সত্তর আশির দশকের কলকাতায় শীত মানেই ঘন কুয়াশা, আলো-আঁধারির সন্ধ্যা আর শহরজুড়ে বড়দিনের উজ্জ্বল আলোর মায়া। কুয়াশার জাল ভেদ করে ঝলমল করত উৎসবের রোশনাই, ফিরে আসে নস্টালজিয়ার উষ্ণ স্মৃতি।
সত্তর ও আশির দশকের কলকাতা—এটা শুধু একটা সময় নয়, একটা অনুভূতি, একটা আলাদা শহর। আজকের ঝলমলে আলো, ডিজিটাল স্ক্রিন, স্মার্টফোন আর সোশ্যাল মিডিয়ায় মোড়া কলকাতার সঙ্গে সেই সময়ের শহরের কোনও তুলনাই চলে না। তখন শহর এত আধুনিক হয়নি। রাস্তায় রাস্তায় আলো ঝলমল করত না। সন্ধ্যা নামলেই ধীরে ধীরে কুয়াশা ঢেকে দিত রাস্তা, ল্যাম্পপোস্ট, ট্রামলাইন আর পুরনো দালানগুলিকে। সেই কুয়াশার চাদর ভেদ করে আলো জ্বালাত বড়দিন—ম্লান কিন্তু উষ্ণ, কম কিন্তু গভীর।
তখন বড়দিন মানেই শুধু চার্চ, প্রার্থনা আর ক্যারল নয়। কলকাতার বড়দিন ছিল শহরের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতিফলন। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব হলেও, সেই উৎসব বাঙালির আবেগে, খাদ্যাভ্যাসে আর দৈনন্দিন জীবনে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে তা হয়ে উঠেছিল সর্বজনীন। বাঙালির সহজাত উৎসবপ্রিয়তা আর ‘সবার রঙে রং মেশানোর’ স্বভাবই এই শহরের বড় শক্তি ছিল। ধর্ম তখন মানুষের মাঝে প্রাচীর তুলে দেয়নি। মানুষ মানুষকে চিনত মানুষের পরিচয়ে।
এই ধর্মনিরপেক্ষতার সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ মিলত খাবারের টেবিলে। বড়দিনে খ্রিস্টান বাড়িতে কেক থাকবেই—তার সঙ্গে জায়গা পেত কড়াইশুঁটির কচুরি, নতুন আলুর দম, কখনও লুচি বা ঘরোয়া বাঙালি রান্না। কেক আর কচুরির এই ‘ককটেল’ আজ অদ্ভুত শোনালেও, তখন ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। এই মিশ্র সংস্কৃতিই ছিল সেই সময়ের কলকাতার পরিচয়।
আজকের মতো উপচে পড়া ভিড় তখন ছিল না। রাস্তায় হাঁটা যেত। ট্রাম চলত নিরিবিলি গতিতে। গাড়ির হর্নে কানে তালা লাগত না। রাত বাড়লেও ভয় কাজ করত না। বড়দিনে শহরের রাস্তায় বেরোনো মানেই ছিল হাঁটতে হাঁটতে শহর দেখা—দোকানের আলো, চার্চের সাজ, জানালার পাশে রাখা ছোট্ট ক্রিসমাস ট্রি।
বো-ব্যারাক তখনও মধ্যবিত্ত বাঙালির নিয়মিত গন্তব্য হয়ে ওঠেনি। আজ যেখানে বড়দিন মানেই বো-ব্যারাকের ভিড়, সেলফি আর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট—তখন মধ্যবিত্ত পরিবার বড়দিনে যেত চিড়িয়াখানায়। কেউ কেউ যেত ধর্মতলায় নামী কেকের দোকানে। অনেকের কাছে বড়দিন মানেই ছিল ‘এক টুকরো ভালো কেক’।
সান্টাক্লজ় তখন উপহারের প্রতিশব্দ ছিল না। আজকের মতো উপহারের পাহাড়, ব্র্যান্ডেড খেলনা বা চমকপ্রদ সারপ্রাইজ—এসব তখন ছিল না। উৎসব ছিল ঘরকেন্দ্রিক। পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া, গল্প করা, হাসি-ঠাট্টাই ছিল আসল আনন্দ।
এই হারিয়ে যাওয়া কলকাতার বড়দিনের সাক্ষী ছিলেন রুপোলি পর্দার তিন জনপ্রিয় মুখ—সুদীপ মুখোপাধ্যায়, কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অম্বরীশ ভট্টাচার্য। তাঁদের বেড়ে ওঠার সময়ের কলকাতায় বড়দিন কেমন ছিল, সেই স্মৃতির দরজা খুলতেই তিনজনই যেন ফিরে গেলেন ছেলেবেলায়।
