অসমের যোরহাটের রৌরিয়া বায়ুসেনাঘাঁটিতে অবতরণের সময় বায়ুসেনার AN-32 বিমানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ভেঙে পড়ার পর মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ধরে যায় বিমানে, যার জেরে প্রাণ হারান পাঁচ সেনাকর্মী। তদন্তে দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অসমের যোরহাটে ভারতীয় বায়ুসেনার একটি এএন-৩২ পরিবহণ বিমান দুর্ঘটনায় পাঁচ সেনাকর্মীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শনিবার সকালে রৌরিয়া বায়ুসেনা ঘাঁটিতে অবতরণের সময় এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন স্কোয়াড্রন লিডার প্রশান্ত সিংহ, ফ্লাইং লেফটেন্যান্ট শুভম কুমার, সার্জেন্ট জিতেন্দ্র শর্মা, অগ্নিবীরবায়ু ক্ষেমারাম কুমাওয়াত এবং দানিশ আলম। দুর্ঘটনার পর গোটা বায়ুসেনা মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
প্রাথমিক তদন্তে অনুমান করা হচ্ছে, রানওয়েতে নামার সময় বিমানের একটি চাকা ফেটে যায়। ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিমানটি রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যে দু’টুকরো হয়ে যায়। দুর্ঘটনার পরপরই বিমানে আগুন ধরে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও পাঁচ সেনাকর্মীকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বায়ুসেনা।
শনিবার সকাল প্রায় পৌনে ১০টা নাগাদ বিমানটি রুটিন প্রশিক্ষণ ও মহড়ায় অংশ নিয়েছিল। অবতরণের সময়ই ঘটে এই বিপর্যয়। ভারতীয় বায়ুসেনা এক বিবৃতিতে নিহত সেনাকর্মীদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে এবং তাঁদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। অসমের মুখ্যমন্ত্রী Himanta Biswa Sarma-ও দুর্ঘটনায় শোকপ্রকাশ করে জানিয়েছেন, ঘটনার বিস্তারিত রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে রাজ্য সরকার।
এএন-৩২ বিমান ভারতীয় বায়ুসেনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবহণ বিমান। সামরিক সরঞ্জাম, রসদ এবং সেনা সদস্যদের বহনের পাশাপাশি দুর্গম ও প্রতিকূল আবহাওয়ার অঞ্চলে উদ্ধারকাজেও এই বিমান দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রায় সাড়ে ৭ টন ওজন বহন এবং প্রায় ৫০ জন সেনাকর্মী পরিবহণের সক্ষমতা রয়েছে এই বিমানের। উত্তর-পূর্ব ভারতের মতো কঠিন ভৌগোলিক অঞ্চলে বায়ুসেনার বিভিন্ন অভিযানে এএন-৩২ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে এই বিমানের দুর্ঘটনার ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৯৮৬ সাল থেকে একাধিকবার এএন-৩২ দুর্ঘটনার মুখে পড়েছে। জানা গিয়েছে, এর আগেও ২২টি এএন-৩২ বিভিন্ন সময়ে দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়েছে। গত বছরও একটি এএন-৩২ দুর্ঘটনার খবর সামনে এসেছিল। তবুও বহুমুখী ব্যবহার ও নির্ভরযোগ্যতার কারণে ভারতীয় বায়ুসেনা এখনও এই বিমানকে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবেই ব্যবহার করে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, কয়েক মাস আগেই অসমের একটি পাহাড়ি এলাকায় রুটিন মহড়ার সময় বায়ুসেনার একটি Sukhoi Su-30MKI যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল। সেই বিমানটিও যোরহাট বায়ুসেনা ঘাঁটি থেকেই উড্ডয়ন করেছিল। পরপর সামরিক বিমান দুর্ঘটনার ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। যোরহাটের এই দুর্ঘটনা শুধু বায়ুসেনার জন্য নয়, গোটা দেশের জন্যই এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অসমের যোরহাটে ভারতীয় বায়ুসেনার একটি এএন-৩২ পরিবহণ বিমান দুর্ঘটনায় পাঁচ সেনাকর্মীর মৃত্যু দেশের প্রতিরক্ষা মহলে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। শনিবার সকালে অসমের রৌরিয়া বায়ুসেনা ঘাঁটিতে অবতরণের সময় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। রুটিন প্রশিক্ষণ ও মহড়া শেষে ঘাঁটিতে ফিরছিল বিমানটি। অবতরণের শেষ পর্যায়ে হঠাৎই বিপত্তি ঘটে। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, রানওয়েতে স্পর্শ করার সময় বিমানের একটি চাকা ফেটে যায়। এর ফলে বিমানটির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং দ্রুতগতিতে রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিমানটি ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দু’টুকরো হয়ে যায় এবং তাতে আগুন ধরে যায়।
এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান স্কোয়াড্রন লিডার প্রশান্ত সিংহ, ফ্লাইং লেফটেন্যান্ট শুভম কুমার, সার্জেন্ট জিতেন্দ্র শর্মা, অগ্নিবীরবায়ু ক্ষেমারাম কুমাওয়াত এবং দানিশ আলম। তাঁদের মৃত্যুতে শুধু ভারতীয় বায়ুসেনাই নয়, গোটা দেশ শোকাহত। প্রত্যেকেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই প্রাণ হারিয়েছেন। বায়ুসেনার তরফে নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে এবং তাঁদের আত্মত্যাগকে দেশের জন্য এক অমূল্য অবদান বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পরপরই বায়ুসেনা ঘাঁটির জরুরি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় উদ্ধারকাজ বেশ কঠিন হয়ে ওঠে। দমকল বাহিনী ও নিরাপত্তারক্ষীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালান। বেশ কিছু সময়ের চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও বিমানটির অধিকাংশ অংশ পুড়ে যায়। দুর্ঘটনার ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে বিমানটির ধ্বংসাবশেষ রানওয়ের একাধিক অংশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর গোটা এলাকা ঘিরে ফেলে নিরাপত্তা বাহিনী এবং তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন শুরু করেন।
ভারতীয় বায়ুসেনা ইতিমধ্যেই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের জন্য কোর্ট অফ ইনকোয়ারি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে। বিমানটির ব্ল্যাক বক্স এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হবে। চাকা ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনার পাশাপাশি যান্ত্রিক ত্রুটি, রানওয়ের অবস্থা, আবহাওয়ার প্রভাব এবং অবতরণের সময়কার অন্যান্য পরিস্থিতিও খতিয়ে দেখা হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন আধিকারিকরা।
অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এই দুর্ঘটনায় গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, যোরহাটে বায়ুসেনার একটি বিমান দুর্ঘটনার খবর অত্যন্ত দুঃখজনক। রাজ্য প্রশাসন প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রকও ঘটনার উপর নজর রাখছে বলে জানা গিয়েছে।
এএন-৩২ বিমান ভারতীয় বায়ুসেনার পরিবহণ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সোভিয়েত ইউনিয়নের ডিজাইন করা এই বিমান বহু বছর ধরে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হচ্ছে। কঠিন আবহাওয়া, পাহাড়ি অঞ্চল এবং দুর্গম এলাকায় উড়ান পরিচালনার ক্ষেত্রে এএন-৩২ বিশেষভাবে কার্যকর বলে পরিচিত। উত্তর-পূর্ব ভারত, লাদাখ, অরুণাচল প্রদেশ এবং সীমান্তবর্তী নানা এলাকায় সেনা, অস্ত্র, খাদ্যসামগ্রী ও জরুরি সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে এই বিমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই বিমানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল প্রতিকূল পরিবেশেও উড়তে সক্ষম হওয়া। উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের ছোট রানওয়ে থেকে উড্ডয়ন ও অবতরণ করার ক্ষমতা রয়েছে এএন-৩২-এর। প্রায় সাড়ে সাত টন মালপত্র বহন করার পাশাপাশি এটি প্রায় ৫০ জন সেনাকর্মী পরিবহণ করতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযানে এই বিমান বহুবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বন্যা, ভূমিকম্প বা ভূমিধসের মতো পরিস্থিতিতে দুর্গম এলাকায় দ্রুত সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এএন-৩২ বায়ুসেনার অন্যতম ভরসা।
তবে দীর্ঘদিন ব্যবহৃত হওয়ার কারণে এএন-৩২ বিমান নিয়ে মাঝেমধ্যেই নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত প্রশ্ন উঠেছে। অতীতে একাধিক দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়েছে এই বিমান। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৮৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দুই ডজনেরও বেশি এএন-৩২ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে যান্ত্রিক ত্রুটি, কিছু ক্ষেত্রে আবহাওয়ার প্রতিকূলতা এবং কিছু ক্ষেত্রে মানবিক ভুল দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। তবুও আধুনিকীকরণ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এই বিমানগুলিকে এখনও সক্রিয় পরিষেবায় রাখা হয়েছে।
উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য যোরহাটের রৌরিয়া বায়ুসেনা ঘাঁটির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এই ঘাঁটি কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সামরিক অভিযান পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর এবং অন্যান্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে দ্রুত সামরিক সহায়তা পৌঁছে দিতে এই ঘাঁটি কার্যকর কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। তাই এখানকার প্রতিটি উড়ান ও সামরিক কার্যকলাপ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পরিচালিত হয়।
উল্লেখযোগ্যভাবে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে অসমে একাধিক সামরিক বিমান দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। কয়েক মাস আগেই একটি সুখোই-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমান রুটিন মহড়ার সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল। সেই ঘটনাও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা সামনে এনেছিল। এবার এএন-৩২ দুর্ঘটনার পর আবারও সামরিক বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধবিমান ও পরিবহণ বিমানের যুগে পুরনো বিমানগুলির ক্ষেত্রে আরও কঠোর নজরদারি এবং নিয়মিত প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রয়োজন। যদিও এএন-৩২ এখনও বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সফলভাবে পালন করে চলেছে, তবুও প্রতিটি দুর্ঘটনা নতুন করে নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্ন তুলে দেয়। বিশেষ করে অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত সেনাকর্মীদের মৃত্যু দেশের জন্য বড় ক্ষতি।
এই দুর্ঘটনার পর নিহত সেনাকর্মীদের পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা তাঁদের আত্মীয়স্বজন এবং সহকর্মীরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সামাজিক মাধ্যমেও বহু মানুষ নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। দেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে তাঁদের এই আত্মত্যাগকে স্মরণ করছে গোটা দেশ।
যোরহাটের এই বিমান দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রতিদিন কত বড় ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। শান্তিকালেও তাঁদের দায়িত্ব অত্যন্ত কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ। কর্তব্য পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো এই পাঁচ বায়ুসেনা সদস্য দেশের ইতিহাসে সাহস, কর্তব্যনিষ্ঠা এবং আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন।