রোনাল্ডোর পর নেমারও পাশে! পিতৃবিয়োগে শোকাহত মেসিকে সান্ত্বনা আরও এক মহাতারকার
বিশ্বফুটবলে তাঁরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী, কখনও সতীর্থ, আবার কখনও ভিন্ন দেশের জার্সিতে মুখোমুখি হওয়া মহাতারকা। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন মুহূর্তে মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা ক্লাবের বিভাজন যে কোনও অর্থ বহন করে না, সেটাই যেন আবারও সামনে এল লিয়োনেল মেসিকে ঘিরে। বাবাকে হারানোর শোকের সময়ে আর্জেন্টিনার মহাতারকার পাশে দাঁড়ালেন প্রথমে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, তার পর নেমার। দুই তারকার আবেগঘন বার্তা ফুটবলপ্রেমীদেরও ছুঁয়ে গিয়েছে।
মেসির বাবা জর্জের প্রয়াণের খবর সামনে আসার পর থেকেই ফুটবলবিশ্বে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মেসির ফুটবলজীবনের সঙ্গে তাঁর বাবার সম্পর্ক কতটা গভীর, তা দীর্ঘদিন ধরেই ফুটবলপ্রেমীদের জানা। ছোটবেলা থেকে মেসির ফুটবলার হয়ে ওঠার লড়াই, আর্জেন্টিনা ছেড়ে স্পেনে যাওয়া, বার্সেলোনার অ্যাকাডেমিতে সুযোগ পাওয়া—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়েই বাবার উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেই মানুষটিকেই হারানোর পর স্বাভাবিকভাবেই আবেগ সামলানো কঠিন হয়ে উঠেছে মেসির জন্য। বাবার সঙ্গে নিজের একটি ছবি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করে নিজের অনুভূতির কথা জানিয়েছেন তিনি। বাবার প্রয়াণের পর এই প্রথম প্রকাশ্যে নিজের মনের কথা বলেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক।
মেসির সেই পোস্টে ফুটবলবিশ্বের অসংখ্য মানুষ সমবেদনা জানিয়েছেন। তবে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো এবং নেমারের প্রতিক্রিয়া।
প্রথমে মেসির পাশে দাঁড়ান রোনাল্ডো। প্রায় দুই দশক ধরে মেসি-রোনাল্ডোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফুটবলবিশ্বের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। কে সেরা—এই বিতর্কে বছরের পর বছর ভাগ হয়েছে ফুটবলবিশ্ব। ব্যালন ডি’অর থেকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লা লিগার এল ক্লাসিকো থেকে আন্তর্জাতিক ফুটবল—দুই মহাতারকার তুলনা কখনও থামেনি।
কিন্তু মাঠের সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে বাধা নয়, রোনাল্ডোর সমবেদনার বার্তায় সেটাই আবারও স্পষ্ট হয়েছে।
মেসির আবেগঘন ইনস্টাগ্রাম পোস্টে রোনাল্ডো তাঁর প্রতি সমবেদনা জানান। কঠিন সময়ে মেসি যেন মানসিক শক্তি পান, সেই কামনাই করেন পর্তুগিজ মহাতারকা। একজন প্রতিদ্বন্দ্বীর উদ্দেশে আর এক কিংবদন্তির এমন মানবিক বার্তা মুহূর্তের মধ্যেই ফুটবলপ্রেমীদের নজর কেড়ে নেয়।
তার পর মেসির পাশে দাঁড়ান নেমার।
বার্সেলোনায় মেসি ও নেমারের সম্পর্ক শুধু সতীর্থের ছিল না। মাঠের বাইরেও দু’জনের বন্ধুত্বের কথা বহুবার সামনে এসেছে। লুইস সুয়ারেজকে নিয়ে মেসি-নেমার-সুয়ারেজের বিখ্যাত ‘MSN’ ত্রয়ী এক সময় ইউরোপীয় ফুটবলে কার্যত আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছিল।
