Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

জাঁকিয়ে শীতের ইঙ্গিত! কলকাতায় পারদ ১৪ ডিগ্রিতে, কালিম্পং ছুঁল কল্যাণী

রাজ্যজুড়ে ফের শীতের দাপট। উত্তর থেকে দক্ষিণে কমছে তাপমাত্রা, কলকাতায় পারদ নেমেছে ১৪ ডিগ্রিতে, জেলাগুলিতে ঠান্ডা আরও তীব্র।

রাজ্যে ফের জাঁকিয়ে শীতের আমেজ। উত্তর থেকে দক্ষিণ—সবত্রই তাপমাত্রার পারদ নামতে শুরু করেছে। শনিবার কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে গিয়েছে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে, যা চলতি মরশুমে শহরের অন্যতম সর্বনিম্ন তাপমাত্রাগুলির মধ্যে একটি। শহরবাসী ফের সোয়েটার, জ্যাকেট, শাল-চাদরের দিকে হাত বাড়াচ্ছেন। দিনের বেলাতেও রোদের তেজ তুলনামূলক কম থাকায় শীতের অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

আলিপুর আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকালে কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২.৫ ডিগ্রি কম। শুক্রবার শহরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রাও ছিল স্বাভাবিকের নিচে—মাত্র ২৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর ফলে সকাল ও সন্ধ্যার পাশাপাশি দুপুরেও হালকা ঠান্ডার আমেজ অনুভূত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর ভারতের শীতল বায়ুপ্রবাহ এবং পরিষ্কার আকাশ মিলিয়ে রাজ্যের আবহাওয়ায় এই পরিবর্তন ঘটছে।

ফের শীতের কামব্যাক কলকাতায়

ডিসেম্বরের শেষদিকে এবং জানুয়ারির প্রথম ভাগে শীত কিছুটা কমে গিয়েছিল বলে মনে করেছিলেন অনেকেই। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শুরুতেই ফের পারদ পতনের ইঙ্গিত মিলছে। বিশেষ করে রাত ও ভোরের দিকে ঠান্ডার দাপট বেশি অনুভূত হচ্ছে। সকালবেলা হালকা কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতাও কোথাও কোথাও কিছুটা কমে আসছে, যদিও ঘন কুয়াশার সম্ভাবনা আপাতত নেই বলে জানিয়েছে হাওয়া অফিস।

কলকাতার রাস্তায় বেরোলেই চোখে পড়ছে শীতের সাজ। অফিসযাত্রী থেকে স্কুলপড়ুয়া—সকলেই হালকা গরম পোশাক পরে বেরোচ্ছেন। ফুটপাতে চায়ের দোকানগুলোতে সকাল থেকেই ভিড়, সঙ্গে গরম সিঙ্গারা, কচুরি কিংবা ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। শহরের পার্ক ও ময়দানে সকালবেলা হাঁটতে বেরোনো মানুষজনও শীতের ঠান্ডা হাওয়ায় বেশ উপভোগ করছেন দিন শুরুটা।

কুয়াশা পরিস্থিতি: দক্ষিণে স্বস্তি, উত্তরে সতর্কতা

আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে কুয়াশার দাপট অনেকটাই কমে এসেছে। কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় ভোরের দিকে কোথাও কোথাও হালকা কুয়াশা থাকতে পারে, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গে এখনও কুয়াশা নিয়ে সতর্কতা জারি রয়েছে। বিশেষ করে দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহার জেলার কিছু অংশে হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশা দেখা যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

কুয়াশার কারণে উত্তরবঙ্গের কয়েকটি অঞ্চলে দৃশ্যমানতা ৯৯৯ মিটার থেকে কমে ২০০ মিটার পর্যন্ত নেমে আসতে পারে। তবে ঘন কুয়াশার সম্ভাবনা আপাতত নেই। ফলে সড়ক ও রেল যোগাযোগে বড়সড় বিঘ্নের আশঙ্কা নেই বলেই মনে করছেন আবহবিদেরা। তবু সকালবেলায় যানবাহন চালানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

রাজ্যজুড়ে তাপমাত্রা পতনের ছবি

শুধু কলকাতা নয়, রাজ্যের প্রায় সর্বত্রই রাতের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ থেকে ১৩ ডিগ্রির মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল—নদিয়ার কল্যাণীতে পারদ নেমেছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা কার্যত উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি শহর কালিম্পংয়ের তাপমাত্রার সমান। এই ঘটনা থেকেই স্পষ্ট, শীতের দাপট এবার সমতলেও বেশ ভালোভাবেই অনুভূত হচ্ছে।

উত্তরবঙ্গের চিত্র আরও ঠান্ডার। শনিবার রাজ্যের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে দার্জিলিঙে—মাত্র ৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পাহাড়ে শীতের এই তীব্রতা নতুন নয়, তবে এ বছর জানুয়ারির শেষ ভাগে এবং ফেব্রুয়ারির শুরুতে ফের ঠান্ডা বেড়ে যাওয়ায় পর্যটকদের মধ্যেও উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কালিম্পংয়ে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা কম।

বিভিন্ন জেলার তাপমাত্রার চিত্র

শনিবার রাজ্যের বিভিন্ন জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল নিম্নরূপ—

  • দার্জিলিং: ৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (রাজ্যের শীতলতম)

  • কালিম্পং: ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস

  • কল্যাণী: ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (দক্ষিণবঙ্গের শীতলতম)

  • সিউড়ি: ১০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস

  • শ্রীনিকেতন: ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস

  • বাঁকুড়া: ১১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস

  • আসানসোল: ১১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস

  • ক্যানিং: ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস

  • বসিরহাট: ১২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস

  • পানাগড়: ১২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস

  • ব্যারাকপুর: ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস

  • বর্ধমান: ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস

  • বহরমপুর: ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস

  • কৃষ্ণনগর: ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস

  • ঝাড়গ্রাম: ১৩.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস

  • কলকাতা: ১৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস

এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যাচ্ছে, উত্তর থেকে দক্ষিণ—রাজ্যের প্রায় সব অংশেই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের নিচে নেমে এসেছে।

কেন ফের বাড়ছে ঠান্ডা?

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে বর্তমানে শক্তিশালী পশ্চিমি ঝঞ্ঝা এবং হিমালয় সংলগ্ন এলাকায় ঠান্ডা বাতাস জমে থাকায় তার প্রভাব পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতেও পড়ছে। সেই সঙ্গে রাজ্যের আকাশ পরিষ্কার থাকায় রাতে তাপ বিকিরণ (radiational cooling) বেড়ে যাচ্ছে, ফলে ভোরের দিকে তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যাচ্ছে।

এ ছাড়া, বঙ্গোপসাগর বা আশপাশে আপাতত কোনও ঘূর্ণাবর্ত বা নিম্নচাপ সক্রিয় নেই। ফলে দক্ষিণ দিক থেকে উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস ঢুকতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা শুষ্ক ও শীতল বাতাস রাজ্যের আবহাওয়ায় প্রাধান্য বিস্তার করছে। এর ফলেই ফের শীতের কামব্যাক ঘটেছে বলে মনে করছেন আবহবিদেরা।

আগামী দিনের পূর্বাভাস

আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় রাজ্যের উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের বেশিরভাগ জেলায় রাতের তাপমাত্রা আরও অন্তত ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমতে পারে। অর্থাৎ, শীতের দাপট আরও খানিকটা বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত মিলছে। তবে তার পরে তাপমাত্রায় বড় কোনও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। ফলে এই ঠান্ডা পরিস্থিতি কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে।

দিনের বেলা আকাশ থাকবে মূলত পরিষ্কার। বৃষ্টির কোনও সম্ভাবনা নেই। তুষারপাতের সম্ভাবনাও নেই, এমনকি পাহাড়ি এলাকাতেও নয়। তবে সকাল ও ভোরের দিকে হালকা কুয়াশা থাকতে পারে উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায়। দক্ষিণবঙ্গে কুয়াশার প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম থাকবে।

সকাল-সন্ধ্যায় ঠান্ডা, দুপুরে স্বস্তি

বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজ্যের সর্বত্রই সকালে ও সন্ধ্যায় শীতের অনুভূতি বেশি থাকবে। সকালের দিকে রাস্তাঘাটে ঠান্ডা হাওয়া বইবে, যার সঙ্গে মিলবে হালকা কুয়াশা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের তাপে কিছুটা উষ্ণতা ফিরবে, ফলে দুপুরে শীতের আমেজ অনেকটাই হালকা হয়ে যাবে। তবে বিকেল গড়াতেই আবার ঠান্ডার প্রকোপ বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

এই আবহাওয়া পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নানা প্রভাব ফেলছে। অফিসযাত্রীদের সকালে বেরোতে গরম পোশাকের প্রয়োজন পড়ছে। শিশু ও প্রবীণদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা, কারণ ঠান্ডার কারণে সর্দি-কাশি, জ্বর এবং শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

শহর কলকাতার শীতের রূপ

কলকাতায় ফের শীত পড়তেই শহরের চেনা ছবি বদলে যাচ্ছে। পার্ক স্ট্রিট, এসপ্ল্যানেড, গড়িয়াহাট কিংবা হাতিবাগান—সব জায়গাতেই সন্ধ্যার পর মানুষজন গরম পোশাকে দেখা যাচ্ছে। রাস্তার ধারের দোকানগুলোতে ভাপা মুড়ি, কফি, চা এবং গরম খাবারের চাহিদা বেড়েছে। অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে, দোকানিরা শীতের কথা মাথায় রেখে বিশেষ খাবারের আয়োজন করেছেন।

ভোরের দিকে ময়দানে হাঁটতে বেরোনো মানুষজনও এখন সোয়েটার বা জ্যাকেট ছাড়া বেরোতে পারছেন না। কেউ কেউ আবার গরম চা বা কফি হাতে নিয়েই হাঁটছেন। শহরের নানা পার্কে সকালের দিকে শীতের হালকা কুয়াশার মধ্যে সূর্যের আলো পড়ে তৈরি হচ্ছে মনোরম দৃশ্য।

উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে পর্যটনের মরসুম

news image
আরও খবর

দার্জিলিং, কালিম্পং, মিরিক, লাভা-লোলেগাঁও—এই সমস্ত পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে শীতের এই কামব্যাক পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে। দার্জিলিঙে ৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা মানে সকালের দিকে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া। অনেক পর্যটকই শীতের এই আবহাওয়ায় পাহাড়ি সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় জমাচ্ছেন।

হোটেল ও পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, জানুয়ারির শেষ দিকে পর্যটকের সংখ্যা কিছুটা কমে গিয়েছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শুরুতে ফের ঠান্ডা বাড়ায় পাহাড়ে ভ্রমণের আগ্রহ নতুন করে তৈরি হচ্ছে। অনেকেই তুষারপাতের সম্ভাবনা না থাকলেও পাহাড়ের শীতল আবহাওয়ায় সকালের সূর্যোদয়, কুয়াশা মোড়া পাহাড়ি দৃশ্য এবং চায়ের বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে যাচ্ছেন।

গ্রামবাংলায় শীতের প্রভাব

দক্ষিণবঙ্গের গ্রামাঞ্চলেও শীতের দাপট স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে। ভোরের দিকে মাঠে কাজ করতে বেরোনো কৃষকরা এখন গরম পোশাক পরে বেরোচ্ছেন। কুয়াশার কারণে কোথাও কোথাও ফসল কাটার কাজে সামান্য বিলম্ব হচ্ছে। তবে আবহাওয়া শুষ্ক থাকায় চাষাবাদের ক্ষেত্রে বড় কোনও সমস্যার আশঙ্কা নেই।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের শীতল ও শুষ্ক আবহাওয়া রবি শস্যের জন্য মোটের উপর অনুকূল। তবে বেশি ঠান্ডা হলে কিছু সবজি ও ফলের ক্ষেত্রে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তাই কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, রাতের দিকে সংবেদনশীল ফসল ঢেকে রাখার ব্যবস্থা করতে।

ঠান্ডায় স্বাস্থ্যের সতর্কতা

চিকিৎসকেরা বলছেন, তাপমাত্রা হঠাৎ কমে গেলে সর্দি-কাশি, জ্বর, গলা ব্যথা এবং শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং যাঁদের আগে থেকেই হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।

চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী—

  • সকালে ও রাতে গরম পোশাক পরা উচিত।

  • ঠান্ডা পানীয় ও আইসক্রিম এড়িয়ে চলা ভালো।

  • পর্যাপ্ত পরিমাণে গরম জল পান করা উচিত।

  • বাইরে থেকে এসে হাত-মুখ ভালোভাবে ধোয়া দরকার।

  • হঠাৎ ঠান্ডা বাতাসে বেরোনোর সময় মুখ ও গলা ঢেকে রাখা ভালো।

কুয়াশার প্রভাব পড়বে কি পরিবহণে?

যদিও দক্ষিণবঙ্গে কুয়াশার দাপট অনেকটাই কমে এসেছে, তবু উত্তরবঙ্গে কোথাও কোথাও দৃশ্যমানতা কমে আসতে পারে বলে জানিয়েছে হাওয়া অফিস। এর ফলে ভোরের দিকে ট্রেন ও বাস চলাচলে সামান্য বিলম্ব হতে পারে। বিমান চলাচলেও বিশেষ করে বাগডোগরা বিমানবন্দরে কুয়াশার কারণে সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। তবে ঘন কুয়াশার সম্ভাবনা আপাতত না থাকায় বড় ধরনের বিঘ্নের আশঙ্কা নেই।

আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের তাৎপর্য

ফেব্রুয়ারি মাস সাধারণত শীতের শেষ পর্যায় হিসেবে ধরা হয়। অনেক বছরেই এই সময় তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে এবং বসন্তের আবহাওয়া অনুভূত হয়। কিন্তু এ বছর ফেব্রুয়ারির শুরুতেই ফের পারদ পতনের ঘটনা প্রমাণ করছে যে শীত এখনই পুরোপুরি বিদায় নিচ্ছে না।

আবহবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবহাওয়ার চরিত্রে বেশ কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে। কখনও দীর্ঘস্থায়ী শীত, কখনও হঠাৎ উষ্ণতা বৃদ্ধি—এই ধরনের ওঠানামা এখন আগের তুলনায় বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে চলতি পরিস্থিতিতে রাজ্যের আবহাওয়া এখনও মৌসুমি স্বাভাবিকতার মধ্যেই রয়েছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞেরা।

শহরের বাজারে শীতের পোশাকের চাহিদা

ঠান্ডা ফের বাড়তেই কলকাতা ও অন্যান্য শহরের বাজারে শীতের পোশাকের চাহিদা নতুন করে বেড়েছে। নিউ মার্কেট, গড়িয়াহাট, হাতিবাগান, বেহালা, সল্টলেক—সব জায়গাতেই সোয়েটার, জ্যাকেট, শাল, মোজা ও কানঢাকার টুপি কিনতে ভিড় জমছে। ব্যবসায়ীদের মতে, জানুয়ারির শেষে বিক্রি কিছুটা কমে গিয়েছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শুরুতেই ফের ঠান্ডা বাড়ায় শীতের পোশাকের বিক্রি আবার বাড়ছে।

বিশেষ করে স্কুলপড়ুয়া শিশুদের গরম পোশাকের চাহিদা বেড়েছে। অনেক স্কুলেই সকালে প্রার্থনার সময় ঠান্ডা বেশি থাকায় অভিভাবকেরা শিশুদের অতিরিক্ত গরম জামা পরিয়ে পাঠাচ্ছেন।

শীতের খাবার ও পানীয়ের কদর

ঠান্ডা বাড়তেই শহরের চা-কফির দোকান, ফাস্ট ফুড স্টল এবং রেস্তোরাঁগুলোতে গরম খাবার ও পানীয়ের কদর বেড়েছে। ভাপা মুড়ি, ঘুগনি, কচুরি-আলুর দম, চা, কফি, স্যুপ—সবকিছুরই চাহিদা চোখে পড়ার মতো। সন্ধ্যার পর রাস্তার ধারের খাবারের দোকানগুলোতে ভিড় বাড়ছে, কারণ ঠান্ডা আবহাওয়ায় গরম খাবার উপভোগ করার আলাদা আনন্দ রয়েছে।

পাহাড় বনাম সমতল: ঠান্ডার তুলনা

এ বছর শীতের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল—দক্ষিণবঙ্গের কিছু অঞ্চলের তাপমাত্রা উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি শহরের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। নদিয়ার কল্যাণীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হওয়া মানে কার্যত কালিম্পংয়ের সমান ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। এটি সাধারণত বিরল ঘটনা।

আবহবিদদের মতে, পরিষ্কার আকাশ, কম আর্দ্রতা এবং উত্তর দিক থেকে আসা শীতল বায়ুর প্রভাব একসঙ্গে কাজ করায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যদিও পাহাড়ে তাপমাত্রা বরাবরই কম থাকে, সমতলে এই মাত্রার ঠান্ডা সাধারণত জানুয়ারির মাঝামাঝি বা শেষের দিকে দেখা যায়। ফেব্রুয়ারির শুরুতে এমন ঠান্ডা তুলনামূলকভাবে কমই হয়।

আগামী সপ্তাহে কী হতে পারে?

আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন রাজ্যে আবহাওয়া শুষ্কই থাকবে। বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। রাতের তাপমাত্রা আরও কিছুটা কমার পর স্থিতিশীল হয়ে যেতে পারে। দিনের বেলায় তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়লেও তা এখনও স্বাভাবিকের কাছাকাছি বা কিছুটা নিচেই থাকবে।

উত্তরবঙ্গে কুয়াশা পরিস্থিতি আগামী দু’দিন বজায় থাকতে পারে, তারপর ধীরে ধীরে তা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। দক্ষিণবঙ্গে সকালের দিকে হালকা কুয়াশা থাকলেও তা দ্রুত কেটে যাবে।

আবহাওয়ার প্রভাব পড়বে কি পরীক্ষার্থীদের উপর?

এই সময় বহু স্কুল ও কলেজে বার্ষিক পরীক্ষা চলছে বা শুরু হওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ঠান্ডা আবহাওয়ায় ভোরে উঠে পড়াশোনা করতে অনেক ছাত্রছাত্রীই সমস্যায় পড়তে পারে। তবে দিনের বেলায় তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক থাকায় পরীক্ষার সময় বড় কোনও অসুবিধা হওয়ার আশঙ্কা নেই।

অভিভাবকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, পরীক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত গরম পোশাক পরতে দেওয়া এবং ঠান্ডাজনিত অসুস্থতা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে এই ঠান্ডা

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়ার স্বাভাবিক চক্রে নানা ধরনের ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। কখনও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, কখনও অস্বাভাবিক ঠান্ডা—এই ধরনের চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি আগের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে। যদিও পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান ঠান্ডা পরিস্থিতি এখনও মৌসুমি স্বাভাবিকতার মধ্যেই রয়েছে, তবু বছরের এই সময়ে এমন তাপমাত্রা পতন ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে বলে মনে করছেন কিছু বিশেষজ্ঞ।

সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা

কলকাতার বেহালার বাসিন্দা রমা চক্রবর্তী বলছেন, “ভাবছিলাম শীত বুঝি শেষ হয়ে গেল। কিন্তু গত দু’দিন ধরে সকালবেলা বেরোতে গিয়ে আবার সোয়েটার গায়ে দিতে হচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে এমন ঠান্ডা সত্যিই একটু অবাক করার মতো।”

অন্যদিকে, উত্তর কলকাতার কলেজ স্ট্রিট এলাকার বাসিন্দা সৌম্য দাসের বক্তব্য, “সকালে কলেজ যেতে গিয়ে গরম চা হাতে না থাকলে যেন দিনটাই শুরু হয় না। আবার ঠান্ডা পড়ায় ভালোই লাগছে, কারণ গরমটা একটু দেরিতে আসবে।”

দার্জিলিঙের এক হোটেল ব্যবসায়ী জানান, “গত কয়েক দিন ধরে ঠান্ডা বেড়েছে। ফলে পর্যটকদের সংখ্যা আবার বাড়ছে। সকালের পাহাড়ি দৃশ্য আর ঠান্ডা হাওয়া উপভোগ করতে অনেকেই আসছেন।”

হাসপাতালগুলির প্রস্তুতি

ঠান্ডা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলিতেও শীতকালীন অসুস্থতার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও প্রবীণদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস এবং অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা পরিষেবা প্রস্তুত রাখছে বলে জানা গেছে।

শীতের আমেজ কতদিন থাকবে?

আবহাওয়া দফতরের বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই শীতল পরিস্থিতি আগামী অন্তত তিন থেকে চার দিন বজায় থাকতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে রাতের তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তে পারে, তবে খুব দ্রুত গরম পড়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত রাজ্যের আবহাওয়া মোটের উপর শীতল ও মনোরমই থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Preview image