ভারতে ব্রাজিলের বিপুল সমর্থকসংখ্যা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মার্কুইনহোস। যুবভারতীতে সেই সমর্থকদের সামনে খেলতে মুখিয়ে রয়েছেন ব্রাজিল অধিনায়ক, ভারত ম্যাচ নিয়ে তাঁর উচ্ছ্বাসও স্পষ্ট।
ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের জন্য ৩ অক্টোবর ২০২৬ হতে চলেছে বিশেষ একটি দিন। কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে প্রথম বার সিনিয়র স্তরে মুখোমুখি হবে ভারত এবং পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ঐতিহাসিক এই আন্তর্জাতিক ফ্রেন্ডলি ম্যাচকে ঘিরে ইতিমধ্যেই ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ম্যাচের আগে ব্রাজিলের অধিনায়ক মার্কুইনহোসের মন্তব্য সেই আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারতীয় সমর্থকদের সামনে খেলতে পারাকে তিনি বিশেষ সুযোগ হিসেবে দেখছেন এবং কলকাতায় এসে সমর্থকদের উষ্ণ অভ্যর্থনায় ব্রাজিল দল অনুপ্রাণিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন।
মার্কুইনহোসের কাছে এটি ভারতে প্রথম সফর। তবে ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের সঙ্গে ব্রাজিলের সম্পর্ক তাঁর অজানা নয়। ভারত যে ব্রাজিলের অন্যতম বড় সমর্থকভিত্তিক দেশ, সেটি তিনি জানেন। ম্যাচের আগে সাংবাদিক বৈঠকে ব্রাজিল অধিনায়ক বলেন, ভারতের মতো দেশে এসে খেলার সুযোগ তাঁদের কাছে আনন্দের এবং সম্মানের। ভারতীয় সমর্থকদের সামনে খেলাটিকে তিনি ব্রাজিলের জন্য একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন।
ভারতে ব্রাজিলের জনপ্রিয়তা বহু দশকের। বিশ্বকাপের সময় কলকাতা-সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ জার্সি দেখা যায়। ব্রাজিলের ফুটবল তারকা, বিশ্বকাপের ইতিহাস এবং আক্রমণাত্মক ফুটবলের প্রতি ভারতীয় সমর্থকদের দীর্ঘদিনের আগ্রহ রয়েছে। AIFF-ও জানিয়েছে, ব্রাজিলের বাইরে ভারতের অন্যতম বড় ব্রাজিল সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। ফলে কলকাতায় ব্রাজিলের এই ম্যাচ শুধু একটি আন্তর্জাতিক ফ্রেন্ডলি নয়, ভারতীয় সমর্থকদের কাছে দীর্ঘদিনের ফুটবল-আবেগের সঙ্গে যুক্ত একটি অনুষ্ঠানও হয়ে উঠেছে।
মার্কুইনহোস জানিয়েছেন, কলকাতায় এসে ব্রাজিল দল যে অভ্যর্থনা পেয়েছে, তা তাঁদের তরুণ ফুটবলারদেরও অনুপ্রাণিত করেছে। নতুন প্রজন্মের বেশ কয়েকজন ফুটবলার এই সফরের অংশ হওয়ায় তাঁদের জন্য ভারত সফরের অভিজ্ঞতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজিলের দলটি বর্তমানে নতুন পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে এবং কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে দলকে আরও সংগঠিত করার প্রক্রিয়া চলছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলি নতুন খেলোয়াড়দের নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগও দিচ্ছে।
ভারত-ব্রাজিল ম্যাচের গুরুত্বের আর একটি কারণ হল দুই দলের FIFA র্যাঙ্কিংয়ের ব্যবধান। ম্যাচের আগে ব্রাজিল পঞ্চম স্থানে এবং ভারত ১৩৮তম স্থানে রয়েছে। AIFF-এর তথ্য অনুযায়ী, FIFA র্যাঙ্কিং চালুর পর এটিই ভারতের মুখোমুখি হওয়া সর্বোচ্চ র্যাঙ্কিংয়ের প্রতিপক্ষ। ফলে ভারতীয় দলের জন্য ম্যাচটি বড় আন্তর্জাতিক পরীক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে ব্রাজিল অধিনায়ক স্পষ্ট করেছেন যে ভারতকে তারা হালকা ভাবে নিচ্ছেন না। তাঁর কথায়, ভারত সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ম্যাচ খেলেছে এবং ব্রাজিলের টিম ম্যানেজমেন্ট প্রতিপক্ষকে নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে। অর্থাৎ ম্যাচটি শুধুই ব্রাজিলের তারকাদের দেখার সুযোগ নয়; মাঠে ভারতীয় দলের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়েই নামতে চলেছে পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
