Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

নবান্নে শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠক, বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়

নবান্নে শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।

নবান্নে শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি প্রসেনজিৎ, কী নিয়ে আলোচনা?

রাজ্যের প্রশাসনিক সদর দফতর নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠক করলেন বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার বিকেলে নবান্নে পৌঁছন অভিনেতা। দীর্ঘ সময় বৈঠকের পর সন্ধ্যায় নবান্ন থেকে বেরিয়ে তিনি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কী আলোচনা হয়েছে, তিনি রাজনীতিতে যোগ দিতে চলেছেন কি না এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক জল্পনার সঙ্গে এই বৈঠকের কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না—এমন একাধিক প্রশ্নের উত্তর দেন টলিউডের ‘বুম্বাদা’।

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের নবান্নে উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়। কারণ, বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রভাবশালী এই অভিনেতাকে সাধারণত সক্রিয় রাজনীতির মঞ্চে দেখা যায় না। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তাঁর সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ হলেও তিনি বরাবরই প্রত্যক্ষ দলীয় রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। ফলে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ বৈঠক স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে রাজনৈতিক জল্পনার জন্ম দেয়।

তবে বৈঠক শেষে সমস্ত রাজনৈতিক জল্পনা কার্যত উড়িয়ে দেন প্রসেনজিৎ। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি স্পষ্ট করে জানান, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কোনও রাজনৈতিক আলোচনা হয়নি। বৈঠকটি ছিল মূলত সৌজন্যমূলক। পাশাপাশি বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি, আগামী দিনের পরিকল্পনা এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়ে তাঁদের কথা হয়েছে।

বিকেল থেকে সন্ধ্যা—নবান্নে দীর্ঘ সময় প্রসেনজিৎ

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিকেল পাঁচটার পর নবান্নে পৌঁছন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। এরপর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তাঁর বৈঠক শুরু হয়। প্রায় দু’ঘণ্টা নবান্নে ছিলেন তিনি। সন্ধ্যা সোয়া সাতটা নাগাদ নবান্ন থেকে বেরিয়ে আসেন অভিনেতা।

নবান্নের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা। প্রসেনজিৎ বাইরে আসতেই তাঁকে ঘিরে শুরু হয় প্রশ্নের পর প্রশ্ন। বৈঠকের উদ্দেশ্য কী ছিল, রাজনৈতিক কোনও বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, তিনি কোনও বিশেষ দায়িত্ব পেতে চলেছেন কি না কিংবা ভবিষ্যতে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কি না—সব প্রশ্নেরই উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেন অভিনেতা।

প্রসেনজিৎ জানান, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বসে তিনি কফি খেয়েছেন এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্প করেছেন। তাঁদের আলোচনায় বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের প্রয়োজন ও উন্নয়নসংক্রান্ত একাধিক বিষয় উঠে এসেছে। কিন্তু সেই আলোচনার সঙ্গে দলীয় রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই বলেই দাবি তাঁর।

রাজনীতিতে যোগদানের জল্পনা উড়িয়ে দিলেন অভিনেতা

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এর আগেও বহুবার জল্পনা তৈরি হয়েছে। ভোটের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রচারে চলচ্চিত্র জগতের পরিচিত মুখদের দেখা গেলেও প্রসেনজিৎ নিজেকে কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত করেননি। বরং তিনি বারবার জানিয়েছেন, বাংলা চলচ্চিত্র এবং সংস্কৃতির উন্নয়নই তাঁর প্রধান অগ্রাধিকার।

নবান্নের বৈঠকের পরও একই অবস্থান বজায় রাখলেন অভিনেতা। তাঁর বক্তব্য, তিনি কোনও দিন সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তা গোপন রাখবেন না। সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষকে জানিয়েই তিনি সেই পদক্ষেপ করবেন। সুতরাং রাজনৈতিক মহলে যে ধরনের আলোচনা চলছে, তার অধিকাংশই সত্য নয় বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

