এশিয়ার আশা এখন জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার হাতে। বিশ্বকাপের রাউন্ড অফ ৩২-এ জাপানের সামনে শক্তিশালী ব্রাজ়িল, আর অস্ট্রেলিয়া মুখোমুখি হবে মহম্মদ সালাহর মিশরের। দুই ম্যাচ ঘিরেই ফুটবলপ্রেমীদের উত্তেজনা তুঙ্গে।
চূড়ান্ত হয়ে গেল ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের সূচি। দীর্ঘ গ্রুপ পর্বের টানটান লড়াই, অঘটন, প্রত্যাবর্তন, বড় দলের দাপট এবং ছোট দলের সাহসী ফুটবলের পর এবার শুরু হতে চলেছে আসল পরীক্ষা। ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণে এবারের বিশ্বকাপ ছিল আগের যেকোনও আসরের তুলনায় আরও বড়, আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং আরও অনিশ্চয়তায় ভরা। সেই গ্রুপ পর্ব শেষে ৩২টি দল জায়গা করে নিয়েছে নকআউট রাউন্ডে। অর্থাৎ এবার থেকে প্রতিটি ম্যাচই কার্যত বাঁচা-মরার লড়াই। একবার হারলেই বিদায়, জিতলেই পরের ধাপে এগোনোর সুযোগ।
বিশ্বকাপের রাউন্ড অফ ৩২ শুরু হচ্ছে ২৯ জুন থেকে। প্রথম দিনই ফুটবলপ্রেমীদের জন্য থাকছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকা-কানাডা এবং ব্রাজ়িল-জাপান। দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম কানাডা ম্যাচটি ভারতীয় সময় অনুযায়ী ২৯ জুন রাত সাড়ে ১২টায়। তবে ভারতীয় দর্শকদের হিসাবে এই ম্যাচটি দেখা যাবে ২৮ জুন গভীর রাতে। অন্যদিকে দিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ব্রাজ়িল বনাম জাপান ম্যাচ। ভারতীয় সময় অনুযায়ী ২৯ জুন রাত ১০টা ৩০ মিনিটে মাঠে নামবে দুই দল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজ়িলের সামনে থাকবে এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল জাপান।
এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলির মধ্যে অন্যতম হল ৪৮ দলের ফরম্যাট। এতদিন ৩২ দলের বিশ্বকাপ দেখতে অভ্যস্ত ছিল ফুটবলবিশ্ব। কিন্তু নতুন ফরম্যাটে বেশি দেশ অংশ নেওয়ায় প্রতিযোগিতা আরও বড় হয়েছে। তার ফলে নকআউট পর্বও শুরু হচ্ছে রাউন্ড অফ ৩২ দিয়ে। গ্রুপ পর্বে প্রতিটি দলকে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়েছে। শুধু বড় নাম বা অতীতের সাফল্য নয়, মাঠের পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে কারা এগিয়ে যাবে আর কারা বিদায় নেবে।
এই রাউন্ড অফ ৩২-এ এশিয়ার দুই প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছে জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া। এশিয়ান ফুটবলের জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় মুহূর্ত। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এশিয়ার দলগুলি গত কয়েক আসর ধরে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করছে। জাপান ইতিমধ্যেই নিজেদের ধারাবাহিকতা, গতিময় ফুটবল এবং কৌশলগত শৃঙ্খলার জন্য পরিচিত। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়াও শক্তিশালী শারীরিক ফুটবল, লড়াকু মানসিকতা এবং বড় ম্যাচে চাপ সামলানোর ক্ষমতার জন্য আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছে।
