ব্রাজ়িল ও উরুগুয়ের মতো আন্তর্জাতিক ফুটবল দলকে কলকাতার মাঠে খেলানোর উদ্যোগ নিয়ে তৃপ্ত সৌরভ চট্টোপাধ্যায় ও অনুজ কিচলু। তাঁদের অভিজ্ঞতা, সাফল্য এবং ভবিষ্যতে কলকাতায় ব্রাজ়িলকে ফের খেলানোর সম্ভাবনা নিয়ে আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে কথা বললেন দুই উদ্যোক্তা।
কলকাতার ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ব্রাজ়িল ও উরুগুয়ের মতো বিশ্বখ্যাত ফুটবল দলকে নিজেদের শহরের মাঠে খেলতে দেখা নিঃসন্দেহে এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। ভিনিসিয়স জুনিয়রের ব্রাজ়িল এবং দিয়েগো ফোরল্যানের উরুগুয়েকে কলকাতায় খেলানোর উদ্যোগ সফল হওয়ার পর তৃপ্তি ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন এই আয়োজনের নেপথ্যের দুই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোক্তা সৌরভ চট্টোপাধ্যায় এবং অনুজ কিচলু। দীর্ঘ চার মাসের প্রস্তুতি, অসংখ্য বৈঠক, আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় এবং নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে কলকাতায় এই আন্তর্জাতিক ফুটবল আয়োজন তাঁদের কাছে এক উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
‘বেস্ট অফ ইউ’ সংস্থার দুই কর্ণধার সৌরভ চট্টোপাধ্যায় ও অনুজ কিচলু আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে কথোপকথনে জানিয়েছেন, কী ভাবে এই আয়োজন বাস্তবায়িত হয়েছিল, ব্রাজ়িল ও উরুগুয়ে দলের প্রতিনিধিরা কলকাতার পরিবেশ সম্পর্কে কী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে আবারও ব্রাজ়িলের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলকে কলকাতার মাঠে খেলতে দেখা যেতে পারে কি না।
কলকাতায় ব্রাজ়িল ও উরুগুয়ের মতো আন্তর্জাতিক ফুটবল দলকে নিয়ে আসা সহজ কাজ ছিল না। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম জনপ্রিয় দল ব্রাজ়িলের প্রতিনিধিদের সন্তুষ্ট করা থেকে শুরু করে স্টেডিয়াম, নিরাপত্তা, যাতায়াত, অনুশীলন এবং অন্যান্য পরিষেবা নিশ্চিত করা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল একাধিক চ্যালেঞ্জ। তবু শেষ পর্যন্ত আয়োজন সফল হওয়ায় স্বস্তি পেয়েছেন সৌরভ ও অনুজ।
শুক্রবার সন্ধ্যায় ক্যালকাটা ক্রিকেট অ্যান্ড ফুটবল ক্লাবে উপস্থিত হয়েছিলেন ভারতের প্রাক্তন টেনিস তারকা জয়দীপ মুখোপাধ্যায়। সৌরভ ও অনুজকে সামনে পেয়ে তিনি তাঁদের উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং অভিনন্দন জানান। তাঁর প্রতিক্রিয়া থেকেই বোঝা যায়, কলকাতায় এমন একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজন কতটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
সৌরভ ও অনুজের মতে, ব্রাজ়িল দলের ফুটবলার এবং প্রতিনিধিরা কলকাতার আতিথেয়তা, সংস্কৃতি, খাবার ও মানুষের ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়েছেন। তাঁদের আশা, এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে ভারত এবং ব্রাজ়িলের মধ্যে ফুটবল সংক্রান্ত যোগাযোগ আরও বাড়াতে সাহায্য করবে।
সৌরভ ও অনুজের বক্তব্য, কলকাতায় এসে ব্রাজ়িল দল যে অভিজ্ঞতা পেয়েছে, তা শুধু একটি ম্যাচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতে ব্রাজ়িল অন্য দেশে খেলতে গেলে ভারতকেও সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। তাঁদের বিশ্বাস, কলকাতার এই আয়োজন আন্তর্জাতিক ফুটবল মানচিত্রে ভারতের উপস্থিতিকে আরও দৃঢ় করতে সাহায্য করবে।
