শীত চলে যাওয়ার সময়েও সক্রিয় হয়ে ওঠে একাধিক ভাইরাস-ব্যাক্টেরিয়া। শীত ও বসন্তের এই সন্ধিক্ষণে ফের নানা অসুখবিসুখ মাথাচাড়া দেয়। মরসুম বদলের এই সময়টাতে তাই সাবধানে থাকা জরুরি। শীত পাততাড়ি গোটাতে শুরু করেছে। মহানগরীতে সকালে হিমেল উত্তুরে হাওয়া নেই। বেলা গড়াতেই বাতাসে গরম ভাব। সন্ধ্যা গড়ানোর পরে একটু যা হিম-হিম ছোঁয়া। সরস্বতী পুজো পেরিয়ে যাওয়ার পর শহরের আবহাওয়ায় পুরোদস্তুর বসন্তের আগমনি। মরমুম বদলের এই সন্ধিক্ষণে মেজাজ ফুরফুরে থাকলেও, শরীর নিয়ে সাবধানতা জরুরি। কারণ শীতের শেষে সক্রিয় হয়ে ওঠে আরও কিছু ভাইরাস-ব্যাক্টেরিয়া, ফলে এই সময়ে নানা অসুখবিসুখ মাথাচাড়া দিতে থাকে। খেয়াল করে দেখবেন,শীত যখনই বিদায় নিতে শুরু করবে সে সময়েই শুকনো কাশি, অ্যালার্জির সমস্যা বেশি করে দেখা দেবে। ঠান্ডা-গরম লেগে জ্বরও হবে। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, এই সময়ে ব্রঙ্কাইটিস, ইনফ্লুয়েঞ্জারও খুব বাড়বাড়ন্ত। তাই সব মিলিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
কী কী অসুখ থেকে সাবধানে থাকতে হবে?
শীতের শেষে ও বসন্তের আগমনের আগে ব্রঙ্কাইটিস ও শুকনো কাশির প্রকোপ খুব বাড়ে। এমনই জানালেন মেডিসিনের চিকিৎসক রণবীর ভৌমিক। এর কারণ নানা ভাইরাস-ব্যাক্টেরিয়া। আবার বাইরের ধুলো-ধোঁয়া থেকেও হতে পারে। শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে যেমন অক্সিজেন শরীরে প্রবেশ করে, তেমনই জীবাণু, বাতাসের নানা ধরনের দূষিত পদার্থও শরীরে ঢুকে পড়ে। এই দূষিত পদার্থগুলি ব্রঙ্কাস বা শ্বাসনালির মিউকাস মেমব্রেনে প্রদাহ তৈরি করে। ফলে যেমন শ্বাস নেওয়ার সময়ে কষ্ট হয়, তেমনই শুকনো কাশি ভোগাতে থাকে। ধূমপান যদি কেউ বেশি করেন, তা হলে তাঁর কাশি বা ব্রঙ্কাইটিসের সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। গলা ব্যথা, গলায় কিছু আটকে থাকার অস্বস্তিকর অনুভূতি হতে থাকবে, রাতে শুলে একটানা কাশি হবে, কাশির সঙ্গে শ্লেষ্মা বার হতে পারে। ব্রঙ্কাইটিসের সঙ্গে যদি ডায়াবিটিস থাকে, তবে রোগীর অবস্থা আরও গুরুতর হতে পারে। কারও যদি ফুসফুসের রোগ থাকে, তার ব্রঙ্কাইটিস হলে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হতে পারে।
অ্যালার্জির প্রকোপও এই সময়ে খুব বাড়ে। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক অরুণাংশু তালুকদার জানাচ্ছেন, চোখ, মুখের ভিতর, শ্বাসনালির ভিতরে অ্যালার্জি হতে পারে। সেই সঙ্গে ত্বকের অ্যালার্জি হতে পারে। হাতে-পায়ে চুলকানি, জ্বালা, র্যাস ও সেই সঙ্গে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। একে বলা হয় অ্যাঞ্জিয়ো ইডিমা। তাপমাত্রার পরিবর্তন হলেই নাগাড়ে হাঁচি, চোখ দিয়ে জল পড়া, চোখের চারপাশে চুলকানি, নাক দিয়ে ক্রমাগত জল পড়ার সমস্যা হতে পারে। একে বলে অ্যালার্জিক রাইনাইটিস।
সুস্থ থাকার উপায়
মাস্ক ব্যবহার করা খুব জরুরি। ছোটরাও যাতে মাস্ক পরে বাইরে যায়, সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে বাবা-মাকে।
ব্রঙ্কাইটিস সারাতে অ্যান্টি-বায়োটিকের তেমন ভূমিকা নেই। যত কম অ্যান্টি-বায়োটিক ব্যবহার করা হয়, তত ভাল।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, ইনহেলার নেওয়া যেতে পারে। গরম জলে ভাপ নেওয়া যেতে পারে। তিন সপ্তাহের বেশি কাশি না সারলে, গলায় ব্যথা থাকলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