তাঁদের কথায় বারবার ফিরে এসেছে একটাই বিষয়—সেই সময় কলকাতা ছিল অনেক সহজ-সরল। অত ঝাঁ-চকচকে নয়, বাহুল্যহীন। এক মাস ধরে আলোয় সেজে ওঠার চল ছিল না। বরং উৎসবের আলো ছিল সংযত, সংবেদনশীল। এই প্রসঙ্গ টেনে কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন,
“তখন শহর অনেকটাই শান্ত ছিল। হয়তো আলো কম ছিল, কিন্তু উৎসবের উষ্ণতা ছিল অনেক বেশি। উদ্যাপন এখনকার মতো বাহুল্যময় ছিল না বলেই সেই সময়ের সমারোহ আজও ভুলতে পারিনি।”
তাঁর স্মৃতিতে বড়দিন মানেই পরিবারের সঙ্গে থাকা। মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে বো-ব্যারাক তখনও ছিল ‘দূরের স্বপ্ন’। তাই বড়দিনে তাঁরা যেতেন চিড়িয়াখানায়, কখনও ধর্মতলায় কেক খেতে। সান্টাক্লজ় কোনও দিন উপহার নিয়ে আসেননি—এই আক্ষেপ নেই অভিনেত্রীর কণ্ঠে। বরং তাঁর কাছে বড়দিন মানেই ছিল ঘরের মানুষদের সঙ্গে সময় কাটানো।
“আমরা এখনকার ছেলেপুলেদের মতো পার্টি করতাম না। আমাদের উৎসব মানেই বাড়ির সবাইকে নিয়ে সময় কাটানো,”—বলেছেন কনীনিকা।
অম্বরীশ ভট্টাচার্যের স্মৃতিতে বড়দিন মানেই ফিরিঙ্গিপাড়া। বো-ব্যারাকে গিয়ে তিনি খেয়েছেন ছানার কেক—যা আজ প্রায় বিলুপ্ত।
“কলকাতা যখন পাম কেকে মজে, আমি তখন ছানার কেক খেয়েছি। ফিরিঙ্গিপাড়ার এটাই ছিল তখনকার রেওয়াজ,”—বলেছেন তিনি।
তাঁর চোখে আজও ভাসে সেই দৃশ্য—খ্রিস্টান বাড়িতে কেকের সঙ্গে কড়াইশুঁটির কচুরি, নতুন আলুর দম পরিবেশন হচ্ছে। ধর্ম আর সংস্কৃতির এই মেলবন্ধনই ছিল কলকাতার প্রাণ। তবে আফসোসও আছে তাঁর কণ্ঠে।
“ওই সময় বড়দিনে শহরের রাস্তায় ফিরিঙ্গিদের দেখা যেত। তাঁরা সেজেগুজে বেরোতেন, হিলজুতো পরে হাঁটতেন। গির্জার ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে সেই শব্দ অদ্ভুতভাবে মিশে যেত। একুশের শতকের শহর আর ওঁদের দেখতে পেল না।”
বাঙালির উৎসবপ্রিয়তা ছোটবেলা থেকেই সুদীপ মুখোপাধ্যায়ের মধ্যেও ছিল প্রবল। তাঁর জীবন শুরু থেকেই খানিকটা ব্যতিক্রমী। বাবা ছিলেন সেনাবাহিনীর চিকিৎসক। নানা জায়গায় বদলি হতেন। পরিবারও তাঁর সঙ্গে ঘুরে বেড়াত।
সবচেয়ে মজার বিষয়—যিশু খ্রিস্টের জন্মদিনেই তাঁর বাবার জন্মদিন। ফলে বড়দিন মানেই মুখোপাধ্যায় পরিবারে দ্বিগুণ আনন্দ।
“বাবা শহরে থাকুন বা না-থাকুন, সেদিন পায়েস হতই। সঙ্গে ভালমন্দ রান্না। তার পর ইডেন গার্ডেনে ক্রিকেট দেখতে যাওয়া, কিংবা চিড়িয়াখানায় ঘুরতে যাওয়া,”—বলেছেন সুদীপ।
হেস্টিংসের উল্টো দিকে টার্ফ ভিউ আবাসন ছিল তাঁদের ঠিকানা। সেখান থেকে রেস কোর্স আর কলকাতা টার্ফ ক্লাব চোখের সামনেই ধরা দিত। শহরের এই অংশটা তখন ছিল তুলনামূলক শান্ত। সন্ধ্যা নামলেই জানালা দিয়ে তাকালে দেখা যেত আলোয় সেজে উঠছে কলকাতা—কিন্তু সেই আলো আজকের মতো ঝলমলে নয়, বরং মৃদু, সংযত। রেস কোর্সের বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়ে ছড়িয়ে থাকত নরম আলো, যা কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে চোখে এসে লাগত।
