সমাজের চোখে সুন্দর হয়ে ওঠা বোধহয় সবচেয়ে কঠিন কাজ। এক দিকে যেমন বিদ্যা বালনকে ‘মোটা’ বলে অপমান, অন্য দিকে ‘রোগা’ হওয়ার দোষে দোষী বনিতা সন্ধু। ইংল্যান্ড থেকে ভারতে এসে বসবাসের পর এমন অভিজ্ঞতার শিকার হতে হয় মডেল-অভিনেত্রীকে। তাই খুব কম বয়স থেকেই শরীরচর্চায় নিষ্ঠাবান হন বনিতা। কোন ধরনের ব্যায়াম তাঁর বেশি পছন্দ? সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জানালেন নায়িকা।
কম বয়সে সারা দিন কার্ডিয়ো করা থেকে শুরু করে ৫ হাজার পা হাঁটা, দৌড়োনো, স্টেপ মেশিনের ব্যবহার করে ব্যায়াম, সব কিছু করতেন বনিতা। কিন্তু সমস্যা হল, শরীরচর্চা সম্পর্কে জ্ঞান কম ছিল তখন। যা মনে হত, তা-ই করতেন তিনি। শরীরের জন্য কী ভাল, তা অতশত জানতেন না। কিন্তু তাঁর বাবা বহু বছর ধরেই বনিতাকে বলতেন, শক্তিবৃদ্ধির ব্যায়াম করা প্রয়োজন। যৌবনে বাবার কথায় পাত্তা দেননি বনিতা। তখন তাঁর বয়স কম, ২০ বছরের শুরুর দিক পর্যন্ত চুটিয়ে কার্ডিয়ো করেছেন।
বয়স ৩০-এর কাছাকাছি আসার পর বাবার কথা শুনছেন বনিতা। এখন তিনি ভারোত্তোলন, শক্তিবৃদ্ধির ব্যায়াম করেন। অভিনেত্রীর কথায়, ‘‘এখন সকাল সকাল শক্তিবৃদ্ধির অনুশীলন করতে ভাল লাগে আমার। তবে অবশ্যই সঙ্গে প্রশিক্ষককে থাকতেই হয়। কারণ এই ব্যায়ামের ধরন সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই আমার। ওজন কী ভাবে তুলতে হয়, তা-ই জানি না।’’ তবে যোগাসনের প্রতি বড়ই নিষ্ঠাবান বনিতা। সপ্তাহে চার দিন শক্তিবৃদ্ধির অনুশীলন করলে দু’দিন যোগাসন করতেই হয় তাঁকে।হাঁটা, দৌড়োনো ইত্যাদির থেকে দূরে সরে আসার আরও একটি বড় কারণ হল, দেশবদল। ইংল্যান্ডের এককালীন বাসিন্দা বনিতা সে দেশের রাস্তায় দৌড়োতে, হাঁটতে ভালবাসতেন। কিন্তু এ দেশের রাস্তা দৌড়োনোর জন্য ততটা উপযুক্ত নয় বলে সে অভ্যাস খানিক কমে এসেছে। তাই রাস্তার থেকে জিমেই বেশি সময় কাটে তাঁর। তবে হাঁটতে বা দৌড়োতে ইচ্ছে হলে মুম্বইয়ে বাড়ির কাছে পার্কে গিয়ে সে শখ মিটিয়ে আসেন। তাও বন্ধু বা ম্যানেজারকে সঙ্গে নিয়ে যেতেই হয়।
ই দু’টি অভ্যাস শুধুই শরীরচর্চার অঙ্গ নয়, অনেকের কাছেই তা এক ধরনের জীবনদর্শন। সকালে নিরিবিলি রাস্তায় হালকা দৌড়, কিংবা সন্ধ্যায় হাঁটতে হাঁটতে শহরের শব্দ শোনা—এই ছোট ছোট অভ্যাসের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সুস্থ শরীর ও শান্ত মনের চাবিকাঠি। কিন্তু এই অভ্যাস যে কতটা পরিবেশনির্ভর, দেশবদলের সঙ্গে সঙ্গে তা কতটা বদলে যেতে পারে—তার বাস্তব উদাহরণ বনিতা।
ইংল্যান্ডে থাকাকালীন বনিতার জীবনের সঙ্গে হাঁটা আর দৌড়নো যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে ছিল। লন্ডনের কিংবা অন্য শহরের প্রশস্ত ফুটপাথ, নির্দিষ্ট জগিং ট্র্যাক, ট্রাফিক শৃঙ্খলা এবং সবচেয়ে বড় কথা—নিরাপত্তাবোধ—সব মিলিয়ে বাইরে বেরিয়ে হাঁটা বা দৌড়নো ছিল একেবারেই স্বাভাবিক ব্যাপার। ভোরে বা সন্ধ্যায় একা বেরোনো নিয়ে বিশেষ চিন্তা করতে হত না। পথচারী এবং দৌড়বিদদের জন্য আলাদা জায়গা থাকায় গাড়ির ভিড় বা হঠাৎ দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
