Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

বাঙালি অভিজ্ঞান ছোটদের বিশ্বকাপে দেশের বড় ভরসা,তবে ফাইনাল ম্যাচ দেখছেন না বাবা অভিষেক

শুক্রবার অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারত খেললেও,মুম্বইয়ে অফিসে ব্যস্ত টিসিএস-এর মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার অভিষেক।

অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপে ভারতের অন্যতম বড় ভরসা হয়ে উঠেছে অভিজ্ঞান কুন্ডু, যার ব্যাটিং দক্ষতা এবং অবিচল মনোভাব তাকে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ক্রিকেট তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি শুধু প্রতিভাবান ব্যাটসম্যানই নন, পাশাপাশি একজন উইকেটরক্ষকও। অভিজ্ঞান কুন্ডু একজন প্রাক্তন মুম্বইয়ের বাসিন্দা, যার শৈশব ছিল চঞ্চল এবং ক্রিকেটে গভীর আগ্রহ নিয়ে বেড়ে উঠেছেন। তার বাবা অভিষেক কুন্ডু, যিনি টিসিএস-এ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেন, প্রথম থেকেই অভিজ্ঞানকে কোচিং-এর মাধ্যমে ক্রিকেটে আসতে সহায়তা করেছেন, যদিও তাকে একাধিক বাধার মধ্যে পড়তে হয়েছিল। এই দীর্ঘ যাত্রা এবং অভিজ্ঞান কুন্ডুর ক্রিকেটের প্রতি একাগ্রতার পিছনে রয়েছে তার বাবা-মায়ের অবিচল সমর্থন, বিশেষত তার মা বিনীতার সাহায্যে।

অভিজ্ঞান কুন্ডুর ক্রিকেটে আগ্রহ তখন থেকেই শুরু হয় যখন তিনি মাত্র পাঁচ বছর বয়সে প্রথম ক্রিকেট কোচিং সেন্টারে যেতে শুরু করেন। তার বাবা-মায়ের মতো কর্মরত অভিভাবকদের জন্য, এটা ছিল এক কঠিন সিদ্ধান্ত, কারণ অভিজ্ঞান তাদের একমাত্র সন্তান এবং তার ভবিষ্যত নিয়ে যথেষ্ট চিন্তা ছিল। অভিষেক কুন্ডু নিজেই বলেছিলেন, ‘‘ছেলে যাতে সারাদিন ক্লান্ত হয়ে রাতে অন্তত শান্তিতে ঘুমোয়, সেই আশায় আমি তাকে ক্রিকেট কোচিংয়ে পাঠিয়েছিলাম।’’

ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহের পাশাপাশি অভিজ্ঞান তার পড়াশোনা নিয়ে অনেক মনোযোগী ছিল। দশম শ্রেণির পরীক্ষায় ৮২ শতাংশ নম্বর পেয়ে সে তার মেধার প্রমাণ দিয়েছিল। এটাই ছিল তার অনুরাগীদের কাছে একটি বড় দৃষ্টান্ত, যে এমন একটি প্রতিভাবান ক্রিকেটার পড়াশোনা বা অন্যান্য বাধার মধ্যে পড়ে না, বরং সে এগিয়ে যায় তার লক্ষ্যকে পূর্ণ করতে। তার বাবা একসময় ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তার ছেলে নিয়ে, তবে বর্তমানে তিনি চান, তার ছেলে ভারতের হয়ে খেলুক এবং বিশ্বকাপে দেশকে গর্বিত করুক।

অভিজ্ঞান কুন্ডুর ক্রিকেটের পথ চলায় কোচ চেতন যাদবের অবদান অপরিসীম। তিনি যেভাবে অভিজ্ঞানকে শৃঙ্খলা এবং পরিশ্রম শেখালেন, তা তার প্রতিভাকে আরও উন্নত করেছে। চেতন যাদবের মতো একজন কোচের অধীনে কাজ করার সুযোগ পাওয়ার ফলে, অভিজ্ঞান কুন্ডু একজন পরিপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চেতন স্যারের কাছ থেকে পাওয়া পরামর্শের ফলে, অভিজ্ঞান জানতেন যে শুধু টেকনিক শিখলেই হবে না, তাকে আরও অনেক কিছু শিখতে হবে। চেতন স্যারের কাছ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতাগুলো তাকে আজকের ক্রিকেটার হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।

অভিজ্ঞান কুন্ডু যখন মাত্র ১৭ বছর বয়সে ভারতের ছোটদের বিশ্বকাপ দলে জায়গা পায়, তখন তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার একটি নতুন দিগন্তে প্রবাহিত হয়। বিজয় মার্চেন্ট ট্রফিতে দ্বিশতরান এবং হ্যারিস শিল্ডে অসাধারণ পারফরম্যান্স তাকে মুম্বই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের নজরে আনতে সহায়তা করে। তার পরবর্তী পঠন-পাঠন এবং পরিশ্রম তাকে দেশের অন্যতম সেরা ক্রিকেট তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অভিজ্ঞান নিজে একবার বলেছিলেন, ‘‘প্রথমে আমি ক্রিকেটে প্রবেশ করেছিলাম শুধুমাত্র খেলার জন্য, কিন্তু এখন আমার লক্ষ্য বড় হয়ে গেছে।’’ তার স্বপ্ন একদিন ভারতের হয়ে খেলতে এবং বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো।

তার অদম্য পরিশ্রম, কোচিংয়ের শৃঙ্খলা এবং পরিবারের সমর্থনের মাধ্যমে, অভিজ্ঞান আজ বিশ্ব ক্রিকেটে নিজের নাম প্রতিষ্ঠিত করেছে। বর্তমানে তিনি ভারতের অনূর্ধ্ব ১৯ দলের হয়ে খেলছেন, এবং বিশ্বকাপ ফাইনালে ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন। তার খেলা প্রতিভা, পরিশ্রম এবং নৈতিকতা তাকে দেশের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট তারকাদের তালিকায় জায়গা করে দিয়েছে।

অভিজ্ঞান কুন্ডু, একাধারে ভারতীয় ক্রিকেটের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এবং অনূর্ধ্ব ১৯ দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, তার কষ্টসাধ্য পরিশ্রম, দৃঢ় সংকল্প এবং একাগ্রতায় গড়ে তুলেছেন নিজের ক্রিকেট ক্যারিয়ার। সে যাত্রা সহজ ছিল না, কিন্তু অভিজ্ঞান নিজের কঠোর পরিশ্রম ও ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে প্রতি পদক্ষেপে প্রমাণ করেছেন যে, কোনো কাজের সফলতার জন্য একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মনোযোগ, ধারাবাহিকতা এবং আত্মবিশ্বাস। তার ক্রিকেট কেরিয়ারে যেভাবে উন্নতি ঘটেছে এবং যেভাবে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের স্থান অর্জন করেছেন, তা নিঃসন্দেহে এক অনুপ্রেরণার গল্প।

শৈশবকাল: চঞ্চল থেকে ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা

অভিজ্ঞান কুন্ডু তার শৈশবেই চঞ্চল এবং সারাক্ষণ দৌড়ে বেড়ানোর জন্য পরিচিত ছিলেন। ছোটবেলায় তিনি এক জায়গায় স্থির থাকতেন না। তার বাবা অভিষেক কুন্ডু এবং মা বিনীতার জন্য তাদের ছেলেকে সামলানো একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে, ক্রিকেটে তার আগ্রহ খুব তাড়াতাড়ি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অভিজ্ঞানকে দেখে বাবা-মা সিদ্ধান্ত নেন যে তাকে ক্রিকেট কোচিংয়ে পাঠানো উচিত, যাতে সে তার অতিরিক্ত শক্তি এবং আগ্রহকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। প্রথমে, অভিজ্ঞানকে স্থানীয় ক্রিকেট কোচিং সেন্টারে পাঠানো হয়, এবং তা থেকেই তার ক্রিকেট যাত্রা শুরু হয়।

