Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

আগরকর সরতেই জাতীয় দলে ভুবনেশ্বর! ‘নির্বাসন’ কাটিয়ে ফেরার নেপথ্যে কী রহস্য?

দীর্ঘ সময় জাতীয় দলের বাইরে থাকার পর ফের ভুবনেশ্বর কুমারের প্রত্যাবর্তন। আগরকর নির্বাচক কমিটি থেকে সরে যাওয়ার পর কী ভাবে বদলে গেল পরিস্থিতি, আর কোন সমীকরণে ফের ভারতীয় দলে জায়গা পেলেন জোরে বোলার—ফাঁস হল সেই নেপথ্যের গল্প।

চার বছর। সময়টা কম নয়। একটা সময় ভারতীয় ক্রিকেট দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য জোরে বোলার ছিলেন তিনি। নতুন বলে সুইং, পুরনো বলে নিয়ন্ত্রিত বোলিং, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট তুলে নেওয়া—সব ক্ষেত্রেই নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু ধীরে ধীরে জাতীয় দলের দরজা তাঁর জন্য বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে ভারতীয় দলের বাইরে থাকতে হয় ভুবনেশ্বর কুমারকে। একটা সময় এমনও এসেছিল, যখন জাতীয় দলে ফেরার স্বপ্ন দেখা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন এই অভিজ্ঞ জোরে বোলার।

কিন্তু ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তনের গল্প কখনও কখনও সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকেই শুরু হয়। ভুবনেশ্বরের ক্ষেত্রেও যেন সেটাই হতে চলেছে। প্রধান নির্বাচক পদে অজিত আগরকরের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর প্রথম দল নির্বাচনের সময়ই জাতীয় দলে ফেরানো হয়েছে ভুবনেশ্বর কুমারকে। আর তাঁর প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সামনে এসেছে গত কয়েক বছরের নানা অজানা সমীকরণ।

দীর্ঘ সময় জাতীয় দলের বাইরে থেকেও ভুবনেশ্বর নিজের ক্রিকেটকে থামিয়ে রাখেননি। বরং ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত খেলেছেন। আইপিএলে নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করেছেন। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তাঁর বোলিংয়ের ধরন আরও পরিণত হয়েছে। নতুন বলে সুইং করানোর পাশাপাশি পুরনো বলেও নিয়ন্ত্রিত বোলিং করে ব্যাটারদের সমস্যায় ফেলেছেন তিনি। প্রতিষ্ঠিত ব্যাটারদেরও তাঁর সুইংয়ের ফাঁদে পড়তে হয়েছে।

সবচেয়ে বড় বিষয়, তাঁর পারফরম্যান্স এসেছে এমন সময়ে, যখন জাতীয় দলে ফেরার দরজা তাঁর জন্য কার্যত বন্ধ বলেই মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু নিজের কাজ করে গিয়েছেন ভুবনেশ্বর। জাতীয় দলে জায়গা না পাওয়ার জন্য প্রকাশ্যে কাউকে দোষারোপ করেননি। বরং নিজের দক্ষতা বাড়ানো এবং আরও ভাল পারফরম্যান্স করার দিকেই মন দিয়েছেন।

দীর্ঘ অপেক্ষার নেপথ্যে কী?

প্রধান নির্বাচক হিসেবে অজিত আগরকরের সময় ভারতীয় ক্রিকেটে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে দল গড়ার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের বদলে তরুণদের সুযোগ দেওয়ার ভাবনা সামনে এসেছিল বার বার। ভুবনেশ্বরের ক্ষেত্রেও সেই নীতির প্রভাব পড়েছিল বলে জানা যাচ্ছে।

ভুবনেশ্বরের প্রাক্তন সতীর্থ এবং বর্তমান নির্বাচক রুদ্রপ্রতাপ সিংহ একাধিক বার নির্বাচক কমিটির বৈঠকে তাঁকে ফেরানোর পক্ষে সওয়াল করেছিলেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁর যুক্তি ছিল, ভুবনেশ্বর এখনও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার মতো সক্ষম। কিন্তু সেই প্রস্তাব বার বার গুরুত্ব পায়নি।