জাপানের সামনে এবার বিশাল চ্যালেঞ্জ। তাদের খেলতে হবে ব্রাজ়িলের বিরুদ্ধে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রতিভা এবং বিশ্বকাপের সাফল্যের বিচারে ব্রাজ়িল ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা নাম। ব্রাজ়িল মানেই আক্রমণাত্মক ফুটবল, সৃজনশীলতা, স্কিল, গতি এবং গোলের খিদে। কিন্তু বর্তমান জাপান দলকে কোনওভাবেই হালকা ভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। গত কয়েক বছরে জাপান প্রমাণ করেছে, তারা বড় দলের বিরুদ্ধে ভয় পায় না। বরং সংগঠিত রক্ষণ, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক এবং ছোট পাসে খেলা তৈরি করার ক্ষমতা দিয়ে তারা যে কোনও প্রতিপক্ষকে সমস্যায় ফেলতে পারে।
ব্রাজ়িল বনাম জাপান ম্যাচ তাই শুধু একটি নকআউট ম্যাচ নয়, এটি হতে চলেছে দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের লড়াই। একদিকে ব্রাজ়িলের স্বাভাবিক ছন্দ, ব্যক্তিগত দক্ষতা এবং আক্রমণভিত্তিক ফুটবল। অন্যদিকে জাপানের শৃঙ্খলা, গতিশীলতা, দলগত সমন্বয় এবং পরিকল্পিত ফুটবল। ব্রাজ়িল যদি দ্রুত গোল পেয়ে যায়, তাহলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে যেতে পারে। কিন্তু জাপান যদি প্রথম ৩০ মিনিট প্রতিপক্ষকে আটকে রাখতে পারে এবং মাঝমাঠে চাপ তৈরি করতে পারে, তাহলে ম্যাচ কঠিন হয়ে উঠতে পারে ব্রাজ়িলের জন্য।
নকআউট ম্যাচে কাগজে-কলমে শক্তিশালী দল সবসময় জেতে না। বিশ্বকাপের ইতিহাসে বহুবার দেখা গিয়েছে, ছোট বা তুলনামূলক কম শক্তিশালী দলও বড় দলকে হারিয়ে চমক দিয়েছে। কারণ নকআউটে ভুলের জায়গা খুব কম। একটি গোল, একটি পেনাল্টি, একটি লাল কার্ড, গোলকিপারের একটি সেভ কিংবা ডিফেন্ডারের একটি ভুল—সবকিছু ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। তাই ব্রাজ়িলকে জাপানের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতেই হবে।
দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম কানাডা ম্যাচও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই ম্যাচ দিয়ে কার্যত নকআউট পর্বের দরজা খুলবে। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করতে চাইবে। তাদের ফুটবলে শারীরিক শক্তি, গতি এবং আবেগের উপস্থিতি বরাবরই চোখে পড়ে। অন্যদিকে কানাডা গত কয়েক বছরে ফুটবলে দ্রুত উন্নতি করেছে। উত্তর আমেরিকার ফুটবলে কানাডার উত্থান বেশ নজরকাড়া। দলটির মধ্যে তরুণ প্রতিভা, দ্রুত আক্রমণ এবং আধুনিক ফুটবলের ছাপ রয়েছে। ফলে এই ম্যাচেও জমজমাট লড়াইয়ের সম্ভাবনা প্রবল।
দক্ষিণ আফ্রিকা এবং কানাডা—দুই দলের কাছেই এই ম্যাচ ঐতিহাসিক সুযোগ। কারণ রাউন্ড অফ ৩২ পার করতে পারলে তারা বিশ্বকাপের আরও বড় মঞ্চে নিজেদের তুলে ধরতে পারবে। বড় দলগুলির তুলনায় এই ধরনের ম্যাচে চাপের ধরন আলাদা। প্রত্যাশা কম থাকলেও সুযোগ বড়। তাই দুই দলই নিজেদের সেরাটা দিতে চাইবে। প্রথম গোল এই ম্যাচে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যে দল আগে গোল করবে, তারা আত্মবিশ্বাস পাবে। তবে নকআউট ম্যাচে শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত কোনও দলকে এগিয়ে ধরে নেওয়া যায় না।
এবারের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব নানা কারণে আলোচনায় ছিল। নতুন ফরম্যাটে বেশি দল অংশ নেওয়ায় প্রতিযোগিতায় বৈচিত্র্য বেড়েছে। এমন অনেক দেশ খেলেছে, যাদের বিশ্বকাপের মূল পর্বে দেখা বিরল। কিছু দল প্রত্যাশামতো পারফর্ম করেছে, কিছু বড় দলকে লড়াই করতে হয়েছে শেষ ম্যাচ পর্যন্ত, আবার কিছু দল নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে চমকে দিয়েছে ফুটবলবিশ্বকে। এই কারণেই রাউন্ড অফ ৩২ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। কারণ এখানে শুধু ফেবারিট নয়, আত্মবিশ্বাসী আন্ডারডগ দলগুলিও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