ব্রাজ়িল দল খুব অল্প সময়ের জন্য কলকাতায় এসেছিল। অনুজ কিচলু জানিয়েছেন, ১ অক্টোবর রাতে কলকাতায় পৌঁছনোর পর দলটি পরের দিন মাত্র একটি অনুশীলন পর্বে অংশ নেয়। ৩ অক্টোবর ছিল ম্যাচ। অর্থাৎ, এত বড় আন্তর্জাতিক দলের জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় ব্যবস্থা করার সময় ছিল অত্যন্ত সীমিত।
এই অল্প সময়ের মধ্যেই দলের যাতায়াত, নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, খাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবা নিশ্চিত করতে হয়েছিল। আন্তর্জাতিক ফুটবল দলের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, খেলোয়াড়দের স্বাচ্ছন্দ্য এবং নিরাপত্তা বজায় না থাকলে মাঠের বাইরের অভিজ্ঞতাও নেতিবাচক হতে পারে।
অনুজের বক্তব্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরে অভিবাসন সংক্রান্ত প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে কলকাতার খাবার, সংস্কৃতি এবং স্থানীয় মানুষের আচরণ—সব কিছু নিয়েই ব্রাজ়িল দলের প্রতিনিধিরা খুশি ছিলেন। এই প্রতিক্রিয়াকে তাঁরা আয়োজনের অন্যতম বড় সাফল্য বলে মনে করছেন।
আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের ক্ষেত্রে স্টেডিয়ামের মান এবং মাঠের প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌরভ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্রাজ়িলের প্রতিনিধিরা প্রথমবার কলকাতায় এসে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের মাঠ দেখে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হননি। ফলে আয়োজকদের সামনে চ্যালেঞ্জ আরও বেড়ে যায়।
এরপর মাঠের প্রস্তুতি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে একাধিক কাজ করতে হয়। ম্যাচের প্রায় এক সপ্তাহ আগে ব্রাজ়িলের প্রতিনিধিরা মাঠ পরিদর্শন করার পর তাঁদের প্রতিক্রিয়ায় সন্তুষ্টির ইঙ্গিত পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন সৌরভ। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর ব্রাজ়িল দলের সামগ্রিক প্রতিক্রিয়াও ইতিবাচক ছিল বলে দাবি দুই উদ্যোক্তার।
সৌরভ ও অনুজের মতে, ম্যাচের দিন যুবভারতী স্টেডিয়ামের পরিবেশ ছিল আকর্ষণীয়। মাঠে ৫০ হাজারেরও বেশি দর্শকের উপস্থিতি এবং দর্শকদের উৎসাহ এই আয়োজনকে বিশেষ মাত্রা দেয়। স্টেডিয়ামের প্রস্তুতি, দর্শকদের জন্য পরিষেবা এবং ম্যাচ পরিচালনার সামগ্রিক ব্যবস্থা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় তাঁরা স্বস্তি পেয়েছেন।
এই আন্তর্জাতিক ফুটবল আয়োজন সফল করতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের ভূমিকার কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছেন সৌরভ ও অনুজ। তাঁদের বক্তব্য, এত বড় আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করতে একাধিক সংস্থার মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। ব্রাজ়িল ও উরুগুয়ের ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে অসংখ্য ভিডিয়ো কল, কনফারেন্স কল এবং পরিকল্পনামূলক বৈঠক করতে হয়েছে।
স্টেডিয়ামের প্রস্তুতি, দর্শকদের বসার ব্যবস্থা, সিটে নম্বর বসানো, পানীয় জল ও খাবারের পরিষেবা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা—প্রতিটি বিষয়েই পরিকল্পনা প্রয়োজন ছিল। উদ্যোক্তাদের দাবি, রাজ্য সরকার এই দায়িত্বগুলি যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে সামলেছে।
