Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ইভিএম কারচুপির অভিযোগে সরব অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়: গণতন্ত্র রক্ষায় আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার হুঁশিয়ারি

ইভিএম কারচুপির অভিযোগে সরব অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়: গণতন্ত্র রক্ষায় আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার হুঁশিয়ারি কলকাতা: ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো নির্বাচন প্রক্রিয়া। আর সেই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (EVM) নিয়ে বিতর্ক যেন কোনোভাবেই থামছে না। সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসের...

ইভিএম কারচুপির অভিযোগে সরব অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়: গণতন্ত্র রক্ষায় আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার হুঁশিয়ারি

কলকাতা: ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো নির্বাচন প্রক্রিয়া। আর সেই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (EVM) নিয়ে বিতর্ক যেন কোনোভাবেই থামছে না। সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসের দ্বিতীয় প্রধান নেতা তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ইভিএম নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করে রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন। তাঁর সাফ দাবি, "জনগণ নয়, বরং ইভিএম বদলে ক্ষমতায় এসেছে বর্তমান শাসক শক্তি। আমরা এই অন্যায়ের শেষ দেখে ছাড়ব এবং খুব শীঘ্রই বিষয়টি নিয়ে উচ্চতর আদালতের দ্বারস্থ হব।"

আক্রমণের প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক উত্তাপ

বিগত বেশ কয়েকটি নির্বাচনে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে ইভিএম-এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এবারের আক্রমণ পূর্বের সব অভিযোগকে ছাপিয়ে গেছে। দলীয় এক কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখার সময় তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন যে, জনগণের রায়কে ‘হাইজ্যাক’ করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, মানুষের ভোটাধিকার যেখানে সুরক্ষিত নয়, সেখানে গণতন্ত্রের কোনো অস্তিত্ব থাকতে পারে না।

অভিষেক তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, নির্দিষ্ট কিছু কেন্দ্রে যেখানে তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান সুনিশ্চিত ছিল, সেখানে ইভিএম গণনা বা যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাতে ফলাফল প্রভাবিত করা হয়েছে। তাঁর কথায়, "এটা কেবল তৃণমূল কংগ্রেসের জয়-পরাজয়ের লড়াই নয়, এটা ভারতের কোটি কোটি মানুষের ভোটাধিকারের অধিকার রক্ষার লড়াই। যদি একটি যন্ত্রের মাধ্যমে জনমতকে বদলে দেওয়া যায়, তবে সেই দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে।"

প্রযুক্তি বনাম নিরপেক্ষতা: ইভিএম ও ভিভিপ্যাট বিতর্ক

ইভিএম এবং এর সাথে যুক্ত ভিভিপ্যাট (VVPAT) স্লিপ নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। বিরোধীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল ১০০ শতাংশ ভিভিপ্যাট স্লিপ গণনা করা হোক। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সেই দাবিকে পুনরুজ্জীবিত করে বলেন, "যদি মেশিনের স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন থাকে, তবে কেন ব্যালট পেপারে ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছে নির্বাচন কমিশন? কেন প্রতিটি ভোটের স্লিপ যাচাই করা হচ্ছে না?"

বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা অনেক সময় ভোটারদের মনে সন্দেহের উদ্রেক করে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মন্তব্য সেই ক্ষোভের বারুদেই অগ্নিসংযোগ করেছে। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, ভোটের ফলাফল ঘোষণার আগে এবং পরে ইভিএম মেশিনের নিরাপত্তা এবং সেটিংসে কারচুপি করার যথেষ্ট অবকাশ থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে মেশিনের 'সফটওয়্যার চিপ' এবং তার ম্যানিপুলেশন নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।

ভোট গণনায় কারচুপি বনাম প্রযুক্তির সুরক্ষা

তৃণমূল নেতৃত্বের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, ভোট গ্রহণ এবং গণনার মাঝে যে দীর্ঘ সময় থাকে, সেই সময়েই ইভিএম-এর তথ্য পরিবর্তন করা সম্ভব। যদিও নির্বাচন কমিশন সবসময় এই দাবি নস্যাৎ করেছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রসঙ্গে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে বলেন যে, বহু জায়গায় দেখা গেছে ইভিএম-এ পড়া মোট ভোট এবং গণনায় পাওয়া ভোটের হিসেবে গরমিল রয়েছে। এই 'ডেটা মিসম্যাচ' বা তথ্যের অসঙ্গতিই তাঁর প্রধান অস্ত্র হতে চলেছে আইনি লড়াইয়ে। তিনি আরও বলেন যে, ভারতের মতো একটি বিশাল দেশে যেখানে ভোট প্রক্রিয়া কয়েক দফায় চলে, সেখানে মেশিনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কমিশনের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ, যা অনেক ক্ষেত্রেই লঙ্ঘিত হচ্ছে।

আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি ও আইনি যুক্তি

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এই লড়াই শুধু রাজপথের আন্দোলন বা রাজনৈতিক সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তৃণমূল কংগ্রেসের লিগ্যাল সেল ইতিমধ্যেই সমস্ত তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করতে শুরু করেছে। নির্দিষ্ট কিছু নির্বাচনী কেন্দ্রের ইভিএম-এর অসঙ্গতি এবং গণনা পদ্ধতির ত্রুটিগুলি নিয়ে তারা সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করার পরিকল্পনা করছে।

তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, ইভিএম হ্যাকিং বা চিপ লেভেলের কারসাজি নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে যে বিতর্ক চলছে, ভারতের প্রেক্ষাপটেও তার তদন্ত হওয়া জরুরি। অভিষেক বলেন, "আমরা দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থাশীল। আমরা চাই আদালত এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করুক এবং নির্বাচন কমিশনকে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় ভোট করার নির্দেশ দিক। যদি প্রয়োজন হয়, তবে ব্যালট পেপার ফেরানোর জন্য আমরা বৃহত্তর আইনি সংগ্রাম গড়ে তুলব।"

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে ইভিএম

news image
আরও খবর

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বক্তব্যে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর উদাহরণও টেনে আনেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস বা আয়ারল্যান্ডের মতো দেশগুলো কেন ইভিএম বর্জন করে আবার ব্যালট পেপারে ফিরে গেছে। তিনি প্রশ্ন করেন, "ভারত যদি প্রযুক্তিতে এতই উন্নত হয়, তবে এই উন্নত দেশগুলো কেন ইভিএম-এর ওপর ভরসা করতে পারল না? সেখানে যদি মেশিন হ্যাক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে ভারতেও সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।" এই যুক্তির মাধ্যমে তিনি সাধারণ ভোটারদের মনে ইভিএম-এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করেছেন।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা আক্রমণ

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মন্তব্যের পর বিরোধী শিবির, বিশেষ করে বিজেপি পালটা আক্রমণ শানিয়েছে। বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের দাবি, তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের পায়ের তলার মাটি হারাচ্ছে বুঝতে পেরেই এখন ইভিএম-এর ওপর দোষ চাপাচ্ছে। তাঁদের মতে, "যখন তৃণমূল জেতে তখন ইভিএম ঠিক থাকে, আর যখন হারে তখনই ইভিএম খারাপ হয়ে যায়—এই দ্বিচারিতা মানুষ বুঝে গেছে।" তারা আরও যোগ করেন যে, নির্বাচন কমিশন একটি স্বশাসিত সংস্থা এবং ইভিএম নিয়ে এই ধরনের মন্তব্য করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকেই অপমান করছেন।

জনমানসে এর প্রভাব ও সামাজিক বিতর্ক

সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এই ইভিএম বিতর্কের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। সাধারণ মানুষের একটি অংশ মনে করছেন যে, যদি মেশিনে কারচুপি সম্ভব হয় তবে ভোট দেওয়ার গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ প্রযুক্তির ওপর আস্থা রাখলেও স্বচ্ছতার প্রশ্নে তারাও সোচ্চার। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মুভমেন্ট সোশ্যাল মিডিয়াতেও বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। "My Vote My Right" বা "Ban EVM" হ্যাশট্যাগগুলি ট্রেন্ড করতে শুরু করেছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সাধারণ মানুষ এই বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবছেন।

নির্বাচন কমিশনের অবস্থান ও চ্যালেঞ্জ

ভারতীয় নির্বাচন কমিশন বারবার দাবি করে এসেছে যে ইভিএম সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত এবং এটি কোনো ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত নয়, ফলে একে হ্যাক করা অসম্ভব। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে ইভিএম ব্যবহারের আগে বহুবার মহড়া বা 'মক পোল' করা হয়। তবে অভিষেকের মতো হেভিওয়েট নেতার আদালতের যাওয়ার হুমকি কমিশনের ওপর নৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে নিঃসন্দেহে। যদি আদালত কোনো বিশেষ অডিটের নির্দেশ দেয়, তবে তা ভারতীয় নির্বাচনী ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে।

গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ও জনগণের আস্থা

একটি সুস্থ গণতন্ত্রে ভোটারের আস্থাই শেষ কথা। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বক্তব্যে বারবার এই আস্থার সংকটের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, "মানুষ রোদে পুড়ে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিচ্ছেন, আর সেই ভোট যদি যান্ত্রিক কারসাজিতে অন্য কোথাও চলে যায়, তবে ভোট দেওয়ার প্রাসঙ্গিকতা থাকে না। আমরা চাই প্রতিটি ভোটারের ভোট যাতে তাঁর পছন্দের প্রার্থীই পান।"

তাঁর এই মন্তব্যের ফলে তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বুথ স্তরের কর্মীদের জানানো হয়েছে যে, আগামী দিনে প্রতিটি ইভিএম-এর গতিবিধির ওপর কড়া নজর রাখতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন আদালতের লড়াই খুব একটা সহজ হবে না। কারণ ইভিএম কারচুপির সুনির্দিষ্ট কারিগরি প্রমাণ জোগাড় করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন, তাতে পরিষ্কার যে তিনি এই বিষয়টিকে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করতে চাইছেন।

উপসংহার

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের "ইভিএম বদলে ক্ষমতায় আসা" এবং "আদালতে যাওয়ার" হুঁশিয়ারি আগামী বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে এক নতুন মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে। এটি কি কেবল পরাজয়ের পূর্বাভাস থেকে বাঁচতে রাজনৈতিক কৌশল, নাকি এর পেছনে সত্যিই কোনো অকাট্য তথ্য রয়েছে, তা সময়ই বলবে। তবে তৃণমূল কংগ্রেস যদি সত্যিই আদালতের মাধ্যমে ইভিএম-এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রামাণ্য নথি পেশ করতে পারে, তবে তা কেবল ভারতের নয়, বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে।

আপাতত সবার নজর এখন আদালতের দিকে—বিচারব্যবস্থা কি ইভিএম ইস্যুতে কোনো যুগান্তকারী রায় দেবে? নাকি ইভিএম বিতর্ক বরাবরের মতো একটি অমীমাংসিত রাজনৈতিক তর্কের বিষয় হয়েই থেকে যাবে? ভারতবাসী এখন সেই উত্তরের অপেক্ষায়।

Preview image