তবে একজন জনপ্রিয় অভিনেতার সঙ্গে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দীর্ঘ বৈঠক যে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে যখন রাজ্যের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক যোগদান নিয়ে নিয়মিত আলোচনা চলছে, তখন প্রসেনজিতের নবান্ন সফর নতুন করে কৌতূহল বাড়িয়েছে।

অভিনেতা নিজে অবশ্য বৈঠকটিকে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পকেন্দ্রিক বলেই ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, কোনও রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার পরিবর্তে শিল্পের স্বার্থে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করাটা স্বাভাবিক। বাংলা সিনেমাকে আরও শক্তিশালী করতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। সেই কারণেই প্রয়োজনীয় বিষয়গুলি মুখ্যমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরা হয়েছে।

আলোচনায় বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়ন

বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প দীর্ঘদিন ধরেই একাধিক সমস্যার মুখোমুখি। প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা কমে যাওয়া, বাংলা ছবির প্রদর্শনের পর্যাপ্ত সময় না পাওয়া, বড় বাজেটের ছবি নির্মাণে বিনিয়োগের অভাব, প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং জাতীয় স্তরে বাংলা ছবির বিপণন—এসব বিষয় নিয়ে টলিউডের পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেতারা বহুদিন ধরে কথা বলছেন।

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় বাংলা চলচ্চিত্রের সঙ্গে কয়েক দশক ধরে যুক্ত। অভিনেতার পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রির একজন অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্ব হিসেবেও তাঁকে দেখা হয়। বাংলা সিনেমার বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে তাঁকে বারবার সরব হতে দেখা গিয়েছে। তাই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে চলচ্চিত্র শিল্পের পরিকাঠামো, বিনিয়োগ এবং আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হওয়াকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।

প্রসেনজিৎ জানিয়েছেন, বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে এখনও অনেক কিছু প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মের অভিনেতা, পরিচালক ও প্রযুক্তিবিদদের জন্য আরও সুযোগ তৈরি করা, উন্নত স্টুডিয়ো ও পোস্ট-প্রোডাকশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বাংলা ছবির বাজার সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলি প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া বাস্তবায়ন করা কঠিন।

বাংলা সিনেমার নিজস্ব ঐতিহ্য থাকলেও বর্তমান সময়ে প্রতিযোগিতা অনেক বেড়েছে। হিন্দি ও দক্ষিণী ছবির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কনটেন্টও সহজে দর্শকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের ফলে দর্শকের বিনোদন দেখার অভ্যাসেও বড় পরিবর্তন এসেছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলা সিনেমাকে শুধু ঐতিহ্যের উপর নির্ভর না করে আধুনিক প্রযুক্তি, শক্তিশালী বিপণন এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগের পথে এগোতে হবে।

নবান্নের বৈঠকে এসব বিষয় কতটা বিস্তারিতভাবে আলোচনা হয়েছে, তা অভিনেতা প্রকাশ করেননি। তবে তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়ন ছিল বৈঠকের অন্যতম প্রধান বিষয়।

উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে প্রসেনজিতের আলোচনায় মহানায়ক উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপনের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তমকুমার একটি অবিস্মরণীয় নাম। কয়েক প্রজন্ম ধরে তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং চলচ্চিত্র বাঙালির আবেগের সঙ্গে যুক্ত।

২০২৬ সালে মহানায়ক উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বড় ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। তাঁর জন্মদিন ৩ সেপ্টেম্বরকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে বিশেষ আয়োজন হতে পারে। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, স্মারক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের নিয়ে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং উত্তমকুমারের জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রদর্শনীর মতো বিভিন্ন উদ্যোগের সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষকে যথাযথ মর্যাদায় উদ্‌যাপন করার বিষয়েও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে এই ধরনের সরকারি উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

উত্তমকুমারের সঙ্গে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের তুলনা বাংলা সিনেমার আলোচনায় বহুবার উঠে এসেছে। যদিও প্রসেনজিৎ নিজে বারবার জানিয়েছেন, উত্তমকুমার বাংলা চলচ্চিত্রের অনন্য ও অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর জায়গা অন্য কেউ নিতে পারেন না। কিন্তু উত্তম-পরবর্তী বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তারকাদের মধ্যে প্রসেনজিতের নাম অবশ্যই উল্লেখযোগ্য।

