একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন অভিনেতা হাভিয়ে বারদেম। তিনি প্রিয়ঙ্কার সঙ্গে মঞ্চে এসে সেরা আন্তর্জাতিক ছবির নাম ঘোষণা করতে গিয়ে প্যালেস্তাইন নিয়ে মন্তব্য করেন।অস্কারের মঞ্চে উঠে এল প্যালেস্তাইন প্রসঙ্গ। বিধ্বস্ত প্যালেস্তাইনকে মুক্ত করার দাবিতে সম্মতি জানালেন প্রিয়ঙ্কা চোপড়াও।এই বছরের অস্কারের মঞ্চে বার বার রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন অভিনেতা হাভিয়ের বারদেম। তিনি প্রিয়ঙ্কার সঙ্গে মঞ্চে এসে সেরা আন্তর্জাতিক ছবির নাম ঘোষণা করতে গিয়ে প্যালেস্তাইন নিয়ে মন্তব্য করেন। প্যালেস্তাইনকে মুক্ত করার বার্তা দেন তিনি।
তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে প্রিয়ঙ্কাও মাথা নেড়ে সেই বার্তায় সমর্থন জানান। এই দিন হাভিয়ের পরনের ব্লেজ়ারেও ছিল শান্তির বার্তা। লাল রঙের কালিতে লেখা ছিল ‘নো টু ওয়ার।’ মঞ্চে উঠে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ নয় এবং প্যালেস্তাইনকে মুক্ত করা হোক।’ এই বার্তাতেই সম্মতি জানান প্রিয়ঙ্কাও। দর্শকাসনও এই মন্তব্যের পরে ভরে ওঠে করতালিতে।
প্রিয়ঙ্কা ও হাভিয়ের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’র নাম ঘোষণা করেন। প্রিয়ঙ্কা এ দিন সাদা রঙের স্ট্র্যাপলেস ডিওর গাউন পরে উপস্থিত হয়েছিলেন।
আমেরিকা ও ইরানের দ্বৈরথ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে এ বার অস্কার অনুষ্ঠান ঘিরে ছিল অতিরিক্ত কড়া নিরাপত্তাও। আয়োজকেরা জানিয়েছিলেন, নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই তারা এফবিআই এবং লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করেছেন। যদিও কোনও বিপদ হতে পারে, এমন কোনও বার্তা পাননি কর্তৃপক্ষ।
উল্লেখ্য, ৯৮তম অস্কারে সেরা ছবির পুরস্কার পেয়েছে ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’। এই ছবির জন্যই সেরা পরিচালকের সম্মান পেয়েছেন পল থমাস অ্যান্ডারসন।
বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র পুরস্কার হিসেবে পরিচিত অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস বা অস্কার প্রতি বছরই আন্তর্জাতিকভাবে বিশাল আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। হলিউডের এই আয়োজন শুধু সিনেমা শিল্পের সাফল্য উদযাপন করে না, বরং এটি বিশ্ব সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রযুক্তি এবং সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিফলনও তুলে ধরে। ২০২৬ সালের ৯৮তম অস্কার অনুষ্ঠানও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তবে এবারের অনুষ্ঠানকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল অতিরিক্ত কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যার পেছনে মূল কারণ ছিল আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা।
এই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অস্কার অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা নিয়ে আয়োজকদের বিশেষ সতর্ক থাকতে হয়েছে। পাশাপাশি সিনেমা জগতেও বড় খবর ছিল— ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ ছবির ঐতিহাসিক সাফল্য এবং পরিচালক পল থমাস অ্যান্ডারসন-এর সেরা পরিচালকের পুরস্কার জয়। এই দুটি বিষয়ই এবারের অস্কারকে বিশেষভাবে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
অস্কার অনুষ্ঠান সাধারণত সিনেমা ও শিল্পের উৎসব হিসেবে দেখা হলেও, বাস্তবে এটি একটি গ্লোবাল ইভেন্ট। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের মানুষ এই অনুষ্ঠান অনুসরণ করে। তাই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেক সময় এর নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলে।
২০২৬ সালের অস্কারের আগে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অন্যতম বড় বিষয় ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা। মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক সংঘাত, সামরিক উত্তেজনা এবং কূটনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ বাড়ছিল।
যদিও অস্কার অনুষ্ঠান সরাসরি রাজনৈতিক নয়, তবুও এত বড় আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে বহু দেশ থেকে অতিথি, অভিনেতা, পরিচালক এবং সাংবাদিকরা উপস্থিত থাকেন। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে আয়োজকদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হয়েছে।
এবারের অস্কার অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা ছিল আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর। আয়োজকেরা আগেই ঘোষণা করেছিলেন যে তারা এফবিআই (FBI) এবং লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (LAPD)-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছেন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে ছিল—
অনুষ্ঠানের চারপাশে বহু স্তরের নিরাপত্তা চেকপয়েন্ট
অতিথিদের পরিচয় যাচাইয়ের উন্নত প্রযুক্তি
ড্রোন ও নজরদারি ক্যামেরার ব্যবহার
সাইবার নিরাপত্তা নজরদারি
অনুষ্ঠানস্থলের আশেপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন
এত বড় আয়োজন হওয়ার কারণে শুধু অনুষ্ঠানস্থল নয়, পুরো এলাকা জুড়েই নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছিল। রাস্তাঘাটে বিশেষ নজরদারি চালানো হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
তবে আয়োজকেরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে কোনও নির্দিষ্ট হামলার সতর্কবার্তা পাওয়া যায়নি। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়ানোর জন্য।
অস্কার অনুষ্ঠান ঘিরে নিরাপত্তা নতুন বিষয় নয়। অতীতে অনেক বড় অনুষ্ঠানেই নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে ২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে বড় পাবলিক ইভেন্টগুলিতে নিরাপত্তা অনেক বেশি কঠোর হয়ে যায়।
এরপর থেকে—
সুপার বোল
অস্কার
গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডস
বড় রাজনৈতিক অনুষ্ঠান
সব ক্ষেত্রেই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখা যায়।
অস্কার অনুষ্ঠানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তারকারা উপস্থিত থাকেন। তাই এটি শুধু বিনোদন অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি উচ্চ প্রোফাইল গ্লোবাল ইভেন্ট।
অস্কার শুধুমাত্র পুরস্কার নয়, এটি চলচ্চিত্র শিল্পের সবচেয়ে বড় সম্মান। প্রতি বছর হাজার হাজার সিনেমার মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া হয় সেরা চলচ্চিত্র, অভিনেতা, পরিচালক এবং অন্যান্য বিভাগে বিজয়ীদের।
অস্কারের গুরুত্ব কয়েকটি কারণে এত বেশি—
১. এটি চলচ্চিত্র শিল্পের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি
২. বিজয়ী সিনেমার জনপ্রিয়তা অনেক বেড়ে যায়
৩. আন্তর্জাতিক দর্শকদের মধ্যে সিনেমার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে
৪. নতুন পরিচালক ও শিল্পীদের জন্য সুযোগ তৈরি হয়
এই কারণে অস্কার শুধু হলিউডের অনুষ্ঠান নয়, বরং বিশ্ব চলচ্চিত্র শিল্পের একটি বড় উৎসব।
২০২৬ সালের অস্কারে সবচেয়ে বড় খবর ছিল ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ ছবির বিজয়।
এই সিনেমাটি সেরা চলচ্চিত্র (Best Picture) বিভাগে পুরস্কার জিতেছে। একই সঙ্গে ছবিটির পরিচালক পল থমাস অ্যান্ডারসন জিতেছেন সেরা পরিচালকের পুরস্কার (Best Director)।
এটি চলচ্চিত্র জগতের জন্য একটি বড় ঘটনা, কারণ পল থমাস অ্যান্ডারসন দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচকদের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত একজন পরিচালক।
পল থমাস অ্যান্ডারসন হলিউডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক হিসেবে পরিচিত। তিনি তার অনন্য গল্প বলার ধরন, শক্তিশালী চরিত্র নির্মাণ এবং গভীর মানবিক বিষয় তুলে ধরার জন্য বিখ্যাত।
তার কিছু উল্লেখযোগ্য সিনেমা হলো—
There Will Be Blood
Magnolia
Phantom Thread
Boogie Nights
Licorice Pizza
এই সব সিনেমা চলচ্চিত্র সমালোচকদের কাছে অত্যন্ত প্রশংসিত হয়েছে। তাই অস্কারে তার সেরা পরিচালকের পুরস্কার জয় অনেকের কাছেই প্রত্যাশিত ছিল।