বাইরের যে কোনও রকম খাবার, প্রক্রিয়াজাত বা ফ্রোজ়েন খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। ধূমপানে রাশ টানা জরুরি।
ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার, যেমন, টক জাতীয় ফল, আমলকি খাদ্য তালিকায় রাখুন। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। আদা, গোলমরিচ, দারচিনি, লবঙ্গ দিয়ে তৈরি চা অ্যালার্জির সমস্যা কমাতে সাহায্য করতে পারে। রোজ সকালে এক চামচ করে মধু খেলেও অ্যালার্জির সমস্যা নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
বয়স্কেরা ইনফ্লুয়েঞ্জা বা নিউমোনিয়ার টিকা নিয়ে রাখতে পারেন, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে।
শীতের শেষে বসন্তের আগমনের সময়টাকে অনেকেই বছরের সবচেয়ে মনোরম সময় বলে মনে করেন। সকাল-সন্ধের হালকা ঠান্ডা, রোদের উষ্ণতা, গাছে গাছে নতুন পাতা—সব মিলিয়ে প্রকৃতি তখন অন্যরকম সুন্দর। কিন্তু এই সময়টাই শরীরের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, হঠাৎ তাপমাত্রার ওঠানামা, বাতাসে ধুলো-পরাগরেণুর পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এবং ভাইরাস-ব্যাক্টেরিয়ার সক্রিয়তা একাধিক রোগের প্রকোপ বাড়িয়ে তোলে।
চিকিৎসকদের মতে, শীতের শেষে ও বসন্তের শুরুতে বিশেষ করে শ্বাসতন্ত্রের অসুখ, অ্যালার্জিজনিত সমস্যা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। সঠিক সতর্কতা না নিলে সাধারণ কাশি-সর্দি থেকে শুরু করে গুরুতর ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া বা অ্যাজমার মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. রণবীর ভৌমিক জানাচ্ছেন, এই সময়ে ব্রঙ্কাইটিস ও দীর্ঘস্থায়ী শুকনো কাশির প্রকোপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ব্রঙ্কাইটিস মূলত শ্বাসনালির (ব্রঙ্কাস) ভিতরের মিউকাস মেমব্রেনে প্রদাহের ফলে হয়।
নানা ধরনের ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়া
বাতাসে ধুলো, ধোঁয়া ও দূষিত কণা
ঠান্ডা ও গরমের হঠাৎ পরিবর্তন
ধূমপান ও প্যাসিভ স্মোকিং
দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
আমরা শ্বাস নেওয়ার সময় শুধু অক্সিজেনই নয়, বাতাসে থাকা নানা জীবাণু ও ক্ষতিকর কণাও শরীরের ভিতরে টেনে নিই। এই কণাগুলি শ্বাসনালিতে জমে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যার ফলেই শুরু হয় কাশি ও শ্বাসকষ্ট।
একটানা শুকনো কাশি, বিশেষ করে রাতে
শ্বাস নিতে কষ্ট
বুকে ভারী ভাব
গলা ব্যথা বা গলায় কিছু আটকে থাকার অনুভূতি
কাশির সঙ্গে শ্লেষ্মা বেরোনো
জ্বর বা শরীর ব্যথা (কিছু ক্ষেত্রে)
ধূমপায়ীরা
ডায়াবিটিস রোগীরা
বয়স্ক মানুষ
যাঁদের আগে থেকেই ফুসফুসের রোগ আছে
শিশু ও কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি
ডা. ভৌমিক জানাচ্ছেন, ব্রঙ্কাইটিসের সঙ্গে ডায়াবিটিস থাকলে রোগীর অবস্থা অনেক বেশি জটিল হয়ে ওঠে। আবার যাঁদের ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD) বা অ্যাজমা আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে।
এই সময়ে আর একটি বড় সমস্যা হল অ্যালার্জি। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক ডা. অরুণাংশু তালুকদার জানাচ্ছেন, বসন্তের শুরুতে বাতাসে পরাগরেণু, ধুলো ও ছত্রাকের স্পোর বেড়ে যাওয়ায় অ্যালার্জির সমস্যা মারাত্মক আকার নিতে পারে।
১. অ্যালার্জিক রাইনাইটিস
