তেঁদুয়া আতঙ্কে যখন পুরো গ্রাম ভয়ে সঙ্কুচিত, তখনই সেই পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসাবে ব্যবহার করল এক যুবক। রাতের অন্ধকারে গ্রামের এক কৃষকের খাটালে ঢুকে ছাগল চুরি করার চেষ্টা করে সে। পরিবারের কুকুর ঘেউ ঘেউ শুরু করলে বাড়ির কর্তা সন্দেহে বাইরে বেরিয়ে এসে তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন। প্রতিবেশীরাও ছুটে এসে চোরটিকে আটক করে গ্রামরক্ষী দলের হাতে তুলে দেয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে চোর স্বীকার করে যে তেঁদুয়া আতঙ্ককে কাজে লাগিয়ে সে ভাবেছিল মানুষ বাইরে বেরোবে না, তাই চুরি করা সহজ হবে। এই ঘটনার পর গ্রামে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং পঞ্চায়েত রাতের পেট্রোলিং বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঘটনাটি দেখিয়ে দিল যে আতঙ্কের সুযোগে অপরাধ বাড়তে পারে এবং সচেতনতা একমাত্র সুরক্ষা।
গ্রামের রাত সবসময়ই নিস্তব্ধ থাকে। দিনের কোলাহল, মানুষের ভিড়, দোকানপাট, মাঠে কাজের ব্যস্ততা সব মিলিয়ে দিনের শেষে এক ধরনের শান্তি নেমে আসে। চাঁদের আলোয় আলোকিত গ্রাম্য রাস্তা, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর টিমটিমে আলোয় থাকা বাড়িগুলো যেন রাতের আলাদা এক সুর তৈরি করে। কিন্তু সেই শান্ত রাত হঠাৎই ভেঙে গেল একটি অস্বাভাবিক ঘটনার কারণে। তেঁদুয়া আতঙ্কে ভীত গ্রামের মধ্যে যখন মানুষজন বাড়ির বাইরে বেরোতে ভয় পাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এক যুবক ছাগল চুরির পরিকল্পনা করে বসে। নিজের সুবিধামতো রাতের অন্ধকার বেছে নিয়ে সে চুরির চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে যায় হাতেনাতে, আর সেই ঘটনাই আজ গ্রামজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। গত কয়েকদিন ধরেই গ্রামে তেঁদুয়া দেখার গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। কেউ বলছিল জঙ্গলের কাছেই রাতে তেঁদুয়া আঁচড়ের শব্দ শোনা গেছে, কেউ বলছিল কাছের বাঁশঝাড়ে নাকি পশুর দেহাংশ পাওয়া গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় কয়েকটা অস্পষ্ট ভিডিওও ভাইরাল হচ্ছিল, যেখানে চারপেয়ে একটি প্রাণীকে দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়। অবশ্য প্রশাসন বা বন বিভাগ বিষয়টি নিশ্চিত না করলেও মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়ে যায়। এই আতঙ্কের সুযোগ নিয়ে গ্রামে ছাগল, গরু বা ভেড়া যেমন বাড়ির পাশে বাধা হচ্ছিল না, তেমনি রাতের বেলা মানুষজন কেউ বাড়ির বাইরে বেরোচ্ছিলেন না। লোকজন দরজা লাগিয়ে ঘরে বসে থাকছিলেন, যেন গ্রামের উপরে অদৃশ্য কোনো ত্রাস নেমে এসেছে। এই অদ্ভুত পরিবেশেই ঘটনার সূত্রপাত। গ্রামের শেষপ্রান্তে একটি সাধারণ কৃষক পরিবার বাস করে। বাড়ির পাশে একটি ছোট খাটাল, যেখানে কয়েকটি ছাগল, দুটি গরু এবং কিছু হাঁস-মুরগি রাখা থাকে। সেদিন রাতেও পরিবারটি তেঁদুয়া আতঙ্কে দরজা জানালা বন্ধ করে ঘুমোতে গিয়েছিল। কিন্তু ঠিক তখনই ঘটনার মোড় ঘুরে যায়। গভীর রাতে তাদের বাড়ির কুকুর হঠাৎই জোরে জোরে ঘেউ ঘেউ করতে শুরু করে। প্রথমে বাড়ির লোকজন ভেবেছিলেন কোন বুনো পশু হয়তো খাটালের কাছে এসেছে, কারণ গ্রামের কুকুর সাধারণত তেঁদুয়া বা অজানা পশুর গন্ধ পেলেই উত্তেজিত হয়ে ওঠে। কিন্তু শব্দে একটি অস্বাভাবিকতা ছিল, যা বাড়ির কর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি বাইরে বেরিয়ে আসতেই দেখেন খাটালের দরজা অল্প ফাঁকা। সন্দেহ বাড়তেই টর্চ জ্বালিয়ে খাটালের সামনে এগিয়ে যান তিনি। ঠিক তখনই তিনি লক্ষ্য করেন একটি ছায়াময় অবয়ব ছাগলটি হাতে নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করছে। সেই মুহূর্তে টর্চের আলো পড়তেই চোরটি আঁতকে ওঠেন। কয়েক সেকেন্ডের জন্য দুজনের চোখাচোখি হয়। কৃষক জোরে চিৎকার করে ওঠেন ছাগলচোর ধরো। তাঁর চিৎকারে বাড়ির অন্য সদস্যরা বাইরে বেরিয়ে আসেন। চোর দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলেও বাড়ির অন্য সদস্যদের সতর্কতায় তিনি আর বেশি দূর যেতে পারেননি। কয়েকজন প্রতিবেশীও চিৎকার শুনে বাড়ির দিকে ছুটে আসেন এবং মিলে চোরটিকে পাকড়াও করেন। চোরটি বয়সে তরুণ, দেখতে সাধারণ। সে প্রথমে ধরা পড়ার পর ক্ষোভে, ভয়ে, লজ্জায় কিছুই বলতে পারছিল না। উপস্থিত মানুষজন তাকে ধরে বসিয়ে রাখেন এবং খবর দেন গ্রামরক্ষী দলকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনজন গ্রামরক্ষী ঘটনাস্থলে পৌঁছে চোরটিকে নিজেদের জিম্মায় নেন। গ্রামবাসীর ভিড় তখন আরও বাড়তে থাকে। প্রত্যেকের মুখে একটাই প্রশ্ন— এই সময় ছাগল চুরি করতে এসেছিল সে কেন? তেঁদুয়া আতঙ্ক কি চোরদের সুযোগ করে দিচ্ছে? গ্রামরক্ষী দলের সদস্যরা জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। প্রথমে চোরটি কিছুই বলতে চাইছিল না। পরে অনেকটা চাপে পড়ে সে স্বীকার করে যে গ্রামের অনেক ঘরেই পশুপাখি বাইরে থাকছে না বলে সে মনে করেছিল মানুষের সতর্কতা কমে গেছে। গ্রামের সবাই তেঁদুয়া আতঙ্কে দোতলায় বা ঘরের ভিতরে ঘুমোচ্ছেন, তাই সে ভেবেছিল রাতের অন্ধকারে খাটাল থেকে ছাগল চুরি করা সহজ হবে। তার মতে, সে এর আগেও অন্য গ্রামে ছাগল চুরির চেষ্টা করেছে কিন্তু সফল হতে পারেনি। এবার ভেবেছিল তেঁদুয়া ভয় মানুষকে এতটাই ঘরে আটকে রেখেছে যে সে নির্বিঘ্নে চুরি করতে পারবে। কিন্তু তার এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। এই ঘটনার পর গ্রামবাসীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। তারা দাবি করেন তেঁদুয়া আতঙ্ক ছাড়াও গ্রামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো ছিল না। বিশেষ করে রাতের বেলায় পেট্রোলিং বা নজরদারি খুবই কম। গ্রামে অনেকদিন ধরেই ছোটখাট চুরির ঘটনা ঘটছিল, কিন্তু এবার তেঁদুয়া আতঙ্ককে ঢাল করে চোরেরা ছড়াছড়ি করার চেষ্টা শুরু করেছে। গ্রামবাসীদের মতে, প্রশাসন যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের চুরি বা বিপজ্জনক ঘটনা ঘটতে পারে। কিছু প্রবীণ মানুষের মতে এই ঘটনার পিছনে সামাজিক অসুরক্ষাও দায়ী। তাদের মতে গ্রামের কিছু বেকার যুবক অর্থকষ্ট বা ভুল পথে চলার কারণে এই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তারা বলেন কাজের অভাব, মাদকাসক্তি এবং দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবেশ অনেক যুবককে এমন কাজে ঠেলে দিচ্ছে। চুরি শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি সামাজিক সমস্যার ফলাফলও হতে পারে। তাই অপরাধীকে শুধু শাস্তি দিলেই হবে না, তার পিছনে থাকা কারণগুলোও বিচারের প্রয়োজন। চোরটিকে গ্রামপুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। গ্রামপুলিশ তাকে নিয়ে স্থানীয় থানায় যান এবং সেখানে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেন। থানায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে আরও স্বীকার করে যে গত কয়েকদিন ধরে সে ওই পরিবারের খাটাল লক্ষ্য করছিল। কিন্তু তেঁদুয়া আতঙ্ক শুরু হওয়ার পর সে সুযোগ পেয়ে যায়। পুলিশের মতে তার বিরুদ্ধে আগেও ছোটখাট চুরির অভিযোগ ছিল। এদিকে বাড়ির কৃষক পরিবারটি স্বস্তি প্রকাশ করেন যে ছাগলটি উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভয় থেকে গেছে। তারা বলেন আজ যদি আমরা জেগে না ওঠতাম বা কুকুরটি সতর্ক না করত তাহলে আমাদের পশুটি চুরি হয়ে যেত। এখন আর কিছুর ওপর ভরসা নেই। গ্রামে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও বাড়ানোর দাবি তোলেন তাঁরা। এই ঘটনার পর গ্রামের পঞ্চায়েত সভা জরুরি বৈঠক ডাকে। সেখানে গ্রামবাসীরা তাদের উদ্বেগ জানিয়ে বলেন যে শুধু তেঁদুয়া আতঙ্ক নয়, রাতের নিরাপত্তা বাড়ানোর ব্যবস্থা করা জরুরি। পঞ্চায়েত প্রধান জানান গ্রামজুড়ে রাত্রিকালীন পেট্রোলিং বাড়ানো হবে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সৌরবিদ্যুৎচালিত রাস্তার আলো বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি গ্রামে বাহিরাগতদের প্রবেশও নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বনবিভাগ জানিয়েছে যে তেঁদুয়া আতঙ্কের গুজব অনেকটাই ভিত্তিহীন। অনেক সময় বুনো শিয়াল বা কুকুরকে তেঁদুয়া ভেবে ভুল হয়। তবে তারা এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে যাতে জনগণ নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন। অন্যদিকে পুলিশ গ্রামবাসীদের সতর্ক করে বলেছেন যে অপরাধীরা যে কোনও পরিস্থিতিকে নিজেদের সুবিধায় কাজে লাগাতে পারে, তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। এই ঘটনা গ্রামের মানুষের মনে ভয়ের পাশাপাশি সচেতনতার বার্তাও দিয়েছে। রাতের বেলায় বাড়ির পাশে বা খাটালে পশুপাখি রাখলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। দরজা-জানালা ভালোভাবে আটকানো, কুকুর বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা, প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চোর ধরা পড়লেও ঘটনাটি গ্রামীণ জীবনের একটি বড় সমস্যা সামনে তুলে ধরেছে। অসতর্কতা, আতঙ্ক, গুজব এবং অপরাধের মিশ্রণে যে বিপদ তৈরি হয় তা আজ গ্রামের মানুষ সরাসরি উপলব্ধি করেছেন। তবে আশার বিষয় হলো, মানুষের সতর্কতা, ঐক্যবদ্ধতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্তই চোরটিকে হাতেনাতে ধরতে সাহায্য করেছে। ভবিষ্যতে সচেতনতা থাকলে এই ধরনের অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এই ঘটনাটি শুধু একটি ছাগল চুরির ঘটনা নয়, বরং এটি একটি গ্রামীণ সমাজের প্রতিচ্ছবি। এখানে আছে ভয়, আছে সতর্কতা, আছে অপরাধ, আছে সামাজিক সমস্যা, এবং তার সঙ্গে সঙ্গে আছে সাধারণ মানুষের মানবিক সহমর্মিতা। রাতের অন্ধকারে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি গ্রামের মানুষের কাছে দীর্ঘদিন মনে থাকার মতো একটি শিক্ষা হয়ে থাকবে যে কোনও আতঙ্কের সুযোগে অপরাধ বাড়তে পারে, তাই সমাধান একটি শব্দেই সতর্কতা।