বৃহস্পতিবার বিকেলে রবীন্দ্র সরোবর স্টেশনে মেট্রো লাইনে ঝাঁপ দেওয়ার ঘটনায় ব্লু লাইনে ট্রেন চলাচলে সমস্যা দেখা দেয়। নিরাপত্তার স্বার্থে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করা হয়।
রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশনে মেট্রোর লাইনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন এক জন যাত্রী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার বিকেলে ফের ব্যাহত হল কলকাতা মেট্রোর ব্লু লাইনের পরিষেবা। ঘটনার জেরে দীর্ঘ সময় ধরে ভোগান্তির শিকার হন হাজার হাজার নিত্যযাত্রী, বিশেষ করে অফিসফেরত যাত্রীরা।
মেট্রোরেল সূত্রে জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার বিকেল ৬টা ৪৬ মিনিট নাগাদ রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশনে ওই যাত্রী ডাউন লাইনে ট্রেন আসার ঠিক আগেই ঝাঁপ দেন। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই নিরাপত্তার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট লাইনের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মেট্রো চলাচল পুরোপুরি থমকে যায় ওই অংশে।
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ জানায়, ওই যাত্রীকে উদ্ধারের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করা হয় এবং উদ্ধারকাজ শুরু করা হয়। এই কারণে ব্লু লাইনের সম্পূর্ণ পরিষেবা চালু রাখা সম্ভব হয়নি। আপাতত ময়দান থেকে দক্ষিণেশ্বর এবং মহানায়ক উত্তম কুমার (টালিগঞ্জ) থেকে শহিদ ক্ষুদিরাম পর্যন্ত ভাঙা পথে মেট্রো পরিষেবা চালানো হচ্ছে। তবে রবীন্দ্র সদন থেকে রবীন্দ্র সরোবর স্টেশন পর্যন্ত মেট্রো পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে।
এই ঘটনার জেরে বৃহস্পতিবার বিকেলের ব্যস্ত সময়ে শহরের একাধিক মেট্রো স্টেশনে ট্রেন আটকে পড়ে। স্টেশনে স্টেশনে মেট্রো দাঁড়িয়ে পড়ায় যাত্রীদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ঘোষণা করে যাত্রীদের জানানো হয় রবীন্দ্র সরোবর স্টেশনে আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনার কথা। এর পরই অনেক যাত্রী মাঝপথে নেমে বাস, অটো বা অন্য যানবাহনের সন্ধান করতে শুরু করেন।
বিশেষ করে যেহেতু ঘটনাটি ঘটেছে অফিস ছুটির সময়ে, তাই অফিসফেরত যাত্রীদের ভোগান্তি ছিল চোখে পড়ার মতো। দক্ষিণ কলকাতা থেকে মধ্য ও উত্তর কলকাতাগামী বহু যাত্রী দীর্ঘক্ষণ স্টেশনে আটকে থাকেন। স্টেশন চত্বরে ভিড় ক্রমশ বাড়তে থাকে। অনেক জায়গায় প্ল্যাটফর্মে জায়গা সংকুলান করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, পরিষেবা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগবে। বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় চালু করে সিগন্যাল ও লাইনের নিরাপত্তা পরীক্ষা না করা পর্যন্ত ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। ফলে যাত্রীদের কিছু সময় অপেক্ষা করার অনুরোধ করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, কলকাতা মেট্রোর ব্লু লাইনে এ ধরনের আত্মহত্যার চেষ্টা নতুন নয়। প্রায়ই এই রুটে এই ধরনের ঘটনা সামনে আসে, যা মেট্রো কর্তৃপক্ষের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্লু লাইন কলকাতা মেট্রোর সবচেয়ে পুরনো রুট হওয়ায় এখানে নতুন নিরাপত্তামূলক অবকাঠামো গড়ে তোলা তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, শহরের নতুন মেট্রো রুটগুলিতে সাবধানতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে লাইনের চারপাশে উঁচু পাঁচিল ও সুরক্ষা দেওয়াল তৈরি করা হয়েছে। যার ফলে সেখানে যাত্রীদের লাইনে ঝাঁপ দেওয়া কার্যত অসম্ভব। কিন্তু ব্লু লাইনে বহু জায়গায় সেই পরিকাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি। সেই কারণেই এই রুটে একের পর এক এমন ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বৃহস্পতিবারের ঘটনাটি সপ্তাহের মাঝামাঝি কাজের দিনে ঘটায় যাত্রী দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। বহু যাত্রী সোশাল মিডিয়ায় ক্ষোভ উগরে দেন। কেউ কেউ মেট্রো কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন। বিশেষ করে রবীন্দ্র সরোবর, কালীঘাট, টালিগঞ্জের মতো ব্যস্ত স্টেশনগুলিতে বাড়তি নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসছে।
মেট্রো সূত্রে খবর, উদ্ধারকাজ শেষ হওয়ার পর ধাপে ধাপে পরিষেবা স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। তবে রাত পর্যন্ত পরিষেবা পুরোপুরি স্বাভাবিক না-ও হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যাত্রীদের বিকল্প যাতায়াত ব্যবস্থা ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ। নিরাপত্তা ও যাত্রী সুরক্ষাই যে তাদের কাছে অগ্রাধিকার, সে কথাও স্পষ্ট করা হয়েছে। তবুও ব্লু লাইনে বারবার এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি মেট্রো পরিষেবার উপর প্রশ্নচিহ্ন ফেলছে বলেই মনে করছেন শহরবাসী।
এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি শুধু যে পরিষেবা ব্যাহত করছে তা নয়, একই সঙ্গে যাত্রী নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ব্লু লাইনের মতো পুরনো রুটে আধুনিক নিরাপত্তা পরিকাঠামো যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর, উঁচু সুরক্ষা পাঁচিল বা সেন্সরভিত্তিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বর্তমানে নতুন মেট্রো রুটগুলিতে যেভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে, ব্লু লাইনে তা না হওয়ায় সমস্যার গভীরতা আরও বেড়েছে। শহরের ব্যস্ততম এই রুটে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ যাত্রী যাতায়াত করেন। অথচ নিরাপত্তার দিক থেকে সেই রুটই বারবার ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যাত্রী সংখ্যা বেশি হওয়ায় নজরদারির পরিমাণও অনেক বাড়ানো প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবারের ঘটনার সময় একাধিক স্টেশনে মেট্রো থমকে যাওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ও বিরক্তি ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই অভিযোগ করেন, হঠাৎ করে পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে প্রবীণ যাত্রী, মহিলা ও শিশুদের ভোগান্তি ছিল চোখে পড়ার মতো।
স্টেশন চত্বরে ভিড় বাড়ার ফলে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় মেট্রো কর্মীদের। কোথাও কোথাও যাত্রীদের শান্ত করতে মেট্রো সুরক্ষা বাহিনী (CISF) ও কর্মীদের অতিরিক্ত সক্রিয় হতে দেখা যায়। যদিও ঘোষণা করে পরিষেবা বন্ধ থাকার কারণ জানানো হচ্ছিল, তবুও দীর্ঘ অপেক্ষা যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে।
সোশাল মিডিয়ায় অনেক যাত্রী এই ঘটনার ছবি ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, কেন বারবার একই ধরনের ঘটনার জন্য পুরো ব্লু লাইনের পরিষেবা ভেঙে পড়ে। আবার অনেকে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্টেশনগুলিতে কাউন্সেলিং বা হেল্পডেস্ক চালু করার দাবি জানিয়েছেন।
শহরবাসীর একাংশের মতে, শুধু অবকাঠামো নয়, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি। স্টেশনগুলিতে যদি আরও বেশি সংখ্যক কর্মী ও নজরদারি থাকে, তাহলে সংকটময় অবস্থায় থাকা কোনও যাত্রীকে সময়মতো চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে। এতে প্রাণহানির আশঙ্কাও কমবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ অবশ্য জানাচ্ছেন, যাত্রী নিরাপত্তা তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ব্লু লাইনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়টি আগেও আলোচনায় এসেছে এবং ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে ঠিক কবে এই কাজ শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনও নির্দিষ্ট কোনও সময়সীমা জানানো হয়নি।
এদিকে উদ্ধারকাজ শেষ হওয়ার পর ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় চালু করা হয় এবং পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেন চালানো শুরু হয়। লাইনের সিগন্যাল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখার পরই পরিষেবা স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে মেট্রো কর্তৃপক্ষ। ফলে যাত্রীদের আরও কিছু সময় ভোগান্তি সহ্য করতে হতে পারে বলে অনুমান।
কলকাতা মেট্রোর ব্লু লাইন শহরের প্রাণকেন্দ্রকে যুক্ত করে রাখে। তাই এই রুটে সামান্য সমস্যাও গোটা শহরের পরিবহণ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে। বৃহস্পতিবারের ঘটনা ফের প্রমাণ করল, ব্লু লাইনের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে দ্রুত এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরিষেবা ফের পুরোপুরি চালু হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হলেও, এই ঘটনার রেশ কাটতে সময় লাগবে বলেই মনে করছেন যাত্রীরা। শহরবাসীর আশা, ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য মেট্রো কর্তৃপক্ষ কার্যকর ও স্থায়ী পদক্ষেপ নেবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্লু লাইনের গুরুত্ব বিবেচনা করে এখানে আলাদা করে নিরাপত্তা রিভিউ ও আধুনিকীকরণের প্রয়োজন রয়েছে। প্ল্যাটফর্মে নজরদারি বাড়ানো, আরও সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রশিক্ষিত কর্মী মোতায়েন করলে অনেক ক্ষেত্রেই বিপজ্জনক পরিস্থিতি আগেভাগে চিহ্নিত করা সম্ভব। পাশাপাশি যাত্রীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিও জরুরি। শহরের পরিবহণ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্লু লাইনের নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ পরিষেবা বজায় রাখতে প্রশাসনিক উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।