নকআউট পর্বে ব্রাজ়িল, জাপান, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলের পাশাপাশি অন্যান্য শক্তিশালী দলগুলিও নিজেদের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে। বিশ্বকাপ জেতার রাস্তা কখনও সহজ নয়। গ্রুপ পর্বে ভাল খেলা মানেই ট্রফির নিশ্চয়তা নয়। বরং নকআউটে প্রতিটি ম্যাচ নতুন চ্যালেঞ্জ। এখানে আগের ম্যাচের ফলাফল, গ্রুপ টেবিলের অবস্থান বা অতীত রেকর্ড অনেক সময় গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। যে দল নির্দিষ্ট দিনে ভাল খেলবে, চাপ সামলাবে এবং সুযোগ কাজে লাগাবে, তারাই এগিয়ে যাবে।
ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের জন্য রাউন্ড অফ ৩২ বিশেষ আকর্ষণীয় হতে চলেছে। কারণ ম্যাচগুলির সময় ভারতীয় সময় অনুযায়ী রাত এবং গভীর রাতে হলেও বিশ্বকাপের উত্তেজনা এমনই যে সমর্থকরা রাত জেগে ম্যাচ দেখবেন। বিশেষ করে ব্রাজ়িল বনাম জাপান ম্যাচ নিয়ে আগ্রহ তুঙ্গে। ভারতে ব্রাজ়িলের সমর্থক বিপুল। একই সঙ্গে গত কয়েক বছরে জাপানের ফুটবলও ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে সম্মান অর্জন করেছে। তাই এই ম্যাচ নিয়ে আলোচনা, বিশ্লেষণ এবং উত্তেজনা স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকবে।
ব্রাজ়িলের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের আক্রমণভাগ। দ্রুত পাসিং, উইং দিয়ে আক্রমণ, ব্যক্তিগত স্কিল এবং বক্সের আশপাশে সৃজনশীলতা—এসবই ব্রাজ়িলকে বিপজ্জনক করে তোলে। কিন্তু নকআউট ম্যাচে শুধু আক্রমণ করলেই চলবে না, রক্ষণেও মনোযোগী হতে হবে। জাপানের মতো দল সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে উঠতে পারে। ব্রাজ়িলের ডিফেন্ডারদের তাই সতর্ক থাকতে হবে। মাঝমাঠে বল হারালে জাপান তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে।
জাপানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে ধৈর্য। ব্রাজ়িলের মতো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ম্যাচের শুরুতেই অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। প্রথমে নিজেদের রক্ষণকে শক্ত রাখা, মাঝমাঠে চাপ তৈরি করা এবং সুযোগ পেলে দ্রুত আক্রমণে ওঠা—এই পরিকল্পনা জাপানের জন্য কার্যকর হতে পারে। সেট-পিসও জাপানের জন্য বড় অস্ত্র হতে পারে। নকআউট ম্যাচে কর্নার, ফ্রি-কিক কিংবা পেনাল্টি থেকে গোল ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা-কানাডা ম্যাচে লড়াই হতে পারে গতি বনাম সংগঠনের। কানাডা যদি দ্রুত আক্রমণে জায়গা তৈরি করতে পারে, তাহলে দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণকে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে। আবার দক্ষিণ আফ্রিকা যদি শারীরিক ফুটবল এবং সেট-পিসে এগিয়ে থাকে, তাহলে কানাডার জন্য ম্যাচ কঠিন হতে পারে। এই ম্যাচে মাঝমাঠের দখল বড় ভূমিকা নিতে পারে। যে দল মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করবে, তারাই ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।