বিশ্বকাপে টানা তিন ম্যাচে শূন্য রানে আউট হলেও তরুণ ব্যাটারের উপর আস্থা হারাচ্ছেন না অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব। কঠিন সময়েও দলের সমর্থন রয়েছে বলেই জানিয়ে তিনি মনে করিয়ে দিলেন বড় মঞ্চে দায়িত্ব নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে চাপ থাকে আলাদা। আলো, প্রত্যাশা, সমর্থকদের আবেগ—সব মিলিয়ে প্রতিটি ম্যাচ যেন একেকটি পরীক্ষার খাতা। সেই পরীক্ষাতেই বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন ভারতের বিস্ফোরক ওপেনার Abhishek Sharma। টানা তিন ম্যাচে শূন্য রানে আউট—শুধু রান না পাওয়া নয়, বরং শূন্যের হ্যাটট্রিক। শেষ আটটি টি টোয়েন্টি ইনিংসে পাঁচবার শূন্য। পরিসংখ্যান বলছে ৮৪, ০, ৬৮*, ০, ৩০, ০, ০, ০—চরম ওঠানামার এক গ্রাফ।
তবু বিস্ময়করভাবে উদ্বিগ্ন নন ভারত অধিনায়ক Suryakumar Yadav। বরং শান্ত, সংযত এবং বার্তাবহ। নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে নিয়মরক্ষার ম্যাচে ১৭ রানের জয় নিশ্চিত করে সুপার এইটে উঠেছে ভারত। কিন্তু ম্যাচ-পরবর্তী সাংবাদিক বৈঠকে সূর্যর বক্তব্য স্পষ্ট—ফর্ম সাময়িক, দায়িত্ব চিরস্থায়ী।
নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে ম্যাচে শুরুটা ছিল অস্বস্তিকর। দ্রুত উইকেট হারিয়ে ১১০ রানে চার উইকেট—ভারত তখন চাপে। ওপেনিং ব্যর্থতা আবারও প্রশ্ন তুলেছে ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে। পিচ পড়তে ভুল? না কি শট সিলেকশনের সমস্যা? এই প্রশ্ন এখন টিম ম্যানেজমেন্টের ভেতরে বাইরে ঘুরছে।
এই কঠিন পরিস্থিতিতে দলকে টেনে তুললেন Shivam Dube এবং Hardik Pandya। দুবের ৩১ বলে ৬৬ রানের বিধ্বংসী ইনিংস ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। চারটি চার ও ছয়টি ছক্কা—পরিকল্পিত আক্রমণ। হার্দিকের ২১ বলে ৩০ ছিল নিখুঁত সহায়ক ইনিংস। শেষ পর্যন্ত ১৯০-এ পৌঁছয় ভারত, যা ম্যাচ জয়ের ভিত্তি গড়ে দেয়।
সূর্য বলেন, “আমরা জানতাম পরে মারার মতো ব্যাটার আছে। তাই শুরুতে ধরে খেলেছি।” এই মন্তব্যে পরোক্ষে দায়িত্বের কথাই মনে করিয়ে দিলেন তিনি। অর্থাৎ ওপেনিংয়ে দ্রুত উইকেট হারালে মিডল অর্ডারের উপর চাপ বাড়ে। বড় মঞ্চে দায়িত্ব বণ্টনই সাফল্যের চাবিকাঠি।
একজন তরুণ ব্যাটারের জন্য এমন সময় ভয়াবহ হতে পারে। আলোচনার কেন্দ্রে নাম, সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা, বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ—সব মিলিয়ে মানসিক চাপ তীব্র। কিন্তু অধিনায়কের প্রকাশ্য সমর্থন সেই চাপ কমাতে পারে অনেকটাই।
অভিষেকের ব্যাটিং স্টাইল আক্রমণাত্মক। পাওয়ারপ্লে কাজে লাগানোই তাঁর প্রধান ভূমিকা। কিন্তু যখন বল সুইং করছে, পিচ ধীর, বা প্রতিপক্ষ পরিকল্পিত বোলিং করছে—তখন শট সিলেকশনে সংযম দরকার। সূর্যের বার্তা এখানেই—“ব্যাটারদের বুঝতে হবে পরিস্থিতি অনুযায়ী দায়িত্ব নিতে।”
শেষ আট ইনিংসে পাঁচবার শূন্য—এটা কেবল টেকনিক্যাল সমস্যা নয়, মানসিকও। প্রথম ১০ বল টিকে থাকা, স্ট্রাইক রোটেশন, উইকেটের গতি বোঝা—এসবেই এখন মনোযোগ প্রয়োজন।
নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে ম্যাচে ভারতের শুরুটা দেখে প্রশ্ন উঠেছে—পিচ পড়তে ভুল হয়েছিল কি? বড় টুর্নামেন্টে প্রতিটি ম্যাচে আলাদা কন্ডিশন। একই ভেন্যুতেও সকাল-সন্ধ্যার পার্থক্য প্রভাব ফেলে। ওপেনারদের ভূমিকা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সূর্য ও তিলক পরিস্থিতি বুঝে ধরে খেলেছেন। কারণ তাঁরা জানতেন, পরের দিকে দুবে ও হার্দিকের মতো পাওয়ার হিটার রয়েছে। এই ব্যাটিং টেমপ্লেট ভবিষ্যতেও দেখা যেতে পারে—শুরুর ধৈর্য, মাঝের গতি, শেষে বিস্ফোরণ।
বিশাখাপত্তনমে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে আগেও দুর্দান্ত খেলেছিলেন দুবে। আবারও প্রমাণ করলেন বড় মঞ্চে নিজের সামর্থ্য। সূর্য তাঁর প্রশংসায় বলেছেন, “ও যেভাবে আমাদের ১৯০-এ নিয়ে গেল, তা অসাধারণ।” মিডল অর্ডারে এমন ইনিংস দলকে আত্মবিশ্বাস দেয়।
দুবের ইনিংস শুধু রান নয়, সময়োপযোগী। চাপে পড়ে দলকে উদ্ধার করা—এটাই ম্যাচ জেতায়।
ভারতীয় দলে বোলিং বিকল্প এখন প্রচুর। সূর্যের মতে, “এমন মাথাব্যথা স্বাস্থ্যকর।” অর্থাৎ পিচ অনুযায়ী কম্বিনেশন বদলানো সম্ভব। বড় টুর্নামেন্টে এই নমনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দল এখন সুপার এইটে। সামনে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। এখানে ছোট ভুলও বড় মূল্য নিতে পারে। ওপেনিং জুটি যদি দ্রুত রান না দেয়, চাপ বাড়বে মিডল অর্ডারে। তাই অভিষেকের দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো জরুরি।
ক্রিকেট বিশ্বের তুলনায় দুর্বল হলেও নেদারল্যান্ডস সেয়ানে সেয়ানে টক্কর দিয়েছে। তাদের শৃঙ্খল বোলিং ও ফিল্ডিং প্রশংসনীয়। সূর্যও বলেছেন, “ম্যাচ জিতলেও শেখার থাকে।” বড় দলগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করে তারা বারবার দেখাচ্ছে—আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কাউকে হালকা নেওয়া যায় না।
সুপার এইটে ভারতের সামনে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ। টপ অর্ডারকে স্থিরতা দিতে হবে। অভিষেকের প্রতিভা নিয়ে সন্দেহ নেই। প্রশ্ন শুধু সময় ও মানসিক দৃঢ়তা। অধিনায়ক তাঁর পাশে আছেন—এটাই বড় সান্ত্বনা।
একটি ইনিংসই বদলে দিতে পারে ছবি। ক্রিকেট ইতিহাস এমন উদাহরণে ভরা। বড় মঞ্চে যারা সমালোচিত, তারাই একদিন ম্যাচ জেতানো নায়ক হয়েছেন।
সব মিলিয়ে, ভারতের জয়ের আড়ালেও প্রশ্ন রয়ে গেছে ওপেনিং নিয়ে। তবে আতঙ্ক নয়, পরিকল্পনা—এই পথেই হাঁটছে দল। সূর্যকুমার যাদবের বার্তা স্পষ্ট—ফর্ম সাময়িক, কিন্তু দায়িত্ব স্থায়ী। দল এগোচ্ছে, বিকল্প আছে, আত্মবিশ্বাস আছে। এখন দরকার সম্মিলিত অবদান।
অভিষেকের ব্যাট কি সুপার এইটে কথা বলবে? উত্তর দেবে সময়। তবে অধিনায়কের আস্থা এবং দলের সমর্থন—এই দুটোই হতে পারে তাঁর পুনর্জাগরণের সবচেয়ে বড় শক্তি।
সব মিলিয়ে, ভারতের জয়ের আড়ালেও প্রশ্ন রয়ে গেছে ওপেনিং নিয়ে। তবে আতঙ্ক নয়, পরিকল্পনা—এই পথেই হাঁটছে দল। Suryakumar Yadav-এর বার্তা স্পষ্ট—ফর্ম সাময়িক, কিন্তু দায়িত্ব স্থায়ী। দল এগোচ্ছে, বিকল্প আছে, আত্মবিশ্বাস আছে। এখন দরকার সম্মিলিত অবদান।
অভিষেকের ব্যাট কি সুপার এইটে কথা বলবে? উত্তর দেবে সময়। তবে অধিনায়কের আস্থা এবং দলের সমর্থন—এই দুটোই হতে পারে তাঁর পুনর্জাগরণের সবচেয়ে বড় শক্তি।