সৌরভ ও অনুজ জানিয়েছেন, বড় কনসার্ট এবং আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের অভিজ্ঞতা তাঁদের রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তাঁরা সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পেরেছেন। ফলে বড় আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের পূর্ব অভিজ্ঞতা সীমিত থাকলেও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বড় কোনও সমস্যা হয়নি বলে তাঁদের মত।
বিশ্বখ্যাত ফুটবল দলগুলির নিরাপত্তা সংক্রান্ত চাহিদা সাধারণত অত্যন্ত কঠোর হয়। শুধু স্টেডিয়াম নয়, হোটেল থেকে মাঠে যাতায়াত এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানেও নিরাপত্তার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। সৌরভ ও অনুজের দাবি, ব্রাজ়িল ও উরুগুয়ে—দুই দলের ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা সন্তোষজনক ছিল এবং দলগুলির তরফে কোনও উল্লেখযোগ্য অভিযোগ আসেনি।
শুধু ব্রাজ়িল নয়, উরুগুয়ে দলের কলকাতা সফরও আয়োজকদের কাছে বিশেষ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে। সৌরভ জানিয়েছেন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় খেলার পর কলকাতায় এসেছিল উরুগুয়ে দল। তাঁদের মতে, কলকাতার আতিথেয়তা এবং পরিবেশ দলের সদস্যদের ভাল লেগেছিল।
অনুজ জানিয়েছেন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় উরুগুয়ে দল তিন দিন করে থাকলেও কলকাতায় তাদের থাকার সময় ছিল ছয় দিন। এই সময়ের মধ্যে শহর ঘুরে দেখা, স্থানীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছিল দলটি।
উরুগুয়ে দলের সদস্যদের ইডেনে ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতাও ছিল বিশেষ আকর্ষণের। সৌরভের বক্তব্য, প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার রবিন সিং তাঁদের ব্যাটিং ও বোলিংয়ের প্রাথমিক কৌশল শিখিয়েছিলেন। ফুটবল মাঠের তারকাদের ক্রিকেটের ঐতিহ্যবাহী পরিবেশে অংশ নিতে দেখা কলকাতার ক্রীড়া সংস্কৃতির এক অন্য দিক তুলে ধরে।
সৌরভ ও অনুজের মতে, এই সফর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার সুযোগ তৈরি করেছে। তাঁদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক ফুটবল তারকারা বিশ্বজুড়ে পরিচিত হলেও ব্যক্তিগত ব্যবহারে তাঁরা অত্যন্ত সহজ-সরল। ফলে এই আয়োজন শুধুমাত্র মাঠে দুটি ম্যাচ আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।
কলকাতায় ব্রাজ়িলের ম্যাচ ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলির মধ্যে একটি হল, ভবিষ্যতে কি আবারও এই দলকে শহরে খেলতে দেখা যাবে? সৌরভ ও অনুজ এই বিষয়ে আশাবাদী।
তাঁদের মতে, ব্রাজ়িল দলের প্রতিনিধিরা কলকাতার আয়োজন এবং আতিথেয়তায় সন্তুষ্ট হওয়ায় ভবিষ্যতে ভারতের সঙ্গে খেলার সম্ভাবনা আরও গুরুত্ব পেতে পারে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সূচি তৈরি, প্রতিপক্ষ নির্বাচন এবং বিভিন্ন দেশের সফর পরিকল্পনার মতো বিষয় অবশ্য একাধিক বিষয়ের উপর নির্ভর করে। তবু কলকাতার এই অভিজ্ঞতা ভারতকে সম্ভাব্য আয়োজক এবং প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরতে সাহায্য করতে পারে বলে তাঁদের বিশ্বাস।
