প্রাণে বাঁচতে কেউ দেওয়াল ভাঙার চেষ্টা করেছিলেন। কেউ মৃত্যু নিশ্চিত বুঝে শেষ বার ফোন করেছিলেন বাড়িতে। আনন্দপুরের সেই অগ্নিকাণ্ডের পর ২৪ দিন কেটে গিয়েছে। এখনও কারও দেহ পায়নি পরিবার।
এক এক করে ২৪টা দিন পেরিয়ে গেছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিন বদলেছে, কিন্তু আনন্দপুরের নাজিরাবাদের সেই অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজদের পরিবারগুলির কাছে সময় যেন থমকে আছে সেই রাতেই। ২৫ জানুয়ারির ভয়াবহ আগুন শুধু দু’টি গুদামকে ভস্মীভূত করেনি, ছাই করে দিয়েছে ২৭টি পরিবারের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ আর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। অথচ এত দিন পরেও মৃতদের কারও পরিচয় সরকারি ভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। পরিবারের হাতে এসেছে ১০ লক্ষ টাকা করে ‘ক্ষতিপূরণের’ চেক, কিন্তু যাঁদের জন্য সেই অর্থ—তাঁদের মৃত্যুর চূড়ান্ত সরকারি সনদ এখনও অধরা।
২৫ জানুয়ারি, গভীর রাত। আনন্দপুরের নাজিরাবাদ এলাকায় পাশাপাশি দুটি গুদামে হঠাৎই আগুন লাগে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গুদাম দু’টিতে দাহ্য পদার্থ মজুত ছিল। রাতের শিফটে কর্মরত শ্রমিক ও নিরাপত্তারক্ষীরা তখন ভিতরে কাজ করছিলেন। প্রথমে ধোঁয়া, তার পরেই দাউ দাউ করে আগুন। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
প্রাণ বাঁচাতে কেউ কেউ মরিয়া হয়ে দেওয়াল ভাঙার চেষ্টা করেছিলেন। কেউ শেষবারের মতো ফোন করেছিলেন বাড়িতে—“আগুন লেগেছে… হয়তো আর ফিরতে পারব না।” সেই ফোনকল এখন অনেক পরিবারের কাছে শেষ স্মৃতি, শেষ কণ্ঠস্বর। তার পর শুধু নিস্তব্ধতা।
দমকলের একাধিক ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় পরদিন বেলা নাগাদ আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু ততক্ষণে গুদাম দু’টি প্রায় সম্পূর্ণ ভস্মীভূত। ভিতরে কী ঘটেছিল, কত জন আটকে পড়েছিলেন—সেই প্রশ্নের উত্তর তখনও অজানা।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে একের পর এক দেহাংশ উদ্ধার করতে শুরু করে পুলিশ ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। কিন্তু আগুনের তীব্রতায় দেহগুলি এতটাই পুড়ে গিয়েছিল যে কারও পূর্ণাঙ্গ দেহ পাওয়া যায়নি। উদ্ধার হওয়া অংশগুলি দেখে বোঝা যায়নি কোনটি হাত, কোনটি পা, কোনটি কার।
পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, প্রথম থেকেই পুলিশ জানিয়ে দেয়—চোখে দেখে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন ডিএনএ পরীক্ষার। বারুইপুর মহকুমা পুলিশ সমস্ত দেহাংশ সংগ্রহ করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠায়। একই সঙ্গে ২৭টি নিখোঁজ ডায়েরি নথিভুক্ত হয় থানায়। প্রতিটি নিখোঁজের পরিবারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় ডিএনএ নমুনা—মা, বাবা, স্ত্রী, সন্তান, ভাই বা বোনের।
কিন্তু এত দিন পরেও সরকারি ভাবে নিশ্চিত করে বলা যায়নি—মোট মৃতের সংখ্যা কত। উদ্ধার হওয়া দেহাংশ ২৭ জনের, না তার কম বা বেশি—তা এখনও পরীক্ষাধীন।
অগ্নিকাণ্ডের কয়েক দিনের মধ্যেই প্রশাসনের তরফে ঘোষণা করা হয়, মৃতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। সেই মতো ২৭টি পরিবারের হাতে পৌঁছে যায় চেক। অনেকেই চোখের জলে তা গ্রহণ করেছেন। কেউ বলেছেন, “আমার মানুষটা কি টাকার বিনিময়ে ফিরে আসবে?” কেউ আবার দ্বিধায়—“সরকার যদি টাকা দেয়, তবে কি ধরে নিতে হবে ও আর নেই?”
এখানেই তৈরি হয়েছে এক গভীর নৈতিক ও মানসিক সঙ্কট। যাঁদের মৃত্যু এখনও সরকারি ভাবে নিশ্চিত হয়নি, তাঁদের পরিবারের হাতে ক্ষতিপূরণ পৌঁছে যাওয়া কি ইঙ্গিত দেয় যে প্রশাসন ধরে নিয়েছে তাঁরা মৃত? যদি তাই হয়, তবে কেন এখনও মৃত্যুসনদ দেওয়া হয়নি? আর যদি না-ই হয়, তবে এই আর্থিক সহায়তার ভিত্তি কী?
আইন অনুযায়ী, কারও মৃত্যু নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন যথাযথ প্রমাণ—দেহ শনাক্তকরণ, ডিএনএ মিল, অথবা অন্য নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য। এই ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে পরিবারগুলি এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তায় ঝুলে রয়েছে—প্রিয়জন কি সত্যিই আর নেই, নাকি এখনও কোনও অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের ক্ষীণ সম্ভাবনা আছে?
বাংলা সমাজে মৃত্যুর পর নানা ধর্মীয় ও সামাজিক রীতি পালিত হয়—শেষকৃত্য, শ্রাদ্ধ, একাদশী, ত্রয়োদশী ইত্যাদি। কিন্তু যখন দেহই নেই, বা মৃত্যুর সরকারি সনদ নেই, তখন সেই আচার কীভাবে সম্পন্ন হবে?
অনেক পরিবার দ্বিধায়—শেষকৃত্য না করলে আত্মার শান্তি হবে তো? আবার মৃত্যুসনদ ছাড়া অনেক পুরোহিত বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক ক্রিয়া করতে চাইছেন না। কেউ কেউ প্রতীকী ভাবে ছবি বা পোশাক সামনে রেখে ক্রিয়া সেরেছেন। কিন্তু মনের মধ্যে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—“যদি ভুল করি?”
এই অনিশ্চয়তা মানসিক যন্ত্রণা আরও বাড়িয়ে তুলছে। শোকের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া আছে—অস্বীকার, ক্রোধ, হতাশা, গ্রহণ। কিন্তু এখানে ‘গ্রহণ’-এর জায়গাটাই স্পষ্ট নয়। ফলে পরিবারগুলি দীর্ঘস্থায়ী ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এত তীব্র অগ্নিকাণ্ডে দেহাংশ থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। উচ্চ তাপমাত্রায় জিনগত উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সময় একাধিক ব্যক্তির দেহাংশ মিশে যেতে পারে। ফলে প্রতিটি নমুনা আলাদা করে বিশ্লেষণ, তুলনা ও মিল খুঁজে বের করতে সময় লাগে।
তবে প্রশ্ন উঠছে—২৪ দিন পেরিয়ে গেলেও কেন এখনও কোনও প্রাথমিক রিপোর্ট প্রকাশ হয়নি? প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, পরীক্ষার কাজ চলছে। কিন্তু পরিবারগুলির দাবি, অন্তত অগ্রগতির হাল জানানো হোক। নীরবতা তাঁদের উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ নিয়ে তদন্ত চলছে। গুদামগুলিতে কি পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল? জরুরি নির্গমনপথ খোলা ছিল? দাহ্য পদার্থ সঠিক নিয়মে সংরক্ষণ করা হয়েছিল? শ্রমিকদের কি অগ্নিনিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল?
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, রাতের শিফটে উপস্থিত কর্মীদের অনেকেই বাইরে বেরোতে পারেননি। যদি নিরাপত্তা বিধি যথাযথ মানা হত, তবে কি প্রাণহানি এড়ানো যেত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা।
যদি গাফিলতি প্রমাণিত হয়, তবে দায় কার? মালিকপক্ষ, ব্যবস্থাপনা, নাকি নজরদারির দায়িত্বে থাকা প্রশাসন? নিহতদের পরিবার শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, ন্যায়বিচারও চাইছে।
১০ লক্ষ টাকা একটি পরিবারের জন্য সাময়িক আর্থিক স্বস্তি আনতে পারে—বিশেষত যদি মৃত ব্যক্তি পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই অর্থ কি যথেষ্ট? সন্তানদের পড়াশোনা, বয়স্ক বাবা-মায়ের চিকিৎসা, দৈনন্দিন খরচ—সব মিলিয়ে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—ক্ষতিপূরণ কি ন্যায়বিচারের বিকল্প? অনেক পরিবার বলছে, “টাকা নয়, আমরা সত্য জানতে চাই। কী ভাবে আগুন লাগল, কেন আমাদের মানুষটা ফিরল না—তার জবাব চাই।”
এই ঘটনার পর শুধু ২৭টি পরিবার নয়, গোটা এলাকার মানুষ আতঙ্কে। শিল্পাঞ্চলে কর্মরত বহু শ্রমিক এখন নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। রাতের শিফটে কাজ করতে ভয় পাচ্ছেন অনেকে।
পরিবারগুলির মধ্যে দেখা দিচ্ছে অবসাদ, অনিদ্রা, আতঙ্কজনিত সমস্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে কাউন্সেলিং অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই সহায়তা পৌঁছয় না।
২৪ দিন কেটে গেছে। প্রতিদিন ফোনের অপেক্ষা—“ডিএনএ রিপোর্ট এসেছে।” প্রতিদিন থানায় খোঁজ—“কিছু জানা গেল?” প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে নজর—“কোনও আপডেট আছে?”
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আশা ক্ষীণ হচ্ছে, কিন্তু সম্পূর্ণ নিভে যাচ্ছে না। কারণ যতক্ষণ না সরকারি ভাবে মৃত্যু নিশ্চিত হচ্ছে, ততক্ষণ একটি ক্ষীণ সম্ভাবনা বেঁচে থাকে—হয়তো কোথাও কোনও ভুল হয়েছে, হয়তো কেউ বেঁচে আছেন।
কিন্তু বাস্তব কঠোর। উদ্ধার হওয়া দেহাংশ, নিখোঁজ ডায়েরি, ক্ষতিপূরণের চেক—সব মিলিয়ে এক নির্মম সত্যের দিকেই ইঙ্গিত করছে। তবু চূড়ান্ত ঘোষণার অভাব পরিবারগুলিকে এক অদ্ভুত ‘অপেক্ষার শোক’-এর মধ্যে আটকে রেখেছে।
আনন্দপুরের এই অগ্নিকাণ্ডের ২৪ দিন পর দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় যে শব্দটি কানে বাজে, তা হল—‘অনিশ্চয়তা’। আগুনের লেলিহান শিখা অনেক আগেই নিভেছে, ধোঁয়ার কুণ্ডলী মিলিয়ে গেছে আকাশে, কিন্তু যে অনিশ্চয়তার আগুন ২৭টি পরিবারের বুকের ভিতর জ্বলছে, তা এখনও নির্বাপিত হয়নি। ক্ষতিপূরণের চেক তাঁদের হাতে পৌঁছেছে, কিন্তু প্রিয়জনের অস্তিত্বের সরকারি স্বীকৃতি এখনও অধরা। ফলে শোকের সঙ্গে মিশেছে প্রশ্ন, ক্ষোভ, অসহায়তা এবং এক অদ্ভুত অপেক্ষা।
একটি মৃত্যু যখন নিশ্চিত হয়, তখন শোকের পথচলা শুরু হয়—মানুষ ধীরে ধীরে বাস্তবকে মেনে নিতে শেখে। কিন্তু এখানে সেই প্রক্রিয়াটিই আটকে আছে। মৃত্যু যেন হয়েছে, অথচ হয়নি; হারিয়ে যাওয়া যেন নিশ্চিত, অথচ সরকারি কাগজে অনিশ্চিত। এই অবস্থাকে অনেক মনোবিদ ‘অ্যামবিগুয়াস লস’ বা অস্পষ্ট শোক বলে উল্লেখ করেন—যেখানে ক্ষতি স্পষ্ট, কিন্তু সমাপ্তি নেই। পরিবারগুলির প্রতিটি দিন কাটছে ঠিক এই মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যে। তাঁরা জানেন, প্রিয়জন হয়তো আর ফিরবেন না। তবু মনে এক কোণে প্রশ্ন—“যদি কোনও ভুল হয়ে থাকে?” এই ‘যদি’ শব্দটিই তাঁদের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে।
ক্ষতিপূরণ নিঃসন্দেহে জরুরি—বিশেষ করে যখন বহু পরিবারে মৃত ব্যক্তিই ছিলেন একমাত্র উপার্জনকারী। ১০ লক্ষ টাকা হয়তো সাময়িক আর্থিক সুরাহা দেবে। কিন্তু অর্থ কখনওই মানুষের অনুপস্থিতি পূরণ করতে পারে না। সন্তান হারানো মা-বাবা, স্বামী হারানো স্ত্রী, বাবাহারা ছোট্ট শিশু—তাঁদের জীবনের যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনও অঙ্কে মাপা যায় না। বরং অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে—এই আর্থিক সহায়তা কি মৃত্যুর নীরব স্বীকৃতি? যদি তাই হয়, তবে কেন সেই স্বীকৃতি লিখিতভাবে দেওয়া হচ্ছে না? আর যদি না হয়, তবে এই অর্থপ্রদান কোন ভিত্তিতে?
