Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

পুজোর আগে ওজন কমাতে সহায়ক ৫ সব্জির রস, ডায়েটে রাখুন এই পানীয়গুলি

পেটের মেদ কমানোর চেষ্টায় ডায়েটে রাখুন ৫ ধরনের সব্জির রস। নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবারের সঙ্গে এগুলি খেলে ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।

পুজো আসতে আর বেশি দেরি নেই। উৎসবের দিনগুলিতে পছন্দের পোশাকে নিজেকে সুন্দর ও আত্মবিশ্বাসী দেখতে কে না চান! বিশেষ করে পুজোর কেনাকাটা শুরু হয়ে গেলে অনেকেই নিজের শরীরের দিকে একটু বেশি নজর দিতে শুরু করেন। বাড়তি ওজন, পেটের মেদ বা ভুঁড়ি নিয়ে চিন্তিত থাকেন অনেকে। তবে অল্প সময়ে ওজন কমানোর জন্য খুব কড়া ডায়েট বা না খেয়ে থাকার মতো পদ্ধতি অনুসরণ করা ঠিক নয়।

স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণে খাবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত শাকসব্জি, ফল, প্রোটিন ও ফাইবার রাখা যেমন জরুরি, তেমনই পর্যাপ্ত জল পান এবং নিয়মিত শরীরচর্চাও প্রয়োজন। এর পাশাপাশি বিভিন্ন সব্জি দিয়ে তৈরি ঘরোয়া পানীয় রাখা যেতে পারে খাদ্যতালিকায়।

লাউ, আমলকি, ধনেপাতা, বিট, গাজর, পালংশাক, শসা, পুদিনা ও টম্যাটোর মতো উপাদান থেকে তৈরি পানীয় শরীরে বিভিন্ন পুষ্টি জোগাতে পারে। তবে মনে রাখা দরকার, কোনও একটি জুস সরাসরি পেটের চর্বি গলিয়ে দিতে পারে না। শরীরের নির্দিষ্ট একটি জায়গার মেদ আলাদা করে কমানোরও কোনও সহজ উপায় নেই। সামগ্রিকভাবে ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ, সুষম খাবার এবং শারীরিক সক্রিয়তার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ওজন কমানো সম্ভব।

তবু পুজোর আগে নিজের ডায়েটে কিছু স্বাস্থ্যকর পানীয় যোগ করতে চাইলে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এই পাঁচ ধরনের সব্জির রস রাখতে পারেন।

১. লাউ, আমলকি ও ধনেপাতার রস

লাউয়ে জলের পরিমাণ বেশি এবং এটি তুলনামূলকভাবে কম ক্যালোরির সব্জি। তাই স্বাস্থ্যকর খাবারের অংশ হিসেবে লাউ রাখা যেতে পারে। অন্যদিকে আমলকিতে রয়েছে ভিটামিন C-সহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান। ধনেপাতাও খাবারে স্বাদ ও বৈচিত্র্য যোগ করার পাশাপাশি কিছু মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সরবরাহ করে।

এই পানীয়টি তৈরি করতে এক কাপের মতো লাউ ছোট ছোট টুকরো করে নিতে পারেন। একটি আমলকির বীজ ফেলে দিয়ে লাউ ও আধ কাপের মতো ধনেপাতা মিক্সারে দিয়ে ভালোভাবে ব্লেন্ড করুন। প্রয়োজন হলে অল্প জল দিতে পারেন। এরপর ছেঁকে নিয়ে সামান্য লেবুর রস যোগ করা যায়। স্বাদ বাড়াতে অল্প ভাজা জিরের গুঁড়ো ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে লাউ কাঁচা খাওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। লাউয়ের স্বাদ যদি অস্বাভাবিক তেতো হয়, তা কখনও পান করবেন না। তেতো লাউয়ে ক্ষতিকর যৌগ থাকতে পারে, যা অসুস্থতার কারণ হতে পারে।

খালি পেটে জুস খেলেই যে বেশি ওজন কমবে, এমন প্রমাণ নেই। তাই খালি পেটে খাওয়ার বাধ্যবাধকতাও নেই। নিজের শরীরের সহনশীলতা অনুযায়ী সময় বেছে নেওয়াই ভালো।

২. বিট-গাজরের রস

বিট ও গাজর—দুই সব্জিই রং, স্বাদ এবং পুষ্টিগুণের জন্য পরিচিত। গাজরে বিটা-ক্যারোটিন থাকে, যা শরীরে ভিটামিন A-তে রূপান্তরিত হয়। বিটে রয়েছে বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ এবং প্রাকৃতিক নাইট্রেট।

এই পানীয় তৈরি করতে অর্ধেক বিট ও একটি গাজর ছোট টুকরো করে নিন। তার সঙ্গে প্রায় এক ইঞ্চি আদা যোগ করতে পারেন। কাঁচা হলুদ ব্যবহার করতে চাইলে অল্প পরিমাণে যোগ করা যায়। সব উপকরণ ব্লেন্ড করে প্রয়োজনমতো জল মিশিয়ে পানীয় তৈরি করুন।

