ভারত বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট ম্যাচে ১৭ বছর পর ভারতের মাটিতে প্রথমবার পাঁচ উইকেট নিলেন জসপ্রিত বুমরাহ। এডেন গার্ডেন্সে তাঁর দুরন্ত বোলিংয়ে ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ায় টিম ইন্ডিয়া।
ভারত বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার টেস্ট সিরিজ সবসময়ই ক্রিকেটজগতের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণ, আর কলকাতার এডেন গার্ডেন্স তো সেই আবেগকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে তোলে। এই ঐতিহাসিক মাঠে জসপ্রিত বুমরাহ যখন বল হাতে ছন্দে থাকেন, তখন প্রতিপক্ষ দলের ব্যাটসম্যানদের মুখে চাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে চলতি টেস্ট ম্যাচেও সেই দৃশ্যই যেন আবার চোখে পড়ল, কারণ বুমরাহ ১৭ বছর পর ভারতের মাটিতে প্রথমবার পাঁচ উইকেটের অসাধারণ কীর্তি গড়লেন। ভারতের একজন ফাস্ট বোলারের জন্য এই অর্জন নিঃসন্দেহে বিশেষ—শুধু তার নিজের ক্যারিয়ারের জন্য নয়, ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এডেন গার্ডেন্সের পরিবেশ সবসময়ই ক্রিকেটারদের মনে আলাদা উত্তেজনা তৈরি করে। মাঠের ঐতিহ্য, গ্যালারির গর্জন, আর ক্রিকেটপ্রেমী দর্শকদের উন্মাদনা—সব মিলিয়ে এখানে খেলা মানেই এক অন্য অভিজ্ঞতা। বুমরাহ যখন নতুন বলে দৌড় শুরু করেন, তখন স্টেডিয়াম জুড়ে হাজির প্রত্যেক মানুষ জানতেন যে কিছু একটা বিশেষ ঘটতে চলেছে। বল হাতে তাঁর নিখুঁত লাইন ও লেংথ শুরু থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানদের চাপে ফেলে দেয়। সুইং, সিম মুভমেন্ট এবং নিখুঁত ইয়র্কার—এই তিন অস্ত্র নিয়েই বুমরাহ শুরু থেকেই আগ্রাসী মেজাজে ছিলেন।
ম্যাচের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকার ওপেনাররা যথেষ্ট সাবধানী ছিলেন। কিন্তু বুমরাহর বোলিংয়ের গতি এবং অদ্ভুত অ্যাঙ্গেল দ্রুতই তাঁদের ধৈর্য ভেঙে দেয়। একের পর এক ডেলিভারি উইকেটের বাইরে হালকা মুভ করে ভেতরে ঢুকে আসছিল, কখনও আবার ব্যাটসম্যানকে ভুল শট খেলানোর জন্য অফ স্টাম্পের বাইরে জায়গা রেখে দিচ্ছিলেন। ব্যাটসম্যানের প্রতিটা ছোট ভুল বুমরাহ কাজে লাগাচ্ছিলেন অসাধারণভাবে। তাঁর প্রথম উইকেট আসে এক নিখুঁত লেংথ ডেলিভারিতে, যা ব্যাটের ধার স্পর্শ করে সোজা স্লিপে চলে যায়। সেই উইকেটই বুমরাহর আগুনে স্পেলকে আরও তীব্র করে তোলে।
এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার মিডল অর্ডারও সামাল দিতে পারেনি বুমরাহর আগ্রাসন। মাঝে মাঝে তিনি এমন কিছু ডেলিভারি করছিলেন যা ব্যাটসম্যানদের মনে আরও ভীতি ছড়ায়। মাঝে এক পর্যায়ে দর্শকরা বুঝতেই পারছিলেন যে বুমরাহ কেবল উইকেট নেওয়ার জন্য বল করছেন না, তিনি ব্যাটসম্যানদের মানসিকভাবেও ভেঙে দিতে চাইছেন। প্রতিটি লেন্থ পরিবর্তন, প্রতিটি অ্যাঙ্গেল, প্রতিটি গতি—সবই ছিল হিসাব করে ফেলা। তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত বোলিং দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসকে দিশেহারা করে তোলে।
চতুর্থ উইকেট নেওয়ার পর স্টেডিয়ামজুড়ে উত্তেজনা তুঙ্গে উঠে। সবাই বুঝতে পারছিলেন যে বুমরাহ তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় মাইলস্টোন ছুঁতে চলেছেন। পঞ্চম উইকেটটি আসে তাঁর স্বাক্ষরস্বরূপ ইন-ডিপার লেংথ ডেলিভারিতে। ব্যাটসম্যান সম্পূর্ণ ভুল বিচার করেন, ব্যাট-প্যাডের ফাঁকে বল ঢুকে স্টাম্পে আঘাত করে। বল লেগে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এডেন গার্ডেন্স গর্জে ওঠে। খুশিতে ভরে যান বুমরাহ নিজেও, যদিও তাঁর অভিব্যক্তি তখনও সেই শান্ত, স্থির, আত্মবিশ্বাসী ক্রিকেটারের মতো।