সৌরভ ও অনুজের বক্তব্য, ব্রাজ়িলের মতো পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল অন্য রাজ্যের পরিবর্তে কলকাতায় খেলতে এসেছে, এটিকে পশ্চিমবঙ্গের জন্য গর্বের বিষয় হিসেবে দেখা উচিত। ভবিষ্যতে স্পেন, ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী দল ভারতে খেলতে এলে তা রাজ্যের ক্রীড়া, পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ভবিষ্যতে ব্রাজ়িল কবে আবার কলকাতায় খেলবে, সে বিষয়ে কোনও নিশ্চিত ঘোষণা তাঁদের বক্তব্যে নেই। উদ্যোক্তাদের আশা এবং বাস্তব সূচি—এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখাই যুক্তিযুক্ত।
সাফল্যের মধ্যেও কিছু সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন অনুজ কিচলু। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের জন্য হাতে মাত্র চার মাস সময় ছিল। আরও আগে থেকে পরিকল্পনা করা গেলে প্রচার, দর্শকসংখ্যা এবং স্পনসরদের সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আরও ভাল ফল পাওয়া সম্ভব হত।
অনুজের বক্তব্য, এই ধরনের বড় ম্যাচের প্রচার আরও বেশি হওয়া প্রয়োজন ছিল। দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করতে দীর্ঘমেয়াদি প্রচার, বিভিন্ন বিপণন পরিকল্পনা এবং যথাযথ সময় নিয়ে স্পনসরদের যুক্ত করা জরুরি। হাতে আরও সময় থাকলে আয়োজনের পরিসর এবং দর্শকদের অংশগ্রহণ বাড়ানো যেত বলে তাঁর মত।
এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। মাঠে ম্যাচ আয়োজন করাই শেষ কথা নয়। ম্যাচকে কেন্দ্র করে দর্শকদের আগ্রহ তৈরি করা, স্থানীয় ব্যবসাকে যুক্ত করা, পর্যটনের সম্ভাবনা তুলে ধরা এবং ভবিষ্যতের জন্য বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলাও প্রয়োজন।
সৌরভ ও অনুজের মতে, কলকাতায় এই আয়োজন ভবিষ্যতে আরও বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানের জন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পরবর্তী সময়ে আরও পরিকল্পিত ভাবে এগোনো সম্ভব।
ব্রাজ়িলের কোচ কার্লো আনচেলোত্তি এবং দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথোপকথনে ভারতীয় ফুটবলের উন্নতির বিষয়টিও উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন অনুজ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতীয় ফুটবলারদের বিদেশের লিগে খেলার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
অনুজের মতে, ভারতীয় খেলোয়াড়দের শুধু ইউরোপের প্রথম সারির লিগে খেলার স্বপ্ন দেখলেই হবে না। সুযোগ পেলে তৃতীয় বা চতুর্থ ডিভিশনের প্রতিযোগিতাতেও খেলতে যাওয়া উচিত। বিদেশের ফুটবল পরিবেশে নিয়মিত খেলার অভিজ্ঞতা, উন্নত প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ এবং বিভিন্ন ধরনের খেলার কৌশল শেখার সুযোগ খেলোয়াড়দের বিকাশে সাহায্য করতে পারে।
অনুজের বক্তব্যে ডেনমার্ক, নরওয়ে, লাটভিয়া এবং স্লোভেনিয়ার মতো দেশের লিগের উদাহরণ উঠে এসেছে। তাঁর মতে, আফ্রিকা এবং এশিয়ার একাধিক দেশের খেলোয়াড়েরা ইউরোপের বিভিন্ন লিগে খেলার মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করেন।
বিদেশের ক্লাবে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে জাতীয় দলে ফিরলে ভারতীয় ফুটবলারদের প্রতিযোগিতামূলক মান উন্নত হতে পারে বলে তাঁর মত। তবে বিদেশে খেলার সুযোগ তৈরি করতে হলে ক্লাব, ফুটবল সংস্থা, কোচ, এজেন্ট এবং খেলোয়াড়দের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক দলের সঙ্গে ম্যাচ আয়োজনের পাশাপাশি ভারতীয় ফুটবলারদের বিদেশে খেলার সুযোগ তৈরি করা গেলে জাতীয় দলের উন্নতির ক্ষেত্রে তা সহায়ক হতে পারে। সৌরভ ও অনুজের বক্তব্যে এই বৃহত্তর ভাবনাটিই উঠে এসেছে।