লেবুর রস দিলে স্বাদ বাড়বে। তবে চিনি বা অতিরিক্ত মিষ্টি সিরাপ যোগ না করাই ভালো, বিশেষ করে ওজন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য থাকলে।

বিট-গাজরের পানীয়কে ‘ফ্যাট বার্নিং ড্রিঙ্ক’ হিসেবে দেখার বদলে শাকসব্জি খাওয়ার একটি উপায় হিসেবে ভাবা ভালো। কারণ ওজন কমানোর মূল বিষয় হল দিনের মোট খাবার ও ক্যালোরির ভারসাম্য।

এখানে আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—জুস করে খেলে শাকসব্জির কিছু ফাইবার নষ্ট বা কমে যেতে পারে। তাই সম্ভব হলে ব্লেন্ড করে ছেঁকে না খাওয়াও একটি বিকল্প। এতে খাবারের ফাইবারের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।

৩. পালংশাকের রস

পালংশাক পুষ্টিকর সবুজ শাকগুলির মধ্যে অন্যতম। এতে ভিটামিন A, C, K, ফোলেট এবং বিভিন্ন খনিজ উপাদান পাওয়া যায়। এছাড়া পালংশাকে কিছু পরিমাণ আয়রনও থাকে। স্বাস্থ্যকর ওজন নিয়ন্ত্রণের ডায়েটে বিভিন্ন ধরনের শাকসব্জি রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

পালংশাকের পানীয় তৈরি করতে এক আঁটি ভালোভাবে ধুয়ে নিন। এর সঙ্গে একটি আপেল ও একটি শসা ছোট টুকরো করে যোগ করা যায়। সামান্য আদা দিলে স্বাদে আলাদা মাত্রা আসবে। সব উপকরণ ব্লেন্ড করে প্রয়োজনমতো জল মিশিয়ে পানীয় তৈরি করুন।

আপেল প্রাকৃতিক মিষ্টত্ব যোগ করবে। ফলে আলাদা করে চিনি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। লেবুর রস ও অল্প গোলমরিচ যোগ করলেও স্বাদ বাড়তে পারে।

তবে পালংশাকের রস খেলেই দ্রুত ওজন কমে যাবে—এমন দাবি করার কারণ নেই। বরং এই পানীয়কে স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার একটি অংশ হিসেবে দেখা উচিত।

পালংশাকে থাকা ভিটামিন ও খনিজ শরীরের সামগ্রিক পুষ্টির চাহিদা পূরণে সাহায্য করতে পারে। তবে শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য সব্জি, ফল, ডাল, শস্য এবং প্রোটিনের উৎসও খাবারে রাখা জরুরি।

৪. শসা-পুদিনার রস

গরমের দিনে শসা-পুদিনার পানীয় বেশ সতেজ করে। শসায় জলের পরিমাণ বেশি হওয়ায় এটি শরীরের তরল চাহিদা পূরণে সহায়ক হতে পারে। পুদিনা পানীয়টিতে আলাদা স্বাদ ও সুগন্ধ যোগ করে।

এই পানীয় তৈরি করতে একটি শসা ভালোভাবে ধুয়ে ছোট টুকরো করে নিন। এর সঙ্গে এক কাপের মতো পুদিনাপাতা, সামান্য আদা এবং জল যোগ করুন। সবকিছু ভালোভাবে ব্লেন্ড করে নিতে পারেন। এরপর লেবুর রস, অল্প নুন ও গোলমরিচ যোগ করা যায়।

news image
আরও খবর

তবে রস তৈরি করার সময় অতিরিক্ত নুন ব্যবহার করবেন না। বিশেষ করে যাঁদের নুন কম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ মেনে চলা উচিত।

শসা-পুদিনার পানীয়ের অন্যতম সুবিধা হল এটি তুলনামূলকভাবে হালকা এবং সতেজ। মিষ্টি পানীয় বা অতিরিক্ত চিনি দেওয়া শরবতের পরিবর্তে এটি বেছে নেওয়া যেতে পারে।

তবে এটিকেও পেটের মেদ কমানোর কোনও জাদুকরী পানীয় হিসেবে ভাবা ঠিক নয়। ওজন কমাতে দিনের সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।

৫. টম্যাটো-দারচিনির জুস

টম্যাটো রান্নাঘরের অত্যন্ত পরিচিত একটি উপাদান। এতে ভিটামিন C, পটাশিয়াম এবং লাইকোপিনের মতো বিভিন্ন উপকারী যৌগ রয়েছে। টম্যাটোতে ক্যালোরির পরিমাণও তুলনামূলকভাবে কম।

টম্যাটোর পানীয় তৈরি করতে দুটি পাকা টম্যাটো নিতে পারেন। তার সঙ্গে অল্প দারচিনি ও জোয়ান যোগ করা যায়। সবকিছু ব্লেন্ড করে প্রয়োজন হলে ছেঁকে নিয়ে সামান্য লেবুর রস মিশিয়ে পান করা যেতে পারে।

