Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সন্তান হওয়ার পরে ওজন বেড়েছে পত্রলেখার নায়িকার চেহারার গড়ন নিয়ে বিতর্ক কী বলছে টলিপাড়া

সদ্য মা হয়েছেন পত্রলেখা। চেহারার গড়নও বদলেছে। তাই নিয়েই নানা নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে হয়েছে, যা শুনে নিজের বিরক্তি উগরে দিয়েছেন পত্রলেখা। এই প্রেক্ষিতে কী মত টলিপাড়ার শিল্পীদের?

মাতৃত্ব— একদিকে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতাগুলির একটি, অন্যদিকে সমাজের চোখে যেন এক অদ্ভুত বিচার ব্যবস্থার সূচনা। বিশেষ করে বিনোদন জগতের নারীদের ক্ষেত্রে এই বিচার আরও কঠোর, আরও নির্মম। সদ্য মা হওয়া অভিনেত্রীদের শরীর, চেহারা, ওজন— সবকিছু যেন হয়ে ওঠে আলোচনার বিষয়। এই প্রবণতা নতুন নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। তবে সমাজমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও বেশি দৃশ্যমান এবং তীব্র হয়ে উঠেছে।

বলিপাড়ায় ঐশ্বর্যা রাই বচ্চন থেকে শুরু করে পত্রলেখা— মাতৃত্বের পর তাঁদের শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে একাধিকবার কটাক্ষের শিকার হতে হয়েছে। অথচ এই পরিবর্তন একেবারেই স্বাভাবিক। সন্তান জন্মের পর শরীরের গঠন বদলানো প্রকৃতিরই নিয়ম। কিন্তু সেই স্বাভাবিক পরিবর্তনই যেন অনেকের কাছে হয়ে ওঠে সমালোচনার কারণ।

সদ্য মা হয়েছেন পত্রলেখা। মাতৃত্বের আনন্দের পাশাপাশি তাঁকে শুনতে হয়েছে নানা নেতিবাচক মন্তব্য। শরীরের গড়নে পরিবর্তন আসায় সমাজমাধ্যমে তাঁকে কটাক্ষ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, একজন নারীর শরীর নিয়ে মন্তব্য করার আগে মানুষের একটু সংবেদনশীল হওয়া উচিত। মাতৃত্ব কোনও প্রতিযোগিতা নয়, যেখানে ‘আগের মতো দেখতে হওয়া’টাই একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে।

এই একই বাস্তবতা টলিউডেও কম নয়। অভিনেত্রী পায়েল দে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, সমাজমাধ্যমই এই ধরনের মানসিকতার জন্ম দিচ্ছে। তাঁর কথায়, “আমার শরীর, আমার সিদ্ধান্ত। সন্তানের জন্য আমি কী করব, কীভাবে নিজেকে গড়ে তুলব, সেটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত।” অন্তঃসত্ত্বাকালীন সময়ে প্রায় ২০ কেজি ওজন বেড়েছিল তাঁর, যা তিনি একেবারেই স্বাভাবিক বলে মনে করেন। বরং তিনি মনে করেন, এই পরিবর্তনই মাতৃত্বের একটি বাস্তব চিহ্ন।

পায়েলের বক্তব্যে স্পষ্ট— তিনি কোনওভাবেই এই ধরনের নেতিবাচক মন্তব্যকে গুরুত্ব দেন না। তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের পরিবর্তন আসবেই। সেটা নিয়ে লজ্জা পাওয়ার বা চাপ নেওয়ার কোনও কারণ নেই। বরং এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করাই উচিত।

অভিনেতা সুদীপ মুখোপাধ্যায় এই বিষয়ে আরও কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি মনে করেন, যারা এই ধরনের ট্রোলিং করেন, তারা আসলে নিজেদের হতাশা থেকেই এমন আচরণ করেন। তাঁর কথায়, “যারা ট্রোল করে, তারা নিজেদের খুব বুদ্ধিমান ভাবেন, অথচ একটা বাক্য ঠিক করে লিখতে পারেন না।” তিনি আরও বলেন, এই ধরনের মানুষদের গুরুত্ব দেওয়া মানে নিজের মানসিক শান্তি নষ্ট করা। কারণ তাঁদের মন্তব্যের কোনও মূল্যই নেই।

সুদীপের বক্তব্যে সমাজের একটি বড় অংশের মানসিকতা ফুটে ওঠে— যেখানে মানুষ নিজের জীবনের অসন্তোষ অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়। বিশেষ করে নারী তারকা হলে সেই আক্রমণ আরও বেশি হয়। কারণ তাঁদের জীবন সবসময়ই জনসমক্ষে থাকে।

