Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ডুরান্ড কাপের ড্রতেই চমক! গ্রুপ পর্বেই ডার্বির আগুন, বিদেশি জটে চাপে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান

আগামী ISL মরশুমে বিদেশি ফুটবলার খেলানোর নিয়ম এখনও চূড়ান্ত করেনি AIFF। ফলে ক্লাবগুলির দলগঠন পরিকল্পনা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

ডুরান্ড কাপ মানেই ভারতীয় ফুটবলের আবেগ, ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং গ্যালারি ভর্তি উন্মাদনার এক অনন্য মিশ্রণ। মরশুমের শুরুতে এই টুর্নামেন্ট ঘিরে সমর্থকদের আগ্রহ এমনিতেই অনেক বেশি থাকে। কারণ, নতুন দল, নতুন কোচিং পরিকল্পনা, নতুন বিদেশি ফুটবলার, নতুন কম্বিনেশন—সব কিছুর প্রথম ঝলক দেখা যায় এই মঞ্চেই। কিন্তু সেই ডুরান্ড কাপেই যদি মরশুমের প্রথম কলকাতা ডার্বির আবহ তৈরি হয়, তা হলে উত্তেজনার মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এ বারও ঠিক সেই ছবিই দেখা যাচ্ছে ভারতীয় ফুটবল মহলে। মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলকে ঘিরে ডুরান্ড কাপের ড্র প্রকাশের পর থেকেই সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

কলকাতা ডার্বি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, এটি বাংলার ফুটবল সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় উৎসবগুলির মধ্যে অন্যতম। মোহনবাগান বনাম ইস্টবেঙ্গল লড়াই মানেই আবেগের বিস্ফোরণ, গ্যালারির রং, ব্যানার, ঢাক, স্লোগান এবং নব্বই মিনিটের অদ্ভুত চাপা উত্তেজনা। মাঠে দু’দলের এগারো জন ফুটবলার লড়াই করলেও সেই ম্যাচের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে লক্ষ লক্ষ সমর্থকের আবেগ। তাই ডুরান্ড কাপের গ্রুপ পর্বেই যদি দুই প্রধানের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তা হলে মরশুমের শুরু থেকেই ভারতীয় ফুটবলে বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে কলকাতা।

গত বছরও ডুরান্ড কাপে মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল একই গ্রুপে পড়েছিল। ফলে ডার্বি দেখার অপেক্ষায় ছিল দুই দলের সমর্থকরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ম্যাচ মাঠে গড়ায়নি। আরজি কর-কাণ্ডের প্রতিবাদের আবহে বহু প্রতীক্ষিত ডার্বি বাতিল হয়ে যায়। ফলে সমর্থকদের মন খারাপ আরও বেড়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এ বার আবার ডুরান্ড কাপেই ডার্বির উত্তাপ ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় দুই শিবিরেই চর্চা তুঙ্গে। অনেকের মতে, মরশুমের শুরুতেই এই ম্যাচ দুই দলের মানসিক শক্তি, প্রস্তুতি এবং স্কোয়াডের গভীরতা যাচাই করার বড় মঞ্চ হতে পারে।

ডুরান্ড কাপের গুরুত্ব এখানেই শেষ নয়। এটি শুধু একটি প্রাক-মরশুম টুর্নামেন্ট নয়, বরং ভারতীয় ফুটবলের ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি প্রতিযোগিতা। বহু নামী ফুটবলার, কোচ এবং ক্লাবের স্মৃতির সঙ্গে ডুরান্ড কাপের নাম জড়িয়ে রয়েছে। মরশুমের শুরুতে এই টুর্নামেন্টে ভাল পারফরম্যান্স করলে দলের আত্মবিশ্বাস বাড়ে। আবার খারাপ ফল করলে মূল মরশুমের আগে চাপও বেড়ে যায়। বিশেষ করে মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলের মতো বড় ক্লাবের ক্ষেত্রে সমর্থকদের প্রত্যাশা সব সময়ই আকাশছোঁয়া থাকে।

