ফ্যাটি লিভার, বারবার জন্ডিস এবং অনিয়ন্ত্রিত ওজন বৃদ্ধির সমস্যায় দীর্ঘদিন ভুগেছিলেন সুনয়না রোশন। শারীরিক জটিলতা ক্রমশ বাড়তে থাকায় তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে, যার প্রভাব পড়ে দৈনন্দিন জীবন ও মানসিক অবস্থার উপরও।
সারা রাত মন্দিরের বাইরে কাটিয়েছিলেন হৃতিক! ক্র্যাশ ডায়েটের ভয়াবহ পরিণতিতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পৌঁছে গিয়েছিলেন সুনয়না রোশন
বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা Hrithik Roshan-এর দিদি Sunaina Roshan আজ অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার নাম। নিজের শারীরিক ও মানসিক লড়াইয়ের গল্প তিনি একাধিকবার প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন। বর্তমানে তিনি অনেকটাই সুস্থ, ওজনও নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। কিন্তু তাঁর জীবনের এমন একটি অধ্যায় রয়েছে, যা শুনলে শিউরে উঠতে হয়। একসময় অতিরিক্ত ওজন কমানোর নেশায় এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সুনয়না, যার ফলে তাঁকে জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
শুধু তাই নয়, পরিস্থিতি এতটাই সংকটজনক হয়ে উঠেছিল যে চিকিৎসকেরা তাঁর পরিবারের সদস্যদের জানিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যেতে পারেন, হারাতে পারেন দৃষ্টিশক্তি, এমনকি কোমাতেও চলে যেতে পারেন। সেই কঠিন সময়ে বোনের সুস্থতার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে সারা রাত মন্দিরের বাইরে কাটিয়েছিলেন হৃতিক রোশন।
স্থূলতা থেকেই শুরু একের পর এক শারীরিক সমস্যা
সুনয়না রোশন দীর্ঘদিন ধরেই স্থূলতার সমস্যায় ভুগছিলেন। ওজন নিয়ন্ত্রণে না থাকায় শরীরে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে শুরু করে। অতিরিক্ত ওজনের কারণে তিনি ফ্যাটি লিভারের সমস্যায় আক্রান্ত হন। পাশাপাশি বারবার জন্ডিসও ফিরে আসত। শারীরিক অসুস্থতা তাঁর জীবনযাত্রাকে ক্রমশ কঠিন করে তুলছিল।
ওজন কমানোর জন্য তিনি নানা ধরনের চেষ্টা করলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছিলেন না। সেই হতাশা থেকেই দ্রুত ওজন কমানোর একটি বিপজ্জনক পথ বেছে নেন তিনি। আর সেই সিদ্ধান্তই তাঁর জীবনের অন্যতম বড় ভুল হয়ে দাঁড়ায়।
দ্রুত রোগা হওয়ার নেশায় শুরু ‘ক্র্যাশ ডায়েট’
অনেকেই অল্প সময়ে ওজন কমানোর জন্য কঠোর ডায়েটের আশ্রয় নেন। সুনয়নাও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি তথাকথিত ‘ক্র্যাশ ডায়েট’ শুরু করেন। দিনের পর দিন প্রায় না খেয়েই কাটাতেন। তাঁর খাদ্যতালিকায় ছিল মূলত কুকিজ, ফলের রস এবং জল।
শরীরের প্রয়োজনীয় প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ভিটামিন, খনিজ ও ক্যালোরি থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে থাকেন তিনি। প্রথমদিকে হয়তো ওজন কিছুটা কমেছিল, কিন্তু ভিতরে ভিতরে শরীর ভেঙে পড়ছিল দ্রুত।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, দীর্ঘদিন ধরে এমন একপেশে ও অপর্যাপ্ত খাদ্যাভ্যাস শরীরে মারাত্মক পুষ্টিহীনতা তৈরি করতে পারে। এর ফলে স্নায়ুতন্ত্র, পেশি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সুনয়নার ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হয়েছিল।
কয়েক দিন ছিল না কোনও জ্ঞান
নিজের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে সুনয়না একবার জানিয়েছিলেন, পরপর কয়েক দিন তাঁর কোনও জ্ঞান ছিল না। পরিস্থিতি এতটাই সংকটজনক হয়েছিল যে চিকিৎসকেরা পরিবারের সদস্যদের সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণতির কথা আগাম জানিয়ে দেন।
