৭৬ বছর বয়সে জটিল ল্যাম্বার স্পাইন অস্ত্রোপচার হল অভিনেতা শরৎ সাক্সেনার। তবে সবাইকে চমকে দিয়ে অস্ত্রোপচারের মাত্র ২৭ দিনের মাথায় আবার কাজে ফিরলেন প্রবীণ অভিনেতা। এই বয়সেও শরীর শক্তপোক্ত রাখতে কী ধরনের ব্যায়াম করা ভাল?
৭৬ বছর বয়সেও শরীরচর্চা ও কাজের প্রতি নিষ্ঠার নজির গড়লেন অভিনেতা শরৎ সাক্সেনা। জটিল ল্যাম্বার স্পাইন অস্ত্রোপচারের মাত্র ২৭ দিনের মাথায় আবার শুটিংয়ে ফিরে সবাইকে চমকে দিয়েছেন প্রবীণ অভিনেতা। বয়সের ভার কিংবা অস্ত্রোপচারের ধাক্কা—কোনও কিছুই যেন তাঁর কর্মস্পৃহাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তবে তাঁর এই দ্রুত কাজে ফেরার ঘটনা আরও এক বার মনে করিয়ে দিল, বয়স বাড়লেও শরীরের যত্ন, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পেশির শক্তি বজায় রাখার গুরুত্ব কতটা। বিশেষ করে ষাট বা সত্তর বছর পেরিয়ে গেলে মেরুদণ্ডের সুস্থতা ও শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে মেরুদণ্ডের শক্তি ও নমনীয়তা কমে যাওয়ার কারণ কী? প্রবীণ বয়সে কোমর, পিঠ কিংবা ঘাড়ের ব্যথা এড়াতে কী ধরনের ব্যায়াম করা যেতে পারে? শরৎ সাক্সেনার শারীরিক সমস্যা থেকেই বা কী শিক্ষা নেওয়া যায়?
প্রবীণ অভিনেতা শরৎ সাক্সেনার যে সমস্যার জন্য মেরুদণ্ডে অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছিল, তার নাম ল্যাম্বার ক্যানেল স্টেনোসিস। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, মেরুদণ্ডের নীচের অংশে স্নায়ু যাওয়ার পথ বা স্পাইনাল ক্যানাল সরু হয়ে গেলে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর ফলে স্নায়ুর উপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং কোমরে ব্যথা, পায়ে ঝিনঝিন করা, অসাড়তা, দুর্বলতা কিংবা হাঁটাচলার অসুবিধা হতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে মেরুদণ্ডের হাড়, ডিস্ক, লিগামেন্ট ও অন্যান্য কাঠামোয় স্বাভাবিক ক্ষয়জনিত পরিবর্তন ঘটতে পারে। কখনও হাড়ের বাড়তি বৃদ্ধি বা লিগামেন্ট মোটা হয়ে যাওয়ার কারণেও স্নায়ুর চলাচলের জায়গা কমে যায়। তবে বয়স বাড়লেই যে প্রত্যেকের এই সমস্যা হবে, এমন নয়।
শরৎ সাক্সেনার ক্ষেত্রে এই সমস্যার কারণে সোজা হয়ে দাঁড়ানো ও হাঁটাচলা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পরে তিনি আবার হাঁটতে সক্ষম হয়েছেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই কাজে ফিরেছেন। তবে কোনও অস্ত্রোপচারের পর কত দ্রুত সুস্থ হওয়া সম্ভব, তা নির্ভর করে রোগীর শারীরিক অবস্থা, অস্ত্রোপচারের ধরন, পুনর্বাসন এবং চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলার উপর।
মেরুদণ্ড আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো। এটি শরীরকে সোজা রাখতে সাহায্য করে, বিভিন্ন অঙ্গের সঙ্গে মস্তিষ্কের যোগাযোগ রক্ষাকারী স্নায়ুকে সুরক্ষা দেয় এবং বসা, দাঁড়ানো, হাঁটা ও শরীর ঘোরানোর মতো দৈনন্দিন কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে পেশির ভর ও শক্তি কমতে পারে। হাড়ের ঘনত্ব হ্রাস, জয়েন্টের ক্ষয়, শরীরের ভারসাম্য কমে যাওয়া এবং নমনীয়তা হারানোর মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। দীর্ঘ সময় বসে থাকা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ভুল ভঙ্গিতে বসা কিংবা অতিরিক্ত ওজনের কারণেও কোমর ও পিঠের উপর চাপ বাড়তে পারে।
তবে নিয়মিত ও উপযুক্ত শরীরচর্চা পেশির শক্তি বজায় রাখতে, শরীরের ভারসাম্য উন্নত করতে এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম সহজ করতে সাহায্য করতে পারে। ব্যায়াম সব ধরনের মেরুদণ্ডের রোগ প্রতিরোধ করতে পারে না, কিন্তু ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী সঠিক ব্যায়াম করলে চলাফেরার ক্ষমতা বজায় রাখতে সুবিধা হয়।
ষাট বা সত্তর বছর পেরিয়ে গেলেই ব্যায়াম বন্ধ করে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং বয়স ও শারীরিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত নড়াচড়া করা জরুরি। তবে কোমরে ব্যথা, মেরুদণ্ডের রোগ, অস্টিওপোরোসিস, সাম্প্রতিক অস্ত্রোপচার কিংবা ভারসাম্যের সমস্যা থাকলে ব্যায়াম শুরুর আগে চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
