Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

১০০ দিনের কাজে গ্রামবাংলার বঞ্চনার ছবি, সুযোগ পেল মাত্র ৩৩ পঞ্চায়েত

পশ্চিমবঙ্গে ১০০ দিনের কাজ শুরু হলেও তা আপাতত সীমিত মাত্র ৩৩টি পঞ্চায়েতে। নবান্ন দ্রুত কাজ চালুর নির্দেশ দেওয়ায় জেলাজুড়ে প্রশাসনিক তৎপরতা বেড়েছে।

চার বছর পর রাজ্যে ফের চালু হয়েছে বহু প্রতীক্ষিত ‘১০০ দিনের কাজ’ বা মনরেগা প্রকল্প। গ্রামবাংলার লক্ষ লক্ষ জবকার্ডধারী মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই প্রকল্প পুনরায় চালুর অপেক্ষায় ছিলেন। অবশেষে ৯ জুন থেকে রাজ্যে ফের এই কাজ শুরু হলেও বাস্তব চিত্র সামনে আসতেই প্রশাসনিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, রাজ্যের মোট ৩,৩৩৯টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে এখনও পর্যন্ত মাত্র ৩৩টি পঞ্চায়েতে কাজ শুরু হয়েছে। বাকি ৩,৩০৬টি গ্রাম পঞ্চায়েতে কাজ শুরু না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে রীতিমতো ক্ষুব্ধ নবান্ন।

নবান্নের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই জেলাশাসকদের কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। দ্রুত প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতে কাজ চালুর জন্য অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে বলা হয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, রাজ্য সরকার চাইছে চলতি মাসের মধ্যেই মনরেগা প্রকল্পের নির্ধারিত শ্রমদিবস তৈরির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে। পশ্চিমবঙ্গের জন্য চলতি পর্যায়ে ১ কোটি ৫৩ লক্ষ শ্রমদিবস অনুমোদন করেছে কেন্দ্র। সেই লক্ষ্য পূরণ করাই এখন রাজ্যের অন্যতম বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আগামী ১ জুলাই থেকে মনরেগার পরিবর্তে দেশজুড়ে চালু হতে চলেছে নতুন প্রকল্প ‘১২৫ দিনের কাজ’ বা ‘ভিবি জি রাম জি’। ফলে তার আগে চলতি মাসের মধ্যে রাজ্যে মনরেগার বকেয়া লক্ষ্য পূরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে প্রশাসন। রাজ্যের পরিকল্পনা, ১ জুলাই থেকেই নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু করে গ্রামবাংলার জবকার্ডধারীদের হাতে দ্রুত কাজ পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু তার আগে পুরনো প্রকল্পের কাজ প্রত্যাশিত গতিতে শুরু না হওয়ায় নবান্নের চিন্তা আরও বেড়েছে।

৯ জুন হাওড়ার উলুবেড়িয়া ২ নম্বর ব্লকের জোয়ারগড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের জগরামপুর কর্মকারপাড়া থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্যে ১০০ দিনের কাজ পুনরায় চালু করা হয়। হাতে কোদাল নিয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু করেন পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। রাজ্যের পঞ্চায়েত দপ্তর এই কাজ পুনরায় চালু হওয়া নিয়ে জোরদার প্রচারও চালায়। দীর্ঘদিন পর গ্রামীণ কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প ফিরে আসায় অনেকেই আশাবাদী হয়েছিলেন। কিন্তু এক সপ্তাহের বেশি সময় কেটে গেলেও কাজের গতি খুব ধীর হওয়ায় প্রশাসনিক স্তরে অসন্তোষ বাড়ছে।

নবান্নের নির্দেশ ছিল, প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতে অন্তত দু’তিনটি করে স্কিমের কাজ দ্রুত চালু করতে হবে। কোথাও রাস্তা সংস্কার, কোথাও পুকুর খনন, কোথাও জলধারণ প্রকল্প, কোথাও গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নয়ন—এ ধরনের কাজ শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু অধিকাংশ পঞ্চায়েতেই এখনও পর্যন্ত সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। ফলে শুধু প্রশাসনিক নির্দেশ নয়, মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই ধীরগতির পিছনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক—দুই ধরনের কারণই রয়েছে। রাজ্যের অধিকাংশ গ্রাম পঞ্চায়েত তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে থাকলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বহু এলাকায় পঞ্চায়েত সদস্যরা প্রকাশ্যে সক্রিয় হতে পারছেন না বলে অভিযোগ উঠছে। বিভিন্ন জায়গায় জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে স্থানীয় ক্ষোভের ছবি সামনে এসেছে। কোথাও বিজেপির প্রতিবাদ, কোথাও সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ—সব মিলিয়ে মাঠপর্যায়ে অনেক পঞ্চায়েত প্রতিনিধি কাজ শুরু করার দায়িত্ব নিতে দ্বিধায় রয়েছেন বলে প্রশাসনিক মহলে আলোচনা চলছে।

