Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সোনায় মোড়া প্রতিমা ভাসত জলে! রবি ঠাকুরের বাড়ির পুজো কেন ছিল কলকাতার বিস্ময়?

রবীন্দ্রনাথের জন্মের তিন বছর আগেই পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে যায় ঠাকুরবাড়ির এই ঐতিহ্যবাহী পুজো। জানুন, কী ছিল সেই জাঁকজমকপূর্ণ পুজোর ইতিহাস।

কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাসে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির পুজোর স্থান নিঃসন্দেহে আলাদা। এই পুজোকে ঘিরে ছিল ঐতিহ্য, আভিজাত্য, ধর্মীয় রীতি এবং একাধিক বিস্ময়কর প্রথা। এক সময় কলকাতার দুর্গাপুজোর জাঁকজমক নিয়ে বনেদি পরিবারগুলির মধ্যে যে প্রতিযোগিতা চলত, তার অন্যতম কেন্দ্র ছিল ঠাকুরবাড়ি। দেবী দুর্গার প্রতিমা থেকে শুরু করে অলঙ্কার, পুজোর আচার, বিসর্জনের রীতি—সবকিছুতেই ছিল রাজকীয়তার ছাপ। আজ সেই দালানে আগের মতো ঢাকের বাদ্যি শোনা যায় না। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এখনও জীবন্ত হয়ে আছে সেই বিখ্যাত দুর্গোৎসবের নানা কাহিনি।

জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৭৮৪ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষ নীলমণি ঠাকুর জোড়াসাঁকোয় দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পুজো ঠাকুর পরিবারের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। তবে পুজোর জৌলুস সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায় প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের সময়ে। সেই সময় কলকাতার ধনী ও প্রভাবশালী পরিবারগুলির মধ্যে দুর্গাপুজোর আয়োজন নিয়ে ছিল এক ধরনের অলিখিত প্রতিযোগিতা। কে কত বড় করে পুজো করছেন, কার প্রতিমার সাজ বেশি দামি, কার বাড়িতে অতিথি সমাগম বেশি—এসব নিয়েই তৈরি হত আভিজাত্যের প্রদর্শন।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির পাশেই ছিল শিবকৃষ্ণ দাঁ-র বাড়ি। সেই পরিবারকে ঘিরেও ছিল দুর্গাপুজোর নানা কিংবদন্তি। জনশ্রুতি ছিল, দেবী দুর্গা মর্ত্যে এসে প্রথম অলঙ্কার পরেছিলেন দাঁ পরিবারের বাড়িতেই। এমন প্রতিবেশীর সঙ্গে টক্কর দিতে ঠাকুরবাড়িও যে পিছিয়ে থাকবে না, সেটাই স্বাভাবিক। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর সেই সময় দেবীর সাজসজ্জায় নিয়ে আসেন বিশেষ আভিজাত্য। শোনা যায়, প্যারিস থেকে দেবীর জন্য গয়না আনানো হয়েছিল। ফলে ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজো খুব দ্রুতই কলকাতার অন্যতম আলোচিত বনেদি পুজোয় পরিণত হয়।

এই পুজোর সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলির একটি ছিল দেবীর অলঙ্কার। খাঁটি সোনার গয়নায় দেবীকে সাজানো হত—এমনই জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। শুধু সাজিয়েই থেমে থাকা নয়, বিসর্জনের সময়ও সেই অলঙ্কারের সঙ্গে যুক্ত ছিল এক অনন্য প্রথা। বিজয়া দশমীর রাতে দেবী প্রতিমাকে গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হত। সেই সময় প্রতিমার গায়ে থাকা গয়না জলের সঙ্গে চলে যেত। এরপর মাঝিমাল্লারা জলে নেমে সেই অলঙ্কার উদ্ধারের চেষ্টা করতেন।

কিন্তু এখানেই ছিল এই পুজোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম। বিসর্জনের জল থেকে যে গয়না বা সম্পদ উদ্ধার করা হবে, তা আর ঠাকুর পরিবারের রাজকোষে ফিরে আসবে না—এমনটাই ছিল প্রচলিত বিশ্বাস ও রীতি। অর্থাৎ দেবীর সঙ্গে যা বিসর্জিত হয়েছে, তা দেবীরই সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হত। এই রীতির মধ্যে ছিল ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি এক ধরনের ত্যাগের দর্শন। পুজোর জাঁকজমক যতই বেশি হোক, দেবীর উদ্দেশে নিবেদিত বস্তু পুনরায় নিজের সম্পত্তি হিসেবে গ্রহণ না করার এই প্রথা ঠাকুরবাড়ির দুর্গোৎসবকে আরও আলাদা করে তুলেছিল।

তবে ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজোর বৈশিষ্ট্য কেবল সোনার গয়না বা রাজকীয় আয়োজনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পুজোর প্রতিমা তৈরি হত ঠাকুরবাড়ির দালানেই। অর্থাৎ বাইরের কোথাও থেকে প্রতিমা এনে পুজো করার পরিবর্তে পরিবারের নিজস্ব ঐতিহ্যের মধ্যেই প্রতিমা নির্মাণের ব্যবস্থা ছিল। এই প্রতিমার মুখাবয়ব নিয়েও রয়েছে নানা ঐতিহাসিক কাহিনি ও জনশ্রুতি।

শোনা যায়, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের স্ত্রী দিগম্বরী দেবীর মুখের আদল অনুসরণ করে দেবীর মুখ গড়ে তোলা হত। এর ফলে প্রতিমার সঙ্গে পরিবারের নিজস্ব ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত স্মৃতিও যেন মিশে গিয়েছিল। বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোয় প্রতিমার মুখের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। ঠাকুরবাড়ির ক্ষেত্রেও সেই ধারাটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করত।

ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও ঠাকুরবাড়ির পুজো ছিল কিছুটা ব্যতিক্রমী। ঠাকুর পরিবার বৈষ্ণব ভাবধারায় বিশ্বাসী হওয়ায় পুজোয় পশুবলি দেওয়া হত না। অর্থাৎ পাঁঠাবলি বা রক্তপাতের পরিবর্তে ব্যবহার করা হত কুমড়ো। এই কুমড়ো বলির রীতির মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন পরিবারের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটত, অন্যদিকে তেমনই দুর্গাপুজোর প্রচলিত কিছু আচার থেকে ঠাকুরবাড়ির পুজোর স্বাতন্ত্র্যও স্পষ্ট হয়ে উঠত।

পুজোর সূচনাতেও ছিল এক বিশেষ প্রথা—শঙ্খচিল ওড়ানো। বিশ্বাস ছিল, শঙ্খচিলের পথ ধরেই দেবী মর্ত্যে আগমন করবেন। এই বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল প্রকৃতি, পাখি এবং দেবী আরাধনার এক সুন্দর প্রতীকী সম্পর্ক। পুজোর আগে শঙ্খচিল ওড়ানো তাই নিছক একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; পরিবারের কাছে এটি ছিল দেবীর আগমনকে স্বাগত জানানোর একটি বিশেষ রীতি।

আবার বিজয়া দশমীর দিন ছিল নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর প্রথা। দেবীর বিদায়ের সঙ্গে নীলকণ্ঠ ওড়ানোর এই রীতি বাংলার বহু পুরনো সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। ঠাকুরবাড়ির পুজোতেও এই প্রথার উপস্থিতি দুর্গোৎসবকে আরও স্বতন্ত্র করে তুলেছিল। অর্থাৎ পুজোর শুরু থেকে বিসর্জন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়েই ছিল আলাদা আলাদা প্রতীকী আচার।

ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই সমস্ত রীতির দিকে তাকালে বোঝা যায়, এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল না। এটি ছিল একটি পরিবারের সামাজিক অবস্থান, সাংস্কৃতিক রুচি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ঐতিহ্যের সম্মিলিত প্রকাশ। উনিশ শতকের কলকাতায় যখন বনেদি পরিবারগুলির দুর্গাপুজো ছিল সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের অন্যতম মাধ্যম, তখন ঠাকুরবাড়িও সেই প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

তৎকালীন কলকাতার অভিজাত সমাজে দুর্গাপুজো ছিল মিলনমেলার মতো। পুজোর দিনগুলিতে বাড়িতে আসতেন আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন, সমাজের বিশিষ্ট মানুষ এবং অতিথিরা। খাওয়া-দাওয়া, গান-বাজনা, আচার-অনুষ্ঠান এবং অতিথি আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে কয়েক দিন ধরে চলত উৎসব। ফলে বনেদি বাড়ির পুজো হয়ে উঠেছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