সুনয়নাকে উদ্ধৃত করে জানা যায়, চিকিৎসকেরা বলেছিলেন যে তাঁর ক্ষেত্রে পক্ষাঘাত, দৃষ্টিশক্তি হারানো কিংবা কোমায় চলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। এমনকি এরপর কী হবে, তা নিয়েও তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন না।
এই সময়টা ছিল রোশন পরিবারের জন্য চরম উদ্বেগের। পরিবারের সদস্যরা কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। চিকিৎসার পাশাপাশি চলছিল নিরন্তর প্রার্থনা।
বোনের জন্য মন্দিরের বাইরে রাত কাটিয়েছিলেন হৃতিক
সুনয়নার কথাতেই জানা যায়, তাঁর শারীরিক অবস্থা যখন সবচেয়ে খারাপ, তখন ভাই হৃতিক রোশন তাঁর সুস্থতার জন্য গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন।
তিনি জানান, হৃতিক একটি মন্দিরের বাইরে সারা রাত কাটিয়েছিলেন শুধুমাত্র তাঁর দ্রুত আরোগ্যের জন্য প্রার্থনা করতে। ভাই-বোনের সম্পর্কের এই আবেগঘন অধ্যায় আজও অনেককে স্পর্শ করে।
একজন তারকা অভিনেতা হিসেবে হৃতিককে আমরা পর্দায় দেখি, কিন্তু পরিবারের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ও আবেগের এই দিকটি সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
একটি খাবারের আবদারই বদলে দিয়েছিল সবকিছু
চিকিৎসকেরা সুনয়নার পরিবারকে জানিয়েছিলেন, তাঁর সুস্থতার প্রথম লক্ষণ হবে যখন তিনি নিজে থেকে খাবার চাইবেন।
কয়েক দিন পর ঠিক সেই ঘটনাই ঘটে। সুনয়না খাবার খেতে চান। পরিবারের কাছে সেটাই ছিল আশার আলো।
সুনয়নার কথায়, সেই একটি মুহূর্ত তাঁদের পরিবারের জন্য সবকিছু বদলে দিয়েছিল। কারণ, তখনই প্রথমবার চিকিৎসকেরা বুঝতে পারেন যে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থতার পথে ফিরছেন।
পরিবারের কাছে সেটি ছিল নতুন জীবনের সূচনা।
সুস্থ হওয়ার আগেই নতুন বিপদ, ধরা পড়ে যক্ষ্মা
তবে এই লড়াই এখানেই শেষ হয়নি। ক্র্যাশ ডায়েটের কারণে শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে তাঁর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কার্যত ভেঙে যায়।
এর কিছুদিন পরই তাঁর শরীরে ধরা পড়ে যক্ষ্মা বা টিউবারকিউলোসিস (টিবি)। নতুন করে শুরু হয় আরেক যুদ্ধ।
সুনয়না জানিয়েছেন, যক্ষ্মা ধরা পড়ার পরে তাঁকে প্রায় এক মাস হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়েছিল। এরপর রোগটি যাতে পুনরায় ফিরে না আসে, তার জন্য আরও প্রায় চার মাস বাড়িতে একপ্রকার বন্দি জীবন কাটাতে হয়।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী দীর্ঘ সময় ধরে ওষুধ খেতে হয়েছে তাঁকে। শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও মানসিক শক্তি হারাননি তিনি।
রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নেমে গিয়েছিল তলানিতে
যক্ষ্মার সঙ্গে লড়াইয়ের সময় চিকিৎসকেরা বুঝতে পারেন যে সুনয়নার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত কমে গিয়েছে। পুষ্টিহীনতা, শারীরিক দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের অসুস্থতা তাঁর শরীরকে ভেতর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অত্যন্ত কম ক্যালোরিযুক্ত ডায়েট দীর্ঘমেয়াদে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে। ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সুনয়নার অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনে দেয়। দ্রুত ওজন কমানোর প্রবল ইচ্ছা শেষ পর্যন্ত তাঁকে এমন এক অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছিল, যেখানে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দই হারিয়ে গিয়েছিল।
জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা
এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা থেকে সুনয়না একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছেন। তাঁর কথায়, জীবনের কোনও লক্ষ্য অর্জনের জন্যই নিজের শরীরকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়।
ওজন কমানো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু তা হতে হবে সঠিক পদ্ধতিতে, চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী। শর্টকাট পদ্ধতি কখনও কখনও সাময়িক ফল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতে পারে।
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি মানুষকে সতর্ক করেছেন।
মেয়ের সংগ্রাম আজও ভুলতে পারেননি রাকেশ রোশন
এই পুরো ঘটনাটি আজও গভীরভাবে মনে রেখেছেন সুনয়নার বাবা Rakesh Roshan। মেয়ের সেই কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি জানিয়েছেন, সুনয়নার এই অভিজ্ঞতা বহু মানুষকে শক্তি ও সাহস জোগাতে পারে।
একজন বাবা হিসেবে মেয়েকে এমন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে দেখা তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল। তবু পরিবারের সবাই মিলে তাঁকে সুস্থ করে তুলতে যে সংগ্রাম করেছিলেন, তা আজও তাঁদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
আবেগঘন বার্তা মায়ের
সুনয়নার মা Pinkie Roshan-ও মেয়ের সেই সময়ের কথা স্মরণ করে আবেগঘন বার্তা দিয়েছিলেন।
তিনি লিখেছিলেন যে ২৫ বছর পর সেই ঘটনার কথা আবার মনে পড়ায় তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন। তাঁর মনে রয়েছে, কীভাবে সুনয়না মানসিক ও শারীরিক দৃঢ়তা দিয়ে সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।
একজন মায়ের কাছে সন্তানের এমন প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়।
মদ্যপানের নেশাও একসময় গ্রাস করেছিল
শুধু শারীরিক অসুস্থতা নয়, জীবনের আরেকটি কঠিন অধ্যায়ের কথাও অকপটে স্বীকার করেছেন সুনয়না। একসময় তিনি মদ্যপানের নেশায় জড়িয়ে পড়েছিলেন।
তাঁর কথায়, একটি বোতল দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে সেই পরিমাণ বেড়ে ছয় বোতল পর্যন্ত পৌঁছে যেত। কখন সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে যেত, তা টেরই পেতেন না।
মদ্যপানের এই অভ্যাস তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেই অন্ধকার অধ্যায় থেকেও বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন।
নতুন জীবনের পথে সুনয়না
আজকের সুনয়না রোশন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। তিনি নিজের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনেছেন, স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন।
তাঁর গল্প শুধুমাত্র একজন তারকা পরিবারের সদস্যের সংগ্রামের কাহিনি নয়; এটি এমন এক নারীর গল্প, যিনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে নতুন করে বাঁচতে শিখেছেন।
ফ্যাটি লিভার, জন্ডিস, পুষ্টিহীনতা, কোমার আশঙ্কা, যক্ষ্মা, মদ্যপানের নেশা—একাধিক বাধা পেরিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে ইচ্ছাশক্তি, পরিবারের সমর্থন এবং সঠিক চিকিৎসা থাকলে জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াইটাও জেতা সম্ভব।
সুনয়নার এই অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শরীরের যত্ন নেওয়া কোনও বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন। দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় কখনও এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যা দীর্ঘমেয়াদে জীবনকেই বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে। তাঁর জীবনের গল্প তাই সতর্কবার্তা যেমন, তেমনই ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ।