Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

১৮ বছরের জুটি ভাঙল! চেন্নাইয়ের কোচিং ছাড়লেন ফ্লেমিং, উত্তরসূরি কে জল্পনা তুঙ্গে

দীর্ঘ ১৮ বছরের সম্পর্কের অবসান। চেন্নাই সুপার কিংসের প্রধান কোচের পদ ছাড়লেন স্টিফেন ফ্লেমিং। ২০০৯ সাল থেকে মহেন্দ্র সিংহ ধোনিদের দায়িত্ব সামলে পাঁচবার আইপিএল জেতানো এই সফল কোচের উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জোর জল্পনা।

CSK-তে ১৮ বছরের যুগের অবসান! কোচের পদ ছাড়লেন স্টিফেন ফ্লেমিং, শেষ ধোনি-ফ্লেমিং অধ্যায়

আইপিএলের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায়ের অবসান ঘটল। চেন্নাই সুপার কিংসের প্রধান কোচের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেন স্টিফেন ফ্লেমিং। ২০০৮ সালে ক্রিকেটার হিসেবে যে ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে তাঁর পথচলা শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে সেই দীর্ঘ সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল। চেন্নাই সুপার কিংস ও ফ্লেমিং পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতেই আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ফ্লেমিংয়ের বিদায় কেবল একজন প্রধান কোচের পদত্যাগ নয়। এটি আইপিএলের সবচেয়ে স্থায়ী, সফল এবং প্রভাবশালী ক্রিকেটীয় অংশীদারত্বগুলির একটির সমাপ্তি। মহেন্দ্র সিংহ ধোনির নেতৃত্ব এবং স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের ক্রিকেটীয় পরিকল্পনা—এই দুইয়ের অসাধারণ সমন্বয়েই দীর্ঘদিন ভারতীয় ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে আধিপত্য বিস্তার করেছে চেন্নাই সুপার কিংস।

চেন্নাই সুপার কিংসের পক্ষ থেকে ১৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় যে, ফ্র্যাঞ্চাইজি এবং স্টিফেন ফ্লেমিং পারস্পরিক সম্মতিতে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দীর্ঘ আলোচনার পর সম্মান ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দল। েটার থেকে চেন্নাইয়ের প্রধান কোচ

২০০৮ সালে আইপিএলের উদ্বোধনী মরসুমে চেন্নাই সুপার কিংসের ক্রিকেটার হিসেবে খেলেছিলেন নিউজিল্যান্ডের প্রাক্তন অধিনায়ক স্টিফেন ফ্লেমিং। সেই সময় থেকেই চেন্নাই ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে তাঁর একটি বিশেষ সম্পর্ক তৈরি হয়। ক্রিকেটার হিসেবে তাঁর আইপিএল সফর খুব বেশি দীর্ঘ না হলেও ফ্লেমিংয়ের ক্রিকেটীয় বুদ্ধিমত্তা, নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা এবং খেলোয়াড়দের বোঝার ক্ষমতা দ্রুতই চেন্নাই কর্তৃপক্ষের নজর কেড়েছিল।

২০০৯ সালের আইপিএলের আগে তাঁকে চেন্নাই সুপার কিংসের প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ করা হয়। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বছরের পর বছর খেলোয়াড় বদলেছে, অধিনায়কত্বে পরিবর্তন এসেছে, আইপিএলের নিয়ম ও প্রতিযোগিতার চরিত্র বদলেছে—কিন্তু চেন্নাইয়ের ডাগআউটে প্রায় অপরিবর্তিত ছিলেন স্টিফেন ফ্লেমিং।

একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রধান কোচ হিসেবে এত দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা আধুনিক পেশাদার খেলাধুলায় অত্যন্ত বিরল। আইপিএলের মতো ফলাফলনির্ভর প্রতিযোগিতায় দু’একটি খারাপ মরসুমের পরেই যেখানে কোচ ও সাপোর্ট স্টাফদের সরিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে ফ্লেমিংয়ের উপর প্রায় দুই দশক ধরে আস্থা রেখেছিল চেন্নাই সুপার কিংস।

এই দীর্ঘ সম্পর্কের ভিত্তি ছিল সাফল্য, বিশ্বাস, স্থিতিশীলতা এবং একই ধরনের ক্রিকেটীয় দর্শন। চেন্নাই কর্তৃপক্ষ দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া বা ঘন ঘন পরিবর্তনের পরিবর্তে নির্দিষ্ট খেলোয়াড় ও কোচিং ব্যবস্থার উপর দীর্ঘমেয়াদি আস্থা রাখার নীতি অনুসরণ করেছে। ফ্লেমিং ছিলেন সেই নীতির অন্যতম প্রধান নির্মাতা।

