উদ্বেগ আর বিষণ্ণতা মনকে গ্রাস করলে সব সময় ওষুধই একমাত্র ভরসা নয় কিছু সহজ যোগাসনও কাজে আসতে পারে। তেমনই একটি কার্যকর আসন হলো মার্জারি আসন বা ক্যাট পোজ় । নিয়মিত এই আসন করলে মেরুদণ্ড নমনীয় হয়, শরীরের টানটান ভাব কমে এবং শ্বাস প্রশ্বাসের ছন্দ ঠিক হতে সাহায্য করে ফলে মনও ধীরে ধীরে শান্ত হতে পারে। তবে গুরুতর সমস্যা হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
মনখারাপ যেন মাথার উপর কালো মেঘের মতো জমে থাকে—কখনও কারণ বোঝা যায়, কখনও বোঝা যায় না। কাজের চাপ, পারিবারিক টানাপোড়েন, অনিশ্চয়তা, শারীরিক ক্লান্তি, ঘুমের ঘাটতি—সব মিলিয়ে মন অস্থির হয়ে ওঠে। অনেক সময় উদ্বেগ (Anxiety) আর অবসাদ/বিষণ্ণতা (Depression)-এর অনুভূতি ধীরে ধীরে আমাদের দৈনন্দিন ছন্দ কেড়ে নেয়। এমন অবস্থায় “সব সমস্যার সমাধান একটাই”—এমন কথা বলা ঠিক নয়। কারও ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং/থেরাপি লাগে, কারও ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সাহায্য লাগে, আবার অনেকের ক্ষেত্রে জীবনযাপনের ছোট ছোট অভ্যাস—ঘুম, খাবার, হাঁটা, শ্বাস-প্রশ্বাস, যোগব্যায়াম—ধীরে ধীরে মানসিক ভার কমাতে সাহায্য করে।
এইখানেই যোগাসনের ভূমিকা খুব বাস্তব এবং কার্যকর। যোগ ব্যায়াম মানে শুধু শরীর বাঁকানো নয়; যোগ মানে শ্বাস, মনোযোগ, শরীরের অঙ্গসঞ্চালন—এই তিনটির সমন্বয়। নিয়মিত যোগাভ্যাস আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত হতে শেখায়, শ্বাসের গতি কমায়, শরীরের “টেনশন-হোল্ডিং এরিয়া” (ঘাড়, কাঁধ, পিঠ, কোমর) ঢিলে করে, ফলে মাথার ভেতরের অস্থিরতাও অনেক সময় কমে।
আপনি যে আসনটির কথা বলেছেন—মার্জারি আসন বা ‘ক্যাট পোজ়’—এটি খুবই সহজ কিন্তু দারুণ কাজের একটি পদ্ধতি। সাধারণভাবে এটি মাটিতে হাত-পা দিয়ে করা হয় (Cat-Cow movement), তবে চেয়ারে বসেই এর একটি নিরাপদ ও সহজ ভ্যারিয়েশন করা যায়—যা অফিসে, বাড়িতে, এমনকি বয়স্কদের জন্যও সহায়ক হতে পারে। যোগাসন প্রশিক্ষকেরা বলেন, এটি “বিড়ালের ভঙ্গিমা”—কারণ বিড়াল যেমন পিঠ গোল করে, আবার ধীরে ধীরে মেরুদণ্ড প্রসারিত করে—এই আসনেও ঠিক সেই রকমই মেরুদণ্ডের চলাচল হয়।
উদ্বেগ বা দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের সময়ে শরীর প্রায়ই “ফাইট-অর-ফ্লাইট” মোডে চলে যায়—শ্বাস দ্রুত হয়, কাঁধ টান টান থাকে, চোয়াল শক্ত হয়ে থাকে, বুকের ভিতর অস্থির লাগে। মার্জারি আসনের মতো রিদমিক (ছন্দময়) মুভমেন্ট + শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ শরীরকে ধীরে ধীরে “রেস্ট-অ্যান্ড-ডাইজেস্ট” মোডে আনতে সাহায্য করতে পারে। এতে—
শ্বাসের গতি কমে
বুক-পিঠের আঁটসাঁট ভাব কমে
মেরুদণ্ডের স্টিফনেস কমে, শরীর হালকা লাগে
মনোযোগ এক জায়গায় থাকে (ভেবে ভেবে দুশ্চিন্তার ঘূর্ণি কমে)
এটা ওষুধের বিকল্প হিসেবে “সবসময়” বলা যাবে না, কিন্তু সহযোগী পদ্ধতি হিসেবে নিয়মিত করলে অনেকের ক্ষেত্রে ভালো পরিবর্তন দেখা যায়।
চেয়ারে বসে মার্জারি আসন: কী ভাবে করবেন
এই পদ্ধতিটা আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠে, অফিসে কাজের মাঝে, অথবা রাতে ঘুমানোর আগে—যে কোনো সময় করতে পারেন। তবে খালি পেটে বা খুব হালকা খাবার খাওয়ার ১.৫–২ ঘণ্টা পরে করলে বেশি আরাম পাবেন।
একটি মজবুত চেয়ার নিন (চাকা-ওয়ালা হলে লক করুন)
পিঠ টানটান করে চেয়ারের মাঝখানে বসুন
পায়ের পাতা মাটিতে থাকবে, হাঁটু প্রায় ৯০ ডিগ্রি
মাথা ও ঘাড় সোজা, চোখ সামনে
চেয়ারে হেলান দেবেন না (এটা খুব জরুরি)
দুই হাত কোলের উপর রাখুন
কাঁধ ঢিলে রাখার চেষ্টা করুন
চোয়াল আলগা, মুখে অযথা চাপ নয়
ধীরে ধীরে শ্বাস নিন
শ্বাস নিতে নিতে শরীর সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকুন
ঘাড় একটু পিছনে নিয়ে মুখ সামান্য উঁচু করুন
বুক সামনে খুলবে, কাঁধ পিছনে আরাম করে যাবে
মনে মনে ভাবুন: “আমি শ্বাস নিয়ে শরীরে জায়গা তৈরি করছি।”
খেয়াল: ব্যথা হলে অতিরিক্ত ঝুঁকবেন না। পরিসীমা ছোট রাখুন।
এবার শ্বাস ছাড়ুন
শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে পিঠ কুঁজো করে দিন
চিবুক বুকে ঠেকানোর চেষ্টা করুন (জোর করবেন না)
কাঁধ সামনের দিকে আসবে, পেট ভেতরের দিকে টানবে
মনে মনে ভাবুন: “আমি শ্বাস ছাড়ছি, দুশ্চিন্তা ছাড়ছি।”
এই গোল পিঠ অবস্থায় ২০–৩০ সেকেন্ড থাকুন (শ্বাস স্বাভাবিক রাখুন)
তারপর ধীরে ধীরে আগের অবস্থায় ফিরে আসুন
৫–৭ সেট করুন প্রতিদিন
১ মিনিট: বসে স্বাভাবিক শ্বাস
৩ মিনিট: মার্জারি আসন ৩–৫ সেট
১ মিনিট: চোখ বন্ধ করে শ্বাস দেখুন
২ মিনিট: ৪–৬ সেট ছোট রেঞ্জে
৩০ সেকেন্ড: কাঁধ ঢিলে, লম্বা শ্বাস ছাড়ুন
১–২ মিনিট: ধীর শ্বাস (৪ সেকেন্ডে শ্বাস, ৬ সেকেন্ডে ছাড়ুন)
৪–৫ মিনিট: মার্জারি ৫–৭ সেট
১ মিনিট: বসে নীরবতা, চোখ বন্ধ
আপনি যে উপকারিতাগুলো লিখেছেন—সেগুলো খুবই প্রাসঙ্গিক। একটু বিস্তারিতভাবে বলছি যাতে বোঝা সহজ হয়:
মার্জারি মুভমেন্টে মেরুদণ্ডের প্রতিটি অংশ ধীরে ধীরে নড়ে। এতে শরীরের জমে থাকা টান কমে, শরীর “হালকা” লাগে।
দীর্ঘসময় মোবাইল/ল্যাপটপ/ডেস্কে বসার ফলে ঘাড়-কাঁধ শক্ত হয়ে যায়। এই আসন ওই জায়গায় রক্তসঞ্চালন বাড়াতে ও স্টিফনেস কমাতে সাহায্য করে। (ব্যথা তীব্র হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।)
ফ্রোজেন শোল্ডারের ব্যথা বা শক্তভাব থাকলে অনেক সময় খুব জোরালো স্ট্রেচ করলে ব্যথা বাড়ে। মার্জারি আসন নরম ও নিয়ন্ত্রিত—তাই অনেকে আরাম পান। তবে সমস্যা গুরুতর হলে ফিজিও/ডাক্তার দেখে তবেই করুন।
বারবার চিন্তা ঘুরপাক খায় কারণ মন “এখন” থেকে সরে যায়। মার্জারি আসনে শ্বাস-ছন্দ ও শরীরের নড়াচড়া মিলিয়ে মনকে একটা কাজের উপর ফোকাস করানো যায়—এটা মনোযোগের ক্ষমতা বাড়ায়।
অতিরিক্ত উদ্বেগে শ্বাস ছোট ও দ্রুত হয়। এই আসন শ্বাসকে ধীরে করতে সাহায্য করে, ফলে বুকের অস্থিরতা ও টেনশন কিছুটা কমে।
মেরুদণ্ড ও কোমর অঞ্চলের নড়াচড়ায় ওই এলাকার রক্তসঞ্চালন কিছুটা সক্রিয় হতে পারে—ফলে সামগ্রিক কার্যক্ষমতা ও এনার্জি অনুভব হতে পারে। (এটা নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসা নয়, বরং শরীরের স্বাভাবিক সাপোর্ট।)
যারা করবেন না / সতর্কতা (Contraindications)
এই অংশটা খুব জরুরি—কারণ যোগাসন “সহজ” হলেও সবার জন্য এক রকম নয়।
চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া করবেন না
করলে খুব ছোট রেঞ্জে, ব্যথা না বাড়িয়ে
মাইগ্রেনে মাথা-ঘাড়ের নড়াচড়া অনেক সময় ট্রিগার করতে পারে।
তীব্র ব্যথার সময় একেবারেই করবেন না
ভালো থাকলে প্রশিক্ষকের গাইডেন্সে ছোট রেঞ্জে চেষ্টা করা যায়
ঘাড়, কাঁধ, পিঠ, কোমরে অপারেশন বা বড় চোট থাকলে আগে ডাক্তার/ফিজিও থেরাপিস্টের মত নিন।
অতিরিক্ত সামনে ঝুঁকে/ঘাড় বেশি ঘোরালে মাথা ঘুরতে পারে। ধীরে করুন, প্রয়োজনে বন্ধ করুন।
চেয়ারে হেলান দিয়ে করা → আসনের কাজ কমে যায়
খুব দ্রুত করা → শ্বাসের ছন্দ ভাঙে, মাথা ভার হতে পারে
ঘাড়ে চাপ দিয়ে চিবুক জোর করে বুকে লাগানো → ব্যথা বাড়তে পারে
কাঁধ কান পর্যন্ত তুলে ফেলা → টেনশন বাড়ে
শ্বাস আটকে রাখা → উদ্বেগ কমার বদলে বাড়তে পারে
মন্ত্রটা সহজ: “ব্যথা নয়, আরাম”—আরাম যেখানে, আসন সেখানেই।
শ্বাস নিন ৪ কাউন্টে
শ্বাস ছাড়ুন ৬ কাউন্টে
এটা মনকে দ্রুত শান্ত করে।
চোখ বন্ধ করলে মাথা ঘোরে—এমন হলে আধবোজা রাখুন।
যেমন—
“আমি নিরাপদ।”
“আমি ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাব।”
“আমার শ্বাস আমার নিয়ন্ত্রণে।”
আপনি চাইলে এই রুটিনটা সপ্তাহে ৪–৫ দিন করুন:
২ মিনিট: বসে ধীর শ্বাস (৪ ইন, ৬ আউট)
৫ মিনিট: মার্জারি আসন ৫–৭ সেট
২ মিনিট: কাঁধ ঘোরানো (নরমভাবে)
১ মিনিট: চোখ বন্ধ, শুধু শ্বাস অনুভব
এটা “চিকিৎসা” না—কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার একটা শক্তিশালী অভ্যাস হতে পারে।
যদি—
২ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে মন একেবারে ভালো না থাকে
ঘুম/খাওয়া/কাজে বড় সমস্যা হয়
বুক ধড়ফড়, শ্বাসকষ্ট, প্যানিক অ্যাটাক হয়
নিজেকে ক্ষতি করার চিন্তা আসে
তাহলে দেরি না করে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ/চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। যোগাসন তখনও সহায়ক হতে পারে, কিন্তু একাই যথেষ্ট নয়।
মনের অস্থিরতা বা অবসাদ মানে আপনি দুর্বল—এটা নয়। এটা আমাদের সময়ের বাস্তব চাপের প্রতিক্রিয়া। ছোট ছোট নিয়মিত অভ্যাস—যেমন চেয়ারে বসে মার্জারি আসন—শরীরকে আরাম দেয়, শ্বাসকে শান্ত করে, আর মনকে একটু জায়গা দেয় “ফিরে আসার”। আজ থেকেই শুরু করুন—৩ সেট দিয়েই। নিয়মিত হলে ফলও ধীরে ধীরে ধরা দেবে।
আপনি চাইলে আমি এটাকে আপনার নিউজ/পোস্টের জন্য (১) আকর্ষণীয় হেডলাইন, (২) ২০০–৩০০ শব্দের শর্ট ভার্সন, (৩) ফেসবুক ক্যাপশন + হ্যাশট্যাগ—সব করে দিতে পারি।