খবর, শনিবার এ বিষয় আদালত রায় জানাবে। জামিন চেয়ে ইতিমধ্যেই আদালতের দ্বারস্থ গায়িকা অমৃতপ্রভা ও জ়ুবিনের দুই ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী।জ়ুবিন গার্গের মৃত্যুরহস্যের জট কি আদৌ খুলবে? নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে গায়কের অনুরাগীদের মনে। খবর, কামরূপ মেট্রোপলিটন জেলা ও দায়রা আদালতে তিন অভিযুক্ত জামিনের আবেদন জানিয়েছেন। শনিবার তাঁদের আবেদন মঞ্জুর হতে পারে বলে জানা গিয়েছে।
শুক্রবার সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, ইতিমধ্যেই জামিন চেয়ে আদালতে আবেদন জানিয়েছেন কণ্ঠশিল্পী অমৃতপ্রভা মহন্ত এবং জ়ুবিনের দুই ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী পরেশ বৈশ ও নন্দেশ্বর বোরা। শনিবার আদালতে তাঁদের জামিন মঞ্জুর হতে পারে বলে ইতিমধ্যেই গুঞ্জন ছড়িয়েছে। মামলার অন্য দুই অভিযুক্ত, গার্গের সচিব সিদ্ধার্থ শর্মা এবং ব্যান্ড সদস্য শেখরজ্যোতি গোস্বামী এখনও পর্যন্ত জামিনের জন্য আবেদন করেননি।
এর আগে, ২২ জানুয়ারির শুনানিতে দুই অভিযুক্ত, উত্তরপূর্ব ভারতীয় উৎসবের অন্যতম কর্মকর্তা শ্যামকানু মহন্ত এবং প্রয়াত গায়কের তুতো ভাই সন্দীপন গার্গ তাঁদের জামিনের আবেদন প্রত্যাহার করে নেন। মহন্তের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ আনা হয়েছে। অসম পুলিশের বরখাস্ত কর্মকর্তা সন্দীপন গার্গের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে উত্তরপূর্ব ভারতীয় সঙ্গীতানুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েছিলেন প্রয়াত জ়ুবিন। অনুষ্ঠানের আগেই রহস্যজনক ভাবে মৃত্যু হয় তাঁর। জানা যায়, তিনি সমুদ্রে সাঁতার কাটতে গিয়ে নাকি ডুবে যান। জনগণের দাবি মেনে অসম সরকার একটি বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) গঠন করে। এসআইটি-র অভিযোগ অনুযায়ী, শ্যামকানু মহন্ত, সিদ্ধার্থ শর্মা, শেখরজ্যোতি গোস্বামী এবং অমৃতপ্রভা মহন্তের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ আনা হয়।
প্রয়াত গায়ক জ়ুবিনের রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই নতুন প্রশ্ন ও বিতর্ক সামনে আসছে। সাম্প্রতিক শুনানিতে দুই অভিযুক্তের জামিন আবেদন প্রত্যাহার, খুন ও অনিচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগ—সব মিলিয়ে এই মামলাটি এখন শুধুমাত্র একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্ত নয়, বরং একটি বহুমাত্রিক অপরাধ অনুসন্ধানে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের কৌতূহল, পরিবার ও অনুরাগীদের ক্ষোভ এবং প্রশাসনের উপর চাপ—সব মিলিয়ে মামলাটি ক্রমশ জটিল আকার নিচ্ছে।
২২ জানুয়ারির শুনানিতে উত্তরপূর্ব ভারতীয় উৎসবের অন্যতম কর্মকর্তা শ্যামকানু মহন্ত এবং প্রয়াত গায়কের তুতো ভাই সন্দীপন গার্গ নিজেদের জামিনের আবেদন প্রত্যাহার করে নেন। আইনজীবী মহলে এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সাধারণত অভিযুক্তরা জামিন পাওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু এখানে আবেদন প্রত্যাহার করা মামলার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তুলছে।
আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে,
“জামিন প্রত্যাহার মানে এই নয় যে অভিযুক্তরা অপরাধ স্বীকার করছেন। তবে এটি ইঙ্গিত দেয় যে তাঁরা হয়তো মনে করছেন, বর্তমান পর্যায়ে আদালত থেকে স্বস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা কম।”
শ্যামকানু মহন্তের বিরুদ্ধে সরাসরি খুনের অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে অসম পুলিশের বরখাস্ত কর্মকর্তা সন্দীপন গার্গের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগ। দুই অভিযোগের প্রকৃতি আলাদা হলেও, তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী দু’জনের ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে উত্তরপূর্ব ভারতীয় এক সঙ্গীতানুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েছিলেন জনপ্রিয় গায়ক জ়ুবিন। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যুর খবর আসে। প্রাথমিক ভাবে জানানো হয়, তিনি সমুদ্রে সাঁতার কাটতে নেমে ডুবে যান। সিঙ্গাপুর পুলিশের প্রাথমিক রিপোর্টেও বিষয়টিকে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বলেই উল্লেখ করা হয়েছিল।
কিন্তু দ্রুতই সেই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। কারণ, জ়ুবিন একজন দক্ষ সাঁতারু ছিলেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল জানিয়েছিল। তাছাড়া, ঘটনার সময় তাঁর সঙ্গে কারা ছিলেন, কেন কোনও প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য স্পষ্ট নয়—এসব প্রশ্ন সামনে আসতে থাকে।
জ়ুবিনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই অসম এবং উত্তরপূর্ব ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে শোকের ছায়া নেমে আসে। কিন্তু শোকের সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নেয় সন্দেহ। গায়কের পরিবার দাবি তোলে, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ প্রকাশ্যে আনা হোক। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনুরাগীরাও ‘ন্যায়বিচার চাই’ স্লোগান তুলে সরব হন।
এই চাপের মুখেই অসম সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে বাধ্য হয়। সাধারণ মানুষের দাবি মেনে একটি বিশেষ তদন্ত দল বা এসআইটি গঠন করা হয়। সরকারের তরফে জানানো হয়, তদন্তে কোনও রকম প্রভাব খাটানো হবে না এবং দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এসআইটি তদন্ত শুরু করার পর ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়। তদন্তকারীদের দাবি, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়। এসআইটি-র অভিযোগ অনুযায়ী, শ্যামকানু মহন্ত, সিদ্ধার্থ শর্মা, শেখরজ্যোতি গোস্বামী এবং অমৃতপ্রভা মহন্ত—এই চার জনের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন জ়ুবিনের সঙ্গে অভিযুক্তদের একাধিকবার বচসা হয়েছিল। সেই বচসার কারণ কী, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এসআইটি দাবি করেছে, জ়ুবিনকে ইচ্ছাকৃত ভাবে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।
এই মামলায় সবচেয়ে আলোচিত নামগুলির একটি সন্দীপন গার্গ। তিনি অসম পুলিশের বরখাস্ত কর্মকর্তা এবং জ়ুবিনের তুতো ভাই। তাঁর বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, তিনি সরাসরি খুনের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও, ঘটনার সময় তাঁর ভূমিকা অবহেলার পর্যায়ে পড়ে।
আইন অনুযায়ী, অনিচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগ মানে এমন একটি কাজ বা অবহেলা, যার ফলে মৃত্যু ঘটে, কিন্তু সরাসরি হত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণ করা যায় না। এসআইটি-র বক্তব্য অনুযায়ী, সন্দীপন গার্গ যদি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতেন, তবে পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত।
শ্যামকানু মহন্ত ছিলেন উত্তরপূর্ব ভারতীয় উৎসবের অন্যতম কর্মকর্তা। তাঁর বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ ওঠায় উৎসবের সংগঠন এবং ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অনুষ্ঠান আয়োজনের সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, শিল্পীদের দেখভাল করার দায়িত্ব কার উপর ছিল—এসব বিষয় এখন তদন্তের আওতায়।
এক তদন্তকারী আধিকারিক জানান,
“শিল্পী বিদেশে গেলে তাঁদের নিরাপত্তা এবং গতিবিধির দায় আয়োজকদের উপরও বর্তায়। এখানে সেই দায়িত্ব পালনে গাফিলতির প্রমাণ মিলছে।”
এই মামলার আর একটি বড় চ্যালেঞ্জ হল আন্তর্জাতিক সীমা। ঘটনাটি সিঙ্গাপুরে ঘটলেও তদন্ত চালাচ্ছে অসমের এসআইটি। প্রমাণ সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি, প্রযুক্তিগত তথ্য—সব কিছুই আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে,
“বিদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনার ক্ষেত্রে প্রমাণ সংগ্রহে সময় লাগে। সেই কারণে মামলার গতি ধীর হতে পারে।”
