প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা জমিয়ে সরকারি সঞ্চয় প্রকল্পে প্রায় ২৫ লাখ টাকার তহবিল তৈরির সুযোগ। তবে কত বছরে এই অঙ্ক পাওয়া যাবে তা নির্ভর করবে প্রকল্পের মেয়াদ ও প্রযোজ্য সুদের হারের উপর জেনে নিন সংশ্লিষ্ট স্কিমের নিয়ম ও সঞ্চয়ের হিসাব
নিয়মিত মাসিক সঞ্চয়ের মাধ্যমে বড় অঙ্কের তহবিল তৈরির একটি উপায় হল পোস্ট অফিসের রেকারিং ডিপোজিট বা RD। এই প্রকল্পে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা জমা করা যায়। জমার সঙ্গে সুদ যুক্ত হয়ে মেয়াদ শেষে একটি তহবিল তৈরি হয়। ইন্ডিয়া পোস্টের ওয়েবসাইটে বর্তমানে ন্যাশনাল সেভিংস রেকারিং ডিপোজিট অ্যাকাউন্টের বার্ষিক সুদের হার ৬.৭ শতাংশ দেখানো হয়েছে। সুদ ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে চক্রবৃদ্ধি পদ্ধতিতে হিসাব করা হয়। প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা জমিয়ে প্রায় ২৫ লাখ টাকা পাওয়ার হিসাব এই প্রকল্পের সঙ্গে মেলে। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল সময়। পাঁচ বছরে এই অঙ্ক পাওয়া যায় না প্রাথমিক পাঁচ বছরের পরে নিয়ম মেনে আরও পাঁচ বছর কিস্তিসহ চালিয়ে যাওয়ার হিসাব এটি। পাঁচ বছরের প্রকল্প কীভাবে দশ বছর চলবে পোস্ট অফিস RD-র প্রাথমিক মেয়াদ পাঁচ বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করে আরও পাঁচ বছর মাসিক জমা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে দশ বছরের তহবিল তৈরির জন্য প্রথম মেয়াদ শেষে অ্যাকাউন্টের মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পাঁচ বছর পরে টাকা তুলে নিয়ে সঞ্চয় বন্ধ করলে দশ বছরের সম্ভাব্য অঙ্ক পাওয়া যাবে না। একইভাবে শুধু আগের টাকা রেখে দেওয়া এবং আগের টাকার পাশাপাশি প্রতি মাসে নতুন কিস্তি জমা চালিয়ে যাওয়া দুটি আলাদা হিসাব। মাসে ১৫ হাজার টাকা জমালে কত হতে পারে ডাক বিভাগের প্রকাশিত ৬.৭ শতাংশ সুদভিত্তিক সারণিতে মাসে ১৫ হাজার টাকা জমার জন্য নিচের মেয়াদান্তের অঙ্ক দেখানো হয়েছে। দশ বছরের হিসাবে প্রথম পাঁচ বছরের পরে কিস্তিসহ মেয়াদ বাড়ানো ধরা হয়েছে।
| হিসাবের বিষয় | প্রথম ৫ বছর | মোট ১০ বছর |
|---|---|---|
| মাসিক জমা | ₹১৫,০০০ | ₹১৫,০০০ |
| মোট কিস্তি | ৬০টি | ১২০টি |
| নিজের মোট জমা | ₹৯,০০,০০০ | ₹১৮,০০,০০০ |
| সুদের অংশ, প্রায় | ₹১,৭০,৪৮৭ | ₹৭,৬২,৮১৯ |
| মোট তহবিল, প্রায় | ₹১০,৭০,৪৮৭ | ₹২৫,৬২,৮১৯ |
এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, দশ বছর শেষে সম্ভাব্য ২৫.৬৩ লাখ টাকার মধ্যে নিজের জমাই ১৮ লাখ টাকা। বাকি প্রায় ৭.৬৩ লাখ টাকা সুদের অংশ। পুরো ২৫ লাখ টাকা লাভ নয়। হিসাবটি নিয়মিত কিস্তি জমা, নির্ধারিত সুদ এবং প্রকল্পের শর্ত মেনে চলার ভিত্তিতে তৈরি।
চক্রবৃদ্ধি সুদ কীভাবে সাহায্য করে চক্রবৃদ্ধি পদ্ধতিতে সুদ মূলধনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরে পরবর্তী হিসাবের ভিত্তি বড় হয়। সময় যত বাড়ে, আগের জমা ও তার উপর যুক্ত সুদ তত বেশি সময় বৃদ্ধির সুযোগ পায়। তবে RD-তে প্রতিটি কিস্তি সমান সময় সুদ পায় না। প্রথম মাসে জমা দেওয়া টাকা দীর্ঘ সময় থাকে, আর শেষের দিকের কিস্তিগুলি তুলনামূলক কম সময় থাকে। তাই দশ বছরে মোট জমা ১৮ লাখ টাকার উপর প্রথম দিন থেকেই দশ বছরের সুদ হিসাব করলে ভুল ফল পাওয়া যাবে। নিয়মিত জমা রাখার সামর্থ্য গুরুত্বপূর্ণ মাসে ১৫ হাজার টাকা সঞ্চয়ের