Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

নিত্যদিনের ভুলেই দাঁতের সর্বনাশ কী এই পেরিমোলাইসিস রোগ

বয়স বাড়লেই দাঁতের ক্ষয় হয়—এই ধারণা ভুল প্রতিদিনের কিছু সাধারণ অভ্যাস নীরবে দাঁতের এনামেল নষ্ট করে দিতে পারে ছোট থেকে বড় যে কোনও বয়সেই এই সমস্যার ঝুঁকি থাকে তাই কোন কোন অভ্যাস দাঁতের ক্ষয়ের জন্য দায়ী তা আগে থেকেই জেনে সতর্ক হওয়াই সবচেয়ে জরুরি

পেরিমোলাইসিস: রোজের অভ্যাসেই নীরবে গলে যাচ্ছে দাঁতের এনামেল

দাঁত নিয়ে সমস্যায় ভোগেননি এমন মানুষ সত্যিই কম। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা দাঁতের যত্নকে গুরুত্ব দিই তখনই, যখন ব্যথা অসহ্য হয়ে ওঠে বা দাঁতের গর্ত এতটাই বড় হয়ে যায় যে খাওয়া-দাওয়া দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়। অথচ দাঁতের ক্ষয় এক দিনে হয় না। দীর্ঘদিনের অবহেলা, ভুল খাদ্যাভ্যাস, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং পাকস্থলীর অ্যাসিডজনিত সমস্যা মিলেই ধীরে ধীরে দাঁতের উপরিভাগের শক্ত আবরণ—এনামেল—ক্ষয়ে যেতে থাকে। এই ক্ষয়ের একটি বিশেষ নাম রয়েছে—পেরিমোলাইসিস


 পেরিমোলাইসিস কী?

পেরিমোলাইসিস হল এমন এক ধরনের দাঁতের রোগ যেখানে পাকস্থলীর অ্যাসিড বারবার মুখগহ্বরে উঠে এসে দাঁতের এনামেলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সাধারণত অ্যাসিড রিফ্লাক্স, দীর্ঘদিনের অম্বল, বমির প্রবণতা বা অম্ল জাতীয় খাবারের আধিক্যের ফলে এই সমস্যা দেখা দেয়।

এনামেল মানবদেহের সবচেয়ে শক্ত পদার্থ হলেও এটি একবার ক্ষয়ে গেলে আর স্বাভাবিক ভাবে ফিরে আসে না। তাই এই রোগকে অবহেলা করলে ভবিষ্যতে দাঁতের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।


 অ্যাসিড কীভাবে দাঁতের ক্ষয় ঘটায়?

আমাদের পাকস্থলীতে হজমের জন্য শক্তিশালী হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড থাকে। এই অ্যাসিড যদি নিয়মিত ভাবে মুখে ফিরে আসে, তবে তা দাঁতের উপরিভাগে থাকা ক্যালসিয়াম ও ফসফেট ভেঙে দেয়।

ফলাফল:

দাঁতে শিরশিরানি

ঠান্ডা বা গরমে সংবেদনশীলতা

দাঁতের রং হলদে হয়ে যাওয়া

দাঁতের ধার ক্ষয়ে যাওয়া

মাড়িতে জ্বালা

দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে দাঁতে গর্ত, ইনফেকশন এমনকি দাঁত পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থাও তৈরি হতে পারে।


দাঁতের রোগ কতটা সাধারণ?

ভারতের প্রাপ্তবয়স্কদের একটি বড় অংশ দাঁতের কোনও না কোনও সমস্যায় ভোগেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে প্রায় ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষের দাঁতের রোগ রয়েছে। শিশু-কিশোরদের মধ্যেও এই সমস্যা বাড়ছে।

এটি শুধু মুখের সমস্যা নয়—দাঁতের সংক্রমণ দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এমনকি ব্রেন স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।


 কোন অভ্যাস বদলাবেন?

১️⃣ অতিরিক্ত মিষ্টি ও আঠালো খাবার

চকোলেট, ক্যান্ডি, জেলি, লজেন্স, কিশমিশ, শুকনো খেজুর—এসব খাবার দাঁতে লেগে থাকে। মুখের ব্যাকটেরিয়া এগুলো ভেঙে অ্যাসিড তৈরি করে। সেই অ্যাসিড এনামেল ক্ষয় করে।

দাঁতের সমস্যা আমরা অনেক সময় হালকাভাবে নিই। মনে করি সামান্য শিরশিরানি, একটু রক্তপাত বা দাঁতে দাগ পড়া বড় কোনও বিষয় নয়। কিন্তু বাস্তবে দাঁতের ক্ষয় শুধু একটি বাহ্যিক সমস্যা নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। পেরিমোলাইসিসের মতো রোগ নীরবে শুরু হয়, প্রথম দিকে খুব একটা ব্যথা বা অস্বস্তি না থাকায় অনেকেই বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। কিন্তু ধীরে ধীরে দাঁতের এনামেল ক্ষয়ে গেলে তার প্রভাব বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে।

news image
আরও খবর

প্রথমত, দাঁতের সুস্থতা সরাসরি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত। আমরা যখন কথা বলি, হাসি বা কারও সামনে নিজেকে উপস্থাপন করি, তখন মুখ ও দাঁতই প্রথম নজরে আসে। দাঁত যদি হলদে, ক্ষয়ে যাওয়া বা ভাঙাচোরা দেখায়, তবে অনেকের মধ্যেই এক ধরনের সংকোচ তৈরি হয়। সামাজিক মেলামেশায় অস্বস্তি বাড়ে, হাসতে দ্বিধা হয়, এমনকি কর্মক্ষেত্রেও আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে। একটি সুস্থ হাসি যেমন ব্যক্তিত্বকে উজ্জ্বল করে তোলে, তেমনই দাঁতের সমস্যা ব্যক্তিত্বকে ম্লান করে দিতে পারে।

দ্বিতীয়ত, দাঁতের ক্ষয় খাওয়াদাওয়ার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। দাঁতে এনামেল ক্ষয়ে গেলে ঠান্ডা, গরম, টক বা মিষ্টি খাবারে তীব্র শিরশিরানি হয়। ধীরে ধীরে মানুষ কিছু খাবার এড়িয়ে চলতে শুরু করে। ফলে খাদ্যতালিকা অসম্পূর্ণ হয়ে যায় এবং শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। দাঁতের সমস্যার কারণে অনেকেই শক্ত খাবার খেতে পারেন না, ফলে চিবিয়ে খাওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হয়। এতে হজমের সমস্যা বাড়তে পারে।

তৃতীয়ত, দাঁতের রোগের সঙ্গে শরীরের অন্যান্য জটিল রোগের সম্পর্ক রয়েছে। মুখগহ্বরের সংক্রমণ দীর্ঘদিন অবহেলা করলে তা রক্তের মাধ্যমে শরীরের অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী মাড়ির রোগ হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এমনকি ব্রেন স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অর্থাৎ দাঁতের যত্ন না নেওয়া মানে শুধু মুখের সমস্যা নয়, সমগ্র শরীরের জন্য ঝুঁকি তৈরি করা।

পেরিমোলাইসিস বিশেষভাবে বিপজ্জনক কারণ এটি ধীরে ধীরে এনামেল গলিয়ে দেয়। এনামেল একবার ক্ষয়ে গেলে তা আর স্বাভাবিক ভাবে ফিরে আসে না। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ চিহ্নিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে করেন দাঁতে ব্যথা না থাকলে সমস্যা নেই। কিন্তু এনামেল ক্ষয়ের প্রাথমিক লক্ষণ ব্যথাহীন হতে পারে। তাই নিয়মিত দন্ত পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।

সচেতনতা মানে শুধু রোগের নাম জানা নয়, বরং দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন আনা। যেমন অতিরিক্ত কার্বোনেটেড পানীয় এড়িয়ে চলা, ধূমপান বন্ধ করা, মিষ্টি ও আঠালো খাবার কম খাওয়া, সঠিক পদ্ধতিতে ব্রাশ করা ইত্যাদি। অনেকেই জানেন না যে খুব জোরে ব্রাশ করলে এনামেল ক্ষয় হয়। আবার অ্যাসিডিক খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশ করাও ক্ষতিকর হতে পারে। এসব ছোট ছোট তথ্য জানলেই অনেক বড় ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।

অভিভাবকদের ক্ষেত্রেও সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের দুধের দাঁত উঠলেই যত্ন শুরু করা উচিত। অনেকেই ভাবেন দুধের দাঁত তো একদিন পড়ে যাবে, তাই বিশেষ যত্নের প্রয়োজন নেই। কিন্তু দুধের দাঁতের অবহেলা ভবিষ্যতের স্থায়ী দাঁতের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। ছোটবেলা থেকেই সঠিক ব্রাশিং অভ্যাস গড়ে তুললে ভবিষ্যতে দাঁতের রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।

সামাজিক পর্যায়েও সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। স্কুল, অফিস এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে দাঁতের স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রচার চালানো উচিত। স্বাস্থ্য শিবির, বিনামূল্যে দন্ত পরীক্ষা, সচেতনতামূলক কর্মসূচি—এসব উদ্যোগ মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করতে পারে। কারণ অধিকাংশ মানুষ দাঁতের সমস্যাকে জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখেন না।

এছাড়া মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও দাঁতের সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘদিনের ব্যথা বা অস্বস্তি মানুষকে খিটখিটে করে তোলে। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। কাজের প্রতি মনোযোগ কমে যায়। এসব বিষয় জীবনের সামগ্রিক মানকে প্রভাবিত করে। তাই দাঁতের যত্ন নেওয়া মানে নিজের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।


 উপসংহার

দাঁত মানবদেহের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমরা খাই, কথা বলি, হাসি—সব ক্ষেত্রেই দাঁতের ভূমিকা অপরিহার্য। অথচ এই অঙ্গটির যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা সবচেয়ে বেশি অবহেলা করি। পেরিমোলাইসিস এমন এক রোগ যা ধীরে ধীরে দাঁতের শক্ত সুরক্ষা স্তর এনামেলকে গলিয়ে দেয়। শুরুতে সমস্যা বোঝা না গেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা গুরুতর হয়ে ওঠে।

আমাদের প্রতিদিনের খাবার, পানীয়, ধূমপানের অভ্যাস, এমনকি ব্রাশ করার পদ্ধতিও দাঁতের সুস্থতার উপর গভীর প্রভাব ফেলে। সামান্য অসাবধানতা দীর্ঘমেয়াদে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। দাঁতের এনামেল একবার ক্ষয়ে গেলে তা আর ফিরে আসে না—এই সত্যটি মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

সচেতনতা, সঠিক অভ্যাস এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ—এই তিনটি বিষয় দাঁতের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার মূল চাবিকাঠি। বছরে অন্তত একবার দন্ত চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করানো উচিত, যদিও কোনও সমস্যা না থাকে। কারণ অনেক সময় রোগের লক্ষণ চোখে পড়ে না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে ক্ষয় চলতেই থাকে

পরিবারের ছোটদের থেকে বড়দের—সবার ক্ষেত্রেই দাঁতের যত্নকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত জলপান, ধূমপান বর্জন, সঠিক ব্রাশিং এবং নিয়মিত কুলকুচি—এই সাধারণ অভ্যাসগুলোই বড় রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে।

একটি সুস্থ হাসি শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি সুস্থ জীবনের প্রতিচ্ছবি। তাই আজ থেকেই দাঁতের যত্নে সচেতন হোন। ছোট ছোট পরিবর্তনই ভবিষ্যতে বড় সমস্যার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। দাঁতকে অবহেলা নয়, প্রাপ্য গুরুত্ব দিন—কারণ সুস্থ দাঁত মানেই সুস্থ জীবন।

 

Preview image