দার্জিলিং মেলে এক মহিলা যাত্রীর ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে চলন্ত ট্রেন থেকে লাফ দেয় দুষ্কৃতী। ঘটনার পর বর্ধমান স্টেশনে নিরাপত্তার অভাব নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন যাত্রীরা।
দূরপাল্লার এক্সপ্রেস ট্রেনে যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে ফের গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। শনিবার ভোরে ডাউন দার্জিলিং মেলের সংরক্ষিত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বগিতে ঘটে যাওয়া এক ডাকাতির ঘটনায় রীতিমতো চাঞ্চল্য ছড়ায়। চলন্ত ট্রেনে এক মহিলা যাত্রীর ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে দুষ্কৃতী লাফিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পর বর্ধমান স্টেশনে ট্রেন থামতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন যাত্রীরা। তাঁদের অভিযোগ, রেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গাফিলতির কারণেই এমন ঘটনা বারবার ঘটছে।
ঘটনাটি ঘটে শনিবার ভোররাতে, যখন ডাউন দার্জিলিং মেল নিউ জলপাইগুড়ি থেকে শিয়ালদহের দিকে যাচ্ছিল। ট্রেনটি বর্ধমান ও আসানসোলের মধ্যবর্তী একটি অংশ অতিক্রম করার সময়, এসি কোচে যাত্রীদের অধিকাংশই তখন গভীর ঘুমে। সেই সুযোগেই এক দুষ্কৃতী কোচে ঢুকে পড়ে বলে অভিযোগ। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রথমে কয়েকটি সিটের দিকে নজর দেয় এবং তারপর এক মহিলা যাত্রীর মাথার দিকের লাগেজ রাখার স্থানে রাখা ব্যাগটি টেনে নেয়।
হঠাৎ ব্যাগ টান পড়ায় ওই মহিলা যাত্রী ঘুম থেকে জেগে ওঠেন এবং চিৎকার শুরু করেন। তাঁর চিৎকারে আশপাশের যাত্রীরাও সজাগ হয়ে ওঠেন। কিন্তু ততক্ষণে দুষ্কৃতী দ্রুত কোচের দরজার দিকে ছুটে যায়। অভিযোগ, চলন্ত ট্রেন থেকেই সে লাফিয়ে পড়ে পালিয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে পুরো কোচে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ দুষ্কৃতীকে ধরার চেষ্টা করলেও চলন্ত ট্রেন হওয়ায় এবং নিরাপত্তার অভাবে তা সম্ভব হয়নি।
মহিলা যাত্রীর দাবি, তাঁর ব্যাগে নগদ টাকা, মোবাইল ফোন, পরিচয়পত্র, ব্যাঙ্কের কাগজপত্র ও কিছু মূল্যবান জিনিস ছিল। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ বেশ কয়েক হাজার টাকা। ঘটনার পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। সহযাত্রীরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে টিকিট পরীক্ষক ও রেল কর্মীদের বিষয়টি জানান।
ট্রেনটি বর্ধমান স্টেশনে পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন যাত্রীরা। অনেকে ট্রেন থেকে নেমে স্টেশন চত্বরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। তাঁদের অভিযোগ, দূরপাল্লার এক্সপ্রেস ট্রেনে, বিশেষ করে রাতে, নিরাপত্তা প্রায় নেই বললেই চলে। সংরক্ষিত এসি কোচেও যদি এইভাবে ডাকাতি হয়, তবে সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা কোথায়—এই প্রশ্ন তোলেন তাঁরা।
এক যাত্রী বলেন, “আমরা টিকিট কেটে, সংরক্ষণ করে নিরাপদে যাত্রা করার আশা করি। কিন্তু এসি কোচেও যদি দুষ্কৃতীরা অনায়াসে ঢুকে পড়ে এবং চলন্ত ট্রেন থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যায়, তবে রেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা দুর্বল তা সহজেই বোঝা যায়।” আরেক যাত্রী অভিযোগ করেন, ট্রেনে আরপিএফ বা জিআরপি কর্মীদের দেখা যায় না বললেই চলে। থাকলেও তাঁরা অনেক সময় নিজেদের কামরায় বসে থাকেন।
বর্ধমান স্টেশনে খবর পেয়ে রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) এবং আরপিএফ কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত মহিলা যাত্রীর সঙ্গে কথা বলেন এবং লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করেন। রেল পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে এবং আশপাশের এলাকায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ট্রেনের কোন অংশে দুষ্কৃতী লাফ দিয়েছে, তা চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি, স্টেশন ও ট্রেনের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়।
তবে যাত্রীরা এই আশ্বাসে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। তাঁদের দাবি, এই ধরনের ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও দার্জিলিং মেল সহ একাধিক দূরপাল্লার ট্রেনে চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুষ্কৃতীরা ধরা পড়ে না। ফলে অপরাধীদের সাহস আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
রেল সূত্রে জানা যায়, দার্জিলিং মেল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত ট্রেন। প্রতিদিনই শত শত যাত্রী এই ট্রেনে যাতায়াত করেন। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম এই ট্রেন। তাই নিরাপত্তার দিক থেকে এই ট্রেনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে বলে অভিযোগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চলন্ত ট্রেনে অপরাধ রুখতে হলে একাধিক পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, প্রতিটি দূরপাল্লার ট্রেনে পর্যাপ্ত সংখ্যক আরপিএফ ও জিআরপি কর্মী মোতায়েন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এসি ও স্লিপার কোচের দরজায় নিয়মিত নজরদারি দরকার, যাতে বাইরের কেউ সহজে ঢুকতে না পারে। তৃতীয়ত, সিসিটিভি ক্যামেরার সংখ্যা বাড়ানো এবং সেগুলির কার্যকারিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