তাই মহানায়কের জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপনের পরিকল্পনায় প্রসেনজিতের অংশগ্রহণ সাংস্কৃতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রশাসনের সঙ্গে চলচ্চিত্র জগতের সমন্বয়ে বড় আকারে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করা গেলে তা বাংলা সিনেমার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।

বাংলা সিনেমায় নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা

নবান্ন থেকে বেরিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেন প্রসেনজিৎ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এখনই নির্দিষ্ট কোনও ঘোষণা করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে ইতিবাচক কিছু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলা সিনেমায় বড় বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিনের। দক্ষ অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও প্রযুক্তিবিদ থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় শুধুমাত্র বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে বড় পরিসরের ছবি তৈরি করা সম্ভব হয় না। উন্নত ভিএফএক্স, আধুনিক সেট, আন্তর্জাতিক মানের পোস্ট-প্রোডাকশন এবং সর্বভারতীয় প্রচারের জন্য যে অর্থ প্রয়োজন, তা অধিকাংশ বাংলা ছবির প্রযোজকদের নাগালের বাইরে থাকে।

এই পরিস্থিতিতে সরকারি সহযোগিতা, কর ছাড়, চলচ্চিত্রবান্ধব নীতি, সহজ শুটিং অনুমতি এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করার ব্যবস্থা বাংলা সিনেমার জন্য ইতিবাচক হতে পারে। চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি রাজ্যে নতুন স্টুডিয়ো, ফিল্ম সিটি, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ গড়ে উঠলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বহু কর্মসংস্থানও তৈরি হবে।

প্রসেনজিতের বক্তব্যে বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা উঠে আসায় টলিউডে নতুন আশা তৈরি হয়েছে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা রূপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে শিল্পী, কলাকুশলী এবং প্রযোজকদের।

প্রশাসন ও চলচ্চিত্র জগতের সমন্বয়ের প্রয়োজন

চলচ্চিত্র শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। এটি একটি বড় শিল্প এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। একটি ছবি নির্মাণের সঙ্গে অভিনেতা-অভিনেত্রী ছাড়াও পরিচালক, সহকারী পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, ক্যামেরাকর্মী, আলোকশিল্পী, মেকআপ আর্টিস্ট, পোশাকশিল্পী, সম্পাদক, সঙ্গীতশিল্পী, পরিবেশক, হলকর্মীসহ অসংখ্য মানুষ যুক্ত থাকেন।

ফলে চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়ন মানে শুধু তারকাদের উন্নয়ন নয়। এর সঙ্গে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা ও কর্মসংস্থান সরাসরি জড়িত। টলিউডের পরিকাঠামো শক্তিশালী হলে বাংলার অর্থনীতিতেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এই কারণেই চলচ্চিত্র জগতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রশাসনের নিয়মিত আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পের বাস্তব সমস্যা প্রশাসনের কাছে পৌঁছলে তার সমাধানের জন্য নির্দিষ্ট নীতি তৈরি করা সহজ হয়। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিজ্ঞ শিল্পী যদি সেই আলোচনায় অংশ নেন, তবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি শিল্পের বাস্তব প্রয়োজনগুলি তুলে ধরতে পারবেন।

news image
আরও খবর

অভিনেতা জানিয়েছেন, ইন্ডাস্ট্রির উপকারের জন্য কোনও কমিটি বা উদ্যোগে তাঁর উপস্থিতি প্রয়োজন হলে তিনি ইতিবাচকভাবে বিষয়টি বিবেচনা করবেন। তাঁর এই বক্তব্য থেকে মনে করা হচ্ছে, চলচ্চিত্র উন্নয়নসংক্রান্ত কোনও সরকারি বা যৌথ কমিটিতে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। তবে এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও ঘোষণা হয়নি।

বৈঠক ঘিরে রাজনৈতিক জল্পনা কেন?