ভারতের বোলিং আক্রমণে বরাবরই স্পিনারদের আধিপত্য ছিল। কিন্তু বুমরাহ সেই চিত্রটাকে বদলে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে ভারতের মাটিতেও দ্রুতগতির বোলাররা প্রভাব বিস্তার করতে পারেন, যদি তাদের কাছে থাকে সঠিক স্কিল সেট, ধারাবাহিকতা এবং মানসিক শক্তি। তাঁর অর্জন তাই শুধু পরিসংখ্যানে শোভা পায় না, এটি ভারতীয় ক্রিকেটের ভাবাদর্শকেও প্রভাবিত করে। আজকের তরুণ ফাস্ট বোলারদের কাছে তিনি অনুপ্রেরণা, এবং তাঁর এই পারফর্ম্যান্স সেই অনুপ্রেরণাকেই আরও শাণিত করে।
এই ম্যাচে বুমরাহর পারফর্ম্যান্সের পাশাপাশি টিম ইন্ডিয়ার বাকি বোলাররাও ভাল করেছেন। মোহাম্মদ সিরাজের সিম মুভমেন্ট, রবীন্দ্র জাডেজার ধারাবাহিকতা এবং অক্ষর প্যাটেলের নিখুঁত অ্যাকিউরেসি দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং লাইনআপকে আরও বিপদে ফেলে। কিন্তু তবুও দিনশেষে আলো কেড়েছেন বুমরাহই। তাঁর পাঁচ উইকেট টিম ইন্ডিয়াকে প্রবলভাবে ম্যাচে এগিয়ে দেয়। ভারত যখন ব্যাট করতে নামে, তখন দলের সামনে সুযোগ থাকে বড় স্কোর করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার।
এই ম্যাচের আরেকটি বিশেষ দিক ছিল এডেনের দর্শকদের উচ্ছ্বাস। দীর্ঘদিন পর কলকাতার মাঠে এমন আগুনে স্পেল দেখতে পেয়ে দর্শকরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন। প্রতিটি বল ডেলিভারির পর দর্শকদের চিৎকার, প্রতিটি উইকেট পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বজ্রধ্বনি—সব মিলিয়ে পরিবেশ এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে বুমরাহ নিজেও ম্যাচশেষে স্বীকার করেন, “এডেনে এমন সমর্থন পাওয়া একজন বোলারের জন্য বিরাট সম্মান।”
খেলা শেষে ক্রিকেটবিশ্বের একের পর এক কিংবদন্তি বুমরাহর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন। অনেকে বলেন যে বুমরাহ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফাস্ট বোলার। তাঁর অ্যাকশন যতই অদ্ভুত হোক না কেন, তার কার্যকারিতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তাঁর ধারাবাহিকতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং ম্যাচ পড়ার ক্ষমতা তাঁকে আরও অসাধারণ করে তুলেছে।
এই অর্জন বুমরাহর ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ১৭ বছর পর ভারতের মাটিতে একজন ভারতীয় ফাস্ট বোলারের পাঁচ উইকেট—এই ঘটনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্রিকেটারদের জন্যও বিশেষ শিক্ষা। ভারতীয় ক্রিকেটে পেস বোলিংয়ের স্বর্ণযুগ যে শুরু হয়ে গেছে তা আর একবার প্রমাণ হল।
এই ম্যাচের সাফল্য শুধু এক দিনের পারফর্ম্যান্স নয়, বরং দীর্ঘ পরিশ্রম, নিষ্ঠা, এবং নিজের দক্ষতাকে নতুন করে গড়ে তোলার গল্প। বুমরাহ সবসময়ই একজন লড়াকু ক্রিকেটার। চোটের পর ফিরে আসা, লাইফস্টাইল ম্যানেজমেন্ট, নিজের বোলিং ভ্যারিয়েশন—সব কিছুই তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে সামলে নেন। তাই আজ তাঁর এই অর্জন আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
এডেন গার্ডেন্সে তাঁর এই পারফরম্যান্স ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো এক অধ্যায় হয়ে থাকবে। ক্রিকেটপ্রেমীরা মনে রাখবেন, যে দিন জসপ্রিত বুমরাহ ভারতের মাটিতে ১৭ বছর পর প্রথমবার পাঁচ উইকেট নিলেন, এবং ভারতীয় বোলিং আক্রমণকে আবারও এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিলেন।
