পুলিশের দাবি, ঘরের ভিতরে চার জনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। ঘটনার সময় অভিযুক্তের সন্তানরা বাড়িতেই ছিল এবং পরে আলমারির ভিতর থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়। ঘটনায় এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
আমেরিকার জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের লরেন্সভিল শহরে ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক ও ভয়াবহ পারিবারিক হত্যাকাণ্ড। তিন সন্তানের সামনে স্ত্রী এবং তিন আত্মীয়কে গুলি করে খুন করার অভিযোগ উঠেছে এক ভারতীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে। অভিযুক্তের নাম বিজয় কুমার। পুলিশ ইতিমধ্যেই তাঁকে গ্রেফতার করেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় শুধু স্থানীয় এলাকাতেই নয়, গোটা আমেরিকা ও ভারতীয় মহলেও তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক বিবাদ থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে অনুমান করছে পুলিশ। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে। একই সঙ্গে এই ঘটনায় আটলান্টায় অবস্থিত ভারতের কনসুলেট জেনারেল গভীর দুঃখপ্রকাশ করেছে এবং নিহত পরিবারের সদস্যদের সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।
ফক্স ৫ আটলান্টা-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার সকালে জর্জিয়ার ব্রুক আইভি কোর্ট এলাকায় এই ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে। স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত আড়াইটে নাগাদ পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। লরেন্সভিল শহরের একটি আবাসিক এলাকায় বিজয় কুমার তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করতেন।
যে সময় এই ভয়াবহ ঘটনা ঘটে, সেই সময় বিজয়ের তিন সন্তান বাড়িতেই ছিল। পুলিশের সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার সময় বাড়ির ভেতরে তীব্র চিৎকার ও উত্তেজনার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, প্রথমে চেঁচামেচির আওয়াজ শোনা যায়, তারপর পরপর গুলির শব্দে গোটা এলাকা কেঁপে ওঠে।
পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় মোট চার জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন—
বিজয়ের স্ত্রী মিমু ডোগরা (বয়স ৪৩)
গৌরব কুমার (বয়স ৩৩)
নিধি চন্দ্র (বয়স ৩৭)
হরিশ চন্দ্র (বয়স ৩৮)
পুলিশের দাবি, নিহত চার জনই গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বাড়ির ভেতরে পড়ে ছিলেন। তাঁদের শরীরে একাধিক গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তদন্তে অনুমান করা হচ্ছে, খুব কাছ থেকে গুলি চালানো হয়েছিল।
এই ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো, অভিযুক্তের তিন সন্তান পুরো ঘটনাটির সাক্ষী ছিল। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সময় তিন সন্তান ভয় ও আতঙ্কে আলমারির ভেতরে লুকিয়ে পড়ে। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে তারা সেখানে আশ্রয় নেয়।
তিন সন্তানের মধ্যে একজন সাহস করে ৯১১ নম্বরে ফোন করে। সেই ফোন কলের মাধ্যমেই পুলিশ খবর পায় এবং দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ বাড়িতে ঢুকে চার জনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। পরে আলমারির ভেতর থেকে তিন সন্তানকে উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, যদি ওই শিশুদের দ্রুত উদ্ধার করা না হতো, তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।
পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্ত বিজয় কুমারকে গ্রেফতার করে। তাঁর কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, বিজয় কুমারের বিরুদ্ধে চারটি হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালতে তাঁকে পেশ করা হলে বিচারক তাঁর হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে হেফাজতেই রাখা হবে বলে সূত্রের খবর।
পুলিশের প্রাথমিক সন্দেহ, পারিবারিক কোনও বিবাদের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। তবে ঠিক কী কারণে এত ভয়াবহ ঘটনা ঘটল, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিবারটির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কোনও ধরনের মানসিক চাপ, আর্থিক সমস্যা বা পারিবারিক দ্বন্দ্ব ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিহতদের সঙ্গে অভিযুক্তের সম্পর্ক, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং সাম্প্রতিক ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যে অনেক সময় সাংস্কৃতিক চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা, আর্থিক দায়বদ্ধতা এবং মানসিক চাপ জমতে জমতে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যদিও কোনও কারণই এই ধরনের হত্যাকাণ্ডকে ন্যায্যতা দিতে পারে না।
