Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কলকাতায় দু’দু’টি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ইএম বাইপাসে প্রাণ গেল বাইক আরোহীর রেড রোডে ল্যাম্পপোস্টে ধাক্কা গুরুতর জখম বাবা ছেলে

মঙ্গলবার গভীর রাতে ইএম বাইপাসের বুকে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, অতিরিক্ত গতির কারণেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিটকে পড়ে যান এক বাইক আরোহী। সংঘর্ষের তীব্রতায় ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। রাতের নির্জনতায় আচমকা ওই দুর্ঘটনা এক মুহূর্তে রাস্তাজুড়ে তৈরি করে আতঙ্কের পরিবেশ। স্থানীয়রা ও ট্রাফিক পুলিশ দ্রুত ছুটে এলেও আর কিছুই করা সম্ভব হয়নি। বাইপাসে মাঝেমধ্যেই এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি শহরজুড়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে নিরাপত্তা নিয়ে। অন্য দিকে, বুধবার সকালে ব্যস্ত সময়েই রেড রোডে ঘটে গেল আরও একটি মারাত্মক দুর্ঘটনা। দ্রুতগামী একটি গাড়ি আচমকা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধাক্কা মারে রাস্তার ধারে থাকা একটি ল্যাম্পপোস্টে। প্রচণ্ড জোরে আঘাত লেগে গুরুতর জখম হন গাড়ির মধ্যে থাকা বাবা-ছেলে। প্রত্যক্ষদর্শীরা দ্রুত পুলিশকে খবর দেন, এবং আহত দু’জনকে তড়িঘড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের অবস্থা উদ্বেগজনক বলেই জানা গেছে। টানা দুই দিনে শহরের দুই গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় এই জোড়া দুর্ঘটনা আবারও সামনে এনে দিল বেপরোয়া গতি ও অসচেতন ড্রাইভিংয়ের বিপদ। নাগরিকদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি ট্রাফিক নিরাপত্তায় আরও কড়াকড়ির দাবি উঠছে চারদিকে।

কলকাতায় জোড়া পথ দুর্ঘটনা এক রাত এক সকাল দু’টি ভয়াবহ ঘটনাই শহরবাসীকে নাড়িয়ে দিল

কলকাতা—এই শহর রাত যত গভীর হয়, তার ছন্দ যেন আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে। ব্যস্ত দিনের ভিড় কমে গিয়ে রাস্তা ফাঁকা হলে অনেকেই মনে করেন—এ হল কিছুটা স্বস্তির সময়। কিন্তু এই ফাঁকা রাস্তার উপরেই অদৃশ্য হয়ে থাকে এক বিপদ—বেপরোয়া গতি। আর সেই গতিই কখনও বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো নেমে আসে কারও জীবনে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি হয়ে। মঙ্গলবার গভীর রাতে এমনই এক বিপর্যয় গ্রাস করে নেয় এক তরুণের জীবন। আর তার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর, বুধবার ভোরের ব্যস্ত সময়ে, রেড রোডের বুকে ঘটে যায় আরও একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা, যেখানে জখম হন বাবা-ছেলে এবং আহত হন এক পথচারীও।

এই জোড়া দুর্ঘটনা শুধু পরিসংখ্যানের খাতা ভরানোর কিছু সংখ্যা নয়—এ শহরের সড়ক নিরাপত্তা, নাগরিক সচেতনতা এবং পুলিশের কড়াকড়ি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। দুর্ঘটনার মুহূর্ত থেকে শুরু করে তদন্ত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, চিকিৎসকদের মতামত, আহতদের পরিস্থিতি—সবকিছুকে এক সুতোয় বেঁধে এখানে তুলে ধরা হল একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন।