চেয়ার ব্যবহার করে করা কিছু হালকা মোচড়ের ব্যায়াম শরীরের নড়াচড়ার ক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে মেরুদণ্ডের সমস্যা থাকলে কোমর থেকে গভীরভাবে মোচড় দেওয়া নিরাপদ নাও হতে পারে।
ব্যায়ামটি করার আগে একটি স্থির চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন। পা দু'টি মেঝেতে রাখুন এবং কাঁধ শিথিল রাখুন। চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্ট অনুমতি দিলে ধীরে ধীরে শরীরের উপরিভাগ এক দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিন এবং কোনও অবস্থাতেই জোর করে শরীর মোচড়াবেন না।
কী উপকার হতে পারে? উপযুক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া শরীরের নমনীয়তা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে ল্যাম্বার ক্যানেল স্টেনোসিস বা তীব্র কোমরব্যথা থাকলে এই ব্যায়াম নিজে থেকে শুরু করা উচিত নয়।
পেলভিক টিল্ট হল কোমর ও শ্রোণি অঞ্চলের নড়াচড়ার একটি সহজ ব্যায়াম। নির্দিষ্ট কিছু কোমরব্যথার ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপিস্টের নির্দেশে এটি ব্যবহার করা হয়।
প্রথমে চিত হয়ে শুয়ে হাঁটু দু'টি ভাঁজ করুন। পায়ের পাতা মেঝেতে রাখুন এবং হাত দু'টি শরীরের দু'পাশে রাখুন। পেটের পেশি আলতো করে শক্ত করে কোমরের নীচের অংশকে মেঝের দিকে নামানোর চেষ্টা করুন। স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে থাকুন। কয়েক সেকেন্ড ধরে রেখে পেশি শিথিল করুন।
শুরুতে অল্প সময় ধরে এবং কম সংখ্যায় ব্যায়ামটি করা যেতে পারে। ব্যথা বাড়লে বা পায়ে ঝিনঝিন করার মতো উপসর্গ দেখা দিলে থামতে হবে।
কী উপকার হতে পারে? সঠিক পদ্ধতিতে করলে পেটের পেশি সক্রিয় করা এবং কোমরের নিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া অনুশীলনে সাহায্য করতে পারে। তবে এটি প্রত্যেক ধরনের মেরুদণ্ডের সমস্যার জন্য উপযুক্ত নয়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে পায়ের পেশি দুর্বল হয়ে গেলে চেয়ার থেকে ওঠা, বসা কিংবা সিঁড়ি ব্যবহার করার মতো দৈনন্দিন কাজ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রবীণদের ব্যায়ামের রুটিনে নিরাপদভাবে পায়ের শক্তি বাড়ানোর অনুশীলন গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমে একটি মজবুত চেয়ার দেওয়ালের কাছে রাখুন, যাতে সেটি পিছলে না যায়। চেয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে প্রয়োজন হলে হাত দিয়ে অন্য কোনও স্থির অবলম্বন ধরুন। ধীরে ধীরে হাঁটু ভাঁজ করে চেয়ারে বসার মতো অবস্থানে যান। তারপর পায়ের সাহায্যে ধীরে উঠে দাঁড়ান। শুরুতে চেয়ারে বসে আবার ওঠার অনুশীলনই যথেষ্ট হতে পারে।
কী উপকার হতে পারে? নিয়মিত ও উপযুক্ত অনুশীলন পায়ের পেশির শক্তি বাড়াতে এবং দৈনন্দিন চলাফেরা সহজ করতে সাহায্য করতে পারে। তবে ভারসাম্যের সমস্যা থাকলে একা এই ব্যায়াম করবেন না।
তাড়াসন বা মাউন্টেন পোজ হল যোগাসনের একটি পরিচিত ভঙ্গি। এটি সঠিকভাবে করলে শরীরের অবস্থান সম্পর্কে সচেতনতা ও স্থিরভাবে দাঁড়ানোর অনুশীলনে সাহায্য করতে পারে।
প্রথমে পা দু'টি আরামদায়ক দূরত্বে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ান। দুই কাঁধ শিথিল রাখুন এবং শরীরের ওজন দুই পায়ের উপর সমানভাবে রাখার চেষ্টা করুন। স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিন। প্রয়োজন হলে দেওয়াল বা মজবুত চেয়ার ধরে অনুশীলন করুন।
হাত মাথার উপর তুলতে বা গোড়ালি মাটি থেকে তুলতে গিয়ে ভারসাম্য নষ্ট হলে সেই অংশটি বাদ দিন। সবার জন্য একই ভঙ্গি উপযুক্ত নয়।
কী উপকার হতে পারে? শরীরের ভঙ্গি ও ভারসাম্য অনুশীলনে সাহায্য করতে পারে। তবে তাড়াসন মেরুদণ্ডের ক্ষয় সারিয়ে দেয় বা স্নায়ুর উপর চাপ কমিয়ে দেয়—এমন দাবি করা ঠিক নয়।