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় নিজে রাজনৈতিক আলোচনা হয়নি বলে জানালেও বৈঠকটি ঘিরে জল্পনা সম্পূর্ণ থামেনি। এর অন্যতম কারণ বৈঠকের সময় এবং সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা।

নবান্ন সফরের কয়েক দিন আগেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তার পরপরই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ বৈঠক হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে নানা সমীকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের সাক্ষাৎ অনেক সময় শুধুমাত্র সৌজন্যমূলক হলেও তার রাজনৈতিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। বিশেষ করে কোনও নির্বাচন বা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে এমন সাক্ষাৎ হলে তা নিয়ে আলোচনা আরও বাড়ে।

অন্যদিকে, সাংস্কৃতিক মহলের বক্তব্য, একজন শিল্পী বা অভিনেতা প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করলেই তাকে রাজনৈতিক যোগদানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা উচিত নয়। চলচ্চিত্র শিল্পের সমস্যা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সরকারি সহায়তা নিয়ে আলোচনার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করা স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ।

প্রসেনজিৎও একই কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, বাইরে বিভিন্ন ধরনের জল্পনা চললেও তার অধিকাংশই সত্য নয়। রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তিনি নিজেই তা প্রকাশ্যে জানাবেন।

প্রসেনজিতের রাজনৈতিক অবস্থান

দীর্ঘ অভিনয় জীবনে প্রসেনজিৎ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। সরকারি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চলচ্চিত্র উৎসব এবং সামাজিক কর্মসূচিতে তাঁকে বিভিন্ন সরকারের আমলেই অংশ নিতে দেখা গিয়েছে।

তবে তিনি নিজেকে কোনও রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেননি। তাঁর প্রধান পরিচয় একজন অভিনেতা এবং বাংলা চলচ্চিত্রের প্রতিনিধি হিসেবেই।

বাংলা চলচ্চিত্রের স্বার্থে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাকে তিনি রাজনৈতিক আনুগত্য হিসেবে দেখতে রাজি নন। তাঁর মতে, শিল্পের উন্নয়নের জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা প্রয়োজন এবং সেই সহযোগিতা চাইতে শিল্পীদের এগিয়ে আসা উচিত।

নবান্নের বাইরে তাঁর বক্তব্যেও একই বার্তা পাওয়া গিয়েছে। তিনি বারবার বাংলা সিনেমা, বিনোদন শিল্প এবং সাংস্কৃতিক উন্নয়নের প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন। রাজনৈতিক প্রশ্নের উত্তর দিলেও তিনি কোনও দলের পক্ষে বা বিপক্ষে মন্তব্য করেননি।

সাংস্কৃতিক মহলে কী প্রতিক্রিয়া?

প্রসেনজিৎ ও শুভেন্দু অধিকারীর বৈঠককে ঘিরে টলিউডের অন্দরেও আলোচনা শুরু হয়েছে। শিল্পীদের একাংশ মনে করছেন, বাংলা চলচ্চিত্রের সমস্যা নিয়ে যদি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হয়, তবে তা অবশ্যই ইতিবাচক।

প্রেক্ষাগৃহের সংকট, বাংলা ছবির প্রদর্শনের সময়, শুটিংয়ের অনুমতি, স্টুডিয়োর পরিকাঠামো, শিল্পীদের সামাজিক নিরাপত্তা এবং টেকনিশিয়ানদের কর্মসংস্থান—এই সমস্ত বিষয় দীর্ঘদিন ধরে টলিউডে আলোচিত হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে এসব বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা তৈরি হলে সমগ্র শিল্প উপকৃত হবে।

তবে অন্য একটি অংশ বৈঠকের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। তাদের বক্তব্য, বাংলা চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য শুধু একজন তারকার সঙ্গে বৈঠক যথেষ্ট নয়। পরিচালক, প্রযোজক, টেকনিশিয়ান, হলমালিক, পরিবেশক এবং বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বৃহত্তর বৈঠক প্রয়োজন।

এই প্রেক্ষাপটে প্রসেনজিতের বৈঠককে একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। আগামী দিনে সরকার চলচ্চিত্র শিল্পের অন্য প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা করে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ।

