Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ক্ষমতার পালাবদলে পুজো দখল নয়, বিধায়কদের কড়া বার্তা শমীক ভট্টাচার্যের

ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও জোর করে কোনও পুজো কমিটি দখল করা যাবে না—দলের বিধায়কদের স্পষ্ট বার্তা দিলেন শমীক ভট্টাচার্য। পুজোয় অংশগ্রহণ বা সভাপতির দায়িত্ব নেওয়া যেতে পারে, তবে তা হতে হবে কমিটির সম্মতি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

ক্ষমতার পরিবর্তন মানেই সামাজিক, সাংস্কৃতিক কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির উপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা নয়। রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এলেও জোর করে কোনও দুর্গাপুজো কমিটির দায়িত্ব বা নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যাবে না—দলের বিধায়ক ও নেতাদের উদ্দেশে এমনই স্পষ্ট এবং কড়া বার্তা দিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক দলের নেতা বা জনপ্রতিনিধিরা এলাকার পুজোয় অংশগ্রহণ করতে পারেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিতে পারেন এবং কোনও কমিটি স্বেচ্ছায় চাইলে সভাপতির দায়িত্বও নিতে পারেন। কিন্তু কোনও অবস্থাতেই ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব বা প্রশাসনিক পরিচয় ব্যবহার করে পুজো কমিটি দখল করা চলবে না।

শমীক ভট্টাচার্যের এই বক্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজো শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এটি বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, শিল্প, সামাজিক সম্প্রীতি এবং সম্মিলিত অংশগ্রহণের অন্যতম বৃহৎ উৎসব। একটি এলাকার পুজোকে সফল করে তুলতে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে স্থানীয় বাসিন্দা, ক্লাবের সদস্য, ব্যবসায়ী, শিল্পী, স্বেচ্ছাসেবক, মহিলা, যুবক এবং প্রবীণ নাগরিকেরা একসঙ্গে কাজ করেন। তাই পুজো কমিটিকে কোনও একটি রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণাধীন সংগঠনে পরিণত করা হলে উৎসবের সর্বজনীন চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

শমীক ভট্টাচার্য পরিষ্কার করে দিয়েছেন, কোনও নেতা বা বিধায়ক একাধিক পুজোর সঙ্গে যুক্ত হতেই পারেন। তাঁরা উদ্বোধনে উপস্থিত থাকতে পারেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন, সামাজিক উদ্যোগে সহযোগিতা করতে পারেন এবং পুজোর আয়োজকদের পাশে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু এই অংশগ্রহণ হতে হবে আমন্ত্রণ, পারস্পরিক সম্মান এবং কমিটির সদস্যদের সম্মতির ভিত্তিতে। রাজনৈতিক ক্ষমতা দেখিয়ে পুরোনো সদস্যদের সরিয়ে দেওয়া, কমিটির পদ দখল করা কিংবা স্থানীয় মানুষের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

পুজোর সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

বাংলার রাজনীতিতে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয়তা নতুন বিষয় নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-মন্ত্রীরা বহু বছর ধরে বিভিন্ন পুজো কমিটির সভাপতি, প্রধান পৃষ্ঠপোষক অথবা বিশেষ অতিথির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এতে সব সময় সমস্যা তৈরি হয় না। জনপ্রতিনিধিরা এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন—এটাই স্বাভাবিক।

সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন কোনও পুজো কমিটির স্বাভাবিক পরিচালন ব্যবস্থায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ শুরু হয়। স্থানীয় সদস্যদের মতামত না নিয়ে নেতৃত্ব পরিবর্তন করা, ভয় দেখিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করা, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সদস্য নির্বাচন করা অথবা বিরোধী মতের মানুষদের কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হলে পুজোর পরিবেশ নষ্ট হতে পারে।

এই জায়গাতেই শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক দখলদারির মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছেন। তাঁর বার্তার মূল কথা হলো—পুজোয় অংশগ্রহণ করা যাবে, কিন্তু পুজোকে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

দলের কোনও বিধায়ককে যদি একটি পুজো কমিটির সদস্যরা সর্বসম্মতভাবে সভাপতি করতে চান, তাহলে তিনি সেই দায়িত্ব নিতে পারেন। কিন্তু সভাপতি হওয়া বা কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদ গ্রহণের সিদ্ধান্তটি সংশ্লিষ্ট কমিটির গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে হতে হবে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে বলে পুরোনো কমিটি ভেঙে নতুন রাজনৈতিক অনুগামীদের নিয়ে কমিটি গঠন করা উচিত নয়।

ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সংযমের নির্দেশ

রাজ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ক্লাব, ইউনিয়ন এবং উৎসব কমিটির নেতৃত্বে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করেন। এই ধরনের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতেই শমীক ভট্টাচার্য দলের বিধায়ক ও নেতাদের সতর্ক করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে একটি বিষয় স্পষ্ট—সরকার পরিবর্তন হলেও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা বজায় রাখতে হবে। রাজনৈতিক দল সরকার পরিচালনা করতে পারে, প্রশাসনিক নীতি নির্ধারণ করতে পারে এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করতে পারে। কিন্তু পাড়ার পুজো কমিটি, সাংস্কৃতিক সংগঠন অথবা সামাজিক ক্লাবের সিদ্ধান্তে জোর করে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কোনও রাজনৈতিক দলের নেই।

পুজো কমিটি পরিচালনার দায়িত্ব মূলত স্থানীয় মানুষ এবং সংগঠনের সদস্যদের। কারা সভাপতি হবেন, কারা সম্পাদক বা কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করবেন এবং কীভাবে পুজোর আয়োজন হবে—এসব সিদ্ধান্ত কমিটির গঠনতন্ত্র, সাধারণ সভা এবং সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। কোনও রাজনৈতিক নেতা নিজের পরিচয় বা ক্ষমতা ব্যবহার করে এসব সিদ্ধান্ত বদলে দিলে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।