এ বারের ডুরান্ড কাপ ঘিরে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অবশ্যই মরশুমের প্রথম সম্ভাব্য ডার্বি। দুই প্রধানের সমর্থকরাই জানতে চাইছেন, নতুন মরশুমে কাদের হাতে থাকবে দলের দায়িত্ব, কোন বিদেশি ফুটবলাররা খেলবেন, দেশীয় ফুটবলারদের মধ্যে কারা সুযোগ পাবেন এবং কোন কৌশলে দল সাজানো হবে। ডার্বির আগে সব সময়ই দল গঠনের খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা বেশি হয়। কারণ এই ম্যাচে শুধুমাত্র ফলাফল নয়, পারফরম্যান্সও সমর্থকদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডার্বি জিতলে মরশুমের শুরুতেই আত্মবিশ্বাসের বড় সঞ্চার হয়। আর হারলে সমালোচনার ঝড় উঠতে সময় লাগে না।

তবে মাঠের উত্তেজনার পাশাপাশি মাঠের বাইরে বেশ কিছু প্রশাসনিক ও দলগঠন সংক্রান্ত জটিলতা দুই প্রধানকেই ভাবাচ্ছে। নতুন মরশুমের আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বিদেশি ফুটবলার নিয়ে। এখনও পর্যন্ত সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন বা AIFF চূড়ান্তভাবে জানায়নি, আগামী ISL মরশুমে কত জন বিদেশি ফুটবলার রেজিস্টার করা যাবে এবং ম্যাচে কত জনকে মাঠে নামানো যাবে। গত মরশুমে ছ’জন বিদেশি ফুটবলার সই করানো গেলেও একসঙ্গে মাঠে নামানো যেত চার জনকে। কিন্তু এ বার সেই সংখ্যায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে ফুটবল মহলে জোর আলোচনা চলছে।

বিদেশি ফুটবলার নিয়মের এই অনিশ্চয়তা মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল—দুই ক্লাবের পরিকল্পনাতেই প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ বিদেশি ফুটবলারদের উপর বড় ক্লাবগুলির কৌশল অনেকটাই নির্ভর করে। একজন গোলস্কোরার স্ট্রাইকার, একজন সৃজনশীল মিডফিল্ডার, একজন শক্তিশালী ডিফেন্ডার কিংবা একজন অভিজ্ঞ গোলকিপার—দল সাজানোর প্রতিটি জায়গায় বিদেশি কোটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। যদি বিদেশি ফুটবলার মাঠে নামানোর সংখ্যা কমে যায়, তা হলে কোচদের কৌশল বদলাতে হবে। দেশীয় ফুটবলারদের দায়িত্বও অনেক বেশি বাড়বে।

মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল উভয় ক্লাবই জানে, শুধু ডুরান্ড কাপ নয়, ISL, সুপার কাপ এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতার জন্য শক্তিশালী স্কোয়াড তৈরি করা জরুরি। কিন্তু বিদেশি ফুটবলার নিয়ম স্পষ্ট না হলে দল গঠনের কাজ অনেকটাই জটিল হয়ে যায়। কোন পজিশনে বিদেশি নেওয়া হবে, কাকে রিটেন করা হবে, কাকে ছাড়া হবে, কাকে রেজিস্টার করা হবে—এসব সিদ্ধান্ত নিয়মের উপর নির্ভরশীল। ফলে ডার্বির আগে সমর্থকদের উত্তেজনার পাশাপাশি ক্লাব কর্তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজও স্পষ্ট।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল OCI বা ভারতীয় বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের ভূমিকা। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় ফুটবলে OCI ফুটবলারদের নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদি তাঁদের দেশীয় ফুটবলার হিসেবে গণ্য করার বিষয়ে কোনও নীতি তৈরি হয়, তা হলে ভারতীয় ফুটবলের দলগঠনের ছবিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এই বিষয়েও এখনও স্পষ্টতা না থাকায় ক্লাবগুলি চূড়ান্ত পরিকল্পনা করতে পারছে না। বিশেষ করে বড় ক্লাবগুলির কাছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভালো মানের OCI ফুটবলার এলে স্কোয়াডের মান অনেকটাই বাড়তে পারে।