এই ম্যাচের আগে মার্কুইনহোসের বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে এসেছে ভারতের গোলকিপার গুরপ্রীত সিংহ সঁধুর নাম। ব্রাজিল অধিনায়ক উল্লেখ করেছেন যে ভারতের অভিজ্ঞ গোলকিপারের এটি ৯০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ হতে চলেছে। গুরপ্রীতের এই মাইলস্টোনকে তিনি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন এবং তাঁকে শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন। ভারতের দীর্ঘদিনের জাতীয় দলের গোলরক্ষক হিসেবে গুরপ্রীতের অভিজ্ঞতা যে ব্রাজিলের নজর এড়ায়নি, মার্কুইনহোসের মন্তব্যে সেটিই স্পষ্ট হয়েছে।
গুরপ্রীত সিংহ সঁধু ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়। জাতীয় দলের পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলেও দীর্ঘদিন ধরে গোলপোস্ট সামলাচ্ছেন তিনি। ব্রাজিলের মতো দলের বিরুদ্ধে ভারতের রক্ষণে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে ব্রাজিলের আক্রমণভাগে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, এন্দ্রিক, গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি এবং অন্যান্য তারকা ফুটবলার থাকায় ভারতীয় গোলরক্ষকের সামনে বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। ব্রাজিলের ঘোষিত দলে একাধিক পরিচিত তারকা রয়েছেন।
গুরপ্রীতের ৯০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচের প্রসঙ্গটি তাই ম্যাচের আবহে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। মার্কুইনহোস নিজেই যখন তাঁর মাইলস্টোনের কথা উল্লেখ করেছেন, তখন ভারতীয় গোলরক্ষকের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। যদিও মাঠে ম্যাচের পরিস্থিতি কী হবে, তা নির্ভর করবে দুই দলের পারফরম্যান্সের উপর।
ভারতের দিক থেকেও ম্যাচটির গুরুত্ব কম নয়। ভারতীয় দল কোচ খালিদ জামিলের অধীনে নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রাজিলের মোকাবিলা করতে প্রস্তুত হচ্ছে। ভারতীয় অধিনায়ক হিসেবে গুরপ্রীত সিংহ সঁধুও জানিয়েছেন, এই ম্যাচকে শুধু তারকাদের সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষ্যেই মাঠে নামবে—এমন বার্তা এসেছে তাঁর কাছ থেকে।
অন্যদিকে ব্রাজিলের জন্যও কলকাতার ম্যাচটি প্রস্তুতির অংশ। ২০২৬ বিশ্বকাপের পর নতুন পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে দলটি। আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিলের লক্ষ্য নতুন খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুযোগ দেওয়া এবং একটি সুসংগঠিত দল তৈরি করা। ভারত ম্যাচের আগে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ব্রাজিল দুটি ম্যাচ খেলেছে। কলকাতার ম্যাচ সেই আন্তর্জাতিক প্রস্তুতি পর্বেরই অংশ।
বিশ্বকাপ প্রসঙ্গেও সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে মার্কুইনহোসকে। ২০০২ সালের পর থেকে ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিততে পারেনি—এই বাস্তবতার পাশাপাশি সাম্প্রতিক বিশ্বকাপের হতাশাজনক ফলাফল নিয়েও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ব্রাজিল অধিনায়ক অতীত নিয়ে বেশি ভাবতে চান না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দলের লক্ষ্য এখন বর্তমান এবং ভবিষ্যতের দিকে নজর রাখা। পুরনো ফলাফল নিয়ে পড়ে না থেকে নতুন ম্যাচগুলির মাধ্যমে দলকে প্রস্তুত করাই তাঁদের উদ্দেশ্য।
এই বক্তব্যের সঙ্গে ব্রাজিলের বর্তমান পরিকল্পনারও মিল রয়েছে। কার্লো আনচেলত্তি দায়িত্ব নেওয়ার পর দলটিতে নতুন প্রজন্মের কয়েকজন ফুটবলারকে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। বিশ্বকাপের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে নতুন চক্র শুরু করার ক্ষেত্রে ভারত সফরও সেই প্রস্তুতির একটি অংশ। কলকাতার ম্যাচে ব্রাজিলের তরুণ ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মার্কুইনহোস নিজেও দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার অধিকারী। ব্রাজিল জাতীয় দলের অধিনায়ক হওয়ার পাশাপাশি তিনি ক্লাব ফুটবলেও দীর্ঘদিন শীর্ষ পর্যায়ে খেলেছেন। প্যারিস সঁ জরমেঁর হয়ে তাঁর সাফল্য এবং ব্রাজিলের জাতীয় দলের হয়ে বড় টুর্নামেন্ট খেলার অভিজ্ঞতা তাঁকে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের ভূমিকায় রেখেছে। কলকাতায় তাঁর নেতৃত্বে ব্রাজিল মাঠে নামবে।