প্রথম দুর্ঘটনা গভীর রাতে ইএম বাইপাসে মৃত্যুর ছায়া

মঙ্গলবার রাত—২টো। কালিকাপুরের কাছে ইএম বাইপাস।

শহর তখন ঘুমের পাড়ে, বেশিরভাগ দোকান বন্ধ, পথেঘাটে কম যানবাহন। শান্ত, নিস্তব্ধ পরিবেশ। কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই ছুটে আসছিল একটি বাইক—দ্রুতগতিতে, ঝড়ের মতো। চালাচ্ছিলেন অলোকেশ হালদার, বয়স মাত্র তিরিশের কোঠায়। কাজ শেষ করে তিনি ফিরছিলেন নিজের বাড়ির দিকে। ঢালাই ব্রিজ থেকে রুবি মোড়ের দিকে নামছিলেন তিনি।

রাতের শহরে, বিশেষত বাইপাসে, গতি বাড়িয়ে বাইক চালানোর প্রবণতা নতুন কিছু নয়। ফাঁকা রাস্তা দেখলেই অনেকেই মনে করেন—এই সময় একটু গতি দিলে দোষ কী? কিন্তু সেই ক্ষণিকের ভুল ধারণাই কত জীবন কেড়ে নেয় তার হিসাব নেই। অলোকেশও হয়তো ভাবেননি, সেই রাতটাই হতে চলেছে তাঁর জীবনের শেষ রাত।

দুর্ঘটনার মুহূর্ত

সিংহবাড়ি মোড়ের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়িকে প্রথমে সজোরে ধাক্কা মারে তাঁর বাইক। সংঘর্ষ এতটাই প্রচণ্ড ছিল যে বাইকটি সামনের ধাক্কা সামলাতে না পেরে সোজা পাশের ডিভাইডারে গিয়ে ধাক্কা খায়। আর তার পরে—অলোকেশ ছিটকে পড়ে যান রাস্তায়। মাথা সোজা ধাক্কা খায় ডিভাইডারের ধারাল অংশে।

মাথায় হেলমেট না থাকায় আঘাত হয় ভয়াবহ।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চারপাশ যেন নিস্তব্ধ। একমাত্র বাইকের ভাঙাচোরা অংশগুলোই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা, দুর্ঘটনার হঠাৎ থেমে যাওয়া গতি বোঝাচ্ছিল। স্থানীয় কয়েকজন প্রথমে দুর্ঘটনার শব্দ শুনে ছুটে আসেন। তাঁরা দেখেন রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে রয়েছেন অলোকেশ।

চিকিৎসার চেষ্টা ও পুলিশের প্রাথমিক রিপোর্ট

দ্রুত তাঁকে এমআর বাঙুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকেরা জানান—অলোকেশকে আনার আগেই তিনি মারা গিয়েছেন। মাথায় গুরুতর আঘাতই মৃত্যুর মূল কারণ বলে দাবি চিকিৎসকদের।

পুলিশের প্রাথমিক অনুমান

  • বাইকটির গতি ছিল অত্যন্ত বেশি

  • সামনে দাঁড়ানো গাড়িটি হয়তো চোখে পড়েনি

  • নিয়ন্ত্রণ হারানোই মূল দুর্ঘটনার কারণ

  • সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হেলমেট না থাকার কারণে মাথায় মারাত্মক চোট লাগে

স্থানীয়রা বলেছেন, রাতে ফাঁকা রাস্তায় বাইকচালকদের বেপরোয়া গতি নতুন নয়। কেউ কেউ আবার দাবি করেছেন, বাইপাসে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলির পাশে বিপজ্জনকভাবে হাই বিম বা ভুল পার্কিংয়ের ঘটনাও বাড়ছে, যা অনেক সময় দুর্ঘটনা ডেকে আনে।

পরিবারের শোক

অলোকেশের মৃত্যুতে তাঁর পরিবার ভেঙে পড়েছে। কাজ শেষে প্রতিদিনের মতোই ফিরছিলেন তিনি। কেউই ভাবতে পারেনি, এক মুহূর্তের ভুল তাঁর পুরো পরিবারকে চিরদিনের জন্য শোকে নিমজ্জিত করে দেবে।