সেই দৃশ্যগুলিই আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে সুদীপ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে। তিনি বলেন, “দেখতাম আলোয় সেজে উঠছে শহর। তখন ভিড় কম। রেড রোড দিয়ে হুসহুস করে গাড়ি ছুটছে। এই দৃশ্যগুলো খুব উপভোগ করতাম।” আজকের রেড রোডে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য কল্পনা করাও কঠিন। তখন ট্রাফিকের চাপ ছিল না, হর্নের চাপে কান ঝালাপালা হত না। রাস্তার প্রশস্ততায় শহর যেন নিজের মতো করে নিঃশ্বাস নিতে পারত।
সেই সময় বড়দিনে কলকাতা মানেই ছিল এই নীরব অথচ প্রাণবন্ত দৃশ্যের সমাহার। চার্চের ঘণ্টাধ্বনি, দূর থেকে ভেসে আসা ক্যারলের সুর, আর আলো-আঁধারিতে ঢাকা শহর—সব মিলিয়ে এক অনন্য আবহ। উৎসব তখন ছিল চোখে দেখার, অনুভব করার। বাড়তি চমক বা বাহুল্যের প্রয়োজন পড়ত না।
তিন অভিনেতার স্মৃতিচারণে আরেকটি বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তাঁদের শৈশব বা কৈশোরে বড়দিন মানেই মাদক বা নিষিদ্ধ পানীয় নয়। আজকের সময়ে বড়দিন অনেক ক্ষেত্রেই রাতভর পার্টি, অ্যালকোহল আর উচ্চ শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু সত্তর ও আশির দশকের কলকাতায় সেই চিত্র একেবারেই আলাদা ছিল।
অম্বরীশ ভট্টাচার্য, কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুদীপ মুখোপাধ্যায়—তিনজনেরই বক্তব্য প্রায় এক। “আমাদের অত সাহস ছিল না। জানতাম, বাড়ির বড়রা জানতে পারলে দুর্গতির শেষ থাকবে না।” এই কথার মধ্যেই ধরা পড়ে সেই সময়ের পারিবারিক শাসন, সামাজিক মূল্যবোধ আর বেড়ে ওঠার ধারা। বড়দের চোখের আড়ালে কিছু করার সংস্কৃতি তখনও খুব একটা গড়ে ওঠেনি।
বড়দিন ছিল পরিবারের সঙ্গে কাটানোর দিন। সকলে মিলে খাওয়া, গল্প করা, হয়তো বাইরে একটু ঘুরে আসা—এই ছিল উদ্যাপনের রূপরেখা। আনন্দ মানে ছিল একসঙ্গে থাকা। কেউই নিজেকে আলাদা করে তোলার চেষ্টা করত না। উৎসব ছিল ব্যক্তিগত নয়, সমষ্টিগত।
এই স্মৃতিগুলোর মধ্য দিয়েই ধরা পড়ে সত্তর-আশির দশকের কলকাতার আসল ছবি। যেখানে বড়দিন মানেই ছিল আলো আর কুয়াশার মেলবন্ধন, কেকের সঙ্গে কচুরি, আর মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। সেই সময়ে উৎসব মানে ছিল সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় করা, প্রতিবেশীর সঙ্গে হাসি বিনিময়, পরিচিত মুখের সঙ্গে শুভেচ্ছা আদানপ্রদান।
আজ কলকাতা অনেকটাই বদলে গেছে। আলো বেড়েছে, ভিড় বেড়েছে, উৎসবের ধরন বদলেছে। কিন্তু সেই পুরনো কলকাতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। সে আজও বেঁচে আছে স্মৃতির পাতায়, গল্পের ভাঁজে, পুরনো অ্যালবামের ছবির ফ্রেমে। আর বড়দিন এলেই, কুয়াশা নামলে, আলো একটু নরম হলেই—মনটা অজান্তেই ফিরে যায় সেই সময়ে। যেখানে বড়দিন মানেই ছিল সহজ আনন্দ, নির্ভেজাল উষ্ণতা আর মানুষের সঙ্গে মানুষের গভীর সংযোগ।