ব্রাজ়িল ও উরুগুয়ের মতো দলের সঙ্গে ম্যাচ আয়োজনের খরচ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে মনে করছেন, এই ধরনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে বিপুল অর্থ ব্যয় করার পরিবর্তে সেই টাকা তৃণমূল স্তরের ফুটবলের উন্নতিতে খরচ করা উচিত।
এই সমালোচনার জবাবে সৌরভ ও অনুজ জানিয়েছেন, তৃণমূল স্তরের ফুটবলের উন্নতি এবং আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন—দুটিই প্রয়োজন। তাঁদের মতে, একটিকে বেছে নিয়ে অন্যটিকে বাদ দেওয়ার কোনও কারণ নেই।
অনুজের বক্তব্য, ছোটদের প্রশিক্ষণ, মাঠের পরিকাঠামো, কোচিং এবং প্রতিযোগিতার সুযোগ বাড়ানো যেমন জরুরি, তেমনই বড় দলের সঙ্গে খেলা এবং আন্তর্জাতিক তারকাদের দেখার সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের ম্যাচ ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে আগ্রহ বাড়াতে পারে এবং নতুন প্রজন্মকে খেলাধুলায় উৎসাহিত করতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করলেই যে ভারতীয় ফুটবলের উন্নতি নিশ্চিত হবে, এমন দাবি করা যায় না। এর সুফল কতটা পাওয়া গেল, তা বুঝতে হলে দর্শকসংখ্যা, আর্থিক হিসাব, তরুণ খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ, প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং পরবর্তী আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দলের পারফরম্যান্সের মতো বিষয়ও বিচার করতে হবে।
সৌরভ ও অনুজের বক্তব্য, শুধু খরচের অঙ্ক দিয়ে এই ধরনের আয়োজনের মূল্য নির্ধারণ করা ঠিক নয়। আন্তর্জাতিক ম্যাচের মাধ্যমে রাজ্যের পরিচিতি, পর্যটনের সম্ভাবনা, ক্রীড়া সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাঁদের মতে, এই বিষয়গুলিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
ব্রাজ়িল ও উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে ভারতের পারফরম্যান্স নিয়েও কথা বলেছেন সৌরভ ও অনুজ। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক ফুটবলে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলা ভারতীয় দলের জন্য নিজেদের দক্ষতা যাচাই করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
সৌরভ জানিয়েছেন, ইউনিটি কাপে ভারতীয় দলের খেলা দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, দলটি আরও পরিশ্রম করলে ভাল ফল করতে পারে। খেলোয়াড় এবং কোচিং স্টাফের আত্মবিশ্বাসও তাঁর নজরে পড়েছিল।
পানামার বিরুদ্ধে ম্যাচের প্রসঙ্গ তুলে সৌরভ বলেছেন, ভারতীয় দল ভাল খেলেছিল এবং কিছুটা ভাগ্য সহায় হলে ফল অন্য রকম হতে পারত। ব্রাজ়িলের বিরুদ্ধেও ভারতীয় ফুটবলারদের পারফরম্যান্সকে তিনি ইতিবাচক ভাবে দেখেছেন।
অন্য দিকে, উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচে ক্লান্তি একটি বিষয় হয়ে উঠেছিল বলে অনুজের মত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতীয় দলকে তিন দিনের মধ্যে দুটি কঠিন ম্যাচ খেলতে হয়েছিল, অন্য দিকে উরুগুয়ে বিশ্রামের সুযোগ পেয়েছিল। ফলে দুই দলের শারীরিক প্রস্তুতি এবং ম্যাচের ব্যবধানের বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ধারাবাহিক উন্নতির জন্য শুধু একটি বা দুটি ম্যাচের ফলাফল নয়, বরং নিয়মিত উচ্চমানের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। সৌরভ ও অনুজের বক্তব্যে সেই প্রয়োজনের কথাই উঠে এসেছে।
