Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সচিনের বিশ্বরেকর্ড ভেঙেই নিজেকে সতর্ক করছেন বৈভব - ‘মাথা যেন ঘুরে না যায়

মাত্র ১৪ বছর বয়সেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অর্ধশতরান করে ইতিহাস গড়ল বৈভব সূর্যবংশী। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৬ বছর ২১৩ দিন বয়সে গড়া সচিন তেন্ডুলকরের দীর্ঘদিনের বিশ্বরেকর্ড ভেঙে কনিষ্ঠতম ক্রিকেটার হিসেবে নতুন নজির স্থাপন করল ভারতীয় এই প্রতিভা।

সচিনের ৩৬ বছরের বিশ্বরেকর্ড ভেঙে ইতিহাস বৈভবের, অর্ধশতরান উৎসর্গ করলেন পরিবার ও কোচদের

ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস লিখল মাত্র ১৫ বছরের এক কিশোর। যে বয়সে অধিকাংশ ক্রিকেটার জেলা বা রাজ্য স্তরে নিজেদের জায়গা তৈরি করার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকে, সেই বয়সেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের রেকর্ড বইয়ে নিজের নাম তুলে ফেলল বৈভব। মাত্র ১৫ বছর ১১৮ দিন বয়সে অর্ধশতরান করে সে ভেঙে দিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যাটার সচিন তেন্ডুলকরের বহু বছরের পুরনো নজির।

এর আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কনিষ্ঠতম ক্রিকেটার হিসাবে অর্ধশতরান করার রেকর্ড ছিল সচিনের দখলে। ১৬ বছর ২১৩ দিন বয়সে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টেস্ট ম্যাচে অর্ধশতরান করেছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটের ‘মাস্টার ব্লাস্টার’। সেই ইনিংসের পর দীর্ঘ সময় ধরে সচিনের রেকর্ডটি অক্ষত ছিল। ক্রিকেটের বিভিন্ন যুগে বহু প্রতিভাবান কিশোর আন্তর্জাতিক মঞ্চে সুযোগ পেলেও সচিনের সেই বয়সভিত্তিক নজির অতিক্রম করা সম্ভব হয়নি।

অবশেষে বৃহস্পতিবার সেই ইতিহাস বদলে দিল বৈভব। ১৫ বছর ১১৮ দিন বয়সে অর্ধশতরান সম্পূর্ণ করে সচিনের রেকর্ড ভেঙে নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়ল তরুণ ব্যাটার। তবে এমন ঐতিহাসিক সাফল্যের পরও তার কথাবার্তায় অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস বা আত্মতুষ্টির কোনও ছাপ দেখা যায়নি। বরং ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বৈভব বুঝিয়ে দিয়েছে, রেকর্ড গড়লেও তার লক্ষ্য শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। দলের প্রয়োজনে রান করা এবং নিজের ক্রিকেটকে আরও উন্নত করাই তার প্রধান উদ্দেশ্য।

১৫ বছর বয়সেই ইতিহাসের পাতায় বৈভব

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সুযোগ পাওয়া যে কোনও ক্রিকেটারের কাছেই বিশেষ সম্মানের। সেখানে মাত্র ১৫ বছর বয়সে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে অর্ধশতরান করা নিঃসন্দেহে বিরল কৃতিত্ব। ক্রিকেট এমন একটি খেলা, যেখানে প্রতিভার পাশাপাশি প্রয়োজন মানসিক শক্তি, পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা, ধৈর্য, শট নির্বাচনের দক্ষতা এবং চাপের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্যতা।

বৈভবের ইনিংসে সেই সমস্ত গুণেরই প্রতিফলন দেখা গিয়েছে। বয়স কম হলেও ব্যাট হাতে তাকে অসহায় বা নার্ভাস দেখায়নি। সুযোগ পাওয়া বলগুলিকে নিজের শক্তি অনুযায়ী কাজে লাগিয়েছে সে। আবার প্রয়োজনের সময় অহেতুক ঝুঁকি না নিয়ে দলকে একটি নির্ভরযোগ্য ইনিংস দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