অভিজ্ঞান কুন্ডুর ক্রিকেট যাত্রা শুরু হয়েছিল পাঁচ বছর বয়সে, যখন তিনি চেতন যাদব স্যরের ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে যোগ দেন। এখানেই তার ক্রিকেটের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং কঠোর পরিশ্রমের বাস্তবতা তৈরি হয়। চেতন স্যরের কাছে অভিজ্ঞান যে পরিমাণ শৃঙ্খলা, কঠোর অনুশীলন এবং প্রকৃতির শিখেছেন, তা তাকে আজকের দিনে একজন শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার এই সময়কাল এক জীবন্ত প্রমাণ যে, কঠোর পরিশ্রম এবং একাগ্রতায় একটি শিশুর জীবনে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।

news image
আরও খবর

শুরুতে চিন্তা ও হতাশা

তবে, অভিজ্ঞান কুন্ডুর পরিবারের জন্য শুরুতে তার ক্রিকেট যাত্রা নিয়ে কিছুটা চিন্তা ছিল। তার মা-বাবা লক্ষ্য করেছিলেন, তার বয়সী অন্যান্য ছেলে-মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে, কিন্তু অভিজ্ঞান সারাদিন ক্রিকেট খেলতে ব্যস্ত। তারা চিন্তিত ছিলেন যে, পড়াশোনা নিয়ে তার কোনো ভবিষ্যত হবে কি না। তবে, অভিজ্ঞান নিজে তার শখকে জীবনের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য বানিয়ে ফেলেছিল। তার বাবা অভিষেক কুন্ডু বলেছিলেন, ‘‘আমরা প্রথমে একটু চিন্তিত ছিলাম। দেখতাম, ওর বয়সিরা স্কুলে যাচ্ছে, আর ও ক্রিকেটে ডুবে যাচ্ছে। তবে এখন আর চিন্তা নেই, আপত্তিও নেই।’’ অভিজ্ঞান তার ভালোবাসার খেলা ক্রিকেটের প্রতি একাগ্রতা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিবারের ভয়কে দূর করতে সক্ষম হয়।

কঠোর পরিশ্রম এবং প্রশিক্ষণ

অভিজ্ঞান কুন্ডুর অগ্রযাত্রা সম্ভব হয়েছিল তার কঠোর পরিশ্রম এবং প্রশিক্ষণের কারণে। চেতন যাদব স্যরের ক্রিকেট কোচিংয়ে তার উন্নতির জন্য একাধিক কঠিন অনুশীলন ছিল। অভিজ্ঞান প্রতিদিন ৫০০০ বল খেলতো, এবং এমন অনুশীলন চলতো সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। তার এই নিয়মিত অনুশীলন এবং প্রশিক্ষণ তাকে অনেক শিখিয়েছে—এটা শুধু তার ব্যাটিংয়ের টেকনিক ছিল না, বরং তার শৃঙ্খলা, মনোসংযোগ এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসও ছিল।

অভিজ্ঞান কুন্ডু শুধুমাত্র ব্যাটিংয়ে দক্ষতা অর্জন করেননি, তার মনোভাবও ছিল চূড়ান্ত। তিনি জানতেন যে, ক্রিকেট শুধু খেলা নয়, বরং একটি জীবনযাপন যা শুধুমাত্র প্রতিভা নয়, বরং শৃঙ্খলা, সহনশীলতা এবং দৃঢ় মনোভাবের উপরও নির্ভরশীল। অভিজ্ঞানও তার মেন্টরের কাছ থেকে এই পরামর্শ পেয়ে তা বাস্তবে রূপায়িত করেন। তিনি নিজে বলেছিলেন, ‘‘প্রথমে আমি ক্রিকেটে প্রবেশ করেছিলাম শুধুমাত্র খেলার জন্য, কিন্তু এখন আমার লক্ষ্য বড় হয়ে গেছে।’’

