অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস বা বাতের সমস্যা বাড়লে জয়েন্টে ব্যথা, ফোলা এবং আঙুল বেঁকে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে পুষ্টিবিদদের মতে, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও ডায়েটে কিছু পরিবর্তন আনলে বাতের ব্যথা ও অস্বস্তি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
বাতের ব্যথা কিছুতেই কমছে না? রোজের ডায়েটে ৫ রকম বদল আনলেই যন্ত্রণার মাত্রা কমবে
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। তার মধ্যে অন্যতম হল অস্থিসন্ধি বা জয়েন্টের সমস্যা। অনেকেই চল্লিশ বা পঞ্চাশের গণ্ডি পেরোনোর পর হাঁটু, কোমর, কাঁধ কিংবা হাত-পায়ের আঙুলে ব্যথা অনুভব করতে শুরু করেন। প্রথমদিকে এই ব্যথা সাময়িক মনে হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস বা বাতের সমস্যা ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলতে পারে।
অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস এমন একটি সমস্যা, যেখানে অস্থিসন্ধির মধ্যে থাকা কার্টিলেজ ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে শুরু করে। ফলে হাড়ের মধ্যে ঘর্ষণ বাড়ে এবং ব্যথা, ফোলা, জড়তা ও চলাফেরায় অসুবিধা দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যাকে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না হলে এবং জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন না আনলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। এমনকি হাত-পায়ের আঙুল বেঁকে যাওয়া, হাঁটাচলায় মারাত্মক অসুবিধা কিংবা স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি হওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস হওয়ার পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। বয়সজনিত পরিবর্তন, জিনগত প্রবণতা, অতিরিক্ত ওজন, পুরনো চোট, দীর্ঘদিন ধরে জয়েন্টের উপর অতিরিক্ত চাপ এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে রজোনিবৃত্তির পর হরমোনের পরিবর্তন—সবই এই সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এছাড়া শরীরে ক্যালশিয়াম ও ভিটামিন ডি-র ঘাটতিও হাড় ও জয়েন্টকে দুর্বল করে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করার মতো কোনও নির্দিষ্ট খাদ্যতালিকা নেই। তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস ব্যথা ও প্রদাহ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পাশাপাশি শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, হাড়কে শক্তিশালী করা এবং পেশিকে মজবুত রাখার মাধ্যমে রোগের অগ্রগতি ধীর করতেও সাহায্য করে।
অস্টিয়োআর্থ্রাইটিসে ডায়েট কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আমাদের শরীরের প্রতিটি অস্থিসন্ধি পেশি, হাড়, লিগামেন্ট ও কার্টিলেজের উপর নির্ভর করে কাজ করে। শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিলে এই গঠনগুলির স্বাভাবিক কার্যকারিতা কমে যায়। ফলে জয়েন্টের ক্ষয় দ্রুত হতে পারে।
অন্যদিকে অতিরিক্ত ওজন হাঁটু ও কোমরের উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শরীরের ওজন সামান্য কমলেও হাঁটুর উপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে ব্যথা ও অস্বস্তিও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রদাহ কমানো—এই দুই লক্ষ্য সামনে রেখে ডায়েট পরিকল্পনা করা অত্যন্ত জরুরি।
১) পর্যাপ্ত প্রোটিন রাখুন খাদ্যতালিকায়
অস্টিয়োআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে করেন প্রোটিন শুধুমাত্র শরীরচর্চা করা মানুষদের জন্য প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে পেশির গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রত্যেক মানুষেরই পর্যাপ্ত প্রোটিন দরকার।
জয়েন্টকে সুরক্ষিত রাখতে আশপাশের পেশিগুলির শক্তিশালী হওয়া জরুরি। পেশি দুর্বল হয়ে গেলে জয়েন্টের উপর চাপ বাড়ে এবং ব্যথা আরও বেড়ে যেতে পারে।
প্রোটিনের ভালো উৎস:
মুসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা
মাছ
ডিম
মুরগির মাংস
সয়াবিন
টোফু
পনির
রাজমা
তবে প্রোটিনের পরিমাণ ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন হতে পারে। বয়স, ওজন, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য রোগের উপর নির্ভর করে খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করা উচিত।
২) ক্যালশিয়াম ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খান
হাড় সুস্থ রাখতে ক্যালশিয়াম ও ভিটামিন ডি অপরিহার্য। ক্যালশিয়াম হাড়ের প্রধান উপাদান হলেও শরীর সেটিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে ভিটামিন ডি-এর সাহায্যে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের শরীরে এই দুই পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেয়। এর ফলে হাড় দুর্বল হয়ে যায় এবং জয়েন্টের সমস্যাও বাড়তে পারে।