তবে দারচিনি বা জোয়ান যোগ করলেই শরীরের জমে থাকা চর্বি দ্রুত গলে যাবে—এমন বৈজ্ঞানিক নিশ্চয়তা নেই। এগুলিকে মূলত স্বাদ ও বৈচিত্র্যের জন্য ব্যবহার করাই ভালো।

টম্যাটোর ফাইবার এবং জলের পরিমাণ খাবারকে তুলনামূলকভাবে তৃপ্তিদায়ক করে তুলতে পারে। তবে জুস ছেঁকে ফেললে ফাইবারের পরিমাণ কমে যায়। তাই পেট ভরা রাখার উদ্দেশ্যে টম্যাটো গোটা অবস্থায় খাওয়াও একটি ভালো বিকল্প।

শুধু জুস নয়, নজর দিন পুরো ডায়েটে

পুজোর আগে ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে অনেকেই শুধুমাত্র জুসের উপর নির্ভর করতে শুরু করেন। এটি দীর্ঘমেয়াদে ভালো অভ্যাস নয়। শরীরের প্রয়োজনীয় প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, জটিল কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন ও খনিজ পেতে বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার প্রয়োজন।

সকালে শুধু এক গ্লাস জুস খেয়ে সারাদিন খুব কম খেলে দ্রুত ওজন কমার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু এমন খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘদিন বজায় রাখা কঠিন এবং পুষ্টির ঘাটতি তৈরি করতে পারে।

তাই জুসকে খাবারের বিকল্প না বানিয়ে সুষম ডায়েটের একটি অংশ হিসেবে রাখা ভালো। সঙ্গে ডাল, ডিম, মাছ, মাংস, দই, বাদাম, সম্পূর্ণ শস্য, ফল এবং বিভিন্ন ধরনের শাকসব্জি রাখতে পারেন।

পেটের মেদ কমাতে কী করবেন?

পেটের মেদ আলাদা করে কমানোর জন্য কোনও একটি খাবার বা পানীয় নেই। শরীরের মোট অতিরিক্ত ফ্যাট কমলে ধীরে ধীরে পেটের মেদও কমতে পারে।

এর জন্য কয়েকটি অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যালোরি গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করা। দ্বিতীয়ত, প্রতিদিন পর্যাপ্ত শাকসব্জি ও ফাইবার খাওয়া। তৃতীয়ত, পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ করা। চতুর্থত, নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম বা অন্য কোনও শারীরিক কার্যকলাপ করা।

পুজোর আগে পরিবর্তন আনতে চাইলে খুব দ্রুত ফল পাওয়ার চেষ্টা না করে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস তৈরি করা ভালো। এতে শুধু উৎসবের সময় নয়, দীর্ঘমেয়াদেও উপকার পাওয়া সম্ভব।

কারা সতর্ক থাকবেন?

সব ধরনের সব্জির রস সবার জন্য সমান উপযোগী নয়। যাঁদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ফল বা মিষ্টি সব্জি দিয়ে তৈরি পানীয়ের মোট কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বিবেচনা করা দরকার।

কিডনি, হৃদ্‌যন্ত্র বা অন্য কোনও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা থাকলে খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন করার আগে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত। একইভাবে গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মহিলাদের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত পুষ্টির প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যতালিকা ঠিক করা ভালো।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অস্বাভাবিক তেতো লাউয়ের রস কখনও পান করা উচিত নয়। কোনও উপাদান খাওয়ার পরে অস্বস্তি, বমি, পেটের সমস্যা বা অন্য কোনও উপসর্গ দেখা দিলে তা উপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

পুজোর আগে স্বাস্থ্যকর থাকার সহজ মন্ত্র

পুজোর আগে ছিপছিপে দেখানোর জন্য না খেয়ে থাকা বা হঠাৎ অত্যন্ত কঠিন ডায়েট শুরু করার প্রয়োজন নেই। বরং প্রতিদিনের খাবারে ছোট ছোট পরিবর্তন আনুন। অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি পানীয়, ভাজাভুজি এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে শাকসব্জি, ফল, প্রোটিন ও সম্পূর্ণ শস্যের পরিমাণ বাড়াতে পারেন।

লাউ-আমলকি-ধনেপাতা, বিট-গাজর, পালংশাক-আপেল-শসা, শসা-পুদিনা এবং টম্যাটো-ভিত্তিক পানীয়—এই পাঁচটি বিকল্প ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খাওয়া যেতে পারে। তবে এগুলিকে ওজন কমানোর একমাত্র উপায় হিসেবে না দেখে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে দেখা উচিত।

পুজোর সাজে নিজেকে সুন্দর দেখানোর পাশাপাশি সুস্থ থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত ওজন কমানোর চেয়ে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস তৈরি করলে তার সুফল অনেক বেশি সময় ধরে পাওয়া যায়। তাই পুজোর আগে লক্ষ্য হোক শুধু ভুঁড়ি কমানো নয়, বরং একটি সুষম খাবার ও সক্রিয় জীবনযাত্রা গড়ে তোলা।

Preview image