Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

শোলার সাজে দেবী, রামকৃষ্ণের পদধূলিধন্য ঘোষবাড়িতে আজও প্রাচীন রীতিতে দুর্গাপুজো

রামকৃষ্ণ পরমহংসের স্মৃতিধন্য ঘোষবাড়িতে আজও প্রাচীন রীতি মেনে অনুষ্ঠিত হয় দুর্গাপুজো। শোলার সাজে সজ্জিত হন দেবী দুর্গা। কামারপুকুর থেকে দাদার সঙ্গে কলকাতায় আসা যুবক গদাধরের স্মৃতিও জড়িয়ে রয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী বাড়ির সঙ্গে।

কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাসে এমন কিছু পরিবার রয়েছে, যাদের পুজোর সঙ্গে শুধু ধর্মীয় আচার নয়, জড়িয়ে রয়েছে বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি এবং আধ্যাত্মিক ইতিহাসের নানা স্মৃতি। সেই তালিকায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ঘোষবাড়ির দুর্গাপুজো। রামকৃষ্ণ পরমহংসের পদধূলিধন্য এই বাড়িতে আজও প্রাচীন রীতিনীতি মেনে দেবী দুর্গার আরাধনা হয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে কলকাতা বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাপন, পুজোর আয়োজনেও এসেছে নানা পরিবর্তন। কিন্তু ঘোষবাড়ির দুর্গাপুজোয় এখনও ধরে রাখা হয়েছে সেই পুরনো দিনের ঐতিহ্য।

এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ শোলার সাজে সজ্জিত দেবী দুর্গা। আধুনিক পুজোর ঝলমলে আলো, থিম কিংবা নানা ধরনের সাজসজ্জার বাইরে ঘোষবাড়ির পুজোয় প্রাধান্য পায় ঐতিহ্য এবং প্রাচীনতার আবহ। দেবীর সাজসজ্জায় শোলার ব্যবহার সেই পুরনো দিনের পুজোর স্মৃতিকে আরও জীবন্ত করে তোলে। প্রতিমার রূপ, পুজোর পরিবেশ এবং প্রাচীন আচার—সব মিলিয়ে এই বাড়ির দুর্গাপুজো হয়ে ওঠে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অনন্য মেলবন্ধন।

ঘোষবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের স্মৃতি। কামারপুকুর থেকে দাদার সঙ্গে কলকাতায় এসেছিলেন যুবক গদাধর। সেই সময় তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কাটে কলকাতায়। মধ্য কলকাতার ঝামাপুকুরে থাকার সময় তিনি ঠনঠনিয়া সিদ্ধেশ্বরী কালীর কাছে যাতায়াত করতেন। সেই সময়ের কলকাতা, তার অলিগলি, পাড়া এবং বনেদি পরিবারগুলির সঙ্গে তাঁর নানা স্মৃতিও আজ ইতিহাসের অংশ।

রামকৃষ্ণের পদধূলিধন্য ঘোষবাড়ির দুর্গাপুজো তাই শুধুমাত্র একটি বনেদি বাড়ির পুজো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উনিশ শতকের কলকাতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলের স্মৃতি। সেই কারণে এই পুজোর প্রতি আগ্রহ শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে নয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির দিক থেকেও তৈরি হয়।

দুর্গাপুজো বাঙালির জীবনে শুধুমাত্র একটি উৎসব নয়। এটি একদিকে যেমন ধর্মীয় আচার, তেমনই অন্যদিকে সামাজিক মিলন, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক। কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোগুলি এই ঐতিহ্যকে আরও গভীরভাবে ধারণ করে। শতাব্দী ধরে চলে আসা পারিবারিক পুজোগুলির মধ্যে অনেক সময় এমন সব ইতিহাস লুকিয়ে থাকে, যা শহরের সামগ্রিক ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে।

ঘোষবাড়ির পুজোর ক্ষেত্রেও সেই ইতিহাসের গুরুত্ব অপরিসীম। বাড়ির প্রাঙ্গণে দেবী দুর্গার আরাধনা যেমন পরিবারের ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিচয় বহন করে, তেমনই এই পুজো অতীতের সঙ্গে বর্তমানের একটি সেতুবন্ধন তৈরি করে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পুজোর সঙ্গে যুক্ত থাকা পরিবার আজও পুরনো রীতিনীতি ধরে রাখার চেষ্টা করে চলেছে।

সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে দুর্গাপুজোর আয়োজনের ধরনেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে এখন থিমের পুজো, বিশাল মণ্ডপ, আধুনিক আলোকসজ্জা এবং নানা ধরনের সৃজনশীল আয়োজন দেখা যায়। কিন্তু বনেদি বাড়ির পুজোগুলির আকর্ষণ অন্য জায়গায়। সেখানে চোখ ধাঁধানো আয়োজনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পারিবারিক ঐতিহ্য, পুরনো রীতি এবং ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক।

ঘোষবাড়ির পুজোও সেই ঐতিহ্যের ধারক। এখানে দেবী দুর্গার শোলার সাজ যেন আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা পুরনো কলকাতার একটি ছবি তুলে ধরে। শোলার কাজ বাংলার লোকশিল্প ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। তাই দেবীর সাজে শোলার ব্যবহার শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধির বিষয় নয়, বরং একটি পুরনো সাংস্কৃতিক রীতিকে ধরে রাখারও প্রতীক।

শোলার তৈরি অলংকার ও সাজসজ্জার নিজস্ব একটি নান্দনিকতা রয়েছে। হালকা, সাদা এবং সূক্ষ্ম কারুকাজে তৈরি শোলার সাজ দেবীর প্রতিমাকে আলাদা এক সৌন্দর্য দেয়। আধুনিক কৃত্রিম উপকরণের যুগেও এই প্রাচীন উপকরণ ব্যবহার করে দেবীকে সাজানো ঐতিহ্যবাহী পুজোর নিজস্ব পরিচয়কে সামনে নিয়ে আসে।

ঘোষবাড়ির পুজো দেখতে আসা মানুষের কাছে তাই দেবীর প্রতিমা যেমন আকর্ষণের কেন্দ্র, তেমনই বাড়ির ইতিহাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রামকৃষ্ণের সঙ্গে সম্পর্কিত স্মৃতি এই বাড়ির পুজোকে আরও বিশেষ করে তুলেছে। ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত কোনও স্থান বা বাড়িতে দাঁড়িয়ে যখন শতাব্দীপ্রাচীন একটি পুজোর ধারাবাহিকতা দেখা যায়, তখন সেই অভিজ্ঞতার মধ্যে আলাদা আবেগ তৈরি হয়।

যুবক গদাধরের কলকাতায় আগমন তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলির অন্যতম। কামারপুকুরের গ্রামীণ পরিবেশ থেকে কলকাতার ব্যস্ত নগরজীবনে এসে তিনি যে সময় কাটিয়েছিলেন, সেই সময়ের নানা স্মৃতি পরবর্তী জীবনে তাঁর আধ্যাত্মিক যাত্রার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। মধ্য কলকাতার ঝামাপুকুরে থাকার সময় ঠনঠনিয়া সিদ্ধেশ্বরী কালীর কাছে তাঁর যাতায়াতের কথাও সেই সময়ের স্মৃতির অংশ।

আজকের কলকাতার সঙ্গে সেই সময়ের কলকাতার অনেক পার্থক্য। কিন্তু শহরের বহু পুরনো বাড়ি, মন্দির এবং পুজোর রীতির মধ্যে এখনও সেই অতীতের কিছু চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়। ঘোষবাড়ির মতো বনেদি পরিবারের পুজো সেই অতীতকে বর্তমানের সামনে তুলে ধরার অন্যতম মাধ্যম।

দুর্গাপুজোর সময় এই বাড়ির পরিবেশ তাই অন্যরকম হয়ে ওঠে। প্রাচীন বাড়ির স্থাপত্য, পুজোর প্রস্তুতি, প্রতিমার সাজসজ্জা এবং পুরনো আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে যেন ফিরে আসে অন্য এক সময়ের কলকাতা। উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি থাকে ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৌতূহল।

বনেদি বাড়ির পুজোর সবচেয়ে বড় শক্তি হল তার ধারাবাহিকতা। বছরের পর বছর, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই পরিবারের মধ্যে পুজোর রীতি বজায় থাকে। অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা দূরে থাকলেও পুজোর সময় বাড়িতে ফিরে আসেন। দুর্গাপুজো হয়ে ওঠে পারিবারিক পুনর্মিলনের একটি বিশেষ উপলক্ষ।

এই ধরনের পুজোয় নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরনো রীতি ও আচারকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তাঁদেরই। ঘোষবাড়ির পুজোর ক্ষেত্রেও সেই ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রয়াসই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কয়েকশো বছরের পুরনো কোনও পুজো শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, ভবিষ্যতের জন্যও একটি সাংস্কৃতিক সম্পদ।