পারস্পরিক সিদ্ধান্তে শেষ হল ঐতিহাসিক সম্পর্ক

চেন্নাই সুপার কিংসের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য অনুযায়ী, ফ্লেমিংকে একতরফাভাবে সরানো হয়নি। ফ্র্যাঞ্চাইজি কর্তৃপক্ষ এবং প্রধান কোচের মধ্যে খোলামেলা আলোচনার পর পারস্পরিক সম্মতিতে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

দলের ম্যানেজিং ডিরেক্টর কেএস বিশ্বনাথন ফ্লেমিংয়ের অবদানের প্রশংসা করে জানিয়েছেন, চেন্নাই কীভাবে ক্রিকেট খেলবে এবং একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে কোন মূল্যবোধ অনুসরণ করবে—সেই পরিচয় নির্মাণে ফ্লেমিংয়ের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর মতে, ধারাবাহিকতা, বিনয়, দলকে ব্যক্তিগত স্বার্থের উপরে রাখা এবং খেলোয়াড়দের সেরা পারফরম্যান্স বের করে আনার সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন ফ্লেমিং। বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিত্ব ও অভিজ্ঞতার ক্রিকেটারদের বোঝার ক্ষমতাই ছিল তাঁর অন্যতম বড় শক্তি। বিদায়ের সময় চেন্নাই সুপার কিংসের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘ এই সময়কে তিনি নিজের কোচিং জীবনের বিশেষ অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দায়িত্ব ছাড়লেও ভবিষ্যতে তিনি চেন্নাই সুপার কিংসের সমর্থক হিসেবেই থাকবেন বলে জানিয়েছেন।

এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, সম্পর্কের সমাপ্তি হলেও দুই পক্ষের মধ্যে কোনও প্রকাশ্য তিক্ততা নেই। বরং সাফল্য ও স্মৃতিতে ভরা দীর্ঘ পথচলার শেষে সম্মানজনকভাবেই নতুন অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে চেন্নাই এবং ফ্লেমিং।

পাঁচটি IPL খেতাবের নেপথ্যের কারিগর

স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের কোচিংয়ে চেন্নাই সুপার কিংস মোট পাঁচবার আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ২০১০, ২০১১, ২০১৮, ২০২১ এবং ২০২৩ সালে ট্রফি জিতেছে হলুদ জার্সির দল।

এই পাঁচটি ট্রফির প্রত্যেকটির পিছনে ছিল আলাদা গল্প। কখনও তারকায় ভরা শক্তিশালী দল নিয়ে আধিপত্য বিস্তার করেছে চেন্নাই, আবার কখনও বয়স, দল নির্বাচন কিংবা নিলামের কৌশল নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েও চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

২০১০ সালে প্রথমবার আইপিএল ট্রফি জয়ের মাধ্যমে চেন্নাই সুপার কিংসের সোনালি অধ্যায়ের সূচনা হয়। পরের বছর, অর্থাৎ ২০১১ সালে খেতাব ধরে রেখে তারা প্রমাণ করে যে প্রথম সাফল্য কোনও আকস্মিক ঘটনা ছিল না। পরপর দু’বার আইপিএল জিতে প্রতিযোগিতার অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত হয় চেন্নাই।

news image
আরও খবর

এরপর ২০১৮ সালের প্রত্যাবর্তন ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম স্মরণীয় কাহিনি। দুই বছরের নির্বাসনের পর আইপিএলে ফিরে এসেই চ্যাম্পিয়ন হয় চেন্নাই সুপার কিংস। সেই সময় দলে একাধিক অভিজ্ঞ ও তুলনামূলক বেশি বয়সের ক্রিকেটার থাকায় অনেকেই দলটিকে ‘ড্যাডস আর্মি’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন। কিন্তু ফ্লেমিং ও ধোনি অভিজ্ঞতাকেই সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত করেন।

২০২১ সালে আরও একবার পরিকল্পনা, অভিজ্ঞতা এবং ধারাবাহিকতার শক্তি দেখিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় চেন্নাই। ২০২৩ সালে গুজরাট টাইটান্সকে হারিয়ে পঞ্চম আইপিএল ট্রফি জেতে তারা। সেই জয়ের মাধ্যমে সর্বাধিক সফল আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলির মধ্যে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে চেন্নাই।

একটি নয়, দুটি Champions League T20 ট্রফি

ফ্লেমিংয়ের রেকর্ড নিয়ে আলোচনা করার সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। তাঁর কোচিংয়ে চেন্নাই সুপার কিংস একটি নয়, মোট দুটি Champions League T20 খেতাব জিতেছে।

২০১০ এবং ২০১৪ সালে Champions League T20 প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল চেন্নাই। ফলে ফ্লেমিংয়ের অধীনে দলটির মোট বড় ট্রফির সংখ্যা সাতটি—পাঁচটি IPL এবং দুটি Champions League T20।