দ্বিতীয় দুর্ঘটনা রেড রোডে ভোরবেলার আতঙ্ক

বুধবার সকাল রেড রোড

কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। প্রতিদিন হাজার হাজার গাড়ি যাতায়াত করে। সরকারি গাড়ি, সাধারণ যাত্রী, অফিসগামী মানুষ সকাল থেকেই দৌরদৌড়। আর এই ব্যস্ততার মধ্যেই ঘটে গেল আরও এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা।

একটি দ্রুতগামী গাড়ি আচমকা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সজোরে ধাক্কা মারে রাস্তার পাশে থাকা বিদ্যুতের খুঁটিতে। সংঘর্ষ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে আশেপাশে থাকা পথচারীরা থমকে দাঁড়িয়ে যান। গাড়িটি কিন্তু সেখানেই থামেনি—আঘাতের ধাক্কায় গাড়িটি আরেকটু এগিয়ে গিয়ে একটি গাছেও ধাক্কা মারে। গাড়ির সামনের অংশ পুরোপুরি দুমড়ে-মুচড়ে যায়।

গাড়ির ভেতরে বাবা ছেলে

গাড়িতে ছিলেন দু’জন পরস্পরের সম্পর্ক বাবা-ছেলে। দু’জনেই গুরুতর জখম হন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন
“হঠাৎই দেখি গাড়িটা প্রচণ্ড গতিতে আসছে। এক মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি খুঁটিতে ধাক্কা। শব্দটা এত জোরে হল, আমরা ভয় পেয়েছিলাম। এরপর গাড়ি গাছেও ধাক্কা মারে। ভিতরে দু’জন আটকে গিয়েছিলেন।”

ঘটনার ফলে আশেপাশের মানুষ ও ট্রাফিক পুলিশ দ্রুত সাহায্যে এগিয়ে আসেন। কাচ ভেঙে, দমকলের সাহায্যে ওই দু’জনকে গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়। তাঁদের গুরুতর আহত অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয় এসএসকেএম হাসপাতালে। সেখানেই তাঁদের চিকিৎসা চলছে।

এক পথচারীও আহত

গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ধাক্কার একাংশ লেগেছিল রাস্তা দিয়ে হাঁটতে যাওয়া এক পথচারীর গায়েও। তিনিও আহত হন, তবে গুরুতর নন বলে জানা গেছে। তাঁকেও প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।


দুই দুর্ঘটনার মিল অমিল সমস্যা কোথায়

এই জোড়া দুর্ঘটনা কলকাতার দুই প্রান্তে, দুই সময়ে হলেও কিছু মিল আছে

বাইক দুর্ঘটনায় হেলমেট না থাকা ছিল মৃত্যুর বড় কারণ। অন্যদিকে গাড়ি দুর্ঘটনায় দ্রুতগামী গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিপদ ডেকে আনে।


ট্রাফিক পুলিশের অবস্থান

ট্রাফিক পুলিশ জানিয়েছে

  • রাতে ও ভোরে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে

  • বেপরোয়া বাইক–গাড়ি চালানোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ

  • ফাঁকা রাস্তায় নজরদারির জন্য বিশেষ মোবাইল ভ্যান

  • পথচারীদের সতর্ক থাকার অনুরোধ


রাস্তার নিরাপত্তা কেন সংকটে?

এই দুই দুর্ঘটনা শহরের সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে

  1. ফাঁকা রাস্তায় গতি নিয়ন্ত্রণ নেই

  2. অনেক চালক নিয়ম মানেন না

  3. হেলমেট/সিটবেল্টের ব্যবহার কম

  4. রাস্তার ধারে ভুল পার্কিং বাড়ছে

  5. সড়কে থাকা খুঁটি–গাছ–ডিভাইডার যথেষ্ট চিহ্নিত নয়

  6. রাতে পর্যাপ্ত আলোর অভাব


শহরবাসীর প্রতিক্রিয়া

দুর্ঘটনা দু'টির পর সামাজিক মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই বলেছেন

  • “রাত মানেই যেন রেস ট্র্যাক!”

  • “পুলিশের কড়া নজরদারি দরকার।”

  • “হেলমেট না পরা মানে মৃত্যুকে ডাক দেওয়া।”

  • “রেড রোডে এতগতি কেন?”