প্রাচীন পুজোর রীতিগুলি ধরে রাখা সহজ নয়। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যায়। মানুষের জীবনযাত্রা পরিবর্তিত হয়, অনেক পুরনো উপকরণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, কিছু রীতি পালন করাও কঠিন হয়ে ওঠে। তবু পরিবারের সদস্যরা যদি ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করেন, তাহলে সেই পুজো তার নিজস্ব পরিচয় বজায় রাখতে পারে।

ঘোষবাড়ির পুজোর ক্ষেত্রেও প্রাচীন রীতি মেনে চলার বিষয়টি তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দেবীর শোলার সাজ থেকে শুরু করে পুজোর পরিবেশ—সবকিছুর মধ্যেই পুরনো দিনের ছাপ রয়েছে। এই ধারাবাহিকতাই পুজোটিকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।

news image
আরও খবর

কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোগুলির সঙ্গে শহরের ইতিহাসের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। কলকাতা যখন ধীরে ধীরে একটি বড় শহর হিসেবে গড়ে উঠছিল, তখন বিভিন্ন পরিবার তাদের নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করেছিল। সেই পরিবারগুলির অনেকেই নিজেদের বাড়িতে দুর্গাপুজোর আয়োজন শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সেই পুজোগুলি শহরের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে।

এই পুজোগুলির মধ্যে অনেকগুলিই আজও টিকে আছে। কোনও পুজোর বয়স কয়েকশো বছর, কোনওটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, আবার কোনও পুজোর নিজস্ব প্রতিমারীতি বা আচার রয়েছে। ঘোষবাড়ির পুজোও সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রামকৃষ্ণের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এই বাড়ির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন ও সাধনার সঙ্গে বাংলার বহু স্থান ও মানুষের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। কলকাতায় তাঁর অবস্থানের সময়কার বিভিন্ন স্মৃতিও আজ মানুষের কাছে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ঘোষবাড়ির মতো একটি পুজোবাড়ি শুধু ধর্মীয় দর্শনের জায়গা নয়, ইতিহাস অন্বেষণেরও একটি ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

দুর্গাপুজোর সময় দর্শনার্থীরা সাধারণত প্রতিমা, মণ্ডপ এবং আলোকসজ্জার পাশাপাশি পুজোর ইতিহাস জানতে আগ্রহী হন। বনেদি বাড়ির পুজোর ক্ষেত্রে সেই আগ্রহ আরও বেশি। কারণ প্রতিটি বাড়ির পুজোর পিছনে থাকে আলাদা গল্প। কোনও গল্পের কেন্দ্রে থাকে পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা, কোনওটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কোনও ঐতিহাসিক ঘটনা, আবার কোথাও রয়েছে কোনও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের স্মৃতি।

ঘোষবাড়ির পুজোর ক্ষেত্রে রামকৃষ্ণের স্মৃতি সেই গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কামারপুকুর থেকে কলকাতায় আসা যুবক গদাধরের জীবনযাত্রার সঙ্গে এই শহরের নানা স্থান যেমন যুক্ত, তেমনই সেই সময়ের সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবেশও তাঁর জীবনে প্রভাব ফেলেছিল। ঝামাপুকুরে থাকার সময় ঠনঠনিয়া সিদ্ধেশ্বরী কালীর কাছে যাতায়াতের উল্লেখ সেই সময়ের ধর্মীয় পরিবেশের একটি ছবি তুলে ধরে।

কলকাতার পুরনো পাড়া-মহল্লাগুলির ইতিহাসের সঙ্গে তাই রামকৃষ্ণের স্মৃতিও অনেক জায়গায় মিশে রয়েছে। আজকের ব্যস্ত শহরের মধ্যে সেই ইতিহাসকে খুঁজে পাওয়া অনেকটা অতীতের সঙ্গে কথোপকথনের মতো। ঘোষবাড়ির পুজো সেই অতীতের একটি জীবন্ত স্মারক।

শুধু ইতিহাস নয়, এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শিল্প ও কারুশিল্পের ঐতিহ্যও। শোলার সাজের মাধ্যমে সেই বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আসে। বাংলার গ্রামীণ ও লোকশিল্পের সঙ্গে শোলার কাজ দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। দেবদেবীর সাজসজ্জা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে শোলার ব্যবহার ঐতিহ্যের অংশ।

আজ যখন বাজারে নানা ধরনের আধুনিক উপকরণ সহজেই পাওয়া যায়, তখনও শোলার সাজ ব্যবহার করে দেবীকে সাজানো নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়াস। এর মাধ্যমে শুধু পুজোর পুরনো রীতি নয়, একটি শিল্পরীতিও বেঁচে থাকে।

