৮০-র দশকের শেষের দিক থেকে বলিউডের প্রযোজনা সংস্থায় কাজ শুরু তাঁর। বেশ কয়েক বছর নিজের কাকুর প্রযোজনা সংস্থায় সহকারী হিসাবে কাজ করেছিলেন সাজিদ নাদিয়াদওয়ালা।
বলিউডে প্রযোজকদের নাম অনেক থাকলেও, দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রাখা ব্যক্তিত্বের সংখ্যা হাতে গোনা। সেই তালিকার প্রথম সারিতেই উঠে আসে Sajid Nadiadwala-র নাম। ৬০ বছরে পা দিলেন তিনি—একজন সফল ব্যবসায়ী, দূরদর্শী প্রযোজক এবং বলিউডের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর যাত্রাপথ নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণাদায়ক।
সাজিদের জন্ম এক চলচ্চিত্র-ঘনিষ্ঠ পরিবারে। তাঁর কাকু A. K. Nadiadwala ছিলেন বলিউডের পরিচিত প্রযোজক। ছোটবেলা থেকেই সিনেমার সেট, স্ক্রিপ্ট আলোচনা, তারকাদের আনাগোনা—এই পরিবেশের মধ্যেই বড় হয়েছেন সাজিদ। ফলে প্রযোজনার জগৎ তাঁর কাছে কখনও অচেনা ছিল না।
৮০-র দশকের শেষ দিকে তিনি কাকুর প্রযোজনা সংস্থায় সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেই সময়টায় তিনি শিখেছেন বাজেট ম্যানেজমেন্ট, তারকাদের সঙ্গে সমন্বয়, বিতরণ কৌশল এবং বক্স অফিসের বাস্তবতা। এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী জীবনে তাঁকে স্বনির্ভর প্রযোজক হয়ে উঠতে সাহায্য করে।
১৯৯২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নিজের প্রযোজনা সংস্থা Nadiadwala Grandson Entertainment। একই বছরে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম প্রযোজিত ছবি Zulm Ki Hukumat, যেখানে অভিনয় করেছিলেন Govinda ও Dharmendra। যদিও ছবিটি বিশাল বাণিজ্যিক সাফল্য পায়নি, তবু প্রযোজক হিসেবে সাজিদের আত্মপ্রকাশ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রথম ছবির পর তিনি থেমে থাকেননি। সময়ের সঙ্গে বদলেছেন কনটেন্ট, ধরেছেন নতুন দর্শকগোষ্ঠী, এবং বাণিজ্যিক সাফল্যের সূত্র খুঁজে পেয়েছেন একাধিক ছবিতে।
সাজিদের প্রযোজিত উল্লেখযোগ্য ছবির তালিকা দীর্ঘ। এর মধ্যে রয়েছে—
Baaghi
Housefull (এবং পরবর্তী সিক্যুয়েলগুলি)
Highway
Heropanti
Mujhse Shaadi Karogi
Heyy Babyy
‘হাউজ়ফুল’ সিরিজ় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ফ্র্যাঞ্চাইজি বক্স অফিসে একাধিকবার শতকোটি ক্লাবে জায়গা করে নিয়েছে। বাণিজ্যিক বিনোদন, কমেডি ও তারকাসমৃদ্ধ কাস্ট—এই তিনের সমন্বয়ে সাজিদ তৈরি করেছেন দর্শকপ্রিয় ব্র্যান্ড।
অন্যদিকে, ‘হাইওয়ে’-র মতো ছবি প্রযোজনা করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে কেবল বাণিজ্যিক বিনোদন নয়, কনটেন্ট-নির্ভর ছবিতেও তাঁর আগ্রহ রয়েছে। এই ছবির মাধ্যমে সমালোচকদের প্রশংসাও কুড়িয়েছিলেন তিনি।
১৯৯২ সালেই অভিনেত্রী Divya Bharti-কে বিয়ে করেন সাজিদ। সে সময় দিব্যা ছিলেন বলিউডের উদীয়মান তারকা। কিন্তু বিয়ের এক বছরের মধ্যেই ব্যালকনি থেকে পড়ে গিয়ে রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হন দিব্যা। প্রথমে নানা জল্পনা, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের গুঞ্জন উঠলেও পরে পুলিশ এটিকে দুর্ঘটনা হিসেবেই চিহ্নিত করে।
এই ঘটনাটি সাজিদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। দীর্ঘ সময় তিনি ব্যক্তিগত জীবন আড়ালেই রেখেছিলেন। পরে ২০০০ সালে সাংবাদিক Warda Khan-কে বিয়ে করেন। বর্তমানে তাঁদের সংসার স্থিতিশীল এবং সুখী বলেই জানা যায়।