ক্যালশিয়ামের উৎস:
দুধ
দই
ছানা
পনির
তিল
বাদাম
সবুজ শাকসবজি
ভিটামিন ডি-এর উৎস:
সকালের রোদ
ডিমের কুসুম
চর্বিযুক্ত মাছ
ফোর্টিফায়েড দুগ্ধজাত খাবার
নিয়মিত সূর্যালোক গ্রহণও ভিটামিন ডি-এর মাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
৩) নুন ও চিনির পরিমাণ কমান
অতিরিক্ত নুন ও চিনি শরীরে নানা ধরনের প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া বাড়িয়ে দিতে পারে। অস্টিয়োআর্থ্রাইটিসে প্রদাহের মাত্রা বাড়লে ব্যথা ও অস্বস্তিও বৃদ্ধি পায়।
বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মানুষ অজান্তেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি নুন ও চিনি গ্রহণ করেন। বিশেষ করে প্যাকেটজাত খাবার, বিস্কুট, কোল্ড ড্রিংকস, চিপস, সস এবং ফাস্টফুডে এই উপাদানগুলির মাত্রা অত্যন্ত বেশি থাকে।
অতিরিক্ত নুনের ক্ষতি:
জলধারণ বাড়ায়
রক্তচাপ বৃদ্ধি করে
শরীরে ফোলাভাব তৈরি করে
অতিরিক্ত চিনির ক্ষতি:
ওজন বৃদ্ধি করে
প্রদাহ বাড়ায়
ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়
তাই দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় নুন ও চিনি নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
৪) ভাজাভুজি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন
ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, শিঙাড়া, চপ, পকোড়া, ফিশ ফ্রাই, ফিশ ফিঙ্গার কিংবা বিভিন্ন ধরনের ডিপ-ফ্রাইড খাবার খেতে সুস্বাদু হলেও এগুলি শরীরের জন্য খুব একটা উপকারী নয়।
এই ধরনের খাবারে সাধারণত:
ট্রান্স ফ্যাট বেশি থাকে
ক্যালোরি বেশি থাকে
প্রদাহ বাড়ানোর উপাদান থাকে
ফলে নিয়মিত ভাজাভুজি খেলে শরীরের ওজন বাড়তে পারে এবং জয়েন্টের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।
এর পরিবর্তে বেছে নিতে পারেন:
সেদ্ধ খাবার
গ্রিলড মাছ বা চিকেন
স্টিম করা সবজি
এয়ার ফ্রায়ারে তৈরি খাবার
এতে স্বাদ ও স্বাস্থ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব।
৫) সফট ড্রিংকস ও কার্বনেটেড পানীয় কমান
অনেকেই তেষ্টা মেটাতে বোতলজাত নরম পানীয় বা সফট ড্রিংকস পান করেন। কিন্তু এই ধরনের পানীয়ে অতিরিক্ত চিনি ও ফসফরিক অ্যাসিড থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে হাড়ের স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ফসফরিক অ্যাসিডের অতিরিক্ত উপস্থিতি শরীরে ক্যালশিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এর ফলে হাড় দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
সফট ড্রিংকের বদলে বেছে নিতে পারেন:
ডাবের জল
লেবুর শরবত
ঘরে তৈরি ফলের রস
ছাছ
সাধারণ জল
পর্যাপ্ত জল পান করলে জয়েন্টের কার্যকারিতাও ভালো থাকে।
আর কোন খাবারগুলি উপকারী?
অস্টিয়োআর্থ্রাইটিসে কিছু খাবার বিশেষভাবে উপকারী বলে মনে করা হয়।
ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
উৎস:
স্যামন মাছ
সার্ডিন
আখরোট
ফ্ল্যাক্সসিড
রঙিন ফল ও সবজি
অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর ফল ও সবজি শরীরের কোষকে সুরক্ষা দেয়।
উদাহরণ:
গাজর
টমেটো
কমলালেবু
বেরি জাতীয় ফল
পালং শাক
হলুদ
হলুদের কারকিউমিন প্রদাহ কমাতে সহায়ক বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
জীবনযাত্রাতেও আনতে হবে পরিবর্তন
শুধু খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করলেই হবে না। অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে জীবনযাত্রাতেও কিছু পরিবর্তন জরুরি।
নিয়মিত ব্যায়াম
হাঁটা
সাঁতার
যোগব্যায়াম
স্ট্রেচিং
এই ধরনের ব্যায়াম জয়েন্টকে সচল রাখতে সাহায্য করে।
ওজন নিয়ন্ত্রণ
অতিরিক্ত ওজন কমানো গেলে হাঁটু ও কোমরের উপর চাপ কমে।
পর্যাপ্ত ঘুম
ভালো ঘুম শরীরের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে এবং ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ায়।
ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার
এই অভ্যাসগুলি হাড় ও জয়েন্টের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
নিম্নলিখিত উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত:
প্রয়োজনে চিকিৎসক এক্স-রে, রক্ত পরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করতে পারেন।
অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস বা বাতের ব্যথা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। যদিও এই রোগ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়, তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে ব্যথা ও অস্বস্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন, ক্যালশিয়াম ও ভিটামিন ডি রাখা, পাশাপাশি নুন-চিনি, ভাজাভুজি ও সফট ড্রিংকস কমিয়ে দেওয়া—এই কয়েকটি সহজ পরিবর্তনই জয়েন্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপনের জন্য তাই আজ থেকেই খাদ্যাভ্যাসে সচেতন হওয়া জরুরি।