ঘটনার পর স্থানীয় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, বিজয় কুমার ও তাঁর পরিবার সাধারণত শান্ত স্বভাবের ছিলেন বলে তাঁদের ধারণা ছিল। কেউই ভাবতে পারেননি যে তাঁদের বাড়িতে এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পারে।
এক প্রতিবেশী জানান, “হঠাৎ চিৎকারের আওয়াজ শুনতে পাই। তারপর কয়েকটি গুলির শব্দ। আমরা ভয় পেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি। কিছুক্ষণ পর পুলিশ আসে।”
আরেক প্রতিবেশীর মতে, “এই ধরনের ঘটনা আমাদের এলাকার জন্য খুবই ভয়াবহ। আমরা এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না যে এমন কিছু ঘটেছে।”
এই ঘটনার খবর প্রকাশ্যে আসার পর ভারতীয় সমাজেও গভীর শোক ও বিস্ময় তৈরি হয়েছে। বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয় পরিবারগুলোর মধ্যে এই ধরনের ঘটনা বিরল হলেও, যখন এমন ঘটনা ঘটে, তখন তা গোটা সমাজকে নাড়িয়ে দেয়।
আটলান্টায় ভারতের কনসুলেট জেনারেল এই ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করেছে। এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এই মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত। নিহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আমাদের সমবেদনা। প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দিতে আমরা প্রস্তুত।”
কনসুলেট সূত্রে জানা গিয়েছে, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং আইনগত ও প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই ঘটনার পর আবারও উঠে এসেছে মানসিক স্বাস্থ্য এবং পারিবারিক সহিংসতার বিষয়টি। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় পরিবারে জমে থাকা মানসিক চাপ, হতাশা, রাগ এবং অব্যক্ত সমস্যাগুলি ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, পরিবারে যদি নিয়মিত যোগাযোগ, বোঝাপড়া এবং মানসিক সমর্থন না থাকে, তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে বিদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে একাকীত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির সম্ভাবনা রয়েছে। আমেরিকার আইন অনুযায়ী, একাধিক হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত হলে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড বা যাবজ্জীবন সাজা হতে পারে।
বর্তমানে পুলিশ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করছে। ফরেনসিক রিপোর্ট, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান, ৯১১ কলের রেকর্ড এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে আদালতে পেশ করা হবে।
এই ঘটনার সবচেয়ে করুণ দিক হলো, অভিযুক্তের তিন সন্তান এখন কার্যত অনাথ অবস্থায় পড়েছে। একদিকে তারা মাকে হারিয়েছে, অন্যদিকে তাদের বাবাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মানসিকভাবে এই ঘটনা তাদের জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
শিশুদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমাজসেবা বিভাগ এবং আত্মীয়দের মাধ্যমে তাদের দেখভালের ব্যবস্থা করা হতে পারে বলে জানা গিয়েছে।
এই ঘটনা শুধু একটি পারিবারিক হত্যাকাণ্ড নয়, বরং আধুনিক সমাজের জন্য এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। পরিবার, সম্পর্ক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে এই ঘটনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবারে সমস্যা হলে তা গোপন না রেখে আলোচনা করা জরুরি। প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিং এবং মানসিক সহায়তা নেওয়া উচিত। কারণ অবহেলিত সমস্যাই একসময় ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
আমেরিকার জর্জিয়ায় ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়, বরং মানবিক সম্পর্কের ভাঙনের এক ভয়ংকর উদাহরণ। স্ত্রী ও আত্মীয়দের হত্যা এবং সন্তানদের সামনে এমন নারকীয় ঘটনা সমাজকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই ঘটনার প্রকৃত কারণ পুরোপুরি স্পষ্ট হবে না। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে দিয়েছে—পারিবারিক সম্পর্কের ভাঙন কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
একটি সুখী পরিবার মুহূর্তের মধ্যে কীভাবে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, এই ঘটনা তারই নির্মম উদাহরণ হয়ে থাকবে।