ঠাকুরবাড়ির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের সময় পরিবারের আর্থিক ক্ষমতা এবং সামাজিক প্রভাব অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল। তাঁর জীবনযাপন ও আভিজাত্যের নানা কাহিনি আজও ইতিহাসে আলোচিত। সেই সময়কার দুর্গাপুজোতেও তাঁর ঐশ্বর্যের ছাপ পড়েছিল। দেবীর অলঙ্কার, প্রতিমার সাজ এবং পুজোর সামগ্রিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে ঠাকুরবাড়ির সেই সমৃদ্ধি প্রকাশ পেত।

news image
আরও খবর

তবে ইতিহাস কখনও একই জায়গায় স্থির থাকে না। সময়ের সঙ্গে কলকাতার সামাজিক কাঠামো বদলেছে, বনেদি পরিবারগুলির আর্থিক পরিস্থিতিতেও পরিবর্তন এসেছে, বদলেছে উৎসবের ধরন। এক সময় যে দুর্গাপুজোকে ঘিরে গোটা কলকাতায় কৌতূহল তৈরি হত, সেই পুজোও ধীরে ধীরে তার পুরনো জৌলুস হারাতে শুরু করে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের কয়েক বছর আগেই এই পুজো পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে যায় বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়। ফলে রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে সেই পুরনো ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজোর ধারাবাহিকতা আর ছিল না। এই তথ্যই ইতিহাসের বিচারে বিষয়টিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। যে পরিবার পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বিশ্বকবির সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাসে অমর হয়ে উঠবে, সেই পরিবারের দুর্গাপুজো তাঁর জন্মের আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

কেন বন্ধ হয়েছিল এই পুজো? এর পিছনে একাধিক কারণের কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র ও জনশ্রুতিতে পাওয়া যায়। সময়ের সঙ্গে পরিবারের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন, আর্থিক পরিস্থিতির ওঠানামা, সামাজিক রীতিনীতির বদল এবং পুজোর বিপুল ব্যয়ের মতো বিষয়গুলি বনেদি পরিবারের পুজোর ধারাবাহিকতায় প্রভাব ফেলেছিল। তবে একটি নির্দিষ্ট কারণকে একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা সবসময় সহজ নয়। ইতিহাসের সঙ্গে মিশে থাকা জনশ্রুতি এবং পারিবারিক তথ্যের কারণে এই অধ্যায় এখনও অনেকটাই রহস্যময়।

তবু পুজো বন্ধ হয়ে গেলেও তার গল্প হারিয়ে যায়নি। বরং সোনার গয়না পরানো প্রতিমা, গঙ্গায় বিসর্জনের সময় অলঙ্কার হারিয়ে যাওয়া, মাঝিমাল্লাদের জলে ঝাঁপ দেওয়া, শঙ্খচিল ওড়ানো, নীলকণ্ঠ পাখির প্রথা এবং কুমড়ো বলির মতো নানা রীতি ঠাকুরবাড়ির দুর্গোৎসবকে বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি আকর্ষণীয় অধ্যায়ে পরিণত করেছে।

আজ কলকাতায় দুর্গাপুজো মানেই একদিকে যেমন বারোয়ারি পুজোর বিপুল আয়োজন, তেমনই অন্যদিকে বনেদি বাড়ির পুজোর ঐতিহ্য দেখার আকর্ষণ। পুরনো কলকাতার বিভিন্ন বাড়িতে এখনও বহু শতাব্দীপ্রাচীন রীতি মেনে পুজো হয়। কিন্তু প্রতিটি বাড়ির ইতিহাস আলাদা। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজোর বিশেষত্ব ছিল তার সঙ্গে যুক্ত ঠাকুর পরিবারের ইতিহাস এবং উনিশ শতকের কলকাতার সামাজিক জীবনের প্রতিচ্ছবি।