এখানেই তৈরি হয়েছিল মূল সমস্যা। এক দিকে ভুবনেশ্বরের অভিজ্ঞতা, অন্য দিকে ভবিষ্যতের জন্য নতুন ক্রিকেটার তৈরি করার পরিকল্পনা—দুইয়ের মধ্যে দ্বিতীয় পথটিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ফলে ঘরোয়া ক্রিকেট এবং আইপিএলে ভাল পারফরম্যান্স করেও জাতীয় দলের দরজা খুলছিল না তাঁর সামনে।

তবে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে আগরকরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর। প্রধান নির্বাচক পদে পরিবর্তনের সঙ্গে নির্বাচক কমিটির ভাবনাতেও পরিবর্তন আসে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচক প্রজ্ঞান ওঝার সামনে ভুবনেশ্বরের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স এবং পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। তাঁকে ফেরানোর বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত নির্বাচকদের সম্মতিতেই জাতীয় দলে ফেরার পথ তৈরি হয় ভুবনেশ্বরের।

আইপিএলেই তৈরি হয়েছিল প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ

ভুবনেশ্বরের প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে আইপিএল। টানা দু’বার ট্রফি জয়ী বেঙ্গালুরু দলের সদস্য ছিলেন তিনি। দুই মরসুমেই দলের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

আইপিএলের মতো প্রতিযোগিতামূলক মঞ্চে তাঁর বোলিং দেখিয়েছে, বয়স বা দীর্ঘ জাতীয় দলের অনুপস্থিতি তাঁর দক্ষতাকে শেষ করে দেয়নি। বরং অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাঁর বোলিং আরও কার্যকর হয়েছে। নতুন বলে ব্যাটারদের সমস্যায় ফেলতে সুইং ব্যবহার করেছেন। আবার প্রয়োজন অনুযায়ী লাইন ও লেংথ বদলে রান আটকে রেখেছেন।

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সাধারণত বোলারদের উপর প্রচণ্ড চাপ থাকে। কয়েক ওভারের মধ্যে ম্যাচের পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। সেই জায়গায় ভুবনেশ্বরের নিয়ন্ত্রণ তাঁকে আলাদা করে দিয়েছে। পাওয়ারপ্লেতে উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ডেথ ওভারেও নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছেন।

প্রতিষ্ঠিত ব্যাটারদের বিরুদ্ধে তাঁর সাফল্যও নির্বাচকদের নজর এড়ায়নি। আইপিএলে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে ভুবনেশ্বর দেখিয়ে দিয়েছেন, জাতীয় দলের স্তরে তাঁর অভিজ্ঞতা এখনও কার্যকর হতে পারে।

নিজেকে কখনও আড়াল করেননি ভুবনেশ্বর

ভুবনেশ্বরের প্রত্যাবর্তনের গল্পের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তাঁর মানসিকতা। জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার পর অনেক ক্রিকেটারই হতাশা প্রকাশ করেন। কেউ কেউ নির্বাচকদের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু ভুবনেশ্বর সেই পথে হাঁটেননি।

নিজের ভুল স্বীকার করেছেন। নিজের বোলিংয়ের দুর্বল জায়গাগুলি নিয়ে কাজ করেছেন। নিয়মিত ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেছেন। নিজের ফিটনেস এবং দক্ষতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। জাতীয় দলে ফেরার সুযোগ না এলেও ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যাননি।

এই ধারাবাহিকতাই শেষ পর্যন্ত তাঁর পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ নির্বাচকদের সামনে তখন শুধু অতীতের সাফল্য নয়, বর্তমান পারফরম্যান্সও ছিল।

news image
আরও খবর

চার বছর পর ফেরার স্বপ্ন

দীর্ঘ সময় জাতীয় দলের বাইরে থাকার পরও ভুবনেশ্বরের মনে ভারতীয় দলের হয়ে খেলার ইচ্ছা শেষ হয়ে যায়নি। কিছু দিন আগেই এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, এখনও জাতীয় দলে ফেরার স্বপ্ন দেখেন।

সেই বক্তব্যের সময় হয়তো অনেকের কাছেই সেটি আশাবাদী একজন ক্রিকেটারের কথা বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করার রাস্তা তৈরি করেছেন ভুবনেশ্বর।

এটাই তাঁর প্রত্যাবর্তনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। তিনি শুধু নির্বাচকদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বসে থাকেননি। বরং যে জায়গায় তাঁর নিয়ন্ত্রণ ছিল, সেখানে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যন্ত সেই ধারাবাহিকতাই জাতীয় দলের দরজা আবার খুলে দিয়েছে।

নির্বাচক বদলালেই বদলে গেল সমীকরণ

ক্রিকেটে নির্বাচকের সিদ্ধান্তের প্রভাব কতটা গুরুত্বপূর্ণ, ভুবনেশ্বরের ঘটনা তার একটি উদাহরণ। একই ক্রিকেটার, একই দক্ষতা এবং একই রকম পারফরম্যান্স—কিন্তু নির্বাচক কমিটি বদলানোর পর তাঁকে নিয়ে ভাবনাও বদলে গেল।

আগরকরের সময় যেখানে ভবিষ্যতের ক্রিকেটারদের দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেখানে নতুন নির্বাচক কমিটি অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের সমন্বয়কে গুরুত্ব দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

ভুবনেশ্বরের ক্ষেত্রে সেই সমীকরণই কাজ করেছে। তাঁর বয়স, অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক আইপিএল পারফরম্যান্স—সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচকদের কাছে তাঁকে ফেরানোর পক্ষে যথেষ্ট কারণ তৈরি হয়েছে।

ভুবনেশ্বরের প্রত্যাবর্তনে কি শামিরও রাস্তা খুলবে?

ভুবনেশ্বরের জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তনের পর স্বাভাবিক ভাবেই আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—মহম্মদ শামির ক্ষেত্রেও কি একই রকম প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে?

বোর্ডের এক কর্তা মজা করেই প্রশ্ন তুলেছেন, ভুবনেশ্বর যদি ফিরতে পারেন, তা হলে শামির প্রত্যাবর্তনও কি খুব দূরে? অবশ্যই দু’জনের পরিস্থিতি এক নয়। তবে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স এবং প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে ফেরানোর ক্ষেত্রে নির্বাচকদের মানসিকতায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

শামি ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম অভিজ্ঞ পেসার। ফলে ভুবনেশ্বরের প্রত্যাবর্তনের পর তাঁর নামও আলোচনায় আসা স্বাভাবিক। তবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচকরা কী সিদ্ধান্ত নেন, তার জন্য অপেক্ষা করতেই হবে।

প্রত্যাবর্তনের গল্পে সবচেয়ে বড় শিক্ষা

ভুবনেশ্বর কুমারের প্রত্যাবর্তনের গল্প শুধু একজন ক্রিকেটারের জাতীয় দলে ফেরার গল্প নয়। এটি অপেক্ষা, পরিশ্রম এবং নিজের উপর বিশ্বাস রাখার গল্পও।

চার বছর জাতীয় দলের বাইরে থেকেও তিনি নিজের ক্রিকেটকে শেষ হতে দেননি। ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলেছেন, আইপিএলে পারফর্ম করেছেন, নিজের বোলিংয়ের উপর কাজ করেছেন। জাতীয় দলের দরজা বন্ধ থাকলেও নিজের ক্রিকেটজীবনের দরজা বন্ধ করেননি।

শেষ পর্যন্ত সেই ধারাবাহিকতাই তাঁকে আবার ভারতীয় দলের দরজায় পৌঁছে দিয়েছে।

অজিত আগরকরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নির্বাচক কমিটিতে পরিবর্তন এসেছে। সেই পরিবর্তনের প্রথম বড় ফলগুলির একটি হল ভুবনেশ্বর কুমারের প্রত্যাবর্তন। এখন দেখার, দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি ভারতীয় দলের হয়ে কতটা প্রভাব ফেলতে পারেন।

চার বছর আগে যে ক্রিকেটারকে জাতীয় দলের বাইরে চলে যেতে হয়েছিল, চার বছর পর সেই ক্রিকেটারই আবার নিজের পারফরম্যান্সের জোরে আলোচনার কেন্দ্রে। ভুবনেশ্বরের প্রত্যাবর্তন তাই শুধু একটি দল নির্বাচনের খবর নয়—এটি ভারতীয় ক্রিকেটে অভিজ্ঞতা বনাম তারুণ্যের ভারসাম্য নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করছে

Preview image