এই ছবিটি শুধু বিনোদনের জন্য নয়, বরং মানব জীবনের সংগ্রাম, সমাজের বাস্তবতা এবং মানুষের মানসিক দ্বন্দ্ব তুলে ধরেছে।
সিনেমাটির গল্প মূলত মানুষের জীবনের বিভিন্ন সংগ্রামকে কেন্দ্র করে। জীবনে একের পর এক সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ আসে— সেই ধারণাটিকেই প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়েছে “এক যুদ্ধের পর আরেক যুদ্ধ” হিসেবে।
ছবিটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—
শক্তিশালী গল্প
গভীর চরিত্র নির্মাণ
বাস্তবসম্মত অভিনয়
অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি
এই কারণেই সিনেমাটি দর্শক এবং সমালোচক— দুই পক্ষের কাছেই প্রশংসা পেয়েছে।
অস্কার জয়ের ফলে একটি সিনেমার ভবিষ্যৎ অনেকটাই বদলে যায়। সাধারণত অস্কার জেতার পর—
সিনেমার বক্স অফিস আয় বাড়ে
আন্তর্জাতিক বাজারে জনপ্রিয়তা বাড়ে
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে চাহিদা বাড়ে
নির্মাতা ও অভিনেতাদের ক্যারিয়ার আরও শক্তিশালী হয়
‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ সিনেমার ক্ষেত্রেও একই বিষয় ঘটবে বলে মনে করা হচ্ছে।
হলিউড দীর্ঘদিন ধরেই রাজনীতি এবং সামাজিক বিষয় নিয়ে কথা বলে। অনেক পরিচালক ও অভিনেতা তাদের সিনেমার মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তা তুলে ধরেন।
অস্কারের মঞ্চেও অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য শোনা যায়। যেমন—
যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য
মানবাধিকার বিষয়
জলবায়ু পরিবর্তন
সামাজিক বৈষম্য
এই কারণে অস্কার শুধু সিনেমার অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি গ্লোবাল সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম।
এত কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও আয়োজকদের লক্ষ্য ছিল যেন অনুষ্ঠানের আনন্দ ও গ্ল্যামার কমে না যায়।
অস্কার অনুষ্ঠান সবসময়ই পরিচিত—
লাল গালিচা (Red Carpet)
তারকাদের ফ্যাশন
লাইভ পারফরম্যান্স
আবেগঘন বক্তৃতা
এই সবকিছু বজায় রেখেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিচালনা করা হয়েছে।
অস্কার অনুষ্ঠান শুধু আমেরিকায় নয়, সারা বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ দেখেন।
ভারতেও অস্কারের জনপ্রিয়তা অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতীয় সিনেমা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ায় দর্শকদের আগ্রহ আরও বেড়েছে।
অনেক ভারতীয় দর্শকও এখন—
অস্কার মনোনয়ন
বিজয়ীদের তালিকা
সিনেমার রিভিউ
এসব বিষয় খুব আগ্রহ নিয়ে অনুসরণ করেন।
প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে অস্কার অনুষ্ঠানও পরিবর্তিত হচ্ছে।
এখন—
ডিজিটাল স্ট্রিমিং
ভার্চুয়াল প্রোডাকশন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
নতুন ধরনের গল্প বলার পদ্ধতি
চলচ্চিত্র শিল্পকে নতুন দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
ভবিষ্যতের অস্কারে হয়তো আরও নতুন ধরনের সিনেমা এবং প্রযুক্তির প্রভাব দেখা যাবে।
২০২৬ সালের ৯৮তম অস্কার অনুষ্ঠান নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একদিকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে সিনেমা জগতেও বড় সাফল্যের খবর এসেছে।
‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ ছবির সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার এবং পল থমাস অ্যান্ডারসন-এর সেরা পরিচালকের সম্মান অস্কার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এই অনুষ্ঠান আবারও প্রমাণ করেছে যে সিনেমা শুধু বিনোদন নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক মাধ্যম, যা মানুষের চিন্তা, সমাজ এবং বিশ্ব রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
অস্কার আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শিল্প ও সৃজনশীলতা পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতিকে একত্রিত করতে পারে। নানা রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মাঝেও সিনেমা মানুষের আশা, স্বপ্ন এবং সংগ্রামের গল্প বলে যায়।