ভারত বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট ম্যাচে এডেন গার্ডেন্স আবারও সাক্ষী থাকল এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের, যার কেন্দ্রে ছিলেন জসপ্রিত বুমরাহ। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ভারতের মাটিতে প্রথমবার কোনও ভারতীয় ফাস্ট বোলার পাঁচ উইকেট নিলেন এবং সেই কৃতিত্ব অর্জন করলেন বুমরাহ। তাঁর এই অসাধারণ পারফর্ম্যান্স শুধু ম্যাচের পরিস্থিতিই বদলে দেয়নি, বরং ভারতের পেস বোলিংয়ের উন্নতির ব্যাপারে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এডেনের সবুজ আভা, আর্দ্রতার কারণে মিলেমিশে যাওয়া পরিবেশ এবং দর্শকদের গর্জন—সব মিলিয়ে মাঠের আবহ এমন ছিল যে বুমরাহর প্রতিটি ডেলিভারি আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছিল।
ম্যাচের শুরু থেকেই বুমরাহ ছন্দে ছিলেন। বল হাতে তাঁর গতি, সিম পজিশন এবং নির্ভুল লেন্থ দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানদের শুরু থেকেই চাপে ফেলে দেয়। ওপেনারদের বিরুদ্ধে দারুণ কিছু ডেলিভারি করার পরই বোঝা যাচ্ছিল যে বুমরাহ আজ বিশেষ কিছু করতে চলেছেন। প্রথম উইকেট পাওয়ার পরই তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে ওঠে এবং তিনি বোলিংয়ের প্রতিটি স্পেলে সেই আগ্রাসন বজায় রাখেন। তাঁর দ্বিতীয় ও তৃতীয় উইকেট মূলত বুদ্ধিদীপ্ত পরিকল্পনার ফল। একদিকে তিনি অফ স্টাম্পের বাইরে বল রেখে ব্যাটসম্যানদের ফাঁদে ফেলছিলেন, আবার কখনও ভিতরে ঢোকা ডেলিভারির মাধ্যমে তাঁদের ভুল শট খেলতে বাধ্য করছিলেন।
চতুর্থ উইকেটটি ছিল সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতার পরিচয়। ব্যাটসম্যান পিচ পড়ে এগিয়ে খেলতে গেলে বুমরাহ হঠাৎ গতি কমিয়ে দেন, যার ফলে শট টাইমিং সম্পূর্ণ ভুল হয়ে যায় এবং সহজেই ক্যাচ তুলে দেন। কিন্তু সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত আসে তাঁর পঞ্চম উইকেট নেওয়ার সময়। একটি নিখুঁত ইন-ডিপার লেংথ বল, যা ব্যাটসম্যানের ব্যাট-প্যাডের ফাঁক দিয়ে ঢুকে সোজা স্টাম্পে আঘাত করে। বল স্টাম্পে লাগার সঙ্গে সঙ্গে গর্জে ওঠে পুরো এডেন গার্ডেন্স। দর্শকদের উন্মাদনা এবং সতীর্থদের অভিনন্দনে তখন বুমরাহ অনন্য এক উচ্চতায়।
ক্রমাগত চোট-আঘাত সামলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করার যে চেষ্টা বুমরাহ করে চলেছেন, এই পাঁচ উইকেট সেই গল্পকেই আরও উজ্জ্বল করে তুলল। ভারতের পেস আক্রমণের মুখ হয়ে উঠেছেন তিনি, এবং তাঁর প্রতিটি দুরন্ত পারফরম্যান্স ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পেসারদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। এই ম্যাচে সিরাজ, জাডেজা এবং অক্ষর প্যাটেলের ভূমিকা থাকলেও আলো কেড়ে নিলেন বুমরাহই। তাঁর এই পারফরম্যান্স প্রমাণ করে দিল যে ভারতীয় পেস বোলিং এখন বিশ্বমানের, এবং যে কোনও পরিস্থিতিতে ফল আনতে সক্ষম।
এডেনে বুমরাহর কীর্তি ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর পাঁচ উইকেট কেবল এক দিনের সাফল্য নয়, বরং বহু বছরের পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং নিজেকে ক্রমাগত উন্নত করার ফল। টেস্ট ক্রিকেটে বুমরাহর এই প্রভাব ভারতের বোলিংয়ের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল করবে—এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।