দেবীর প্রতিমার সামনে দাঁড়ালে তাই একসঙ্গে কয়েকটি বিষয় অনুভব করা যায়—ধর্মীয় বিশ্বাস, পারিবারিক ঐতিহ্য, লোকশিল্প এবং ইতিহাস। এই বহুমাত্রিকতাই ঘোষবাড়ির পুজোর বিশেষত্ব।

পুজোর দিনগুলিতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যেমন উৎসাহ থাকে, তেমনই পুরনো পরিচিত মানুষ এবং দর্শনার্থীদের আনাগোনাতেও বাড়ি সরগরম হয়ে ওঠে। প্রাচীন বাড়ির পুজোয় এই সামাজিক যোগাযোগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুজো হয়ে ওঠে পুরনো সম্পর্ককে নতুন করে জাগিয়ে তোলার উপলক্ষ।

অনেকের কাছে বনেদি বাড়ির পুজো মানেই শৈশবের স্মৃতি। ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে পুজো দেখতে আসা, প্রতিমার সামনে দাঁড়ানো, পুজোর প্রসাদ পাওয়া কিংবা বাড়ির প্রবীণদের মুখে পুজোর ইতিহাস শোনা—এই স্মৃতিগুলি বছরের পর বছর মানুষের মনে থেকে যায়। ঘোষবাড়ির মতো প্রাচীন পুজোগুলির ক্ষেত্রেও এমন স্মৃতির ধারাবাহিকতা তৈরি হয়।

সময়ের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে পুজোর অর্থও বদলাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া, ছবি এবং ভিডিওর মাধ্যমে মানুষ এখন পুজোর নানা দিক অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেয়। কিন্তু বনেদি বাড়ির পুজোর আসল আকর্ষণ এখনও তার ইতিহাস এবং ঐতিহ্য। কয়েকশো বছরের পুরনো রীতি চোখের সামনে দেখা এবং সেই রীতির ধারাবাহিকতার অংশ হওয়া একেবারেই আলাদা অভিজ্ঞতা।

ঘোষবাড়ির পুজো সেই অভিজ্ঞতাই তৈরি করে। শোলার সাজে দেবী দুর্গা, প্রাচীন পুজোর রীতি এবং রামকৃষ্ণের স্মৃতি—সব মিলিয়ে এই পুজো কলকাতার ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজোর মানচিত্রে একটি স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করেছে।

আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের সংঘাতের জায়গায় এই ধরনের পুজো বরং দেখিয়ে দেয়, দুটিকে পাশাপাশি রাখা সম্ভব। সময়ের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এলেও পুজোর মূল রীতি ও পরিচয় ধরে রাখা যায়। আর সেই কারণেই প্রাচীন বনেদি বাড়ির পুজোগুলি আজও মানুষের কাছে আকর্ষণীয়।

ঘোষবাড়ির দুর্গাপুজো সেই ধারাবাহিকতার একটি উদাহরণ। এখানে দেবী দুর্গা শুধু পূজিতা হন না; তাঁকে ঘিরে বেঁচে থাকে একটি পরিবারের ইতিহাস, একটি শহরের অতীত এবং বাংলার সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

সব মিলিয়ে, শোলার সাজে সজ্জিত দেবী দুর্গা, প্রাচীন রীতিনীতির ধারাবাহিকতা এবং শ্রীরামকৃষ্ণের স্মৃতি—এই তিনের মেলবন্ধনে ঘোষবাড়ির দুর্গাপুজো হয়ে উঠেছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কামারপুকুর থেকে কলকাতায় আসা যুবক গদাধরের স্মৃতি, ঝামাপুকুরে তাঁর অবস্থান এবং ঠনঠনিয়া সিদ্ধেশ্বরী কালীর কাছে যাতায়াতের ইতিহাস এই পুজোর আবহকে আরও সমৃদ্ধ করে।

আজকের ঝলমলে থিমপুজোর সময়ে ঘোষবাড়ির মতো বনেদি বাড়ির পুজো যেন মনে করিয়ে দেয়, দুর্গাপুজোর সৌন্দর্য শুধু নতুনত্বে নয়—তার গভীরতা রয়েছে ঐতিহ্য, স্মৃতি, আচার এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা বিশ্বাসে। সেই বিশ্বাসের ধারাতেই আজও শোলার সাজে দেবী দুর্গার আরাধনা করে চলেছে রামকৃষ্ণের পদধূলিধন্য ঘোষবাড়ি।

Preview image