নেমার বার্সেলোনা ছেড়ে প্যারিস সাঁ জারমাঁয় চলে যাওয়ার পরও তাঁদের ব্যক্তিগত বন্ধুত্বে বড় কোনও পরিবর্তন হয়নি। পরবর্তী সময়ে মেসিও পিএসজিতে যোগ দিলে ফের একই ক্লাবে খেলেন দুই বন্ধু। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা ফুটবলের ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও মেসি ও নেমারের ব্যক্তিগত সম্পর্ক সব সময়ই তার ঊর্ধ্বে থেকেছে।
তাই মেসির জীবনের এমন কঠিন সময়ে নেমারের প্রতিক্রিয়া আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।
মেসির পোস্টে নেমার তাঁর এবং তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে এই কঠিন পরিস্থিতি সামলে ওঠার জন্য ঈশ্বর যেন তাঁদের শক্তি দেন, সেই প্রার্থনাও করেন ব্রাজিলীয় তারকা। বন্ধুর প্রতি নিজের ভালবাসার কথাও প্রকাশ করেন তিনি।
নেমারের বার্তায় কোনও আনুষ্ঠানিকতার ছাপ ছিল না। বরং দীর্ঘদিনের বন্ধুর প্রতি ব্যক্তিগত আবেগই স্পষ্ট হয়েছে।
মেসির বাবা জর্জে তাঁর ফুটবলজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। বিশ্বফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হয়ে ওঠার পেছনে যেমন মেসির অসাধারণ প্রতিভা, কঠোর পরিশ্রম এবং অধ্যবসায় ছিল, তেমনই পরিবারের অবদানও ছিল বিরাট।
শৈশবে মেসির শারীরিক বৃদ্ধিজনিত সমস্যার চিকিৎসা এবং ফুটবলের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য তাঁর পরিবারের সিদ্ধান্তই তাঁর জীবন বদলে দিয়েছিল। মাত্র অল্প বয়সে আর্জেন্টিনা ছেড়ে স্পেনে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করা কোনও পরিবারের পক্ষেই সহজ ছিল না।
এই কঠিন যাত্রাপথে ছেলের পাশে ছিলেন বাবা।
পরবর্তী সময়ে মেসির পেশাদার ফুটবলজীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও বাবার ভূমিকার কথা বারবার সামনে এসেছে। মাঠে মেসি নিজের অসাধারণ পারফরম্যান্সে পৃথিবী জয় করলেও মাঠের বাইরের বিভিন্ন বিষয়ে পরিবারের ওপর তাঁর নির্ভরতার কথাও অজানা নয়।
সেই কারণেই বাবার প্রয়াণ মেসির জীবনে যে কত বড় শূন্যতা তৈরি করেছে, তা তাঁর নিজের লেখাতেই স্পষ্ট।
ইনস্টাগ্রামে দেওয়া আবেগঘন বার্তায় মেসি জানিয়েছেন, তিনি এখনও বাবার চলে যাওয়া বিশ্বাস করতে পারছেন না। বাবাকে আর কোনও দিন দেখতে পাবেন না—এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া তাঁর কাছে অত্যন্ত কঠিন।
একজন বিশ্ববিখ্যাত ফুটবলার হিসেবে লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে মেসিকে প্রায় সব সময়ই শান্ত, সংযত এবং নিয়ন্ত্রিত আবেগের মানুষ হিসেবেই দেখা যায়। কিন্তু বাবাকে নিয়ে লেখা তাঁর কথায় ফুটবলারের পরিচয়ের আড়ালে থাকা একজন সন্তানের অসহায়তাই যেন প্রকাশ পেয়েছে।
বিশ্বকাপ নিয়েও বাবার সঙ্গে নিজের কথোপকথনের কথা স্মরণ করেছেন মেসি। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, বাবার সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও অনেক পরিকল্পনা ছিল। আরও অনেক আনন্দের মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু অসুস্থতার কারণে সেই পরিকল্পনার অনেকটাই অসম্পূর্ণ থেকে গিয়েছে।