কলকাতা দীর্ঘদিন ধরেই ফুটবলপ্রেমের জন্য পরিচিত। শহরের বড় ক্লাবগুলিকে ঘিরে সমর্থকদের আবেগ, ঐতিহাসিক ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের মতো বড় স্টেডিয়াম এই শহরকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত করেছে।
ব্রাজ়িল ও উরুগুয়ের মতো আন্তর্জাতিক দলকে নিয়ে আসা সেই পরিচিতিকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। আন্তর্জাতিক তারকাদের কাছ থেকে ফুটবলপ্রেমীরা সরাসরি খেলা দেখার সুযোগ পান। তরুণ খেলোয়াড়েরা আন্তর্জাতিক ফুটবলের গতি, কৌশল এবং শারীরিক সক্ষমতা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পেতে পারেন।
এ ছাড়া, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে হোটেল, পরিবহণ, খাবার, পর্যটন এবং অন্যান্য পরিষেবার ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কাজে লাগল, তা নির্ভর করে আয়োজনের খরচ, আয়, পর্যটকদের অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় ব্যবসার উপরে তার প্রভাবের মতো একাধিক বিষয়ের উপর।
সৌরভ ও অনুজের মতে, এই ধরনের আয়োজনকে শুধুমাত্র ফুটবল ম্যাচ হিসেবে না দেখে রাজ্যের সামগ্রিক ক্রীড়া ও পর্যটন উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখা উচিত। আন্তর্জাতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বড় আয়োজনের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে আরও প্রতিযোগিতা আয়োজনের পথ খুলে দিতে পারে।
কলকাতায় ব্রাজ়িল ও উরুগুয়ের ম্যাচ আয়োজনের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থাকবে। চার মাসের প্রস্তুতি, আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়, স্টেডিয়াম সাজানো, নিরাপত্তা এবং দর্শকদের পরিষেবা পরিচালনার মাধ্যমে আয়োজকেরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
সৌরভ ও অনুজের আশা, ভবিষ্যতে আরও বেশি সময় হাতে নিয়ে এবং আরও বিস্তৃত পরিকল্পনার মাধ্যমে বড় আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করা সম্ভব হবে। সেই ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি ক্রীড়া সংস্থা, বেসরকারি উদ্যোক্তা, স্পনসর এবং ফুটবলপ্রেমীদের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রাজ়িল আবার কলকাতায় খেলতে আসবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে এই আয়োজনের মাধ্যমে ভারত ও ব্রাজ়িলের মধ্যে ফুটবল সংক্রান্ত যোগাযোগের একটি নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন দুই উদ্যোক্তা।
সব মিলিয়ে, ভিনিসিয়স জুনিয়রের ব্রাজ়িল এবং দিয়েগো ফোরল্যানের উরুগুয়েকে কলকাতায় নিয়ে আসা সৌরভ চট্টোপাধ্যায় ও অনুজ কিচলুর কাছে শুধু একটি আয়োজনের সাফল্য নয়, ভবিষ্যতে আরও বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানের সম্ভাবনার দরজাও খুলে দিয়েছে। তাঁদের মতে, ভারতীয় ফুটবলের উন্নতির জন্য তৃণমূল স্তরে কাজ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ, বিদেশের লিগে খেলার সুযোগ এবং বড় দলের সঙ্গে নিয়মিত প্রতিযোগিতার ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
কলকাতার মাঠে আন্তর্জাতিক ফুটবলের এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে কী ভাবে কাজে লাগানো হয়, রাজ্য সরকার আরও বড় ম্যাচ আয়োজনের উদ্যোগ নেয় কি না এবং ভারতীয় ফুটবলারদের উন্নতির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয় কি না, এখন সেদিকেই নজর থাকবে ফুটবলপ্রেমীদের।