অর্ধশতরান পূর্ণ করার সঙ্গে সঙ্গেই ইতিহাসের পাতায় নাম উঠে যায় বৈভবের। সচিন তেন্ডুলকরের মতো কিংবদন্তির রেকর্ড ভাঙা যে কোনও ক্রিকেটারের জন্য বিশাল সম্মানের। কিন্তু বৈভবের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সে সচিনের চেয়েও প্রায় এক বছর কম বয়সে এই নজির গড়েছে।

সচিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম অর্ধশতরান করেছিলেন ১৬ বছর ২১৩ দিন বয়সে। বৈভব সেখানে মাত্র ১৫ বছর ১১৮ দিন বয়সেই পঞ্চাশ রানের সীমা অতিক্রম করেছে। বয়সের হিসাব অনুযায়ী সচিনের থেকে ৪৬০ দিন কম বয়সে আন্তর্জাতিক অর্ধশতরান করল বৈভব। এই পরিসংখ্যানই তার কৃতিত্বের ব্যাপকতা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

রেকর্ডের পরও আত্মতুষ্ট নন বৈভব

বড় রেকর্ড গড়ার পর তরুণ ক্রিকেটারদের মধ্যে অতিরিক্ত উত্তেজনা দেখা যেতেই পারে। বিশেষ করে সেই রেকর্ড যদি সচিন তেন্ডুলকরের মতো কিংবদন্তির হয়, তা হলে আবেগ সামলানো সহজ নয়। কিন্তু বিসিসিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বৈভবের বক্তব্যে পরিণত মানসিকতার পরিচয় পাওয়া গিয়েছে।

সচিনের রেকর্ড ভাঙার বিষয়ে বৈভব বলেছে, “কিছু মাঠ রয়েছে, যেখানে সকলে রান করতে চায়। তাই বলে আমি কিন্তু একটুও হালকা ভাবে নিচ্ছি না বিষয়টা। যতটা সম্ভব ভাল খেলার চেষ্টা করেছি। দলকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি।”

এই বক্তব্যের মধ্যেই বৈভবের মানসিকতার গুরুত্বপূর্ণ দিকটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সে নিজের ইনিংসকে শুধু একটি ব্যক্তিগত রেকর্ড হিসাবে দেখছে না। তার কাছে দলের প্রয়োজনে রান করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় সফল হতে হলে এই দলকেন্দ্রিক মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রেকর্ডের আলোচনায় নিজেকে হারিয়ে না ফেলে বৈভব বারবার দলের কথাই বলেছে। তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সে ইতিমধ্যে উপলব্ধি করেছে যে একটি ভাল ইনিংস ক্রিকেটজীবনের শুরু হতে পারে, কিন্তু সেখানেই যাত্রা শেষ হয়ে যায় না। আগামী দিনে একই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং আরও কঠিন পরিস্থিতিতে সফল হওয়াই হবে তার আসল পরীক্ষা।

পরিবার ও কোচদের উৎসর্গ ঐতিহাসিক ইনিংস

একজন ক্রিকেটারের সাফল্যের পিছনে শুধু তার ব্যক্তিগত পরিশ্রম থাকে না। ছোটবেলা থেকে পরিবার, কোচ, প্রশিক্ষক এবং বিভিন্ন পর্যায়ে পাশে থাকা মানুষদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈভবও নিজের সাফল্যের মুহূর্তে তাঁদের কথা ভুলে যায়নি।

ঐতিহাসিক অর্ধশতরান সম্পর্কে বৈভব বলেছে, “এই ইনিংসটা আমার পরিবার, কোচেদের উৎসর্গ করতে চাই। আমাকে এই পর্যন্ত পৌঁছোতে যাঁরা সাহায্য করেছেন, তাঁদেরও উৎসর্গ করছি।”

news image
আরও খবর

মাত্র ১৫ বছর বয়সে এমন বক্তব্য তার পরিণতবোধের পরিচয় দেয়। নিজের সাফল্যের পুরো কৃতিত্ব না নিয়ে সে পরিবার এবং কোচদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিয়েছে। ক্রিকেটের কঠিন পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ছোটবেলা থেকেই একজন খেলোয়াড়কে নিয়মিত অনুশীলন, শারীরিক পরিশ্রম, খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তিগত জীবনের অনেক আনন্দ ত্যাগ করতে হয়।

একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদেরও বিভিন্ন ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। অনুশীলনের জন্য মাঠে নিয়ে যাওয়া, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা, খারাপ পারফরম্যান্সের পর মানসিকভাবে পাশে থাকা এবং পড়াশোনার সঙ্গে ক্রিকেটের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করা—সব ক্ষেত্রেই পরিবারের ভূমিকা থাকে।

কোচেরা একজন প্রতিভাবান ক্রিকেটারের দক্ষতাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। ব্যাটিংয়ের কৌশল শেখানো থেকে শুরু করে ম্যাচের পরিস্থিতি বোঝানো, ভুল শট সংশোধন করা এবং চাপের মধ্যে স্থির থাকার শিক্ষা দেওয়া—প্রতিটি ধাপেই কোচের ভূমিকা অপরিহার্য। তাই নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক অর্ধশতরান তাঁদের উৎসর্গ করে বৈভব কৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।

প্রথম অর্ধশতরানেই বেড়েছে আত্মবিশ্বাস

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম বড় ইনিংস একজন তরুণ ক্রিকেটারের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বদলে দিতে পারে। প্রতিভা থাকলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তা প্রয়োগ করতে পারার বিষয়ে অনেক সময় ক্রিকেটারের নিজের মধ্যেই সংশয় থাকে। প্রথম উল্লেখযোগ্য সাফল্য সেই সংশয় দূর করে দেয়।

প্রথম অর্ধশতরানের পর নিজের আত্মবিশ্বাস সম্পর্কে বৈভব বলেছে, “ক্রিকেটজীবনের শুরুর দিকে এই রকম ইনিংস খেলতে পারলে আত্মবিশ্বাস পাওয়া যায়। পরের ম্যাচের আগে মনোবল বেড়ে যায়। নিজের পছন্দ মতো জায়গায় বল পেয়েছি। নিজের শক্তি অনুযায়ী খেলার চেষ্টা করেছি।”

এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, বৈভব নিজের ব্যাটিং সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। কোন জায়গায় বল পেলে সে স্বচ্ছন্দে শট খেলতে পারে এবং কোন শটগুলি তার প্রধান শক্তি—সেই বিষয়ে তার পরিষ্কার ধারণা রয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সফল হওয়ার জন্য নিজের শক্তি ও দুর্বলতা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বৈভব অহেতুক অভিনব কিছু করার চেষ্টা না করে নিজের স্বাভাবিক খেলায় ভরসা রেখেছে। পছন্দের জায়গায় বল পেলে শট খেলেছে এবং নিজের ব্যাটিংয়ের শক্তিকে কাজে লাগিয়েছে। একজন তরুণ ক্রিকেটারের ক্ষেত্রে এই পরিকল্পিত ব্যাটিং ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা।

প্রথম অর্ধশতরান তার পরবর্তী ম্যাচগুলির আগে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে। তবে সেই আত্মবিশ্বাস যাতে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে পরিণত না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। বৈভবের বর্তমান বক্তব্য থেকে অবশ্য মনে হচ্ছে, সে নিজের সাফল্যের গুরুত্ব বুঝলেও সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতন।

সচিনের কিশোর বয়সের ইতিহাস

ভারতীয় ক্রিকেটে কিশোর প্রতিভার কথা উঠলেই প্রথমে মনে আসে সচিন তেন্ডুলকরের নাম। মাত্র ১৬ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল তাঁর। প্রতিপক্ষ ছিল শক্তিশালী পাকিস্তান। সেই সময় পাকিস্তানের বোলিং বিভাগে ছিলেন বিশ্বের অন্যতম ভয়ঙ্কর দ্রুতগতির বোলাররা।

কিশোর সচিনকে সামলাতে হয়েছিল প্রবল গতি, বাউন্স এবং স্লেজিং। তবুও তিনি পিছিয়ে যাননি। ১৬ বছর ২১৩ দিন বয়সে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টেস্টে অর্ধশতরান করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কনিষ্ঠতম অর্ধশতরানকারী হিসাবে রেকর্ড গড়েছিলেন সচিন।

সেই ইনিংস শুধু একটি অর্ধশতরান ছিল না। ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল সেই সময়। পরবর্তী দুই দশকেরও বেশি সময় সচিন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে রান করেছেন এবং অসংখ্য রেকর্ড তৈরি করেছেন। ফলে তাঁর কিশোর বয়সের রেকর্ডটি ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আবেগের বিষয়।

 

 

 

 

Preview image