শোনা যায়, সাজিদ নাদিয়াদওয়ালার মোট সম্পত্তির পরিমাণ আনুমানিক ১০০০ থেকে ১৫০০ কোটি টাকার মধ্যে। এই বিপুল সম্পদের উৎস শুধু চলচ্চিত্র প্রযোজনা নয়—বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৌশলগত বিনিয়োগও তাঁর আয়ের বড় উৎস।
মুম্বইয়ের অভিজাত এলাকায় তাঁর একাধিক সম্পত্তি রয়েছে।
জুহুতে প্রায় ৩১.৩ কোটি টাকায় একটি বিলাসবহুল আবাসন
দক্ষিণ মুম্বইয়ে দু’টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, যার মূল্য প্রায় ৩৬.৫৭ কোটি টাকা
এই সম্পত্তিগুলি তাঁর প্রযোজনা সংস্থার নামেই কেনা হয়েছে, যা ভবিষ্যতের বিনিয়োগ পরিকল্পনার অংশ বলেই মনে করা হয়।
সাজিদের গাড়ির সংগ্রহও চোখ ধাঁধানো। তাঁর গ্যারাজে রয়েছে—
Rolls-Royce Motor Cars-এর মডেল
Mercedes-Benz-এর বিলাসবহুল সেডান
Lamborghini-র স্পোর্টস কার
এই গাড়িগুলি তাঁর জীবনযাপনের আভিজাত্যের প্রতীক হলেও, এগুলি একই সঙ্গে তাঁর সাফল্যেরও সাক্ষ্য বহন করে।
সাজিদ নাদিয়াদওয়ালা কেবল অর্থলাভের উদ্দেশ্যে ছবি প্রযোজনা করেন না—তিনি ট্রেন্ড বোঝেন, দর্শকের মনোভাব বুঝতে পারেন। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি ডিজিটাল রিলিজ, আন্তর্জাতিক বাজার, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম—সব ক্ষেত্রেই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন।
তাঁর সংস্থা নতুন পরিচালকদের সুযোগ দিয়েছে, নতুন অভিনেতাদের লঞ্চ করেছে। ‘হিরোপন্তি’ ছবির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের নায়ককে লঞ্চ করার ঝুঁকিও নিয়েছিলেন তিনি, যা পরে সফল প্রমাণিত হয়।
ছয় দশকের জীবনে সাজিদ নাদিয়াদওয়ালা দেখেছেন সাফল্য, ব্যর্থতা, ব্যক্তিগত শোক ও পেশাগত উত্থান। কিন্তু প্রতিটি অধ্যায় তাঁকে আরও পরিণত করেছে। বলিউডে প্রযোজক হিসেবে তাঁর অবস্থান আজ সুদৃঢ়।
৬০ বছরে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু কোটি কোটি টাকার মালিক নন—তিনি একটি ব্র্যান্ড, একটি প্রতিষ্ঠান, এবং এক দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আধার। আগামী দিনেও তাঁর সংস্থা থেকে আরও বড় বাজেটের, আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছবি আসবে—এমন প্রত্যাশাই করেন অনুরাগীরা।
ছয় দশকের জীবনপথে Sajid Nadiadwala কেবল একজন সফল প্রযোজক নন, তিনি বলিউডের বাণিজ্যিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। উত্তরাধিকারসূত্রে চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, নিজের পরিচয় গড়ে তোলা ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ তিনি শুধু গ্রহণই করেননি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা জয়ও করেছেন। সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করে, ঝুঁকি নিয়ে নিজের প্রযোজনা সংস্থা দাঁড় করানো, একের পর এক বক্স অফিস হিট উপহার দেওয়া—এই দীর্ঘ যাত্রা প্রমাণ করে তাঁর ধৈর্য, দূরদর্শিতা ও ব্যবসায়িক মেধা কতটা সুসংহত।