news image
আরও খবর

এই পরিস্থিতিতে ডুরান্ড কাপ দুই প্রধানের জন্য শুধু মরশুমের প্রথম বড় পরীক্ষা নয়, বরং পরিকল্পনা যাচাইয়ের মঞ্চও হতে পারে। বিদেশি ফুটবলারদের অনিশ্চয়তা থাকলে কোচরা হয়তো দেশীয় ফুটবলারদের বেশি সুযোগ দিতে বাধ্য হবেন। তরুণ ফুটবলারদের জন্য এটি বড় সুযোগ হতে পারে। যারা নিয়মিত প্রথম একাদশে সুযোগ পান না, তাঁরা ডুরান্ড কাপে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ পেতে পারেন। একই সঙ্গে নতুন সই করা ফুটবলারদের ফিটনেস, বোঝাপড়া এবং ম্যাচ পরিস্থিতিতে পারফরম্যান্সও এই টুর্নামেন্টে যাচাই করা যাবে।

মোহনবাগানের ক্ষেত্রে সমর্থকদের প্রত্যাশা সব সময়ই অত্যন্ত বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দল শক্তিশালী স্কোয়াড, অভিজ্ঞ বিদেশি ফুটবলার এবং বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে এসেছে। ডুরান্ড কাপের মতো টুর্নামেন্টে মোহনবাগানের লক্ষ্য থাকবে মরশুমের শুরুতেই নিজেদের ছন্দ খুঁজে পাওয়া। ডার্বি যদি গ্রুপ পর্বেই হয়, তা হলে সবুজ-মেরুন শিবির চাইবে শুরুতেই ইস্টবেঙ্গলকে চাপে ফেলতে। কারণ ডার্বি জয় শুধু তিন পয়েন্ট নয়, সমর্থকদের কাছে তা মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।

অন্যদিকে ইস্টবেঙ্গলের কাছেও এই ডুরান্ড কাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে সমর্থকরা বড় সাফল্যের অপেক্ষায়। নতুন মরশুমে দল কেমন গড়ে ওঠে, কোন ফুটবলাররা দায়িত্ব নেন এবং বড় ম্যাচে দল কতটা লড়াকু মনোভাব দেখায়—এসব প্রশ্নের উত্তর ডুরান্ড কাপ থেকেই পাওয়া যেতে পারে। ডার্বির মঞ্চে ভালো ফল করলে লাল-হলুদ শিবিরে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হবে। বিশেষ করে মরশুমের শুরুতেই মোহনবাগানের বিরুদ্ধে ভাল পারফরম্যান্স করলে সমর্থকদের বিশ্বাস অনেকটাই বাড়বে।

ডার্বির আরেকটি বড় দিক হল মানসিক চাপ। মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল—দুই দলের ফুটবলারদেরই এই ম্যাচে আলাদা চাপ সামলাতে হয়। অনেক সময় কাগজে-কলমে যে দল শক্তিশালী, মাঠে সেই দলই জিতবে এমন কোনও নিশ্চয়তা থাকে না। ডার্বিতে ফর্ম, পরিসংখ্যান, অতীত ফল—সব কিছু অনেক সময় গৌণ হয়ে যায়। নব্বই মিনিটে যে দল চাপ সামলাতে পারে, সুযোগ কাজে লাগাতে পারে এবং আবেগের মধ্যে স্থির থাকতে পারে, তারাই এগিয়ে যায়। তাই ডুরান্ড কাপের ডার্বি শুধু স্কোয়াডের নয়, মানসিক দৃঢ়তারও পরীক্ষা।

সমর্থকদের দিক থেকেও এই ম্যাচের গুরুত্ব অপরিসীম। গত বছরের বাতিল হওয়া ডার্বির হতাশা এখনও অনেকের মনে রয়েছে। তাই এ বার যদি ডুরান্ড কাপেই দুই প্রধান মুখোমুখি হয়, তা হলে গ্যালারিতে প্রবল উন্মাদনা দেখা যেতে পারে। টিকিট, নিরাপত্তা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, যাতায়াত—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি নজরদারির প্রয়োজন হবে। কলকাতা ডার্বি ঘিরে আবেগ যেমন তীব্র, তেমনই প্রশাসনিক দিক থেকেও এই ম্যাচ পরিচালনা করা বড় দায়িত্ব। ফলে আয়োজকদেরও প্রস্তুতি নিতে হবে নিখুঁতভাবে।

 

 

 

Preview image