লাগাতার হাঁচি
নাক দিয়ে জল পড়া
নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া
চোখ দিয়ে জল পড়া
চোখের চারপাশে চুলকানি
২. অ্যাঞ্জিও ইডিমা
মুখ, চোখ বা ঠোঁট ফুলে যাওয়া
ত্বকে র্যাশ ও চুলকানি
শ্বাসকষ্ট (গুরুতর ক্ষেত্রে)
৩. ত্বকের অ্যালার্জি
হাতে-পায়ে চুলকানি
জ্বালা
লালচে ফুসকুড়ি
ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
অনেক সময় তাপমাত্রার সামান্য পরিবর্তনেই এই উপসর্গগুলি বেড়ে যায়। অ্যালার্জি দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকলে অ্যাজমার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
শীতের শেষে ভাইরাল ফিভার, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও সিজ়নাল ফ্লুর প্রকোপও দেখা যায়। হালকা জ্বর, গা ব্যথা, মাথা যন্ত্রণা, কাশি ও দুর্বলতা—এই উপসর্গগুলি অনেক সময় ব্রঙ্কাইটিসের সঙ্গে মিলে যায়, ফলে রোগ নির্ণয়ে দেরি হতে পারে।
শরীর হঠাৎ আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সাময়িকভাবে কমে যায়
বাতাসে জীবাণু ও অ্যালার্জেনের পরিমাণ বাড়ে
দূষণ বেড়ে যায়
পর্যাপ্ত জল পান ও বিশ্রামের অভাব
বাইরে বেরোলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করুন। শিশুদের ক্ষেত্রেও এই বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। মাস্ক ধুলো, ধোঁয়া ও পরাগরেণু থেকে অনেকটাই সুরক্ষা দেয়।
ব্রঙ্কাইটিস বা ভাইরাল কাশিতে অ্যান্টি-বায়োটিকের তেমন ভূমিকা নেই। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ওষুধ খেলে শরীরে রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে মারাত্মক হতে পারে।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনহেলার ব্যবহার করা যেতে পারে। গরম জলে ভাপ নিলে শ্বাসনালি পরিষ্কার হয় ও কাশি কমে।
তিন সপ্তাহের বেশি কাশি না সারলে
শ্বাসকষ্ট বাড়লে
বুকে ব্যথা হলে
কাশির সঙ্গে রক্ত এলে
জ্বর দীর্ঘদিন থাকলে
বাইরের খাবার, ফ্রোজ়েন ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন
ধূমপানে রাশ টানুন বা সম্পূর্ণ বন্ধ করুন
পর্যাপ্ত জল পান করুন
নিয়মিত ঘুম ও বিশ্রাম নিন
ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার – কমলা, লেবু, আমলকি, পেয়ারা
মধু – রোজ সকালে এক চামচ
আদা, গোলমরিচ, দারচিনি, লবঙ্গের চা
হালকা গরম জল
হলুদ দুধ (রাতে)
এই উপাদানগুলি শরীরের ইমিউনিটি বাড়াতে সাহায্য করে ও অ্যালার্জির উপসর্গ কমায়।
বয়স্ক ব্যক্তি ও যাঁদের ডায়াবিটিস বা ফুসফুসের সমস্যা আছে, তাঁরা চিকিৎসকের পরামর্শে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোনিয়ার টিকা নিতে পারেন। এটি গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
শীতের শেষে ও বসন্তের শুরুতে অসুখ-বিসুখ হওয়া খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সামান্য সচেতনতা ও নিয়ম মেনে চললেই বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব। কাশি বা অ্যালার্জিকে অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসা নিন। মনে রাখবেন, সতর্কতাই সুস্থ থাকার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।
আপনি চাইলে আমি এটিকে
খবরের কাগজের ফিচার
স্বাস্থ্য ম্যাগাজিনের লেখা
সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ভাষার গাইড
এই তিনটি ফরম্যাটের যেকোনো একটিতে আরও ঘষেমেজে সাজিয়ে দিতে পারি।