এই ঘটনার আর এক গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রশাসনিক স্বচ্ছতা। ডিএনএ পরীক্ষার প্রক্রিয়া জটিল—এ কথা সত্যি। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে কোনও স্পষ্ট অগ্রগতির খবর না পেলে স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের উদ্বেগ বাড়ে। নিয়মিত আপডেট, খোলামেলা যোগাযোগ এবং সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণ এই মুহূর্তে অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ বিপর্যয়ের পর শুধু তদন্ত নয়, প্রয়োজন আস্থার পুনর্গঠনও।
আনন্দপুরের এই অগ্নিকাণ্ড আমাদের সামনে শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্নও তুলে ধরেছে। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল? জরুরি নির্গমনপথ কি সচল ছিল? কর্মীদের কি যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল? যদি সামান্য গাফিলতিও থেকে থাকে, তবে তার মূল্য দিতে হয়েছে নিরীহ শ্রমিকদের। ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে হলে কড়া নজরদারি, নিয়মিত অডিট এবং কঠোর শাস্তির বিধান জরুরি। কারণ প্রতিটি প্রাণের মূল্য সমান—সে শ্রমিক হোক বা মালিক।
সবচেয়ে বড় কথা, এই মুহূর্তে প্রয়োজন মানবিক সহায়তা। শুধু অর্থ নয়, প্রয়োজন মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং, সামাজিক সমর্থন এবং আইনি সহায়তা। পরিবারগুলিকে একা ফেলে রাখলে চলবে না। তাঁদের পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু সহানুভূতি দেখানো নয়, বরং সক্রিয়ভাবে তাঁদের পুনর্গঠনের পথে সাহায্য করা।
একটি সমাজের শক্তি বোঝা যায় তার বিপর্যয়-পরবর্তী আচরণে। আমরা কি শুধু ক্ষতিপূরণ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করব, না কি সত্য উদ্ঘাটন, ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষার পথে এগোব? আনন্দপুরের ২৭টি পরিবার আজ সেই উত্তর খুঁজছে। তাঁরা চান না এই ঘটনা কেবল পরিসংখ্যান হয়ে থাকুক। তাঁরা চান তাঁদের প্রিয়জনদের পরিচয় ফিরে আসুক—ডিএনএ রিপোর্টের মাধ্যমে, সরকারি স্বীকৃতির মাধ্যমে, মর্যাদাপূর্ণ শেষকৃত্যের মাধ্যমে।
শেষ পর্যন্ত, এই উপসংহার কোনও সমাপ্তি নয়। বরং এটি এক দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প। যত দিন না প্রতিটি দেহাংশের পরিচয় নিশ্চিত হচ্ছে, যত দিন না প্রতিটি পরিবার পরিষ্কার উত্তর পাচ্ছে, তত দিন এই ঘটনার প্রকৃত শেষ লেখা সম্ভব নয়। শোককে গ্রহণ করার জন্য প্রয়োজন নিশ্চিত সত্য। আর সেই সত্য উদ্ঘাটনের দায়িত্ব প্রশাসনের, তদন্তকারী সংস্থার এবং আমাদের সমাজেরও।
আনন্দপুরের আগুন অনেক কিছু পুড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু যদি এই ঘটনার পর আমরা নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং মানবিকতার প্রশ্নে আরও সচেতন হই, তবে সেই ছাই থেকে হয়তো এক নতুন দায়িত্ববোধের জন্ম হবে। তবেই এই বিপর্যয়ের মধ্যেও কিছু অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে। তত দিন পর্যন্ত ২৭টি পরিবার অপেক্ষা করে থাকবে—একটি সরকারি ঘোষণার, একটি নিশ্চিত পরিচয়ের, এবং প্রিয়জনকে শেষবারের মতো বিদায় জানানোর সুযোগের জন্য।