রয়টার্সের প্রতিবেদন ও ফ্লেমিংয়ের কোচিং রেকর্ডেও পাঁচটি IPL এবং দুটি Champions League T20 খেতাবের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। s League T20 বর্তমানে আর আয়োজন করা না হলেও একসময় বিভিন্ন দেশের সেরা ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি দলগুলিকে নিয়ে এই প্রতিযোগিতা হত। সেখানে দু’বার চ্যাম্পিয়ন হওয়া চেন্নাইয়ের আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে শক্তিশালী অবস্থানের পরিচয় বহন করে।

দশটি IPL ফাইনালে চেন্নাই

স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের কোচিংয়ে চেন্নাই সুপার কিংস মোট দশটি আইপিএল ফাইনালে অংশ নিয়েছে। ২০০৮ সালের ফাইনালে ফ্লেমিং দলের ক্রিকেটার ছিলেন। ২০০৯ সাল থেকে তিনি প্রধান কোচের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

চেন্নাই ২০০৮, ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৩, ২০১৫, ২০১৮, ২০১৯, ২০২১ এবং ২০২৩ সালের আইপিএল ফাইনালে খেলেছে। এর মধ্যে পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন এবং পাঁচবার রানার্স-আপ হয়েছে দলটি।

ফ্লেমিংয়ের ব্যক্তিগত IPL কোচিং ক্যারিয়ারে ফাইনালের সংখ্যা আরও একটি বেশি। কারণ ২০১৬ ও ২০১৭ সালে চেন্নাই সুপার কিংস নির্বাসিত থাকাকালীন তিনি রাইজিং পুণে সুপারজায়ান্টের প্রধান কোচ ছিলেন। ২০১৭ সালে পুণে আইপিএল ফাইনালে উঠেছিল। সেই হিসাব ধরলে ফ্লেমিং প্রধান কোচ হিসেবে মোট ১১টি IPL ফাইনালের অংশ ছিলেন।

তবে শুধু চেন্নাই সুপার কিংসের রেকর্ড বিবেচনা করলে দলটি মোট দশটি IPL ফাইনাল খেলেছে। এই ধারাবাহিকতা দেখায় যে ফ্লেমিংয়ের সাফল্য কেবল ট্রফির সংখ্যায় সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রায় প্রতি কয়েক বছর অন্তর দলকে ফাইনাল কিংবা প্লে-অফের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াও ছিল তাঁর বড় কৃতিত্ব।

ধোনি ও ফ্লেমিং—সাফল্যের ঐতিহাসিক জুটি

চেন্নাই সুপার কিংসের সাফল্যের আলোচনা মহেন্দ্র সিংহ ধোনি এবং স্টিফেন ফ্লেমিংকে আলাদা করে করা প্রায় অসম্ভব। মাঠের ভিতরে ধোনির সিদ্ধান্ত এবং মাঠের বাইরে ফ্লেমিংয়ের পরিকল্পনা মিলেই তৈরি হয়েছিল আইপিএলের অন্যতম কার্যকর নেতৃত্বব্যবস্থা।

দু’জনেই ছিলেন শান্ত স্বভাবের। কঠিন পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে আবেগ দেখানো বা আতঙ্কিত হয়ে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলার প্রবণতা তাঁদের মধ্যে খুব কমই দেখা গিয়েছে। এই মানসিক স্থিরতা দলের ক্রিকেটারদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল।

কোনও খেলোয়াড় কয়েকটি ম্যাচে ব্যর্থ হলে তাঁকে দ্রুত বাদ দেওয়ার পরিবর্তে পর্যাপ্ত সুযোগ দিত চেন্নাই। দলের ভূমিকা, ব্যাটিং অর্ডার এবং বোলিং পরিকল্পনা সম্পর্কে ক্রিকেটারদের স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হত। ফলে খেলোয়াড়েরা জানতেন, তাঁদের ঠিক কী দায়িত্ব পালন করতে হবে।

ফ্লেমিং নিজেও একাধিকবার চেন্নাইয়ের সাফল্যের কৃতিত্ব খেলোয়াড় এবং ধোনির নেতৃত্বকে দিয়েছেন। পাঁচটি IPL খেতাবের কৃতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানিয়েছিলেন, মাঠে শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়েরাই পারফর্ম করেন। একই সঙ্গে ধোনির মতো একজন অসাধারণ অধিনায়কের সঙ্গে কাজ করতে পারাকে নিজের সৌভাগ্য বলেও উল্লেখ করেছিলেন। ্লেমিংয়ের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ছিল চেন্নাইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি। নিলামে কোন ধরনের ক্রিকেটার নেওয়া হবে, ম্যাচের প্রথম একাদশ কেমন হবে, অভিজ্ঞদের কতটা সুযোগ দেওয়া হবে কিংবা তরুণদের কীভাবে তৈরি করা হবে—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দু’জনের ক্রিকেটীয় দর্শনে গভীর মিল ছিল।

Preview image