অর্থ বছরে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা আলাদা রাখা। এই পরিকল্পনার শক্তি হল ধারাবাহিকতা। কিন্তু পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ, ঋণের কিস্তি এবং অন্যান্য দায়িত্ব মিটিয়ে এই টাকা নিয়মিত রাখা সম্ভব কি না, সেটিও বিবেচ্য। একটি বড় তহবিলের লক্ষ্য আকর্ষণীয় হলেও মাসিক জমার অঙ্ক বাস্তবসম্মত হওয়া প্রয়োজন। শুধু সম্ভাব্য মেয়াদান্তের অঙ্ক দেখে এমন কিস্তি বেছে নিলে অসুবিধা হতে পারে, যা কয়েক মাস পর চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আগে টাকা তুললে হিসাব বদলাবে দীর্ঘ মেয়াদের সঞ্চয় পরিকল্পনায় মাঝপথে টাকা প্রয়োজন হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। পোস্ট অফিস RD-তে অ্যাকাউন্ট খোলার তিন বছর পরে নিয়ম অনুযায়ী আগাম বন্ধ করার সুযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে পোস্ট অফিস সেভিংস অ্যাকাউন্টের প্রযোজ্য হারে সরল সুদ দেওয়া হয় পূর্ণ মেয়াদের RD-র প্রত্যাশিত হিসাব পাওয়া যায় না। প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা জমিয়ে বড় তহবিল তৈরি করতে সময় ও ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। পোস্ট অফিসের রেকারিং ডিপোজিট বা RD-তে মাসে ১৫ হাজার টাকা জমিয়ে প্রায় ২৫.৬৩ লাখ টাকার যে হিসাব দেখানো হয়েছে, সেটি দশ বছরের পরিকল্পনা। এখানে প্রথম পাঁচ বছরের মেয়াদ সম্পূর্ণ করার পরে নিয়ম মেনে আরও পাঁচ বছর কিস্তিসহ অ্যাকাউন্ট চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি ধরা হয়েছে। এই অঙ্ক বুঝতে নিজের জমা এবং সুদের অংশ আলাদা করা জরুরি। মাসে ১৫ হাজার টাকা করে দশ বছরে মোট ১২০টি কিস্তিতে নিজের জমা হবে ১৮ লাখ টাকা। আগের উদাহরণে ব্যবহৃত ৬.৭ শতাংশ সুদভিত্তিক সারণি অনুযায়ী মোট তহবিল প্রায় ২৫ লাখ ৬২ হাজার ৮১৯ টাকা। অর্থাৎ, সেখানে সুদের অংশ প্রায় ৭ লাখ ৬২ হাজার ৮১৯ টাকা। পুরো মেয়াদান্তের অর্থকে লাভ হিসেবে ধরলে সঞ্চয়ের প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে না।
পাঁচ বছর পরে পরিকল্পনা চালিয়ে যাওয়ার গুরুত্ব দশ বছরের লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রে প্রথম পাঁচ বছরের পরে কী করা হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক মেয়াদ শেষে টাকা তুলে নিলে দশ বছরের উদাহরণের অঙ্ক পাওয়া যাবে না। আবার আগের জমা রেখে দেওয়া এবং তার সঙ্গে প্রতি মাসে নতুন কিস্তি জমা চালিয়ে যাওয়া এই দুই পদ্ধতির ফলও এক হবে না। তাই প্রথম মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন, কিস্তি চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট শর্ত জেনে রাখলে সঞ্চয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হয়। দশ বছরের হিসাবটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। মেয়াদান্তের অঙ্ক ও মাঝপথে প্রাপ্য অর্থ আলাদা ভবিষ্যতে প্রায় ২৫.