অন্যদিকে, অভিনেত্রী রূপসা চট্টোপাধ্যায়-ও একই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। সন্তান জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই কাজে ফিরেছেন তিনি। বর্তমানে ধারাবাহিক ‘পরিণীতা’-তে অভিনয় করছেন। রূপসা বলেন, “এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার কোনও মানেই হয় না।” তাঁর মতে, প্রত্যেক মানুষের শরীর আলাদা, প্রত্যেকের জীবনের পরিস্থিতিও আলাদা। তাই এক মাপকাঠিতে সবাইকে বিচার করা একেবারেই ভুল।

রূপসা আরও বলেন, তাঁর বিয়ে এবং মাতৃত্ব— সবকিছুই এমন সময়ে হয়েছে, যখন এই ধরনের মন্তব্য নিয়ে ভাবার সুযোগই ছিল না। কাজ এবং পরিবার— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন, এখনও যদি কেউ ওজন বা চেহারা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেন, তা পড়লে খারাপ লাগে। কারণ এতে বোঝা যায়, সমাজ এখনও সেই জায়গা থেকে খুব একটা এগোতে পারেনি।

এই ঘটনাগুলি আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে— কেন একজন নারীর শরীর নিয়ে এত আলোচনা? কেন মাতৃত্বের পর তাঁর পরিবর্তনকে স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করা হয় না?

এর উত্তর খুঁজতে গেলে সমাজের গভীরে যেতে হয়। বহু বছর ধরে নারীর সৌন্দর্যকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে দেখা হয়েছে— যেখানে ‘স্লিম’, ‘ফিট’, ‘পারফেক্ট’ হওয়াটাই যেন একমাত্র মানদণ্ড। এই মানদণ্ড থেকে সামান্য বিচ্যুতি হলেই শুরু হয় সমালোচনা। আর সোশ্যাল মিডিয়া সেই সমালোচনাকে আরও সহজ করে দিয়েছে।

একটি মন্তব্য, একটি পোস্ট— মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে হাজার হাজার মানুষের মধ্যে। ফলে একজন মানুষের ব্যক্তিগত পরিবর্তন হয়ে ওঠে জনসমক্ষে আলোচনার বিষয়। আর এই আলোচনার অনেকটাই হয় নেতিবাচক।

কিন্তু প্রশ্ন হল, এই মানসিকতা কি বদলানো সম্ভব?

উত্তর— অবশ্যই সম্ভব, তবে তার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা। প্রথমত, আমাদের বুঝতে হবে যে মাতৃত্বের পর শরীরের পরিবর্তন একেবারেই স্বাভাবিক। এটি কোনও ব্যর্থতা নয়, বরং একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। দ্বিতীয়ত, অন্যের শরীর নিয়ে মন্তব্য করার আগে আমাদের ভাবা উচিত— সেই মন্তব্যটি কতটা প্রয়োজনীয়, কতটা মানবিক।

news image
আরও খবর

এছাড়াও, তারকাদের ক্ষেত্রেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো দরকার। তাঁরা পর্দায় যতটা নিখুঁত দেখান, বাস্তব জীবনে তাঁরা ততটাই সাধারণ মানুষ। তাঁদেরও শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন হয়, তাঁদেরও বিশ্রাম দরকার, তাঁদেরও সময় লাগে নিজেকে নতুন ভাবে গড়ে তুলতে।

এই প্রসঙ্গে পায়েল, সুদীপ এবং রূপসার মতো শিল্পীদের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁরা শুধু নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন না, বরং সমাজকে একটি বার্তাও দিচ্ছেন— নিজের শরীরকে ভালোবাসুন, অন্যের শরীরকে সম্মান করুন।

সবশেষে বলা যায়, মাতৃত্ব কোনও ‘রূপের প্রতিযোগিতা’ নয়। এটি একটি গভীর, ব্যক্তিগত এবং আবেগপূর্ণ অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতাকে সম্মান জানানোই আমাদের দায়িত্ব। একজন মা কেমন দেখাচ্ছেন, সেটি নয়— তিনি কেমন মানুষ, কেমন ভাবে তাঁর সন্তানকে বড় করে তুলছেন— সেটিই হওয়া উচিত আলোচনার বিষয়।

সমাজ যদি সত্যিই এগোতে চায়, তবে এই মানসিকতার পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। কারণ, একজন নারীর শরীর নয়— তাঁর ব্যক্তিত্ব, তাঁর অনুভূতি, তাঁর অভিজ্ঞতাই তাঁর প্রকৃত পরিচয়।

সব মিলিয়ে এই ঘটনাগুলি আমাদের সমাজের এক গভীর মানসিকতার প্রতিফলন তুলে ধরে— যেখানে একজন নারীর সাফল্য, প্রতিভা বা ব্যক্তিত্বের চেয়ে তাঁর শরীর ও চেহারাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। মাতৃত্বের মতো একটি সংবেদনশীল, শারীরিক ও মানসিকভাবে পরিবর্তনশীল সময়েও যখন একজন নারীকে এই ধরনের মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে— আমরা আদৌ কতটা এগিয়েছি?

