সৌদি আরবের মদিনার কাছে ভয়াবহ বাস–ট্যাঙ্কার সংঘর্ষে প্রাণ গেল ৪২ জন ভারতীয় নাগরিকের। গভীর রাতে জেদ্দা–মদিনা হাইওয়েতে যাত্রীবোঝাই বাসটির সঙ্গে জ্বালানিবাহী ট্যাঙ্কারের মুখোমুখি সংঘর্ষে মুহূর্তে আগুন ধরে যায় দুই গাড়িতে। ঘটনাস্থলেই বহু যাত্রী দগ্ধ হয়ে মারা যান, আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহতদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে এবং ভারতীয় দূতাবাস সৌদি প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় শোক ছড়িয়েছে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে।
সৌদি আরবের মদিনার কাছে ঘটে গেল এমন এক ভয়ঙ্কর সড়ক দুর্ঘটনা, যার খবরে শোকভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছে ভারত। গভীর রাতে জেদ্দা–মদিনা হাইওয়ে ধরে দ্রুতগতিতে চলছিল একটি যাত্রীবাহী বাস, আর বিপরীত দিক থেকে আসছিল জ্বালানিবাহী একটি ট্যাঙ্কার। সাধারণ একটি রাত, কোনও অশনি সংকেত ছিল না, কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়। ট্যাঙ্কারটি আচমকাই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটির সামনে এসে পড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যেই ঘটে যায় এক ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষ। ট্যাঙ্কারের জ্বালানি বিস্ফোরিত হয়ে প্রচণ্ড আগুন ধরে যায় দুই গাড়িতেই। আগুনের তাপে চারদিক সেদ্ধ হয়ে ওঠে এবং যাত্রীবোঝাই বাস মুহূর্তের মধ্যে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
সংঘর্ষের ধাক্কা এতই প্রবল ছিল যে বহু যাত্রী সিট থেকে ছিটকে পড়েন এবং কেউ কেউ দরজার কাছে এসে আটকে যান, কারও পক্ষে নিজেকে বাঁচানোর সুযোগই ছিল না। আগুনের হাঁসফাঁস করা শিখা বাসকে পুরোপুরি গ্রাস করে নেয়। অন্ধকার রাত ভেদ করে শুধু শোনা যাচ্ছিল আহত যাত্রীদের আর্তনাদ। হাইওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীরাও প্রথমে কিছুই করতে পারেননি, কারণ আগুনের তাপে কাছে যাওয়া অসম্ভব হয়ে ওঠে। দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই সৌদি সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান, কিন্তু আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লেগে যায়। ততক্ষণে বহু যাত্রী দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
বাসটিতে মোট ৫৮ জন ভারতীয় যাত্রী ছিলেন বলে সৌদি প্রশাসন জানিয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৪২ জন ঘটনাস্থলেই মারা যান এবং অন্যদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে যে নিহতদের অধিকাংশই সৌদি আরবে কর্মরত শ্রমিক ছিলেন অথবা মদিনায় সফরে যাচ্ছিলেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, কেরল, তামিলনাড়ু—বিভিন্ন রাজ্যের পরিবারগুলো রাতভর ফোনে খবর জানতে চেষ্টা করেছে, তাঁদের প্রিয়জন বেঁচে আছেন নাকি এই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। যাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না, তাঁদের পরিবার চরম উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছে।
ভারতীয় দূতাবাস ইতিমধ্যেই সৌদি প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং নিহতদের দেহ শনাক্তের কাজ শুরু হয়েছে। তবে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে মরদেহ শনাক্তে। প্রচণ্ড আগুনে দগ্ধ হওয়ায় বহু দেহের পরিচয় বাহ্যিকভাবে নির্ণয় করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এতে সময় লাগবে বলে জানিয়েছে সৌদি সরকার। অনেক পরিবারকে অফিসিয়ালি কোনো তথ্য পেতে আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হতে পারে। এই অপেক্ষা যেন শোকের সঙ্গে আরও অসহায়তা জুড়ে দিচ্ছে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন যে প্রতিটি ভারতীয় নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। সৌদি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি আহতদের চিকিৎসা প্রক্রিয়া নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং দূতাবাস তাঁদের পাশে রয়েছে। সৌদি সরকার জানিয়েছে, আহতদের চিকিৎসার সমস্ত ব্যয় তারা বহন করবে। বেশ কয়েকজনের শরীরের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত দগ্ধ হয়েছে, তাঁদের নিয়ে চিন্তা আরও বেশি। ডাক্তারদের মতে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই দুর্ঘটনা আবারও সামনে এনেছে সৌদির হাইওয়েগুলোর নিরাপত্তা প্রশ্ন। জেদ্দা–মদিনা হাইওয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকার তালিকায় রয়েছে। এখানে প্রচুর ট্যাঙ্কার, ট্রাক এবং যাত্রীবাহী বাস চলাচল করে। দীর্ঘ সোজাসুজি রাস্তার কারণে অনেকে অতিরিক্ত গতি নেয়, আর সামান্য ভুলেই ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্যাঙ্কারগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়া, অতিরিক্ত গতি এবং চালকদের ক্লান্তি—এই তিনটি কারণই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।