মেসির মতো একজন ফুটবলার, যিনি দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ব্যালন ডি’অর-সহ প্রায় সমস্ত বড় সম্মান অর্জন করেছেন, তাঁর জীবনেও পরিবারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গভীর।
ফুটবলের মাঠে একটি ম্যাচ হারলে পরের ম্যাচে ফিরে আসার সুযোগ থাকে। একটি ট্রফি হাতছাড়া হলে আবার জেতার লড়াই করা যায়। কিন্তু কাছের মানুষকে হারানোর শূন্যতা কোনও ট্রফি বা সাফল্য দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
মেসির বর্তমান পরিস্থিতিও তাই ফুটবলীয় সাফল্যের অনেক ঊর্ধ্বে।
আর এই জায়গাতেই রোনাল্ডো ও নেমারের প্রতিক্রিয়া আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রোনাল্ডো এবং মেসিকে নিয়ে বিশ্বফুটলে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ তৈরি হয়েছে, তার বড় অংশই সমর্থক এবং সংবাদমাধ্যমকেন্দ্রিক। দুই তারকাকে প্রায় সব ক্ষেত্রেই একে অপরের বিপরীতে দাঁড় করানো হয়েছে।
ব্যালন ডি’অরের সংখ্যা থেকে গোল, অ্যাসিস্ট, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, আন্তর্জাতিক ট্রফি—কোনও কিছুই সেই তুলনার বাইরে থাকেনি।
কেউ মেসিকে সর্বকালের সেরা মনে করেন, কেউ আবার রোনাল্ডোকে। সামাজিক মাধ্যমেও দুই তারকার সমর্থকদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক নিয়মিত ঘটনা।
কিন্তু ব্যক্তিগত দুঃসময়ে রোনাল্ডোর বার্তা বুঝিয়ে দিয়েছে, খেলাধুলার প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মানবিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
রোনাল্ডো নিজেও জীবনে ব্যক্তিগত শোকের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। ফলে কাছের মানুষ হারানোর যন্ত্রণা কতটা গভীর হতে পারে, তা তাঁর অজানা নয়। মেসিকে দেওয়া তাঁর বার্তায় সেই মানবিক অনুভূতিও ফুটে উঠেছে।
অন্য দিকে নেমারের সঙ্গে মেসির সম্পর্কের সমীকরণ একেবারেই আলাদা।
মেসি যখন বার্সেলোনায় বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, তখন তরুণ নেমার ব্রাজিল থেকে বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে স্পেনে পা রাখেন। অনেকেই ভেবেছিলেন, দুই বড় তারকার মধ্যে হয়তো সংঘাত তৈরি হবে।
বাস্তবে হয়েছিল তার উল্টো।
মেসি এবং নেমারের মধ্যে তৈরি হয়েছিল অসাধারণ বোঝাপড়া। সুয়ারেজ যোগ দেওয়ার পর সেই সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়। মাঠে তাঁদের রসায়ন বার্সেলোনাকে একের পর এক সাফল্য এনে দেয়।
তিন তারকার সম্পর্কের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল একে অপরের সাফল্যে আনন্দিত হওয়ার ক্ষমতা। ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেখানে ব্যক্তিগত সাফল্যের প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র, সেখানে মেসি, নেমার ও সুয়ারেজের বন্ধুত্ব আলাদা নজির তৈরি করেছিল।
বার্সেলোনা ছাড়ার পরও নেমার বারবার মেসির প্রতি নিজের শ্রদ্ধা এবং ভালবাসার কথা জানিয়েছেন।