এই পরিস্থিতিতে ১০০ দিনের কাজ পুনরায় চালুর দায়িত্ব অনেকটাই এসে পড়েছে সরকারি আধিকারিকদের ওপর। জবকার্ডধারীদের হাতে কাজ পৌঁছে দিতে ব্লক ও জেলা প্রশাসনকে সরাসরি তৎপর হতে বলা হয়েছে। নবান্নের কড়া বার্তার পর জেলায় জেলায় বৈঠক শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বলা হয়েছে, শুধু কাগজে-কলমে পরিকল্পনা নয়, মাঠে কাজ শুরু করাই এখন অগ্রাধিকার। প্রতিটি পঞ্চায়েতে দ্রুত স্কিম নির্বাচন, শ্রমিক তালিকা প্রস্তুত, কাজের মাপজোক এবং অর্থ বরাদ্দের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মনরেগা প্রকল্প বন্ধ হওয়ার আগে পশ্চিমবঙ্গ দেশে অন্যতম শীর্ষস্থানে ছিল। একসময় রাজ্যে ৩৬ থেকে ৪২ কোটি শ্রমদিবস তৈরি হয়েছিল বলে প্রশাসনিক মহলে দাবি করা হয়। সেই রেকর্ডকে সামনে রেখেই রাজ্য আবার গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পুরনো অবস্থান ফিরে পেতে চাইছে। কিন্তু চার বছর পর প্রকল্প চালু হওয়ায় মাঠপর্যায়ে অনেক কাঠামো নতুন করে সক্রিয় করতে হচ্ছে। কোথাও কাজের তালিকা তৈরি হয়নি, কোথাও শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি, কোথাও আবার প্রশাসনিক প্রস্তুতিতে ঘাটতি রয়েছে। ফলে শুরুতেই কাজের গতি প্রত্যাশিত নয়।

রাজ্য সরকার মনে করছে, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করতে ১০০ দিনের কাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু দরিদ্র পরিবার এই প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল। কৃষির বাইরে গ্রামে বিকল্প কাজের সুযোগ সীমিত। তাই মনরেগা চালু হলে গ্রামের শ্রমজীবী মানুষের হাতে নগদ অর্থ পৌঁছায়, স্থানীয় বাজারে ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ায়। সেই কারণেই প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে নবান্ন।

news image
আরও খবর

চলতি মাসের জন্য ৭০২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এই অর্থ কাজে লাগিয়ে দ্রুত শ্রমদিবস তৈরি করতে চাইছে রাজ্য। কিন্তু বরাদ্দ থাকলেই কাজ হবে না, তার জন্য প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তা। জবকার্ডধারীদের কাজে ডাকা, প্রকল্প নির্বাচন, অনুমোদন, মজুরি প্রক্রিয়া—সবকিছু সময়মতো না হলে লক্ষ্য পূরণ কঠিন হয়ে পড়বে। তাই জেলাশাসকদের পাশাপাশি বিডিও, পঞ্চায়েত আধিকারিক এবং স্থানীয় প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে বলা হয়েছে।

প্রশাসনিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে প্রতিটি জেলায় বিশেষ পর্যালোচনা বৈঠক হতে পারে। কোন পঞ্চায়েতে কাজ শুরু হয়েছে, কোথায় হয়নি, কেন হয়নি—এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট চাওয়া হতে পারে। যে পঞ্চায়েতগুলিতে এখনও কাজ শুরু হয়নি, সেখানে অবিলম্বে অন্তত কয়েকটি স্কিম চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে পঞ্চায়েত সদস্যদের অপেক্ষা না করে প্রশাসনিক স্তর থেকেই কাজ এগিয়ে নিতে বলা হয়েছে।