এই পুজোর কাহিনিতে তাই শুধু দেবী দুর্গার আরাধনা নেই। রয়েছে কলকাতার জমিদার ও অভিজাত সমাজের ইতিহাস, পরিবারের সামাজিক প্রতিপত্তির গল্প, ধর্মীয় বিশ্বাসের বৈচিত্র্য এবং ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেষ্টা। রয়েছে সেই সময়কার কলকাতার সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার ছবিও।

সবচেয়ে বেশি কৌতূহল তৈরি করে বিসর্জনের সেই দৃশ্য। কল্পনা করা যায়—বিজয়া দশমীর রাত। গঙ্গার ঘাটে মানুষের ভিড়। ঢাকের শব্দ, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনির মধ্যে দেবীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিসর্জনের জন্য। প্রতিমার গায়ে ঝলমল করছে সোনার অলঙ্কার। এরপর দেবীকে জলে বিসর্জন দেওয়া হল। আর সেই জলে নেমে পড়লেন মাঝিমাল্লারা। তাঁদের লক্ষ্য দেবীর সঙ্গে বিসর্জিত গয়না উদ্ধার করা। কিন্তু উদ্ধার করা সেই সম্পদ আর ঠাকুরবাড়ির কোষাগারে ফিরে আসবে না। দেবীর উদ্দেশে উৎসর্গ করা সম্পদ দেবীর সঙ্গেই চলে গেল—এই বিশ্বাসই যেন সেই বিসর্জনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছিল।

এমন দৃশ্য আজকের কলকাতায় কল্পনা করাই কঠিন। আধুনিক শহরের ব্যস্ততা, পুজোর পরিবর্তিত অর্থনীতি এবং উৎসবের বদলে যাওয়া চরিত্রের মধ্যে সেই পুরনো বনেদি পুজোর অনেক রীতিই আজ ইতিহাস। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজোও সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের অন্যতম স্মারক।

ঠাকুরবাড়ির এই পুজোর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুর্গাপুজো বাংলায় শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি, শিল্প এবং পারিবারিক ঐতিহ্যেরও অংশ। শত শত বছর ধরে বাংলার বিভিন্ন পরিবার নিজেদের মতো করে দেবীকে আরাধনা করেছে। কোথাও ছিল রাজকীয় আয়োজন, কোথাও ছিল কঠোর ধর্মীয় রীতি, কোথাও আবার ছিল স্থানীয় সংস্কৃতির ছাপ। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির পুজো তার অনন্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

আজ সেই দালানে হয়তো আর আগের মতো ঢাকের কাঠি পড়ে না। নেই সেই রাজকীয় আয়োজন, নেই গঙ্গার জলে সোনার গয়না-সহ প্রতিমা বিসর্জনের দৃশ্য। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এখনও টিকে রয়েছে সেই বিস্ময়কর কাহিনি। রবীন্দ্রনাথের জন্মের আগেই যে পুজো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তার স্মৃতি এখনও কলকাতার বনেদি পুজোর ইতিহাসে আলোচিত হয়।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজো তাই এক অর্থে হারিয়ে যাওয়া কলকাতার গল্প। এমন এক কলকাতা, যেখানে বনেদি পরিবারগুলির পুজো ছিল সামাজিক মর্যাদার প্রতীক, যেখানে দেবীর সাজে ব্যবহার হত মূল্যবান অলঙ্কার, যেখানে পুজোর আগে শঙ্খচিল ওড়ানো হত এবং বিজয়ার দিন নীলকণ্ঠ পাখিকে বিদায় জানানো হত। আর এমন এক বিসর্জন, যেখানে দেবীর গায়ে থাকা সোনার গয়না গঙ্গার জলে বিলীন হয়ে যেত।

ইতিহাসের এই অধ্যায় হয়তো আজ আর ফিরবে না। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির সেই দুর্গোৎসবের কাহিনি এখনও বাঙালির কৌতূহল জাগায়। কারণ এটি শুধু একটি পুজো বন্ধ হয়ে যাওয়ার গল্প নয়; এটি পুরনো কলকাতার আভিজাত্য, বিশ্বাস, প্রতিযোগিতা, ঐতিহ্য এবং সময়ের পরিবর্তনের গল্প। সোনায় মোড়া প্রতিমা থেকে গঙ্গার বিসর্জন—সব মিলিয়ে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজো আজও কলকাতার দুর্গোৎসবের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর অধ্যায় হয়ে আছে।

Preview image