গ অক্সিজেন উৎপাদন ব্যবস্থা তৈরি করা যা মানুষের ব্যবহারের উপযোগী পরিমাণে অক্সিজেন উৎপাদন করতে পারবে।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মানুষ পাঠানোর আগে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র মঙ্গলে পাঠানো হতে পারে। তারা সেখানে কয়েক বছর ধরে অক্সিজেন ও জ্বালানি তৈরি করে মজুত রাখবে। সমস্ত কিছু ঠিকঠাক কাজ করছে নিশ্চিত হওয়ার পরই মহাকাশচারীদের পাঠানো হবে।
এতে অভিযানের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে। কারণ মহাকাশচারীরা পৌঁছানোর আগেই তাদের প্রয়োজনীয় সম্পদের একটি অংশ মঙ্গলে প্রস্তুত থাকবে।
অন্যান্য দেশও কেন আগ্রহী?
শুধু আমেরিকা নয়, বিশ্বের একাধিক দেশ মঙ্গল গবেষণায় বিনিয়োগ করছে। European Space Agency, China National Space Administration এবং Indian Space Research Organisation-সহ বিভিন্ন সংস্থা মঙ্গল অভিযানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
ভারতের Mars Orbiter Mission ইতিমধ্যেই মঙ্গল গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত মঙ্গল মিশনের পরিকল্পনাও রয়েছে। ফলে MOXIE-এর সাফল্য শুধু নাসার নয়, গোটা আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা সম্প্রদায়ের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে কেন স্মরণীয় থাকবে MOXIE?
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসে কিছু পরীক্ষা তাদের তাৎক্ষণিক ফলাফলের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার জন্য বিখ্যাত হয়ে থাকে। MOXIE ঠিক তেমনই একটি প্রকল্প।
মোট ১২২ গ্রাম অক্সিজেন উৎপাদন শুনতে খুব বড় কিছু না মনে হলেও এর গুরুত্ব অন্য জায়গায়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রথমবার প্রমাণিত হল যে, পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনও গ্রহের সম্পদ ব্যবহার করে মানুষের প্রয়োজনীয় শ্বাসযোগ্য অক্সিজেন তৈরি করা সম্ভব।
এটি এমন এক প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরি করল, যার উপর দাঁড়িয়ে আগামী কয়েক দশকে মঙ্গলে মানুষের উপস্থিতি বাস্তবে রূপ নিতে পারে। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, MOXIE এখনও শেষ কথা নয়; বরং এটি ভবিষ্যতের আরও বড় প্রযুক্তির প্রথম খসড়া।
মঙ্গলগ্রহে মানুষের পদচিহ্ন পড়তে এখনও হয়তো সময় লাগবে। কিন্তু সেই দিন যখন আসবে, তখন ইতিহাসের পাতায় MOXIE-এর নাম বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে লেখা থাকবে। কারণ এই ছোট যন্ত্রটিই প্রথম দেখিয়েছিল, পৃথিবীর বাইরে অন্য এক গ্রহেও মানুষ নিজের শ্বাস নেওয়ার বাতাস নিজেই তৈরি করতে পারে।