ব্যায়ামের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনের কয়েকটি অভ্যাসও প্রবীণ বয়সে মেরুদণ্ড ও পেশির যত্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নিয়মিত হাঁটুন: শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী অল্প সময় ধরে হাঁটা দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে সমতল জায়গা বেছে নিন এবং হাঁটার সময় উপযুক্ত জুতো পরুন। হাঁটলে ব্যথা বাড়লে বা পায়ে দুর্বলতা অনুভব করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
একটানা বসে থাকবেন না: দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে বসে থাকার পরিবর্তে মাঝেমধ্যে উঠে দাঁড়ানো বা হালকা নড়াচড়া করা ভালো। তবে দাঁড়ালে ব্যথা বাড়ে এমন রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে।
সঠিক ভঙ্গিতে বসুন: বসার সময় পিঠকে আরামদায়ক সমর্থন দিন এবং পা মেঝেতে রাখুন। দীর্ঘক্ষণ ঝুঁকে বসা এড়িয়ে চলুন। কোনও ভঙ্গিতেই অস্বস্তি হলে অবস্থান পরিবর্তন করুন।
পুষ্টিকর খাবার খান: হাড় ও পেশির স্বাস্থ্যের জন্য পর্যাপ্ত প্রোটিন, ক্যালশিয়াম এবং ভিটামিন ডি গুরুত্বপূর্ণ। বয়স, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে কোন খাবার বা সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন, তা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: অতিরিক্ত ওজন কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কোমর ও পিঠের উপর চাপ বাড়াতে পারে। সুষম খাবার এবং নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
পড়ে যাওয়া এড়ানোর ব্যবস্থা করুন: বাড়ির মেঝে শুকনো ও বাধামুক্ত রাখুন। বাথরুমে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্র্যাব বার বা হাতল ব্যবহার করুন। দৃষ্টিশক্তি, জুতো এবং চলাফেরার সহায়ক যন্ত্রের উপযুক্ততাও খেয়াল রাখা জরুরি।
সব ব্যায়াম সবার জন্য উপযুক্ত নয়। বিশেষ করে ল্যাম্বার ক্যানেল স্টেনোসিস, অস্টিওপোরোসিস, স্নায়ুর সমস্যা কিংবা সাম্প্রতিক মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচারের পরে কিছু নড়াচড়ায় উপসর্গ বেড়ে যেতে পারে।
চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া গভীরভাবে কোমর মোচড়ানো, জোর করে সামনে ঝোঁকা, ভারী ওজন তোলা বা ব্যথা উপেক্ষা করে ব্যায়াম করা উচিত নয়। অস্ত্রোপচারের পরে কখন হাঁটা শুরু করবেন, কতটা ঝুঁকবেন এবং কোন ব্যায়াম করা যাবে, তা সার্জন ও ফিজিওথেরাপিস্টের নির্দেশ অনুযায়ী ঠিক করতে হবে।
ব্যায়াম করার সময় কোমর থেকে পায়ে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা, নতুন করে অসাড়তা বা দুর্বলতা, কিংবা হাঁটাচলার সমস্যা বাড়লে অনুশীলন বন্ধ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
বিশেষ করে প্রস্রাব বা পায়খানা নিয়ন্ত্রণে নতুন সমস্যা, যৌনাঙ্গ বা নিতম্বের মাঝের অংশে অসাড়তা কিংবা দুই পায়ে দ্রুত বাড়তে থাকা দুর্বলতা দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। এই উপসর্গগুলি গুরুতর স্নায়ুর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
শরৎ সাক্সেনার দ্রুত কাজে ফিরে আসার ঘটনা প্রবীণ বয়সেও সক্রিয় থাকার অনুপ্রেরণা জোগায়। তবে তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা উচিত নয় যে প্রত্যেকের অস্ত্রোপচারের পর একই সময়ে সুস্থ হয়ে ওঠা সম্ভব। প্রত্যেক রোগীর শারীরিক অবস্থা, রোগের জটিলতা এবং পুনর্বাসনের প্রয়োজন আলাদা।
মেরুদণ্ডের সুস্থতা বজায় রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল নিজের শরীরের সীমাবদ্ধতা বুঝে চলা, নিয়মিত নিরাপদ শারীরিক সক্রিয়তা বজায় রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। সঠিক ব্যায়াম পেশির শক্তি, নমনীয়তা ও ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে ব্যথা বা স্নায়ুর সমস্যাকে অবহেলা করে ব্যায়াম করা বিপজ্জনক হতে পারে।
মনে রাখবেন: বয়স বাড়া মানেই ব্যায়াম বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং সঠিক পরামর্শ, নিয়মিত অনুশীলন এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে প্রবীণ বয়সেও অনেকের পক্ষে সক্রিয় ও স্বনির্ভর থাকা সম্ভব।