যুবভারতীতে এই ম্যাচকে ঘিরে কলকাতার ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ব্রাজিলের মতো বিশ্বখ্যাত দলের বিরুদ্ধে ভারতের প্রথম সিনিয়র আন্তর্জাতিক ম্যাচ হওয়ায় স্টেডিয়ামে বিশেষ আবহ তৈরি হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। AIFF-এর তথ্য অনুযায়ী, ম্যাচটি ৩ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে শুরু হবে।
ব্রাজিল দলের কলকাতা সফরও ইতিমধ্যে শহরে ফুটবল আবহ তৈরি করেছে। দলের বিমানবন্দরে পৌঁছনোর সময় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, এন্দ্রিক, মারকুইনহোস-সহ ব্রাজিলের তারকা ফুটবলারদের দেখতে সমর্থকদের মধ্যে আগ্রহ দেখা যায়। দলের উপস্থিতি কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ফুটবল সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন মাত্রায় যোগ করেছে।
এই ম্যাচের আগে মার্কুইনহোসের মন্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ভারতীয় সমর্থকদের প্রতি তাঁর সম্মান। তিনি বুঝেছেন যে ব্রাজিলের প্রতি ভারতের আবেগ দীর্ঘদিনের। তাই ভারতীয় সমর্থকদের সামনে খেলাটিকে ব্রাজিল দলের কাছে আনন্দের মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন তিনি। ম্যাচটি তাঁদের জন্য সমর্থকদের সঙ্গে এক ধরনের সংযোগ তৈরির সুযোগও বলে মনে করছেন।
তবে মাঠে নামার পর আবেগের পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতাও থাকবে। মার্কুইনহোস জানিয়েছেন, ব্রাজিলের লক্ষ্য জয়। একই সঙ্গে ভারতীয় দলের সাম্প্রতিক ম্যাচ এবং তাদের খেলার ধরন বিশ্লেষণ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। ফলে ভারতীয় দলের সামনে ব্রাজিলের তারকাখচিত আক্রমণ সামলানোর পাশাপাশি নিজেদের আক্রমণের সুযোগ তৈরি করার চ্যালেঞ্জও থাকবে।
গুরপ্রীত সিংহ সঁধুর জন্য ম্যাচটি ব্যক্তিগতভাবেও স্মরণীয় হয়ে উঠতে পারে। ৯০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচের মাইলস্টোনের সঙ্গে একই ম্যাচে বিশ্বের অন্যতম সফল ফুটবল দলের মুখোমুখি হওয়া তাঁর আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের একটি উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত হতে পারে। মার্কুইনহোসের মতো প্রতিপক্ষ অধিনায়কের মুখে তাঁর নাম উঠে আসাও সেই উপলক্ষকে আরও বিশেষ করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে ভারত-ব্রাজিল ম্যাচ ঘিরে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে—ভারতে ব্রাজিলের বিপুল সমর্থকগোষ্ঠী, গুরপ্রীত সিংহ সঁধুর ৯০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং ব্রাজিলের নতুন পর্যায়ের প্রস্তুতি। মার্কুইনহোসের মন্তব্যে এই তিনটি বিষয়ই কোনও না কোনও ভাবে উঠে এসেছে।
শনিবার যুবভারতীতে ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের সামনে ব্রাজিলের মতো দলের খেলা নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক ফুটবলের একটি বড় উপলক্ষ। ব্রাজিলের কাছে এটি নতুন দল গড়ার প্রস্তুতির অংশ হলেও ভারতীয় ফুটবলের কাছে এই ম্যাচের আলাদা ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। মাঠে কী ফল হবে, তা ম্যাচেই নির্ধারিত হবে। তবে তার আগে মার্কুইনহোসের বক্তব্যে স্পষ্ট, ব্রাজিল ভারত সফরকে গুরুত্ব দিয়েই দেখছে এবং কলকাতার সমর্থকদের উচ্ছ্বাসকে তারা যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেছে।
এই ম্যাচে গুরপ্রীত বনাম ব্রাজিলের তারকা আক্রমণভাগের লড়াই এবং যুবভারতীর পরিবেশ—দুটিই তাই ফুটবলপ্রেমীদের নজরে থাকবে।