দুর্ঘটনার পরপরই যে ভয়াবহ দৃশ্য দেখা গেছে, তা বর্ণনা করতে গিয়ে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “আগুন এত তীব্র ছিল যে কেউ বাসের দিকে যাওয়ার সাহস পাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, আগুনের তাপেই পুরো হাইওয়ে গলে যাবে।” আরেকজন জানান, “যাত্রীদের অনেকেই দ্রুত বাস থেকে বেরোনোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বিস্ফোরণের পর সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। কেউ কেউ দরজার কাছে পড়ে গিয়েছিলেন, অনেকে জানলা ভেঙে বেরোতে চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু ততক্ষণে আগুন চারদিক ঘিরে ফেলে।”
এই দুর্ঘটনা শুধু একটি দেশের নয়, দু’টি দেশের মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। ভারতে নিহতদের পরিবারের কান্না থামছে না। বহু পরিবার এমনিতেই আর্থিক সংকটে ছিল, পরিবার চালাতে কেউ কেউ সৌদিতে গিয়ে শ্রমিকের কাজ করছিলেন। তাঁদের হঠাৎ মৃত্যুতে ভবিষ্যত কী হবে, তা ভাবতেই শিউরে উঠছেন পরিজনেরা। সরকারিভাবে সাহায্যের আশ্বাস মিললেও তা যত দ্রুত পৌঁছবে, ততই কিছুটা স্বস্তি মিলবে পরিবারগুলোর।
এখন প্রশ্ন উঠছে—বিদেশে থাকা ভারতীয় শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আর কী কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন? তাদের জন্য পরিবহণ ব্যবস্থার ওপর আরও কড়া নজরদারি কি করা উচিত নয়? বিশেষ করে এমন দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় নিয়ন্ত্রিত গতি ও নিয়মিত ট্যাঙ্কার পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা জরুরি কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভারত সরকারও সৌদি প্রশাসনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
অগ্নিকুণ্ডে মুহূর্তে ঝলসে যাওয়া ৪২ ভারতীয়ের এই করুণ পরিণতি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং হাজারো পরিবারের জীবনের চিত্র বদলে দেওয়া এক দুঃস্বপ্ন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় ভারত–সৌদি সম্পর্কের কূটনৈতিক সংযোগ আরও দৃঢ় হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে দুই দেশ যৌথভাবে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে। আপাতত নিহতদের পরিবারকে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, আর গোটা দেশ প্রার্থনা করছে—আহতরা যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং পরিবারগুলো যেন এই ভয়ঙ্কর ক্ষতির মধ্যেও শক্ত থাকতে পারেন।
গত কয়েক বছরে সৌদি আরবে ভারতীয় শ্রমিকদের ওপর সড়ক দুর্ঘটনা, গ্যাস লিক, নির্মাণস্থলের দুর্ঘটনা ইত্যাদি ঘটনা বেড়ে গেছে। দুর্ঘটনা-প্রবণ হাইওয়ে, অতিরিক্ত গতি, বড় যানবাহনের চাপ—এই সবই বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে।
বিশেষত মদিনা-জেদ্দা হাইওয়েটি পরিচিত দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায়। প্রতি বছর বহু তীর্থযাত্রী ও কর্মরত বাসিন্দা এই রাস্তায় যাতায়াত করেন—তাই দুর্ঘটনার পরিমাণও বেশি।
হাসপাতালে ভর্তি আহতদের কয়েকজনের শরীরের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে বলে জানা গেছে। তাঁদের নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হয়েছে। সৌদি সরকার জানিয়েছে, চিকিৎসার সকল খরচ তারা বহন করবে।
কয়েকজন আহত যাত্রীর মতে,
“সংঘর্ষের পর বাসে মুহূর্তে অন্ধকার। তারপর আগুন। কেউ কিছুই বুঝতে পারছিল না।”
ভারতের বিভিন্ন জায়গায় নিহত শ্রমিকদের পরিবার শোকে ভেঙে পড়েছে। কারও বাবা, কারও স্বামী, কারও ছেলে—দীর্ঘদিন ধরে সৌদিতে কাজ করে পরিবারের দায়িত্ব পালন করছিলেন তাঁরা। এমন অবস্থায় তাঁদের হঠাৎ মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছে গোটা পরিবার।
অনেক পরিবার এখনও নিশ্চিতভাবে জানতে পারেনি তাঁদের প্রিয়জন বেঁচে আছেন কি না। তাঁরা দূতাবাস ও প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন।
এই দুর্ঘটনার পরে আবারও সামনে এসেছে সৌদির হাইওয়েগুলোর নিরাপত্তা প্রশ্ন। বড় বড় ট্যাঙ্কার ও দ্রুতগামী বাসের চলাচল নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠছে। ভারত সরকারও সৌদি প্রশাসনের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোকপাত করতে পারে বলে জানিয়েছেন কূটনৈতিক মহলের একাংশ।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি জানান, সৌদি প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। আহতদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ভারতীয় দূতাবাসকে।
টুইটারে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বার্তা—
“মদিনার কাছে দুর্ঘটনায় বহু ভারতীয়ের মৃত্যুতে আমরা গভীর শোকাহত। পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা রইল। চিকিৎসার জন্য সকল ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
এছাড়া বিভিন্ন রাজ্য সরকার নিজ নিজ রাজ্যের নিহত শ্রমিকদের পরিচয় জানার জন্য কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।