শেষ কথা: সচেতনতা না বাড়লে দুর্ঘটনা কমবে না

কলকাতার সড়ক এখন প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে মূলত মানুষের অসচেতনতার কারণে। প্রযুক্তি, পুলিশ, আইন সবই আছে। নেই শুধু রাস্তা ব্যবহারের সতর্কতা ও দায়িত্ববোধ।

জোড়া দুর্ঘটনা যেন আরেকবার স্পষ্ট করে দিল—
এক মুহূর্তের বেপরোয়া সিদ্ধান্তই বদলে দিতে পারে বহু মানুষের জীবন। 

এই দুই ঘটনার পর শহরজুড়ে যে আতঙ্ক, ক্ষোভ এবং প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তা কেবল কিছু প্রশাসনিক ব্যর্থতার দিকে আঙুল তোলে না; বরং আমাদের প্রতিদিনের পথচলার অভ্যাসগুলোকেও সামনে নিয়ে আসে। রাস্তায় বেরোলেই দেখা যায়—হাতের মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে চালানো, সিটবেল্ট না বাঁধা, হেলমেটকে ‘ঝামেলা’ মনে করে ফেলে রাখা, ফাঁকা রাস্তায় গতি বাড়িয়ে ‘অ্যাডভেঞ্চার’ করার অহেতুক চেষ্টা—এসবই যেন স্বাভাবিক অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই চেনা ভুলগুলিই অনিচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করে প্রাণঘাতী মুহূর্ত।

অলোকেশের মতো বহু মানুষ প্রতিদিনই কাজ থেকে ফিরে পরিবারের কাছে পৌঁছানোর স্বপ্ন নিয়ে রাস্তায় নামেন। তাঁদের মধ্যে কেউই ভাবেন না, কয়েক সেকেন্ডের গতি ভুল বা সতর্কতার অভাব তাঁদের জীবনের শেষ পথ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে রেড রোডের ঘটনাটি প্রমাণ করে—গাড়ির ভেতরে বসে থাকা মানুষই শুধু নয়, রাস্তা দিয়ে হাঁটতে যাওয়া পথচারীও যে কোনও সময় বিপদের মুখোমুখি হয়ে যেতে পারেন। কারণ বেপরোয়া একটি গাড়ি শুধু চালকের জীবন নয়, আশপাশের বহু মানুষের নিরাপত্তাকেও মুহূর্তে ধ্বংস করে দিতে পারে।

এই ঘটনাগুলির পেছনে শুধু ব্যক্তিগত গাফিলতি নয়, সামগ্রিক সামাজিক সমস্যা লুকিয়ে আছে। শহরের বাড়তে থাকা যানবাহন, দ্রুতগতির প্রতি অনাবশ্যক আকর্ষণ, ট্রাফিক নিয়ম মানতে অনীহা—এসবই একসঙ্গে বিপর্যয়ের সম্ভাবনা তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে দুর্ঘটনার প্রধান তিন কারণ—অতিরিক্ত গতি, অসাবধানতা, এবং নিরাপত্তা সরঞ্জামের অবহেলা—এই দুই ঘটনাতেই প্রকটভাবে দেখা গিয়েছে।

এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে সচেতনতা। শুধু কঠোর আইন নয়, প্রয়োজন ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ। হেলমেট পরে বাইক চালানো, সিটবেল্ট সবসময় বাঁধা, ফাঁকা রাস্তা মানেই গতি বাড়ানো যাবে—এই ভুল ধারণা ত্যাগ করা, এবং সবচেয়ে জরুরি ড্রাইভিংয়ের সময় সম্পূর্ণ মনোযোগ রাখা।

কারণ রাস্তা সবার। আর প্রাণও সবারই মূল্যবান।
একজনের ভুল সিদ্ধান্ত যেন আর কারও জীবন কেড়ে না নেয়—এই বার্তাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ে দাঁড়াল কলকাতার এই জোড়া দুর্ঘটনা থেকে। 

Preview image