৬৩ লাখ টাকা হওয়ার সম্ভাবনা মানে এই নয় যে অ্যাকাউন্ট চালু থাকা অবস্থায় যেকোনও সময়ে ওই অর্থ তুলে নেওয়া যাবে। এটি নির্দিষ্ট মেয়াদ ও শর্ত পূরণের ভিত্তিতে দেখানো একটি হিসাব। মাঝপথে বন্ধ করলে প্রাপ্য অর্থ সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। একই কথা মেয়াদ বাড়ানোর পরের সময়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কত দিন অ্যাকাউন্ট চালানো হয়েছে এবং কখন বন্ধ করা হচ্ছে, তার ভিত্তিতে হিসাব বদলাতে পারে। তাই সম্ভাব্য মেয়াদান্তের অঙ্ককে বর্তমানের ব্যবহারযোগ্য ব্যালান্স হিসেবে দেখা ঠিক নয়। দীর্ঘ সময়ের সঞ্চয়ের পাশাপাশি হঠাৎ প্রয়োজনের জন্য সহজে ব্যবহার করা যায় এমন অর্থ আলাদা রাখলে পরিকল্পনাটি বজায় রাখা সুবিধাজনক হতে পারে। চিকিৎসা, আয় কমে যাওয়া কিংবা জরুরি পারিবারিক খরচের কারণে যেন নির্ধারিত সঞ্চয় বারবার ভাঙতে না হয়, সেই বিষয়টি বাজেটে বিবেচনা করা যায়। মাসিক জমার অঙ্ক হতে হবে বাস্তবসম্মত মাসে ১৫ হাজার টাকা সঞ্চয় করার অর্থ বছরে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা আলাদা রাখা। কয়েক মাস এই টাকা জমা দেওয়া এবং দশ বছর ধরে তা চালিয়ে যাওয়া এক ধরনের দায়িত্ব নয়। তাই শুধু বড় তহবিলের অঙ্ক দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে নিয়মিত আয় ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি। সংসার খরচ, ঋণের কিস্তি, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় মিটিয়ে কত টাকা নিয়মিত রাখা সম্ভব, সেটিই পরিকল্পনার ভিত্তি হওয়া উচিত। আয় অনিয়মিত হলে মাসিক কিস্তির ব্যবস্থা কীভাবে করা হবে, সেটিও আগে ভেবে রাখা প্রয়োজন। টেকসই সঞ্চয়ের জন্য নিজের সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অঙ্ক বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
দেখানো তহবিল ও হাতে পাওয়া নিট অর্থ উদাহরণে দেখানো প্রায় ২৫.৬৩ লাখ টাকা করের প্রভাব বাদ দেওয়ার আগের হিসাব। তাই এই পুরো অঙ্ককে করমুক্ত অর্থ বা হাতে পাওয়া নিট প্রাপ্তি হিসেবে লেখা যথাযথ নয়। প্রযোজ্য করবিধি ও ব্যক্তির পরিস্থিতি অনুযায়ী করের প্রভাব বিবেচনা করতে হবে। কোনও ভবিষ্যৎ খরচের জন্য তহবিল তৈরি করলে মোট জমার পাশাপাশি ব্যবহারযোগ্য অর্থের ধারণাও প্রয়োজন। শুধু মেয়াদান্তের বড় সংখ্যাটি দেখলে সেই পার্থক্য চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। দশ বছর পরে টাকার ক্রয়ক্ষমতা কত থাকবে ভবিষ্যতে টাকার অঙ্ক বাড়লেও জিনিসপত্র ও পরিষেবার দাম বাড়তে পারে। ফলে আজ ২৫ লাখ টাকায় যে খরচ মেটানো সম্ভব, দশ বছর পরে একই কাজের জন্য আরও বেশি অর্থ প্রয়োজন হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে কোনও খরচের বর্তমান মূল্য ১৫ লাখ টাকা হলে এবং তা বছরে গড়ে ৫ শতাংশ হারে বাড়ে ধরে নিলে দশ বছর পরে খরচটি প্রায় ২৪.৪৩ লাখ টাকা হতে পারে। এটি মূল্যবৃদ্ধি বোঝানোর একটি গাণিতিক উদাহরণ; ভবিষ্যতের নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়। সন্তানের শিক্ষা, বাড়ির কাজ কিংবা অন্য নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে সঞ্চয় করলে তাই লক্ষ্যটিও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য খরচ অনুযায়ী নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সময়ের সঙ্গে লক্ষ্য ও জমার পরিকল্পনা পর্যালোচনা করলে ঘাটতি আগে থেকে বোঝা সহজ হয়। পোস্ট অফিস RD-তে এই তহবিল তৈরির উদাহরণটির ভিত্তি হল নিয়মিত মাসিক জমা, নির্ধারিত সময় সম্পূর্ণ করা এবং যথাযথভাবে মেয়াদ বাড়ানো। অ্যাকাউন্ট খোলার সময় প্রযোজ্য সুদ ও নিয়ম নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর, প্রয়োজনের সময়ে অর্থ ব্যবহারের সুযোগ এবং মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বুঝে নিলে পরিকল্পনাটি বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা সম্ভব হবে।