কিন্তু ভারত, বিশেষ করে মুম্বইয়ের মতো ব্যস্ত মহানগরে এসে সেই অভ্যাস ধরে রাখা সহজ হয়নি। এখানকার রাস্তাঘাট মূলত যানবাহনকেন্দ্রিক। ফুটপাথ থাকলেও অনেক জায়গায় তা দখল হয়ে যায় হকার, দোকান বা পার্ক করা গাড়িতে। কোথাও আবার ফুটপাথের অবস্থা এতটাই খারাপ যে সেখানে হাঁটাই বিপজ্জনক। ফলে দৌড়নো তো দূরের কথা, স্বাভাবিক হাঁটাও অনেক সময় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তার প্রশ্ন। ইংল্যান্ডে যেখানে একা দৌড়তে বেরোনো নিয়ে খুব একটা ভাবতে হত না, সেখানে মুম্বইয়ে সেই বিলাসিতা নেই। বিশেষ করে একজন পরিচিত মুখ হলে তো আরও বেশি সতর্ক থাকতে হয়। রাস্তায় অপ্রয়োজনীয় দৃষ্টি, ছবি তোলার চেষ্টা কিংবা ভিড়ের মধ্যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্ভাবনা থেকেই যায়। তাই হাঁটা বা দৌড়নোর ইচ্ছা থাকলেও বনিতাকে প্রায়ই বন্ধু বা ম্যানেজারের সঙ্গে যেতে হয়। একা বেরোনোর স্বাধীনতা অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে।
এই সব কারণ মিলিয়েই ধীরে ধীরে রাস্তায় হাঁটা বা দৌড়নোর অভ্যাস কমে এসেছে তাঁর। তার বদলে জিম হয়ে উঠেছে শরীরচর্চার প্রধান ঠিকানা। জিমের মধ্যে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, নির্দিষ্ট সময়, প্রশিক্ষকের উপস্থিতি এবং সবচেয়ে বড় কথা—নিরাপত্তা—এই সবই তাঁকে তুলনামূলকভাবে স্বস্তি দেয়। সেখানে ট্রেডমিলে দৌড়নো যায়, ওয়েট ট্রেনিং করা যায়, যোগা বা স্ট্রেচিংয়ের মতো বিকল্পও থাকে। বাইরে রাস্তায় দৌড়নোর মতো প্রাকৃতিক অনুভূতি না পেলেও অন্তত শরীরচর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায়।
তবে এর মানে এই নয় যে বনিতা পুরোপুরি বাইরে হাঁটা বা দৌড়নো ছেড়ে দিয়েছেন। সুযোগ পেলে তিনি এখনও পার্ককেই বেছে নেন। মুম্বইয়ে তাঁর বাড়ির কাছাকাছি যে পার্কটি আছে, সেটিই এখন তাঁর কাছে রাস্তায় হাঁটার বিকল্প। নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে দৌড়বিদ, প্রবীণ মানুষ, যোগা করতে আসা দল—সব মিলিয়ে এক ধরনের পরিচিত পরিবেশ তৈরি হয়। খোলা আকাশ, সবুজের ছোঁয়া আর তুলনামূলক নিরাপদ পরিসর—এই তিনের সমন্বয়েই সেখানে হাঁটা বা হালকা দৌড়নো সম্ভব হয়।
তবুও পার্কে যাওয়ার ক্ষেত্রেও পুরো স্বাধীনতা নেই। বেশির ভাগ সময়েই কাউকে সঙ্গে নিতে হয়—বন্ধু হোক বা ম্যানেজার। এর একটা দিক নিরাপত্তা, আরেকটা দিক সামাজিক বাস্তবতা। পরিচিত মুখ হলে অনেকেই কথা বলতে চান, ছবি তুলতে চান। একা থাকলে সেগুলি সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। সঙ্গে কেউ থাকলে পরিস্থিতি কিছুটা সহজ হয়।
এই অভিজ্ঞতা আসলে শুধু বনিতার একার নয়। বহু মানুষই বিদেশ থেকে ভারতে ফিরে এসে একই সমস্যার মুখোমুখি হন। ইউরোপ বা ইংল্যান্ডের মতো দেশে যেখানে ‘ওয়াকিং কালচার’ বা ‘রানিং কালচার’ খুব স্বাভাবিক, সেখানে ভারতীয় শহরগুলো এখনও সেই মানসিকতা ও পরিকাঠামো পুরোপুরি তৈরি করতে পারেনি। এখানে শরীরচর্চা বলতে অনেকের কাছেই এখনও জিমে যাওয়া বা বাড়ির মধ্যে যোগা করা—এই দু’টিতেই সীমাবদ্ধ।