ক্লাব ফুটবলে দু’জনের বন্ধুত্ব থাকলেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে অবশ্য তাঁরা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশের প্রতিনিধি। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের ম্যাচ মানেই অন্য রকম উত্তেজনা।
কোপা আমেরিকার ফাইনালেও একে অপরের বিরুদ্ধে খেলেছেন তাঁরা। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর ফলাফলকে পিছনে ফেলে দুই বন্ধুকে একসঙ্গে দেখা গিয়েছে। সেই ছবিগুলি ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বন্ধুত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে।
সেই নেমারই এ বার মেসির ব্যক্তিগত শোকের সময়ে পাশে দাঁড়ালেন।
সামাজিক মাধ্যমের যুগে কোনও বড় তারকার ব্যক্তিগত পোস্ট মুহূর্তের মধ্যেই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। মেসির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তাঁর বাবাকে নিয়ে আবেগঘন পোস্টটি প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে সমবেদনার বার্তা আসতে শুরু করে।
সেখানে রোনাল্ডো ও নেমারের মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই আলাদা গুরুত্ব পায়।
কারণ এই তিন ফুটবলার গত দেড় দশকের বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে বড় মুখগুলির মধ্যে অন্যতম। এক সময় ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে মেসি ও রোনাল্ডোর দ্বৈরথ যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করেছে, তেমনই মেসি-নেমার জুটি ফুটবলের সৌন্দর্যের অন্য এক ছবি তুলে ধরেছিল।
আজ মেসির জীবনের কঠিন সময়ে সেই দুই তারকাকেই তাঁর পাশে দেখা যাওয়াটা তাই নিছক একটি সামাজিক মাধ্যমের মন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
এটি বিশ্বফুটবলের মানবিক দিকটিকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
একজন খেলোয়াড়কে মাঠে দেখে সমর্থকেরা তাঁর গোল, ট্রফি, রেকর্ড এবং ব্যক্তিগত পুরস্কার নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু বিশ্বখ্যাত ক্রীড়াবিদদেরও ব্যক্তিগত জীবন থাকে। তাঁদেরও পরিবার রয়েছে, প্রিয়জন রয়েছে, আনন্দ রয়েছে, শোক রয়েছে।
মেসির আবেগঘন লেখা সেই বাস্তবতাই মনে করিয়ে দিয়েছে।
ফুটবলজীবনের প্রতিটি বড় সাফল্যের পর পরিবারের সঙ্গে মেসির উদ্যাপনের ছবি বহুবার দেখা গিয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বকাপ জয়ের পর তাঁর পরিবারকে ঘিরে আবেগের ছবি ফুটবলবিশ্বকে ছুঁয়ে গিয়েছিল।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানো মেসির কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বপ্নগুলির মধ্যে একটি ছিল। সেই সাফল্যের পেছনে তাঁর পরিবারের সমর্থনের কথাও তিনি বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করেছেন।
তাই বাবার সঙ্গে বিশ্বকাপ নিয়ে তাঁর শেষ দিকের কথোপকথনের স্মৃতি নিঃসন্দেহে মেসির কাছে অত্যন্ত আবেগের।
মেসির লেখায় যে অপূর্ণতার অনুভূতি ফুটে উঠেছে, সেটিও যে কোনও সাধারণ মানুষের অনুভূতির সঙ্গে মিল খুঁজে পায়। কাছের কাউকে হারানোর পর প্রায় সকলেরই মনে হয়, আরও কিছু সময় যদি পাওয়া যেত, আরও কিছু কথা যদি বলা যেত, আরও কিছু মুহূর্ত যদি একসঙ্গে কাটানো যেত!
বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারও সেই একই আবেগের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন।
আর হয়তো এই কারণেই মেসির পোস্ট এত দ্রুত সমর্থকদের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছে।
রোনাল্ডো ও নেমারের মন্তব্যের নিচেও বহু সমর্থক নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। দুই তারকার মানবিক আচরণের প্রশংসা করেছেন ফুটবলপ্রেমীরা। বিশেষ করে মেসি-রোনাল্ডোর দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কেন্দ্র করে যাঁরা দুই শিবিরে বিভক্ত, তাঁদের অনেকেই এই ঘটনায় ফুটবলের বাইরের সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছেন।
একজন কিংবদন্তি যখন ব্যক্তিগত শোকে ভেঙে পড়েছেন, তখন আর কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা গুরুত্বপূর্ণ নয়—এই বার্তাই যেন উঠে এসেছে গোটা ঘটনায়।
মেসি ও রোনাল্ডো একটি প্রজন্মের ফুটবলের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছেন। দু’জনের অসাধারণ ধারাবাহিকতা, গোল করার ক্ষমতা, ব্যক্তিগত পুরস্কারের লড়াই এবং ক্লাব সাফল্য ফুটবলের ইতিহাসে বিরল অধ্যায় তৈরি করেছে।
নেমারও সেই যুগের সবচেয়ে প্রতিভাবান ফুটবলারদের একজন। ব্রাজিলীয় ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী শিল্প এবং দক্ষতার অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে দীর্ঘদিন বিশ্বফুটবলের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছেন তিনি।
এই তিন মহাতারকাকে এক সূত্রে বেঁধেছে ফুটবল। কিন্তু এই মুহূর্তে তাঁদের সংযোগ আরও ব্যক্তিগত এবং মানবিক।
রোনাল্ডোর পর নেমারের বার্তা তাই শুধু মেসির পাশে দাঁড়ানোর ঘটনা নয়, বরং খেলাধুলার জগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ছবিও।
মাঠে প্রতিপক্ষ হতে হয়। নিজের দেশ বা ক্লাবকে জেতানোর জন্য কখনও বন্ধুর বিরুদ্ধেও সর্বশক্তি দিয়ে খেলতে হয়। কিন্তু চূড়ান্ত বাঁশি বাজলে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরেও জীবন রয়েছে।
মেসি, রোনাল্ডো এবং নেমারের সম্পর্কের বিভিন্ন অধ্যায় সেই কথাই বারবার প্রমাণ করেছে।
বর্তমানে মেসির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়ই পরিবারের পাশে থাকা এবং ব্যক্তিগত শোক সামলে ওঠা। এমন সময়ে বিশ্বজুড়ে বন্ধু, সতীর্থ, প্রাক্তন সতীর্থ এবং ফুটবলপ্রেমীদের কাছ থেকে পাওয়া সমর্থন কিছুটা হলেও শক্তি জোগাতে পারে।
বাবার স্মৃতি অবশ্যই আজীবন তাঁর সঙ্গে থেকে যাবে।
একজন ফুটবলার হিসেবে মেসিকে পৃথিবী চেনে তাঁর বাঁ-পায়ের জাদু, অসাধারণ ড্রিবলিং, গোল এবং অবিশ্বাস্য ফুটবলবুদ্ধির জন্য। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ যাত্রার নেপথ্যে যে পরিবারের সংগ্রাম ছিল, সেই গল্পও মেসির কিংবদন্তি হয়ে ওঠার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শৈশবের সেই ছেলেকে বিশ্বফুটবলের শিখরে পৌঁছে দেওয়ার লড়াইয়ে পরিবারের ভূমিকা কোনও ট্রফির পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।
জর্জে ছিলেন সেই যাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী।
তাই তাঁর অনুপস্থিতি মেসির জীবনে তৈরি করেছে এমন এক শূন্যতা, যা কোনও বিশ্বকাপ, কোনও ব্যালন ডি’অর বা কোনও ব্যক্তিগত রেকর্ড দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
এই কঠিন সময়ে মেসির পাশে দাঁড়ানো নেমার ও রোনাল্ডোর বার্তা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে—বিশ্বমানের ক্রীড়াবিদদের মধ্যেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা কতটা গভীর হতে পারে।
সমর্থকেরা হয়তো সেরা ফুটবলার নির্বাচন নিয়ে অনন্তকাল তর্ক করবেন। মেসি না রোনাল্ডো, ব্রাজিল না আর্জেন্টিনা—এই আলোচনা ফুটবলের অংশ হয়েই থাকবে।
কিন্তু কিছু মুহূর্ত সমস্ত তর্কের ঊর্ধ্বে।
প্রিয়জনকে হারানো তেমনই একটি মুহূর্ত।
সেখানে দেশের জার্সি আলাদা নয়, ক্লাবের ইতিহাস আলাদা নয়, ব্যক্তিগত রেকর্ডও কোনও অর্থ বহন করে না।
সেখানে একজন মানুষ আর একজন মানুষের পাশে দাঁড়ান।
মেসির জীবনের এই কঠিন অধ্যায়ে রোনাল্ডো ও নেমারের বার্তা সেই মানবিকতারই প্রতিফলন।