বর্তমানে অভিযুক্তরা বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন। জামিন আবেদন প্রত্যাহার করার ফলে আপাতত তাঁদের মুক্তির সম্ভাবনা নেই। আদালত জানিয়েছে, এসআইটি-র চার্জশিট খতিয়ে দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে ইঙ্গিত মিলেছে, মামলাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং জনস্বার্থ জড়িত থাকায় দ্রুত নিষ্পত্তি জরুরি।
এই মামলা ঘিরে রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, শুরুতে সরকার বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। যদিও সরকার তা অস্বীকার করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর দফতর থেকে জানানো হয়েছে,
“ন্যায়বিচারের প্রশ্নে কোনও আপস করা হবে না।”
এসআইটি সূত্রে জানা যাচ্ছে, খুব শীঘ্রই আরও কিছু অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হতে পারে। ডিজিটাল ফরেনসিক রিপোর্ট এবং সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আসা তথ্য মামলার গতিপথ বদলে দিতে পারে।
জ়ুবিনের পরিবার এখনও ন্যায়বিচারের আশায় দিন গুনছে। তাঁদের বক্তব্য,
“আমরা কাউকে দোষী প্রমাণ করতে চাই না। শুধু সত্যটা জানতে চাই।”
প্রয়াত গায়ক জ়ুবিনের মৃত্যু আজ আর শুধুই এক দুর্ঘটনার গল্প নয়। এটি হয়ে উঠেছে ক্ষমতা, দায়িত্বহীনতা এবং সম্ভাব্য অপরাধের এক জটিল সমীকরণ। আদালতের রায়ই শেষ পর্যন্ত ঠিক করবে কে দোষী, কে নির্দোষ। তবে এটুকু স্পষ্ট—এই মামলার রায় শুধু জ়ুবিনের পরিবারের জন্য নয়, ভবিষ্যতে বিদেশে অনুষ্ঠান করতে যাওয়া ভারতীয় শিল্পীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
এই মামলায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রমাণের ধরণ ও বিশ্বাসযোগ্যতা। এসআইটি সূত্রে জানা যাচ্ছে, সিঙ্গাপুরে ঘটনার দিন অভিযুক্তদের গতিবিধি খতিয়ে দেখতে সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের লোকেশন ডেটা এবং কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে শেষ কয়েক ঘণ্টায় কারা জ়ুবিনের সঙ্গে ছিলেন, তাঁদের বক্তব্যের মধ্যে কোনও অসঙ্গতি রয়েছে কি না, তা খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের দাবি, একাধিক অভিযুক্তের জবানবন্দিতে পারস্পরিক বিরোধ ধরা পড়েছে, যা মামলাকে আরও জোরালো করছে।
এছাড়াও, জ়ুবিনের মৃত্যুর সময় উপস্থিত থাকার কথা যাঁরা স্বীকার করেছেন, তাঁদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কেউ কি ইচ্ছাকৃত ভাবে সাহায্য করেননি? কেউ কি পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝেও চুপ করে ছিলেন? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতেই তদন্তের পরিধি আরও বাড়ানো হয়েছে। আইনজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ক্ষেত্রে ‘ক্রিমিনাল নেগলিজেন্স’ প্রমাণিত হলে শাস্তির পথ খুলে যায়, এমনকি সরাসরি খুনের উদ্দেশ্য না থাকলেও।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, তদন্ত একতরফা হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক তদন্ত প্রক্রিয়ার সব নিয়ম মানা হয়নি। তাঁদের বক্তব্য, সিঙ্গাপুর পুলিশের প্রাথমিক রিপোর্টকে গুরুত্ব না দিয়ে এসআইটি কেবল অনুমানের উপর ভিত্তি করে অভিযোগ সাজাচ্ছে। তবে এসআইটি এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছে, সমস্ত নথি ও প্রমাণ আইনি কাঠামোর মধ্যেই সংগ্রহ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আদালতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিচারক স্পষ্ট জানিয়েছেন, আবেগ নয়—শুধু প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আগামী শুনানিতে ফরেনসিক রিপোর্ট ও ডিজিটাল প্রমাণ আদালতে পেশ করা হলে মামলার গতিপথ আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। জ়ুবিনের পরিবার এবং অনুরাগীরা এখন তাকিয়ে রয়েছেন সেই দিনটির দিকেই, যেদিন সত্যটা আইনের আলোয় পরিষ্কার হয়ে উঠবে।