এর পেছনে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও কাজ করে। রাস্তায় দৌড়নো বা দ্রুত হাঁটাকে অনেক সময় অদ্ভুত চোখে দেখা হয়। বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রশ্ন, মন্তব্য বা কৌতূহল আরও বেশি। ফলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাইরে বেরিয়ে শরীরচর্চা করার ইচ্ছা অনেকেরই দমে যায়। বনিতার মতো যাঁরা বিদেশে থেকে এই অভ্যাসে অভ্যস্ত ছিলেন, তাঁদের কাছে এই পরিবর্তনটা আরও তীব্রভাবে ধরা পড়ে।
মানসিক দিক থেকেও এর প্রভাব পড়ে। বাইরে খোলা জায়গায় হাঁটা বা দৌড়নো শুধু শরীর নয়, মনকেও মুক্ত করে। চারপাশের দৃশ্য, বাতাস, আলো—সব মিলিয়ে এক ধরনের থেরাপির মতো কাজ করে। জিমে সেই অনুভূতি পুরোপুরি পাওয়া যায় না। বনিতাও তা অনুভব করেন। তাই সুযোগ পেলেই তিনি পার্কে যাওয়ার চেষ্টা করেন, অন্তত সপ্তাহে কয়েক দিন হলেও।
এই অভ্যাসের বদল আসলে আধুনিক শহুরে জীবনের বড় এক সমস্যার দিকেই আঙুল তোলে। আমরা কি এমন শহর তৈরি করছি, যেখানে মানুষ স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে বা দৌড়তে পারবে? নাকি ক্রমশ গাড়ি, কংক্রিট আর ভিড়ের মধ্যে সেই সুযোগ আরও কমে যাবে? বনিতার অভিজ্ঞতা সেই প্রশ্নটাকেই সামনে নিয়ে আসে।
দেশবদলের সঙ্গে সঙ্গে যে শুধু কাজের ধরন বা সামাজিক বৃত্ত বদলায় তা নয়, বদলে যায় শরীরের সঙ্গে সম্পর্কও। ইংল্যান্ডে যেখানে রাস্তাই ছিল জিমের মতো, ভারতে এসে জিমই হয়ে উঠেছে রাস্তার বিকল্প। এই বদল মানিয়ে নেওয়ার মধ্যেই বনিতা নিজের ফিটনেস রুটিনকে নতুন করে সাজিয়েছেন। কিছুটা আপস, কিছুটা মানিয়ে নেওয়া—এই দুইয়ের সমন্বয়েই এখন তাঁর জীবনযাপন।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, হাঁটা বা দৌড়নোর অভ্যাস কমে যাওয়ার পেছনে অলসতা নয়, বরং বাস্তব পরিস্থিতিই বড় কারণ। দেশ, শহর ও পরিবেশ বদলালে অভ্যাসও বদলায়। বনিতার গল্প সেই পরিবর্তনেরই এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি—যেখানে সুস্থ থাকার ইচ্ছা আছে, কিন্তু তার পথ খুঁজে নিতে হয় নতুন বাস্তবতার মধ্যেই।
এই বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াটাই বনিতার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ইংল্যান্ডে যেখানে শরীরচর্চা ছিল দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ, ভারতে এসে তা পরিকল্পনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখন বেরোবেন, কোথায় যাবেন, কার সঙ্গে যাবেন—সব কিছু ভেবে নিতে হয়। এই অতিরিক্ত ভাবনাই অনেক সময় স্বতঃস্ফূর্ততাকে মেরে ফেলে। তবু তিনি চেষ্টা করেন, কারণ নিজের শরীর ও মানসিক সুস্থতাকে তিনি কখনওই অবহেলা করতে চান না।
বনিতা মনে করেন, শহরের পরিকল্পনায় যদি আরও হাঁটাবান্ধব রাস্তা, আলাদা সাইকেল ও জগিং ট্র্যাক তৈরি হয়, তাহলে শুধু তাঁর মতো তারকাই নয়, সাধারণ মানুষও বাইরে শরীরচর্চায় উৎসাহ পাবে। এতে স্বাস্থ্য যেমন ভালো থাকবে, তেমনই মানসিক চাপও কমবে। তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছেন, শরীরচর্চা আসলে কোনও নির্দিষ্ট জায়গার উপর নির্ভর করে না, বরং মানসিক প্রস্তুতির উপর নির্ভর করে। পরিবেশ যতই প্রতিকূল হোক, বিকল্প খুঁজে নেওয়াটাই আসল। তাই জিম, পার্ক বা ঘরের মধ্যেই হোক—নিজেকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন, আর সেটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।