আগামী ১ জুলাই থেকে ‘১২৫ দিনের কাজ’ প্রকল্প চালুর প্রস্তুতিও একসঙ্গে চলছে। কেন্দ্রের শর্ত অনুযায়ী, প্রতিটি রাজ্যকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নতুন প্রকল্প চালু করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার চাইছে শুরু থেকেই এই প্রকল্পে এগিয়ে থাকতে। মনরেগার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে আরও বেশি শ্রমদিবস তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তার আগে বর্তমান পর্যায়ের কাজ দ্রুত শেষ করা জরুরি।

গ্রামবাংলার মানুষের কাছে ১০০ দিনের কাজ শুধু একটি সরকারি প্রকল্প নয়, এটি অনেক পরিবারের জীবিকার ভরসা। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় বহু জবকার্ডধারী আর্থিক সমস্যায় পড়েছিলেন। অনেকেই অন্য রাজ্যে কাজের খোঁজে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কৃষিকাজের মরসুমের বাইরে কাজ পাননি, কেউ আবার ধারদেনার ওপর নির্ভর করেছেন। তাই প্রকল্প পুনরায় চালুর খবর তাঁদের কাছে স্বস্তির হলেও বাস্তবে কাজ হাতে না পেলে সেই স্বস্তি পূর্ণতা পাবে না।

বিভিন্ন জেলার গ্রামীণ এলাকায় শ্রমিকদের মধ্যে এখন প্রশ্ন—কবে তাঁদের পঞ্চায়েতে কাজ শুরু হবে? অনেক জবকার্ডধারী পঞ্চায়েত অফিসে খোঁজ নিচ্ছেন। কিন্তু সব জায়গায় এখনও স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও বলা হচ্ছে স্কিম তৈরি হচ্ছে, কোথাও বলা হচ্ছে অনুমোদনের অপেক্ষা, কোথাও আবার স্থানীয় স্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কাজ এগোচ্ছে না। এই অনিশ্চয়তা দূর করতেই নবান্ন দ্রুত পদক্ষেপ চাইছে।

রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, প্রচার বেশি হলেও বাস্তবে কাজের গতি অত্যন্ত ধীর। অন্যদিকে শাসকপক্ষের দাবি, দীর্ঘদিন প্রকল্প বন্ধ থাকার পর পুনরায় চালু করতে কিছুটা সময় লাগা স্বাভাবিক। তবে নবান্নের কড়া নির্দেশের পর প্রশাসন এখন দ্রুত পরিস্থিতি বদলাতে চাইছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে রাজ্যের বহু পঞ্চায়েতে কাজ শুরু হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে জেলাশাসকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদেরই মাঠপর্যায়ে কাজের গতি বাড়াতে হবে। প্রতিটি ব্লক থেকে নিয়মিত রিপোর্ট নিতে হবে। যে পঞ্চায়েতে সমস্যা রয়েছে, সেখানে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রমিকদের কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা, মজুরি প্রদানের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখা এবং প্রকল্পের বাস্তবায়ন সময়মতো করা—সবকিছুই এখন প্রশাসনের নজরে।

সব মিলিয়ে, চার বছর পর ১০০ দিনের কাজ ফিরে এলেও শুরুটা মোটেই মসৃণ হয়নি। মাত্র ৩৩টি পঞ্চায়েতে কাজ শুরু হওয়া রাজ্যের কাছে উদ্বেগের বিষয়। নবান্ন তাই আর সময় নষ্ট করতে রাজি নয়। চলতি মাসের মধ্যেই ১ কোটি ৫৩ লক্ষ শ্রমদিবস তৈরির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে প্রতিটি জেলা, প্রতিটি ব্লক এবং প্রতিটি পঞ্চায়েতকে দ্রুত সক্রিয় হতে হবে। গ্রামবাংলার জবকার্ডধারীদের হাতে কাজ পৌঁছানোই এখন রাজ্য সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

আগামী কয়েক দিন তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের তৎপরতা কতটা ফল দেয়, কত দ্রুত বাকি পঞ্চায়েতগুলিতে কাজ শুরু হয় এবং শ্রমিকরা বাস্তবে কাজ পান কি না—সেই দিকেই নজর থাকবে গ্রামবাংলার মানুষের। নবান্নের কড়া বার্তার পর যদি দ্রুত কাজ শুরু হয়, তবে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর গ্রামীণ কর্মসংস্থানে নতুন গতি আসতে পারে। আর ১ জুলাই থেকে ১২৫ দিনের কাজ শুরু হলে তা গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য আরও বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।

Preview image