বুম্বাদার কাঁধে টলিউডের প্রত্যাশা

বাংলা চলচ্চিত্র জগতে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা দীর্ঘদিনের। শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় শুরু করে তিনি কয়েক দশক ধরে বাংলা সিনেমার অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন। বাণিজ্যিক ছবি থেকে শুরু করে ভিন্ন ধারার সিনেমা—সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের অভিনয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

একসময় যখন বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমা কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন তাঁর ছবিগুলি প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টেনে এনেছিল। সেই কারণেই অনেকেই তাঁকে ভালোবেসে ‘ইন্ডাস্ট্রি’ নামে উল্লেখ করেন।

তাই বাংলা চলচ্চিত্রের সমস্যা নিয়ে তিনি প্রশাসনের কাছে কথা বললে শিল্পের বহু মানুষের প্রত্যাশা তৈরি হয়। শিল্পীরা আশা করছেন, এই বৈঠক শুধুমাত্র সৌজন্যমূলক কথাবার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আলোচনা থেকে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

প্রসেনজিৎ নিজেও বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, তাঁর উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত সুবিধা নয়। বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের সার্বিক উন্নয়নই তাঁর আলোচনার মূল বিষয়।

নতুন প্রজন্মের জন্য সুযোগ তৈরির দাবি

বাংলা সিনেমায় প্রতি বছর বহু তরুণ অভিনেতা, পরিচালক, লেখক ও প্রযুক্তিবিদ কাজের সুযোগের সন্ধানে আসেন। কিন্তু পর্যাপ্ত ছবি নির্মাণ না হওয়া এবং বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকেই নিয়মিত কাজ পান না।

নতুন বিনিয়োগ এলে ছবির সংখ্যা বাড়বে। পাশাপাশি ওয়েব সিরিজ, অ্যানিমেশন, তথ্যচিত্র, স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি এবং আন্তর্জাতিক সহ-প্রযোজনার ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

রাজ্য সরকার চলচ্চিত্র প্রশিক্ষণ, চলচ্চিত্র উৎসব, প্রতিভা অনুসন্ধান এবং জেলা স্তরে প্রেক্ষাগৃহ সংস্কারের উদ্যোগ নিলে বাংলা কনটেন্টের বাজার আরও বিস্তৃত হতে পারে। কলকাতার বাইরে বিভিন্ন জেলায় নতুন দর্শক তৈরি করাও বাংলা সিনেমার ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রসেনজিতের মতো একজন অভিজ্ঞ অভিনেতা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় এসব বিষয় তুলে ধরলে নতুন প্রজন্ম উপকৃত হতে পারে। যদিও বৈঠকের বিস্তারিত বিষয় এখনও প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও তাঁর বক্তব্যে চলচ্চিত্র শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচক ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে।

উত্তমকুমারের শতবর্ষ হতে পারে বাংলা সংস্কৃতির বড় উৎসব

মহানায়ক উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ শুধু চলচ্চিত্র জগতের অনুষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেই প্রত্যাশা সাংস্কৃতিক মহলের। এটি বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও সিনেমার আন্তর্জাতিক প্রচারের বড় সুযোগ হতে পারে।

উত্তমকুমারের উল্লেখযোগ্য ছবিগুলির পুনরুদ্ধার এবং ডিজিটাল সংরক্ষণ, দেশ-বিদেশে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, তাঁর অভিনয় নিয়ে গবেষণামূলক আলোচনা, বিশেষ ডাকটিকিট বা স্মারক প্রকাশ এবং তরুণ শিল্পীদের জন্য পুরস্কার চালু করার মতো পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।

স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরেও উত্তমকুমারের চলচ্চিত্র এবং বাংলা সিনেমার ইতিহাস নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম বাংলা সিনেমার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে।

এই ধরনের বৃহৎ উদ্যোগের জন্য সরকার ও চলচ্চিত্র জগতের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। প্রসেনজিৎ ও মুখ্যমন্ত্রীর আলোচনায় বিষয়টি উঠে আসায় জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠান নিয়ে প্রত্যাশা আরও বেড়েছে।

 

 

Preview image