Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সৌরজগতের গ্রহাণুতে মিলল ডিএনএর চার উপাদান জীবনের রহস্য কি আরও কাছে

পৃথিবীর কাছের এক গ্রহাণু যেখানে পৌঁছেছে মহাকাশযান ফিরিয়ে এনেছে মাটির নমুনা।

সৌরজগতের গ্রহাণুতে মিলল ডিএনএর চার উপাদান  জীবনের রহস্য কি আরও কাছে
International News

? রিউগু গ্রহাণুতে ডিএনএ–আরএনএ উপাদান আবিষ্কার: মহাকাশে কি লুকিয়ে আছে জীবনের রহস্য?

মহাবিশ্বে আমরা কি একা? এই প্রশ্ন মানবসভ্যতার সবচেয়ে প্রাচীন এবং রহস্যময় কৌতূহলগুলির মধ্যে একটি। যুগের পর যুগ ধরে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করে চলেছেন পৃথিবীর বাইরে জীবনের অস্তিত্ব খুঁজে বের করার। এই অনুসন্ধানের পথেই সম্প্রতি এক যুগান্তকারী আবিষ্কার সামনে এসেছে—পৃথিবীর কাছাকাছি অবস্থিত রিউগু নামের একটি গ্রহাণুর মাটিতে পাওয়া গেছে ডিএনএ এবং আরএনএর সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ যৌগিক উপাদান।

এই আবিষ্কার শুধু মহাকাশবিজ্ঞানের জন্য নয়, মানবজাতির নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কিত ধারণাকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।


? রিউগু: পৃথিবীর কাছের রহস্যময় গ্রহাণু

রিউগু হল একটি কার্বনসমৃদ্ধ গ্রহাণু, যা সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর মতোই পরিক্রমণ করে। এটি মঙ্গল এবং বৃহস্পতির মাঝখানে অবস্থিত গ্রহাণুপুঞ্জের সদস্য হলেও এর কক্ষপথ এমনভাবে গঠিত যে এটি সময়ভেদে পৃথিবীর তুলনামূলক কাছাকাছি চলে আসে।

পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব কখনও লক্ষ লক্ষ কিলোমিটার, আবার কখনও কয়েক কোটি কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। যদিও এই দূরত্ব আমাদের কাছে বিশাল মনে হতে পারে, কিন্তু মহাকাশ গবেষণার নিরিখে এটি খুবই কম। সেই কারণেই রিউগুকে পৃথিবীর নিকটবর্তী গ্রহাণুগুলির মধ্যে একটি হিসেবে ধরা হয়।


? হায়াবুসা-২: জাপানের ঐতিহাসিক মহাকাশ অভিযান

রিউগুর গুরুত্ব বোঝার পর জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা JAXA একটি উচ্চাভিলাষী মিশন শুরু করে। ২০১৪ সালে পাঠানো হয় মহাকাশযান Hayabusa2।

প্রায় ছয় বছরের দীর্ঘ যাত্রার পর ২০২০ সালে এই মহাকাশযান সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরে আসে। কিন্তু এটি শুধু ফিরে আসেনি—এটি সঙ্গে করে এনেছে রিউগুর মাটির নমুনা, যা এই গবেষণার মূল ভিত্তি।

মোট প্রায় ৫.৪ গ্রাম মাটি সংগ্রহ করা হয় গ্রহাণুর পৃষ্ঠ থেকে। এই সামান্য পরিমাণ নমুনাই বিজ্ঞানীদের সামনে খুলে দেয় এক বিশাল সম্ভাবনার দরজা।


? নমুনা বিশ্লেষণে একের পর এক চমক

রিউগুর মাটি নিয়ে গবেষণা শুরু হয় পৃথিবীতে ফিরে আসার পর থেকেই। প্রথম দিকের গবেষণাগুলিতে জানা যায়, এই গ্রহাণুর মাটিতে জটিল জৈব যৌগ রয়েছে।

২০২৩ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় পাওয়া যায় ইউরাসিল—যা আরএনএর একটি মৌলিক উপাদান। এই আবিষ্কারই প্রথম ইঙ্গিত দেয় যে, মহাকাশে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান থাকতে পারে।

কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা সেই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে।


? ডিএনএ ও আরএনএর সব উপাদানই মিলল!

নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, রিউগুর মাটিতে শুধু ইউরাসিল নয়, ডিএনএ এবং আরএনএর সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ যৌগিক উপাদানই উপস্থিত।

ডিএনএ এবং আরএনএ গঠিত হয় পাঁচটি প্রধান নাইট্রোজেন বেস দিয়ে—

  • অ্যাডেনিন
  • গুয়ানিন
  • সাইটোসিন
  • থায়ামিন
  • ইউরাসিল

এর মধ্যে প্রথম চারটি ডিএনএর জন্য গুরুত্বপূর্ণ, আর আরএনএতে থায়ামিনের পরিবর্তে ইউরাসিল থাকে।

এই সমস্ত উপাদানের উপস্থিতি রিউগুর মাটিতে পাওয়া যাওয়ায় বিজ্ঞানীরা এখন আরও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করছেন যে, জীবনের মৌলিক উপাদানগুলি মহাকাশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকতে পারে।


?‍? গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব

এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন Yasuhiro Oba এবং তাঁর সহকর্মীরা। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Nature Astronomy জার্নালে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করেছেন যে, এই আবিষ্কার মানেই রিউগুতে প্রাণ রয়েছে—এমনটা নয়। বরং এটি দেখাচ্ছে যে, জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান মহাকাশে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হতে পারে।


? প্রাণের উৎপত্তি: নতুন করে ভাবার সময়?

পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি কীভাবে হয়েছে, তা নিয়ে বহু তত্ত্ব রয়েছে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হল—প্যানস্পার্মিয়া তত্ত্ব, যেখানে বলা হয় জীবনের মৌলিক উপাদানগুলি মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে এসেছে।

রিউগুর এই নতুন আবিষ্কার সেই তত্ত্বকে আরও জোরালো করে তুলছে।

news image
আরও খবর

বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীর শুরুর দিকে গ্রহাণু বা উল্কাপিণ্ডের সঙ্গে সংঘর্ষের মাধ্যমে এই ধরনের জৈব উপাদান পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে।


? আগেও মিলেছে এমন ইঙ্গিত

রিউগু একমাত্র উদাহরণ নয়। এর আগেও মহাকাশে এমন উপাদানের সন্ধান মিলেছে।

নাসার OSIRIS-REx মিশন ‘বেন্নু’ গ্রহাণু থেকেও মাটি সংগ্রহ করে এনেছিল। সেই নমুনাতেও ডিএনএ ও আরএনএর উপাদান পাওয়া গেছে।

এছাড়া পৃথিবীতে পতিত বিভিন্ন উল্কাপিণ্ডেও এই ধরনের জৈব যৌগ পাওয়া গেছে।


⚠️ তবে কি রিউগুতে প্রাণ আছে?

এই প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন—না, রিউগুতে প্রাণের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এই বিষয়ে গবেষক Toshiki Koga বলেছেন, এই উপাদানগুলি জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও, এগুলি নিজে থেকে প্রাণের অস্তিত্ব নির্দেশ করে না।


? কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণে—

✔️ এটি প্রমাণ করে যে, জীবনের উপাদান মহাকাশে সাধারণভাবে তৈরি হতে পারে
✔️ পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়
✔️ ভবিষ্যতে অন্য গ্রহে জীবনের সম্ভাবনা খুঁজতে সাহায্য করবে
✔️ মহাকাশ অনুসন্ধানে নতুন দিশা দেখায়

? ভবিষ্যতের গবেষণা: কোথায় এগোবে বিজ্ঞান?

রিউগু গ্রহাণুতে ডিএনএ ও আরএনএর মৌলিক উপাদান আবিষ্কার মহাকাশবিজ্ঞানীদের সামনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এতদিন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা ধারণা করতেন যে, জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় জটিল রাসায়নিক উপাদানগুলি মূলত পৃথিবীতেই তৈরি হয়েছে। কিন্তু রিউগুর মাটিতে এই উপাদানগুলির উপস্থিতি প্রমাণ করছে—মহাবিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এমন উপাদান স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হতে পারে। ফলে, ভবিষ্যতের গবেষণার লক্ষ্য এখন আরও বিস্তৃত এবং গভীর।

বিশেষ করে বিজ্ঞানীদের নজর এখন কয়েকটি নির্দিষ্ট মহাজাগতিক বস্তুর দিকে। প্রথমেই রয়েছে Mars বা মঙ্গল গ্রহ। বহু বছর ধরেই মঙ্গলকে পৃথিবীর ‘সহোদর গ্রহ’ হিসেবে ধরা হয়। অতীতে সেখানে জল ছিল বলে প্রমাণ মিলেছে, আর জল মানেই জীবনের সম্ভাবনা। বর্তমানে বিভিন্ন রোভার ও অরবিটার মঙ্গলের মাটি, বায়ুমণ্ডল এবং শিলার গঠন বিশ্লেষণ করছে, যাতে অতীতে বা বর্তমানেও কোনও জীবনের চিহ্ন পাওয়া যায় কি না।

এরপরেই রয়েছে বৃহস্পতির উপগ্রহ Europa। ইউরোপার বরফে ঢাকা পৃষ্ঠের নিচে বিশাল সমুদ্র থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই সমুদ্রের জলে এমন পরিবেশ থাকতে পারে, যা জীবনের জন্য উপযুক্ত। ভবিষ্যতে সেখানে বিশেষ মিশন পাঠিয়ে বরফ ভেদ করে নিচের জলের নমুনা পরীক্ষা করার পরিকল্পনা রয়েছে।

একইভাবে, শনি গ্রহের উপগ্রহ Enceladus-ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এনসেলাডাসের পৃষ্ঠ থেকে জলীয় বাষ্প এবং জৈব যৌগ মহাকাশে ছিটকে বেরোতে দেখা গেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এর অভ্যন্তরে এমন এক পরিবেশ রয়েছে যেখানে জীবনের উপাদান তৈরি হতে পারে। ভবিষ্যতে এই উপগ্রহে আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনুসন্ধান চালানো হবে।

এই সব গবেষণার পাশাপাশি গ্রহাণু ও ধূমকেতু নিয়েও আগ্রহ বাড়ছে। কারণ, রিউগুর মতো আরও অনেক গ্রহাণুতে হয়তো জীবনের মৌলিক উপাদান লুকিয়ে রয়েছে। নতুন নতুন মহাকাশ মিশনের মাধ্যমে এই ধরনের বস্তু থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে এনে বিশ্লেষণ করা হবে। এতে করে বিজ্ঞানীরা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবেন—জীবনের ‘বীজ’ কীভাবে তৈরি হয় এবং কীভাবে তা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।


✨ উপসংহার

রিউগু গ্রহাণুতে ডিএনএ এবং আরএনএর সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আবিষ্কার নিঃসন্দেহে আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। এই আবিষ্কার শুধু একটি বৈজ্ঞানিক তথ্য নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব সম্পর্কিত ধারণাকেও নতুনভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। এতদিন আমরা ভাবতাম, পৃথিবীই হয়তো একমাত্র গ্রহ যেখানে জীবনের জন্ম হয়েছে। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে—জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকতে পারে।

এর অর্থ এই নয় যে, আমরা ইতিমধ্যেই ভিনগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছি। বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত—জীবনের পথচলা হয়তো মহাকাশ থেকেই শুরু হয়েছিল। কোনও গ্রহাণু বা ধূমকেতুর মাধ্যমে সেই উপাদান পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছিল, এবং সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল জীবনের বিবর্তন।

এই আবিষ্কার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা এই বিশাল মহাবিশ্বের এক ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। আমাদের চারপাশে অসংখ্য অজানা রহস্য লুকিয়ে রয়েছে, যা এখনও আবিষ্কারের অপেক্ষায়। বিজ্ঞানীরা দিনরাত চেষ্টা করে চলেছেন সেই রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য।

ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তি, নতুন মিশন এবং গভীর গবেষণার মাধ্যমে হয়তো আমরা জানতে পারব—আমরা কি সত্যিই একা, নাকি এই মহাবিশ্বে আরও কোথাও জীবনের অস্তিত্ব রয়েছে।

একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়—মানবজাতির এই অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়নি। বরং রিউগুর এই আবিষ্কার আমাদের নতুন করে পথ দেখাচ্ছে। এটি এক নতুন যাত্রার সূচনা, যেখানে প্রতিটি আবিষ্কার আমাদের নিয়ে যাবে অজানার আরও কাছে।


 

Preview image