আবহাওয়া বদলের সঙ্গে বাড়ছে জ্বর, সর্দি-কাশি, ছত্রাকের সংক্রমণ ও নানা ধরনের চর্মরোগ। সুস্থ থাকতে এই সময় কী কী সতর্কতা মেনে চলবেন?
পুজো শেষ হতেই ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে আবহাওয়া। ভোর ও রাতের দিকে হালকা ঠান্ডার আমেজ থাকলেও দিনের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার ওঠানামা অনেকের শরীরে অস্বস্তি তৈরি করছে। এই সময় মাথা যন্ত্রণা, নাক দিয়ে জল পড়া, সর্দি-কাশি, জ্বর এবং গায়ে-হাতে ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি কিছু মানুষের ত্বকে দেখা যাচ্ছে লালচে দাগ, চুলকানি, ফোস্কা কিংবা হাত-পায়ের আঙুলের ফাঁকে ক্ষত। ফলে আবহাওয়া পরিবর্তনের এই সময়ে মরসুমি সংক্রমণ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
চিকিৎসকদের মতে, আবহাওয়া বদলের সময়ে বিভিন্ন ধরনের শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, ভাইরাল জ্বর এবং ত্বকের সমস্যা দেখা দিতে পারে। ইনফ্লুয়েঞ্জা, রাইনোভাইরাসের মতো ভাইরাস সর্দি-কাশির কারণ হতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের সংক্রমণেও ত্বকের সমস্যা তৈরি হয়। তবে সব ধরনের জ্বর বা র্যাশের কারণ এক নয়। তাই উপসর্গ দেখে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
মরসুমি ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জায় সাধারণত জ্বর, কাশি, গলাব্যথা, মাথাব্যথা, শরীরে ব্যথা, ক্লান্তি এবং নাক দিয়ে জল পড়ার মতো উপসর্গ দেখা যায়। কারও কারও ক্ষেত্রে কাঁপুনি, দুর্বলতা কিংবা খাওয়ার ইচ্ছা কমে যাওয়ার সমস্যাও হতে পারে। সংক্রমণের ধরন, বয়স এবং শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করে উপসর্গের তীব্রতা আলাদা হতে পারে।
সাধারণ সর্দি-কাশি এবং ইনফ্লুয়েঞ্জার লক্ষণ অনেক সময় একই রকম হওয়ায় শুধু উপসর্গ দেখে দুটিকে আলাদা করা কঠিন। আবার ডেঙ্গি, কোভিড-১৯ এবং অন্যান্য সংক্রমণেও জ্বর ও শরীরব্যথা হতে পারে। তাই জ্বরের সঙ্গে অন্য কোনও অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টিকে অবহেলা করা উচিত নয়।
বিশেষ করে জ্বর দীর্ঘস্থায়ী হলে, শ্বাস নিতে কষ্ট হলে, বুকে ব্যথা হলে, অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে কিংবা জ্বর কমার পর আবার বেড়ে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, অন্তঃসত্ত্বা মহিলা এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা জরুরি।
আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় বিভিন্ন ভাইরাস ও জীবাণুর সংক্রমণ ছড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। স্কুল, অফিস, গণপরিবহণ কিংবা ভিড়ের জায়গায় সংক্রমিত ব্যক্তির কাছাকাছি থাকলে শ্বাসযন্ত্রের কিছু সংক্রমণ ছড়াতে পারে। সংক্রমিত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি কিংবা কথা বলার সময় নির্গত ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু ভাইরাস অন্যের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
অন্যদিকে ঘাম, ত্বকে আর্দ্রতা জমে থাকা, ভেজা পোশাক দীর্ঘক্ষণ পরে থাকা এবং ত্বকের পরিচ্ছন্নতার অভাব কিছু ক্ষেত্রে ছত্রাকের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে শুধুমাত্র আবহাওয়া বদলালেই যে প্রত্যেকের রোগ হবে, তা নয়। ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং সংক্রমণের সংস্পর্শে আসার উপরও ঝুঁকি নির্ভর করে।
জ্বরের পাশাপাশি হাতের তালু, পায়ের পাতা, আঙুলের ফাঁক কিংবা মুখের আশপাশে লালচে র্যাশ, ফোস্কা বা ক্ষত দেখা দিলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কিছু ভাইরাসজনিত রোগে জ্বরের সঙ্গে হাত-পা ও মুখে ফোস্কার মতো দাগ দেখা যায়। শিশুদের মধ্যে হ্যান্ড, ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ নামে পরিচিত একটি ভাইরাসজনিত রোগেও এই ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
আবার ত্বকের কিছু ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে ঘা বা ক্ষত তৈরি হতে পারে। ছত্রাকের সংক্রমণে চুলকানি, ত্বকের উপরিভাগে আঁশ ওঠা, লালচে দাগ কিংবা আঙুলের ফাঁকে চামড়া ফেটে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই সব ধরনের ফোস্কা বা র্যাশকে একই রোগের লক্ষণ মনে করা ঠিক নয়।
ত্বকে এমন কোনও পরিবর্তন দেখা দিলে আক্রান্ত জায়গা পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন। ফোস্কা ফাটাবেন না, ক্ষত খুঁটবেন না এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েডযুক্ত ক্রিম বা অ্যান্টিবায়োটিক মলম ব্যবহার করবেন না। সংক্রমণের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা আলাদা হতে পারে। জ্বরের সঙ্গে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া র্যাশ, তীব্র ব্যথা, পুঁজ, মুখে ঘা কিংবা খাওয়াদাওয়ায় অসুবিধা হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান।
শিশুদের মধ্যে কিছু সংক্রমণ দ্রুত ছড়াতে পারে। বিশেষ করে স্কুল, ডে-কেয়ার বা অন্য শিশুদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। শিশুর জ্বর, হাত-পায়ে ফোস্কা, মুখে ঘা কিংবা খাওয়ার সময় ব্যথা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অসুস্থ অবস্থায় শিশুকে স্কুলে না পাঠানো এবং হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।
বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ কখনও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। যাঁদের হৃদ্রোগ, ফুসফুসের রোগ, ডায়াবিটিস, ক্যানসার রয়েছে অথবা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাঁদের বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের ক্ষেত্রেও জ্বর বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক ফ্লু-সহ নির্দিষ্ট সংক্রমণের পরীক্ষা, চিকিৎসা কিংবা টিকাকরণের পরামর্শ দিতে পারেন। অসুস্থ ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এড়ানো, হাত পরিষ্কার রাখা এবং ভিড়ের জায়গায় প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা উপকারী।
১. নিয়মিত হাত ধুতে হবে: বাইরে থেকে বাড়ি ফেরার পর, খাবার খাওয়ার আগে এবং শৌচাগার ব্যবহারের পরে সাবান ও জল দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে নিন। অপরিষ্কার হাতে চোখ, নাক বা মুখ স্পর্শ করা এড়িয়ে চলুন।
২. কাশি ও হাঁচির সময় সতর্ক থাকুন: কাশি বা হাঁচির সময় টিস্যু কিংবা কনুইয়ের ভাঁজ দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখুন। ব্যবহৃত টিস্যু নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে দিন। জ্বর বা সর্দি-কাশি থাকলে অন্যদের কাছাকাছি যাওয়ার সময় সতর্ক থাকুন।
৩. প্রয়োজন অনুযায়ী মাস্ক ব্যবহার করুন: ভিড়ের জায়গায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কিংবা শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকলে ভালোভাবে ফিট করা মাস্ক ব্যবহার করা উপকারী হতে পারে। অসুস্থ অবস্থায় অন্যদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করুন।
৪. শরীর ও ত্বক পরিষ্কার রাখুন: ঘাম হলে পোশাক বদলে নিন। ভেজা মোজা বা জুতো দীর্ঘক্ষণ পরে থাকবেন না। পায়ের আঙুলের ফাঁকসহ ত্বক পরিষ্কার করে ভালোভাবে শুকিয়ে নিন। নিজের তোয়ালে, পোশাক ও ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী অন্যের সঙ্গে ভাগ করে ব্যবহার না করাই ভালো।
৫. পর্যাপ্ত জল ও পুষ্টিকর খাবার খান: শরীরে জলের ঘাটতি এড়াতে পর্যাপ্ত তরল পান করুন। প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফল, ডাল, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার এবং অন্যান্য পুষ্টিকর উপাদান রাখুন। অসুস্থ হলে বিশ্রাম নিন এবং শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার খান।
৬. পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নিন: নিয়মিত ঘুম এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে সাহায্য করে। জ্বর বা শরীরব্যথা থাকলে অতিরিক্ত পরিশ্রম না করাই ভালো।
৭. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাবেন না: জ্বর হলেই নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত নয়। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে, ভাইরাসের বিরুদ্ধে নয়। ভুল ওষুধ ব্যবহার করলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, বিভ্রান্তি, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব, তীব্র দুর্বলতা কিংবা শরীরে জলের ঘাটতির লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন। একইভাবে র্যাশ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে, ত্বকে তীব্র ব্যথা বা পুঁজ হলে কিংবা মুখে ঘা হওয়ার কারণে জল পান করতে অসুবিধা হলে দেরি করবেন না।
জ্বর কত দিন স্থায়ী হচ্ছে, শরীরের কোন অংশে র্যাশ দেখা দিচ্ছে এবং তার সঙ্গে অন্য কী কী উপসর্গ রয়েছে, সেগুলি চিকিৎসককে স্পষ্ট করে জানান। চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে রক্ত পরীক্ষা বা অন্য পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো কিছু সংক্রমণে নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা উপকারী হতে পারে, তবে তা কখন শুরু করতে হবে, তা চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন।
ইনফ্লুয়েঞ্জার ঝুঁকি কমাতে উপযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য ফ্লু ভ্যাকসিন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, অন্তঃসত্ত্বা মহিলা এবং নির্দিষ্ট দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে টিকাকরণের প্রয়োজনীয়তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। তবে ফ্লু ভ্যাকসিন সব ধরনের জ্বর, ত্বকের সংক্রমণ বা অন্যান্য ভাইরাসজনিত রোগ প্রতিরোধ করে না। তাই টিকা নেওয়ার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য সতর্কতাও বজায় রাখতে হবে।
পুজোর পর থেকে শীতের আগের এই সময়টিতে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে জ্বর, সর্দি-কাশি এবং বিভিন্ন ধরনের ত্বকের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে প্রতিটি জ্বর বা র্যাশের কারণ এক নয়। হাত-পা-মুখে ফোস্কা, ত্বকে ক্ষত, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর কিংবা অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, নিয়মিত হাত ধোয়া, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার, প্রয়োজনীয় টিকাকরণ এবং অসুস্থ অবস্থায় অন্যদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি কমানোর মাধ্যমে অনেক সংক্রমণের আশঙ্কা কমানো সম্ভব। নিজে সচেতন থাকুন, পরিবারের শিশু ও বয়স্কদের খেয়াল রাখুন এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সতর্কতা: এই প্রতিবেদনটি সাধারণ সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শ বা রোগ নির্ণয়ের বিকল্প নয়।