শমীক ভট্টাচার্যের নির্দেশ দলের বিধায়কদের জন্য রাজনৈতিক শৃঙ্খলার বার্তা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করা নয়। তাঁদের সামাজিক শান্তি, সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষা করার দায়িত্বও রয়েছে। ফলে কোনও পুজো কমিটিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, বিতর্ক বা দখলদারির অভিযোগ উঠলে তা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

দুর্গাপুজো সর্বজনের উৎসব

দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সর্বজনীনতা। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, নাটক, সামাজিক সচেতনতা এবং মানবিক উদ্যোগের বিস্তার ঘটে। বহু পুজো কমিটি রক্তদান শিবির, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দরিদ্র মানুষের মধ্যে পোশাক বিতরণ, শিক্ষাসামগ্রী প্রদান এবং পরিবেশ রক্ষার মতো উদ্যোগ গ্রহণ করে।

একটি পুজো কমিটিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ একসঙ্গে কাজ করতে পারেন। কেউ শাসক দলের সমর্থক, কেউ বিরোধী দলের সমর্থক এবং কেউ কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই যুক্ত নাও থাকতে পারেন। কিন্তু পুজোর সময় তাঁদের প্রধান পরিচয় হয় এলাকার বাসিন্দা এবং উৎসবের আয়োজক হিসেবে।

news image
আরও খবর

পুজো কমিটির মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হলে দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই এলাকার প্রতিবেশীদের মধ্যে বিরোধ বাড়তে পারে এবং উৎসবের আনন্দ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় পরিণত হতে পারে। তাই পুজো কমিটির স্বাভাবিক ও নিরপেক্ষ চরিত্র রক্ষা করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্যে সেই সর্বজনীনতার কথাই উঠে এসেছে। পুজো কোনও রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি সাধারণ মানুষের উৎসব। রাজনৈতিক নেতারা সেখানে অতিথি, সহযোগী অথবা কমিটির অনুমোদিত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে থাকতে পারেন। কিন্তু তাঁরা উৎসবের মালিক নন।

সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে কমিটির সম্মতি জরুরি

অনেক পুজো কমিটি এলাকার পরিচিত জনপ্রতিনিধি, সমাজকর্মী, ব্যবসায়ী বা বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করে। এর উদ্দেশ্য হতে পারে প্রশাসনিক সহযোগিতা পাওয়া, পুজোর প্রচার বাড়ানো অথবা আয়োজনে অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে যুক্ত করা। এই ধরনের নির্বাচন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হলে তা নিয়ে কোনও আপত্তি থাকার কথা নয়।

শমীক ভট্টাচার্যও জানিয়েছেন, কোনও কমিটি চাইলে দলের বিধায়ক বা নেতাকে সভাপতি করতে পারে। তবে সেই সিদ্ধান্ত কমিটির সদস্যদের সম্মতির ভিত্তিতে হতে হবে। বাইরে থেকে চাপ সৃষ্টি করে অথবা রাজনৈতিক ক্ষমতা দেখিয়ে পদ নেওয়ার চেষ্টা করা যাবে না।

কমিটির সাধারণ সভায় আলোচনা, প্রস্তাব গ্রহণ, সদস্যদের সম্মতি এবং প্রয়োজন হলে ভোটাভুটির মাধ্যমে সভাপতি বা অন্যান্য পদাধিকারী নির্বাচন করা যেতে পারে। এতে দায়িত্ব গ্রহণকারী ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে এবং ভবিষ্যতে কোনও বিরোধের সম্ভাবনাও কমে।

অন্যদিকে জোর করে দায়িত্ব নিলে কমিটির পুরোনো সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। তাঁরা পুজো থেকে দূরে সরে যেতে পারেন এবং আয়োজনে বিভাজন দেখা দিতে পারে। বহু বছরের পুরোনো পুজোর ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সেই কারণেই কমিটির সম্মতি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিধায়কদের কীভাবে পুজোয় অংশগ্রহণ করা উচিত

জনপ্রতিনিধি হিসেবে বিধায়কদের এলাকার মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকা প্রয়োজন। পুজোর সময় তাঁরা বিভিন্ন মণ্ডপে যেতে পারেন, উদ্বোধনে অংশ নিতে পারেন এবং আয়োজকদের উৎসাহিত করতে পারেন। কিন্তু তাঁদের ভূমিকা হওয়া উচিত সহযোগিতামূলক, নিয়ন্ত্রণমূলক নয়।

বিধায়কেরা পুজোর সময় প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। বিদ্যুৎ, পানীয় জল, যান নিয়ন্ত্রণ, অগ্নিনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে কমিটিকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দিতে পারেন। তবে এই সহযোগিতার বিনিময়ে কমিটির পদ বা নিয়ন্ত্রণ দাবি করা উচিত নয়।

এলাকার ছোট ও মাঝারি পুজোগুলির পাশে দাঁড়ানোও জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বের মধ্যে পড়তে পারে। অনেক ছোট পুজো কমিটি আর্থিক এবং পরিকাঠামোগত সমস্যার সম্মুখীন হয়। বিধায়কেরা নিয়ম মেনে সরকারি সুবিধা, প্রশাসনিক অনুমতি অথবা প্রয়োজনীয় পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের পথ দেখাতে পারেন।

কিন্তু সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এক বিষয় নয়। সহযোগিতার উদ্দেশ্য হবে উৎসবকে নিরাপদ ও সফল করা। প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্য হয় কমিটির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। শমীক ভট্টাচার্যের বার্তা এই দুইয়ের পার্থক্যই দলের নেতাদের মনে করিয়ে দিয়েছে।

 

 

 

 

 

Preview image