তাঁর জীবনের ব্যক্তিগত অধ্যায়ও কম নাটকীয় নয়। সুখ-দুঃখ, সাফল্য-বেদনা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন এক পূর্ণদৈর্ঘ্যের সিনেমা। প্রথম স্ত্রী Divya Bharti-র অকালমৃত্যু তাঁকে মানসিকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল, কিন্তু সেই কঠিন সময় কাটিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর সাহসই তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তাকে স্পষ্ট করে। পরবর্তী সময়ে স্থিতিশীল পারিবারিক জীবন, পেশাগত মনোযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে তিনি নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন।
প্রযোজক হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সময়কে বোঝার ক্ষমতা। দর্শকের রুচি বদলালে তিনি কনটেন্ট বদলেছেন, নতুন প্রজন্ম এলে নতুন মুখকে সুযোগ দিয়েছেন। কমেডি, অ্যাকশন, রোম্যান্স থেকে শুরু করে কনটেন্ট-নির্ভর সিনেমা—সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন। কেবল তারকাদের ভরসায় নয়, গল্প ও উপস্থাপনার শক্তিতেও যে ছবি সফল হতে পারে, তা তিনি বারবার দেখিয়েছেন।
একই সঙ্গে তিনি বুঝেছেন, চলচ্চিত্র জগত শুধু সৃজনশীলতার জায়গা নয়, এটি একটি শক্তিশালী শিল্পও। তাই রিয়্যাল এস্টেট, বিলাসবহুল সম্পত্তি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে তিনি নিজের আর্থিক ভিত্তিকে আরও মজবুত করেছেন। কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হলেও তাঁর সাফল্যের মূল মন্ত্র কেবল অর্থ নয়—পরিকল্পনা, ধারাবাহিকতা ও আত্মবিশ্বাস।
৬০ বছরে দাঁড়িয়ে সাজিদ নাদিয়াদওয়ালার জীবন যেন এক অনুপ্রেরণার পাঠশালা। তিনি দেখিয়েছেন, উত্তরাধিকার থাকলেও নিজের অবস্থান তৈরি করতে হলে পরিশ্রম, ধৈর্য এবং সঠিক সিদ্ধান্ত অত্যন্ত জরুরি। ব্যক্তিগত বিপর্যয় হোক বা পেশাগত চ্যালেঞ্জ—প্রতিটি পরিস্থিতিকে তিনি নতুন সূচনার সুযোগ হিসেবে দেখেছেন।
আগামী দিনেও তাঁর প্রযোজনা সংস্থা থেকে নতুন স্বপ্নের সিনেমা, নতুন প্রতিভার উত্থান এবং বক্স অফিসে নতুন রেকর্ড তৈরি হবে—এমন প্রত্যাশা করাই স্বাভাবিক। তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা বলিউডের ইতিহাসে এক স্থায়ী ছাপ রেখে যাবে। জন্মদিনের এই মাইলফলকে দাঁড়িয়ে বলা যায়, সাজিদ নাদিয়াদওয়ালা কেবল একজন প্রযোজক নন, তিনি এক যুগের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিত্ব—যাঁর গল্প আগামী প্রজন্মকেও সাহস ও স্বপ্ন দেখাতে অনুপ্রাণিত করবে।
আর্থিক দিক থেকেও তিনি নিজেকে সুসংহত করেছেন। চলচ্চিত্র প্রযোজনার বাইরে রিয়্যাল এস্টেট ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে নিজের সম্পদের পরিধি বাড়িয়েছেন। মুম্বইয়ের বিলাসবহুল এলাকায় আবাসন ক্রয়, দামী গাড়ির সম্ভার—এসব তাঁর আর্থিক সাফল্যের প্রতীক। তবে এগুলি কেবল বাহ্যিক সাফল্যের চিহ্ন; প্রকৃত শক্তি তাঁর পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতায়। শোনা যায় তাঁর মোট সম্পত্তির পরিমাণ ১০০০ থেকে ১৫০০ কোটি টাকার মধ্যে—কিন্তু এই অঙ্কের পেছনে রয়েছে বহু বছরের শ্রম ও ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতা।
৬০ বছরে দাঁড়িয়ে তাঁর জীবন যেন এক অনুপ্রেরণার গল্প। তিনি দেখিয়েছেন, ব্যর্থতা বা বিতর্ক সাফল্যের পথে বাধা হতে পারে, কিন্তু তা শেষ কথা নয়। ব্যক্তিগত বেদনা পেরিয়ে পেশাগত সাফল্য অর্জন করা সহজ নয়; অথচ তিনি তা করেছেন। নতুন প্রতিভাকে সুযোগ দেওয়া, বৃহৎ বাজেটের ছবিতে বিনিয়োগ করা, এবং বলিউডের বাজারকে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস—সব মিলিয়ে তিনি এক যুগের প্রতিনিধিত্বকারী প্রযোজক।