পত্রলেখা, পায়েল দে, সুদীপ মুখোপাধ্যায় এবং রূপসা চট্টোপাধ্যায়— প্রত্যেকেই তাঁদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে একটি সাধারণ সত্য সামনে এনেছেন: সমাজমাধ্যমের অযাচিত মন্তব্য আমাদের চিন্তাভাবনার সীমাবদ্ধতাকেই প্রকাশ করে। এই মন্তব্যগুলি শুধু একজন অভিনেত্রী বা জনমানুষের উপরেই প্রভাব ফেলে না, বরং প্রতিটি সাধারণ মায়ের মনেও অনিশ্চয়তা ও চাপ তৈরি করতে পারে।

মাতৃত্বের পর শরীরের পরিবর্তন কোনও ব্যতিক্রম নয়, বরং স্বাভাবিক একটি জৈবিক প্রক্রিয়া। তবুও, ‘আগের মতো হয়ে ওঠা’কে একটি অদৃশ্য লক্ষ্য হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। এই ধারণা শুধু অবাস্তব নয়, বরং ক্ষতিকারকও। কারণ, এতে করে নারীরা নিজেদের উপর অযথা চাপ সৃষ্টি করেন, যা তাঁদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এই প্রসঙ্গে আমাদের ভাবতে হবে— আমরা কি সত্যিই একজন মাকে তাঁর মাতৃত্বের জন্য সম্মান জানাই, নাকি তাঁর বাহ্যিক রূপের ভিত্তিতেই বিচার করি? যদি উত্তর দ্বিতীয়টি হয়, তবে আমাদের সমাজ এখনও অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।

একজন নারীর শরীর তাঁর নিজের। মাতৃত্বের পরে তিনি কীভাবে নিজেকে গড়ে তুলবেন, কতটা সময় নেবেন, আদৌ কোনও পরিবর্তন আনবেন কি না— এই সমস্ত সিদ্ধান্ত একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত। এই জায়গায় বাইরের কোনও মন্তব্য বা ‘পরামর্শ’ আসলে অপ্রয়োজনীয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই আঘাতজনক।

সামাজিক মাধ্যম আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে এসেছে দায়িত্বও। কোনও কিছু মন্তব্য করার আগে যদি আমরা একবার ভাবি— সেটি অন্যের মনে কী প্রভাব ফেলতে পারে— তবে অনেক অপ্রয়োজনীয় নেতিবাচকতা এড়ানো সম্ভব।

অন্যদিকে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে তারকাদের প্রতিক্রিয়া আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। তাঁরা দেখিয়ে দিচ্ছেন, কীভাবে আত্মবিশ্বাস এবং আত্মসম্মান বজায় রেখে এই নেতিবাচকতাকে উপেক্ষা করা যায়। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, সকলের পক্ষে এই উপেক্ষা করা সহজ নয়। তাই সমাজ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব আরও বেশি— এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে কাউকে নিজের শরীর নিয়ে লজ্জা বা অস্বস্তি বোধ করতে না হয়।

আজকের দিনে ‘বডি পজিটিভিটি’ শুধু একটি ট্রেন্ড নয়, বরং একটি প্রয়োজন। এটি আমাদের শেখায়, প্রতিটি শরীরই স্বতন্ত্র এবং সুন্দর। বিশেষ করে মাতৃত্বের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতার পর সেই শরীরকে আরও বেশি সম্মান জানানো উচিত।

সবশেষে বলা যায়, একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় তাঁর চেহারা নয়, তাঁর মানবিকতা, তাঁর শক্তি এবং তাঁর অভিজ্ঞতা। মাতৃত্ব সেই অভিজ্ঞতার একটি অমূল্য অংশ। তাই সেই সময়ে তাঁকে সমালোচনা নয়, সমর্থন দেওয়াই হওয়া উচিত আমাদের একমাত্র কাজ।

যেদিন আমরা এই বিষয়টি সত্যিই উপলব্ধি করতে পারব, সেদিনই সমাজ আরও মানবিক, আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠবে। আর ততদিন পর্যন্ত, এই ধরনের আলোচনাগুলি চলতেই থাকবে— সচেতনতার আলো জ্বালানোর জন্য, পরিবর্তনের পথ দেখানোর জন্য।

Preview image