এছাড়া যাত্রীদেরও কিছুটা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। ঘুমের সময় মূল্যবান জিনিস হাতের কাছে বা তালাবদ্ধ ব্যাগে রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অপরিচিত কাউকে কোচে ঘোরাঘুরি করতে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে রেল কর্মীদের জানানো উচিত বলেও মত তাঁদের।
ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত মহিলা যাত্রী বলেন, “আমি কখনও ভাবিনি এসি কোচে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। খুব ভয় পেয়ে গেছি। শুধু টাকার ক্ষতি নয়, মানসিক আঘাতটা অনেক বড়।” তিনি দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তার ও উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানান।
রেল কর্তৃপক্ষের এক আধিকারিক জানান, যাত্রী নিরাপত্তা তাঁদের কাছে অগ্রাধিকার। এই ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট বিভাগকে সতর্ক করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে, তার জন্য অতিরিক্ত নজরদারি ও নিরাপত্তা জোরদার করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে এই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হবে? যাত্রীদের একাংশের মতে, প্রতিবার ঘটনার পর একই ধরনের আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু কিছুদিন পর পরিস্থিতি আবার আগের মতোই হয়ে যায়। তাই শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তব পদক্ষেপ ও নিয়মিত নজরদারিই পারে যাত্রীদের আস্থা ফেরাতে।
সব মিলিয়ে দার্জিলিং মেলে ঘটে যাওয়া এই ডাকাতির ঘটনা ফের একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, দূরপাল্লার ট্রেনে যাত্রী নিরাপত্তা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। রেল প্রশাসন যদি দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়, তবে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে এমনটাই মনে করছেন যাত্রীরা।
এই ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়াতেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেক যাত্রী দার্জিলিং মেল ও অন্যান্য দূরপাল্লার ট্রেনে তাঁদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। কেউ লিখেছেন, গভীর রাতে অচেনা লোকজনকে কোচে ঘোরাঘুরি করতে দেখলেও অভিযোগ জানাতে গেলে অনেক সময় রেলকর্মীদের কাছ থেকে সঠিক সহযোগিতা মেলে না। আবার কেউ অভিযোগ করেছেন, এসি কোচে ওঠানামার দরজাগুলি অনেক সময় ভেতর থেকে ঠিকমতো বন্ধ রাখা হয় না, যার সুযোগ নিয়ে দুষ্কৃতীরা সহজেই ঢুকে পড়ে।
রেল পুলিশের একটি সূত্র জানায়, দীর্ঘ রুটের ট্রেনে দুষ্কৃতীদের একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা বিশেষ করে রাতের দিকে টার্গেট করে। যাত্রীরা যখন গভীর ঘুমে থাকেন, তখনই তারা ছিনতাই বা চুরির চেষ্টা করে। অনেক ক্ষেত্রে ট্রেন ধীরগতির হলে বা জনবসতি সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছলে দুষ্কৃতীরা চলন্ত ট্রেন থেকেই লাফিয়ে নেমে যায়, ফলে তাদের ধরা কঠিন হয়ে পড়ে।
বর্ধমান স্টেশনে বিক্ষোভ চলাকালীন বেশ কিছু যাত্রী দাবি করেন, শুধু তদন্ত বা ফুটেজ খতিয়ে দেখার আশ্বাসে কাজ হবে না। তাঁদের মতে, প্রতিটি বড় স্টেশনে ট্রেন থামার সময় আরপিএফের পক্ষ থেকে কোচে কোচে তল্লাশি চালানো উচিত। বিশেষ করে রাতে যে সব স্টেশনে ট্রেনের গতি কমে, সেখানে অতিরিক্ত নজরদারি প্রয়োজন।
এক প্রবীণ যাত্রী বলেন, “আগে ট্রেনে কনস্টেবলরা নিয়মিত টহল দিতেন। এখন সেটা চোখে পড়ে না। প্রযুক্তি যতই বাড়ুক, মানুষের উপস্থিতি না থাকলে অপরাধ কমবে না।” তাঁর মতে, নিরাপত্তা কর্মীদের দৃশ্যমান উপস্থিতি থাকলেই দুষ্কৃতীদের সাহস অনেকটাই কমে যাবে।
এদিকে, রেলযাত্রী সংগঠনগুলিও এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এক সংগঠনের তরফে জানানো হয়েছে, তারা দ্রুত রেল দপ্তরের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেবে। সংগঠনের দাবি, শুধু দার্জিলিং মেল নয়, রাজ্যের মধ্যে চলাচলকারী সব গুরুত্বপূর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন করা হোক। প্রয়োজনে ট্রেনপ্রতি নিরাপত্তা কর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর দাবিও তোলা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ দমনে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানো দরকার। যেমন চলন্ত ট্রেনেও হাই-রেজোলিউশনের সিসিটিভি ক্যামেরা, দরজায় সেন্সর, এবং সন্দেহজনক নড়াচড়া হলে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে দুষ্কৃতীদের শনাক্ত করা সহজ হবে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই অনেক যাত্রী তাঁদের পরবর্তী যাত্রা নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে একা মহিলা যাত্রী ও বয়স্কদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে। অনেকেই বলছেন, রাতের ট্রেনযাত্রায় এখন আর আগের মতো নিশ্চিন্ত বোধ করেন না।
সব মিলিয়ে, দার্জিলিং মেলের এই ডাকাতির ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং রেলের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। যাত্রীরা চাইছেন দ্রুত ও কড়া পদক্ষেপ, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনও যাত্রীকে এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে না হয়। রেল প্রশাসন কত দ্রুত ও কতটা কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে সকলের নজর।