সুপার এইট পর্বে প্রতিটি ম্যাচ কার্যত নকআউটের সমান গুরুত্ব বহন করে। এখানে শুরুটা ভালো না হলে ম্যাচ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি থাকে অনেক বেশি। সেই কারণেই ওপেনিং জুটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাওয়ারপ্লের ছয় ওভার শুধু রান তোলার সুযোগ নয়, বরং ম্যাচের গতি নির্ধারণের সময়। যদি শুরুতেই ৫০ থেকে ৬০ রান উঠে যায়, তাহলে মিডল অর্ডার অনেক স্বচ্ছন্দে খেলতে পারে। কিন্তু দ্রুত উইকেট পড়লে পরিকল্পনা বদলাতে হয়, ঝুঁকি নিতে হয় হিসেব করে। এখানেই অভিজ্ঞতা ও মানসিক দৃঢ়তা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়।
অভিষেক শর্মার মতো আক্রমণাত্মক ব্যাটারের ক্ষেত্রে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া জরুরি। তিনি স্বভাবতই স্ট্রোকপ্লেয়ার, বল দেখলেই আক্রমণ করতে ভালোবাসেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিপক্ষ দলও প্রস্তুত থাকে পরিকল্পনা নিয়ে। শর্ট বল, সুইং, স্লোয়ার, ভ্যারিয়েশন—সব মিলিয়ে তাঁকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা চলবে। তাই হয়তো এখন প্রয়োজন প্রথম ১০ থেকে ১৫ বল সময় নেওয়া, পরিস্থিতি বোঝা, তারপর গিয়ার বদলানো। বড় ইনিংসের ভিত্তি অনেক সময় ছোট ছোট ধৈর্যের সিদ্ধান্তেই গড়ে ওঠে।
দলের ভেতরে যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, সেটিও ইতিবাচক। সিনিয়ররা তরুণদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। মিডল অর্ডারে শিবম দুবে ও হার্দিক পাণ্ডিয়ার মতো ক্রিকেটাররা দায়িত্ব নিচ্ছেন। ফলে একজন ব্যাটার সাময়িক ব্যর্থ হলেও পুরো কাঠামো ভেঙে পড়ছে না। বরং এটি দেখাচ্ছে, দল হিসেবে ভারত কতটা পরিণত। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স গুরুত্বপূর্ণ হলেও, চূড়ান্ত লক্ষ্য দলীয় সাফল্য।
এখানেই অধিনায়কের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রকাশ্যে কোনও ক্রিকেটারের সমালোচনা না করে, বরং আস্থার বার্তা দেওয়া—এটি ড্রেসিংরুমে বড় প্রভাব ফেলে। একজন ব্যাটার যখন জানেন যে অধিনায়ক তাঁর উপর ভরসা রাখছেন, তখন তিনি চাপের মধ্যেও নিজের স্বাভাবিক খেলায় ফিরতে পারেন। ক্রিকেটে আত্মবিশ্বাসই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। একবার ছন্দ ফিরে এলে ধারাবাহিকতা আসতে সময় লাগে না।
অন্যদিকে, টিম ম্যানেজমেন্টও নিশ্চয়ই বিকল্প ভাবছে। প্রয়োজন হলে কম্বিনেশন বদলানো, ব্যাটিং অর্ডার সামান্য রদবদল—এসবই টুর্নামেন্ট ক্রিকেটের অংশ। তবে আপাতত যে বার্তা মিলছে, তা হল ধৈর্য ধরে এগোনো। কারণ বড় টুর্নামেন্টে হঠাৎ সিদ্ধান্ত অনেক সময় উল্টো ফল দেয়।
সবচেয়ে বড় কথা, ক্রিকেট অনিশ্চয়তার খেলা। আজ যে ব্যাটার শূন্য করছেন, তিনিই কাল ম্যাচের নায়ক হতে পারেন। ইতিহাস বলছে, বহু তারকা ক্রিকেটারই বড় টুর্নামেন্টের শুরুতে ব্যর্থ হয়ে পরে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করেছেন। তাই অভিষেকের ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সুপার এইটে যখন ভারত আরও শক্ত প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হবে, তখন প্রত্যেকের অবদান প্রয়োজন। ওপেনার থেকে ফিনিশার, স্পিনার থেকে পেসার—সবাইকে নিজেদের সেরা দিতে হবে। সূর্যের নেতৃত্বে দল যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগোচ্ছে, তা স্পষ্ট। এখন দেখার, সুযোগ পেলে অভিষেক সেই আস্থার মর্যাদা কত দ্রুত দিতে পারেন। তাঁর ব্যাট যদি কথা বলে, তাহলে ভারতের ব্যাটিং লাইনআপ আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে—এতে কোনও সন্দেহ নেই।