প্রাথমিক সাফল্য: স্কুল ক্রিকেট থেকে মুম্বই ক্রিকেট

অভিজ্ঞান কুন্ডুর ক্রিকেটের পথ চলার শুরু হয়েছিল স্কুল ক্রিকেটে। হ্যারিস শিল্ডে তার অসাধারণ পারফরম্যান্স তাকে মুম্বই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের নজরে এনে দেয়। এটি তার ক্যারিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল, কারণ এখান থেকেই তার ক্রিকেট জীবনের নতুন দিগন্ত শুরু হয়। এরপর তাকে বিজয় মার্চেন্ট ট্রফি এবং জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। অভিজ্ঞান তার খেলায় নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর জন্য পরিশ্রম করতে থাকেন এবং তার ফলও পেতে শুরু করেন।

এভাবে, মাত্র ১৭ বছর বয়সে, অভিজ্ঞান কুন্ডু ভারতের ছোটদের বিশ্বকাপ দলের অংশ হয়ে ওঠেন। এর পর থেকেই তার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু হয় এবং দেশের হয়ে খেলার সুযোগ তার সামনে আসে।

বিশ্বকাপে অভিজ্ঞান কুন্ডু: ভারতের বড় ভরসা

অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপে অভিজ্ঞান কুন্ডুর পারফরম্যান্স ভারতীয় দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশ্বকাপে ভারতের হয়ে তার ব্যাটিং অসাধারণ ছিল এবং তার ব্যাট থেকে বেরিয়ে আসে একের পর এক ম্যাচ উইনিং ইনিংস। তার সেরা পারফরম্যান্সগুলি তাকে দেশের হয়ে খেলতে আরও উত্সাহিত করে এবং তার সাফল্য পুরো ভারতকে গর্বিত করে। তার প্রতি দেশের আশা এবং বিশ্বাস বড় হয়ে ওঠে, এবং তার পরবর্তী লক্ষ্য একদিন ভারতীয় জাতীয় দলের হয়ে খেলা।

বাবা অভিষেক কুন্ডু: ছেলের খেলা ও পরিবার

অভিজ্ঞান কুন্ডু যতই বড় হোক না কেন, তার বাবা অভিষেক কুন্ডু সর্বদা তার পাশে ছিলেন। মুম্বইয়ের টিসিএস-এ কাজ করা অভিষেক কুন্ডু যখন ছেলের খেলা নিয়ে উৎকণ্ঠিত ছিলেন, তখনও তিনি তার কাজের প্রতি মনোযোগী ছিলেন। ‘‘কী আর করা যাবে! কাজের চাপ খুব বেশি। তবে আপডেটেড থাকছি, ফাঁকে ফাঁকে টেলিভিশনে চোখও রাখছি,’’ ফোনে কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন অভিষেক কুন্ডু। তার এই কথাগুলো প্রমাণ করে, ছেলের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং সমর্থন।

ভবিষ্যৎ: দেশকে গর্বিত করার লক্ষ্যে

অভিজ্ঞান কুন্ডুর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন রয়েছে। তার মা-বাবার মতো, তিনি নিজেও চান যে, তার ছেলে দেশের হয়ে খেলুক এবং ক্রিকেটের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সম্মান অর্জন করুক। তার কোচ চেতন যাদবও তার জন্য আরও বড় লক্ষ্য স্থির করেছেন। সচিন তেন্ডুলকরের মতো ভারতীয় ক্রিকেটের মহাত্মা হয়ে উঠতে অভিজ্ঞান কুন্ডুর স্বপ্নের আকাশ অনেক উঁচু। তিনি শুধু ক্রিকেটের প্রতিভা নয়, বরং একজন অনুপ্রেরণামূলক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও পরিচিত হতে চান।

এভাবে, অভিজ্ঞান কুন্ডু তার শৈশব থেকে শুরু করে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছাতে কঠোর পরিশ্রম, পরিবারের সমর্থন এবং নিজের সংকল্পের মাধ্যমে এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। তার পরবর্তী পথ আগামী দিনে ভারতীয় ক্রিকেটকে নতুন দিগন্তে নিয়ে যাবে, এমনটাই প্রত্যাশা।

Preview image