ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেওয়ার পরই বিমান ‘ক্র্যাশ’ করানোর ছক কষেছিলেন হামাম—এমনই চাঞ্চল্যকর দাবি সামনে এসেছে। জুলাইতেই হামলার দিন ঠিক হয়েছিল বলে অভিযোগ, তবে বন্ধুর জন্য শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে যান তিনি। ঘটনায় নতুন করে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।
বিমান ‘ক্র্যাশ’ করানোর ছক, ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেওয়ার নেপথ্যে কী? জুলাইয়ের পরিকল্পনা থেকে মাঝআকাশের হামলা—হামামকে ঘিরে তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য
ফ্লাইদুবাইয়ের একটি যাত্রীবাহী বিমানে মাঝআকাশে কো-পাইলটের হামলার ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ, বিমানের কো-পাইলট হামাম আল-হাম্মামি ককপিটে থাকা ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরকে হামলা করেন এবং বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর বিমানটি দ্রুত নীচে নামতে শুরু করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হন ক্যাপ্টেন, কেবিন ক্রু এবং যাত্রীদের কয়েক জন। শেষ পর্যন্ত বিমানটি সৌদি আরবের তাবুকের একটি বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে।
ঘটনার পর হামাম আল-হাম্মামিকে গ্রেফতার করে তদন্ত শুরু হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এই ঘটনাকে সন্ত্রাসবাদী হামলার চেষ্টা হিসেবে তদন্ত করছে। একই সঙ্গে ইজরায়েল, সৌদি আরব, ওমান এবং অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন কর্তৃপক্ষও হামামের অতীত, তাঁর বিমানচালনার প্রশিক্ষণ, চাকরির ইতিহাস এবং সম্ভাব্য উগ্রপন্থী যোগাযোগ খতিয়ে দেখছে।
সবচেয়ে বেশি চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে হামাম কেন ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দিয়েছিলেন এবং তিনি আদৌ আগে থেকেই কোনও পরিকল্পনা করেছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন ঘিরে। ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যমের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তদন্তকারীদের কাছে হামাম নাকি জানিয়েছেন যে তেল আভিভগামী বিমান পরিচালনা করে এমন সংস্থার খোঁজ করেই তিনি ফ্লাইদুবাইকে বেছে নিয়েছিলেন। তবে এই বক্তব্যের স্বাধীনভাবে সম্পূর্ণ যাচাই এখনও হয়নি এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন—হামাম কি শুধুমাত্র পাইলট হিসেবে চাকরি পাওয়ার জন্য ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দিয়েছিলেন, নাকি তাঁর মনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল?
প্রকাশিত তদন্ত-তথ্য অনুযায়ী, হামাম আগে ওমান এয়ারে কাজ করেছিলেন। তাঁর আচরণ এবং উগ্রপন্থী ওয়েবসাইটে আগ্রহ নিয়ে সেখানে নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল বলে একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পরে তিনি বিমান সংস্থায় পাইলট হিসেবে কাজ থেকে সরে যান। এরপর ২০২৬ সালে তিনি ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেন। কীভাবে তাঁর আগের রেকর্ড যাচাই করা হয়েছিল, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এই ঘটনা আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামনে একটি বড় প্রশ্নও তুলে দিয়েছে। কোনও পাইলটের অতীত কর্মজীবনে যদি নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ থাকে, তাহলে নতুন কোনও বিমান সংস্থায় চাকরি পাওয়ার আগে সেই তথ্য কতটা গভীরভাবে যাচাই করা হয়? সংশ্লিষ্ট দেশগুলির মধ্যে তথ্য আদানপ্রদানের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? হামামের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ায় কোথাও কোনও ফাঁক ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
তদন্ত সংক্রান্ত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে আরও একটি দাবি সামনে এসেছে। ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যম Channel 12 এবং Ynet-এর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, হামাম নাকি জুলাই মাসেই বিমান ছিনতাই বা সেটিকে হামলার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি সেই পরিকল্পনা বাতিল করেন বলে দাবি করা হয়েছে। কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিমানের এক ক্রু সদস্যের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের কথা।
এই তথ্য যদি তদন্তে সত্যি প্রমাণিত হয়, তাহলে ঘটনাটির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ সেক্ষেত্রে ৩০ সেপ্টেম্বরের হামলাটি হঠাৎ করে নেওয়া কোনও সিদ্ধান্ত ছিল না—বরং আগে থেকেই পরিকল্পিত একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও জোরালো হতে পারে।
তবে এই মুহূর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, জুলাইয়ের পরিকল্পনা এবং বন্ধুর কারণে তা বাতিল করার দাবি মূলত তদন্ত সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। ইজরায়েলি তদন্তকারীরা নিজেরা হামামের সঙ্গে সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন কি না, সে বিষয়েও বিভিন্ন প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এই তথ্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামামের বিরুদ্ধে ওঠা সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হল তিনি তেল আভিভগামী ফ্লাইটকে লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তদন্ত সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, তিনি ফ্লাইদুবাইয়ের মাধ্যমে ইজরায়েলগামী রুট সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন এবং বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হামাম বিমানবন্দরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এবং পরবর্তী হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তিনি বিমানের অবতরণের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে উড়ান চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। এরপর বিমানটিকে অন্য কোনও লক্ষ্যবস্তুর দিকে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল বলে তদন্ত সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে।
তবে এই ধরনের পরিকল্পনার নির্দিষ্ট বিবরণ নিয়ে তদন্ত এখনও চলছে। তাই কোন তথ্য হামামের নিজের বক্তব্য, কোনটি তদন্তকারীদের অনুমান এবং কোনটি সংবাদমাধ্যমের সূত্রভিত্তিক দাবি—এই পার্থক্যটি মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
৩০ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় ফ্লাইদুবাই FZ1073 বিমানটি দুবাই থেকে তেল আভিভের দিকে যাচ্ছিল। বিমানে শতাধিক যাত্রী ছিলেন। মাঝআকাশে হঠাৎ ককপিটে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। অভিযোগ, কো-পাইলট হামাম আল-হাম্মামি ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের ওপর আক্রমণ করেন। ককপিটের জরুরি ক্র্যাশ অ্যাক্স ব্যবহার করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
হামলার ফলে ক্যাপ্টেন আহত হন এবং বিমানটি দ্রুত নীচে নেমে যেতে শুরু করে। পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক হয়ে ওঠে। কিন্তু ক্যাপ্টেন শেষ পর্যন্ত ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। এরপর যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা হামামকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করেন। বিমানে থাকা দু’জন অফ-ডিউটি পাইলটও পরে বিমান নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত বিমানটি সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণ করে। ঘটনায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়। ক্যাপ্টেন মচ্ছরসহ কয়েক জন আহত হলেও বিমানটি নিরাপদে মাটিতে নামতে সক্ষম হয়।
এই ঘটনার পর ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। গুরুতর অবস্থাতেও তিনি বিমানের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেন এবং শেষ পর্যন্ত ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। তাঁর এই পদক্ষেপই যাত্রীদের এবং অন্য ক্রু সদস্যদের ককপিটে প্রবেশ করে হামামকে নিয়ন্ত্রণে আনার সুযোগ করে দেয়।
ঘটনার পর মচ্ছর তাঁর অভিজ্ঞতা ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে শেয়ার করেন বলে রিপোর্টে প্রকাশিত হয়েছে। সংকটের সেই মুহূর্তে বিমানটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার লড়াই কতটা কঠিন ছিল, তাঁর বর্ণনা থেকে তার একটি ধারণা পাওয়া যায়।
এই ঘটনার ফলে আবারও সামনে এসেছে বিমানে প্রশিক্ষিত ক্রু, অফ-ডিউটি পাইলট এবং যাত্রীদের জরুরি পরিস্থিতিতে ভূমিকার গুরুত্ব। যদিও বিমান নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব পেশাদার ক্রু ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের, তবুও এই ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে বড় বিপদ ঠেকাতে সাহায্য করেছেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
হামাম আল-হাম্মামির অতীত এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, তিনি আগে ওমান এয়ারে কাজ করেছিলেন এবং সেখানে তাঁর আচরণ নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে উগ্রপন্থী ওয়েবসাইটে আগ্রহের অভিযোগও রয়েছে। পরে তিনি বিমানচালনার কাজ থেকে সরে যান এবং নতুন করে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন।
এই অতীত তথ্য যদি সত্যি হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠছে—নতুন সংস্থায় যোগ দেওয়ার সময় তাঁর পূর্ববর্তী কর্মস্থলের নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য কি যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু হামামের ঘটনা বোঝার জন্য নয়, আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহণ ব্যবস্থার নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন পাইলটকে এক দেশের সংস্থা থেকে অন্য দেশের সংস্থায় নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হামামের জীবনের আরও একটি অধ্যায় এখন তদন্তের আওতায় এসেছে—অস্ট্রেলিয়ায় তাঁর থাকার সময়কাল। অস্ট্রেলিয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামাম অতীতে সেখানে পড়াশোনা করেছিলেন এবং তাঁর অস্ট্রেলিয়া-সংযোগও তদন্ত করা হচ্ছে। ভিক্টোরিয়ার Joint Counter Terrorism Team এই বিষয়ে তদন্ত করছে বলে অস্ট্রেলিয়ান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
ফলে তদন্ত এখন শুধু ৩০ সেপ্টেম্বরের বিমানের ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হামামের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়, তাঁর শিক্ষা, পূর্ববর্তী চাকরি, অনলাইন কার্যকলাপ এবং সম্ভাব্য যোগাযোগ—সবকিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনা শুধু একজন কো-পাইলটের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত নয়। এটি আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা। বিশেষ করে প্রশ্ন উঠছে, একজন পাইলটের অতীত রেকর্ড কীভাবে যাচাই করা হয় এবং কোনও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সতর্কতা থাকলে সেই তথ্য কত দ্রুত অন্য দেশের বিমান সংস্থা ও কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছয়।
ইজরায়েল ইতিমধ্যেই বিদেশি বিমান সংস্থার ফ্লাইট নিরাপত্তা পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছে বলে রিপোর্টে প্রকাশিত হয়েছে। কারণ তেল আভিভগামী একটি আন্তর্জাতিক বিমানের ককপিটে থাকা কো-পাইলটই যখন বিমানের জন্য সম্ভাব্য হুমকি হয়ে ওঠেন, তখন প্রচলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
ঘটনার পরে ফ্লাইদুবাইয়ের নিয়োগ ও নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। হামামের আগের চাকরির ইতিহাস এবং তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলি নিয়োগের সময় কতটা জানা ছিল, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফ্লাইদুবাই বা অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়। কর্তৃপক্ষের তদন্তেই স্পষ্ট হবে কোথায় গাফিলতি হয়েছিল এবং কোনও সতর্কতা থাকলেও তা কীভাবে উপেক্ষিত হয়েছিল কি না।
আরেকটি বড় প্রশ্ন—হামাম কি একাই এই পরিকল্পনা করেছিলেন?
এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনও সন্ত্রাসবাদী সংগঠন এই হামলার দায় স্বীকার করেনি। তদন্তকারীরা হামাম একা কাজ করেছিলেন কি না, নাকি কোনও সংগঠন বা ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল, তা খতিয়ে দেখছেন।
তাঁর অনলাইন কার্যকলাপ, পুরনো পোস্ট, যোগাযোগ এবং ভ্রমণের ইতিহাসও তদন্তের অংশ। তবে অনলাইনে পাওয়া কোনও পোস্ট বা মতাদর্শগত উপাদানকে সরাসরি কোনও সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে সাংগঠনিক যোগাযোগের প্রমাণ হিসেবে ধরা যায় না—সেটি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
জুলাইয়ের পরিকল্পনা সংক্রান্ত দাবি সত্যি প্রমাণিত হলে তদন্তের চরিত্র অনেকটাই বদলে যেতে পারে। কারণ তখন প্রশ্ন উঠবে, হামাম কত আগে থেকে পরিকল্পনা করেছিলেন, কেন তিনি প্রথম পরিকল্পনা বাতিল করেছিলেন এবং কীভাবে পরে নতুন সুযোগ তৈরি করেছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাইয়ে তাঁর পরিকল্পনা বাতিলের পেছনে এক ক্রু সদস্যের সঙ্গে বন্ধুত্বের বিষয়টি ছিল। এই দাবি সত্যি হলে আরও একটি প্রশ্ন তৈরি হয়—পরবর্তী সময়ে সেই একই ধরনের পরিকল্পনা কেন ফের সক্রিয় হল?
এই সব প্রশ্নের উত্তর পেতে তদন্তকারীদের হামামের জিজ্ঞাসাবাদ, ফ্লাইট রেকর্ড, কর্মসংস্থানের নথি, নিরাপত্তা রিপোর্ট এবং ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ করতে হবে।
‘বন্ধুর জন্য শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে আসা’—এই দাবিটিই বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত তথ্যগুলির একটি। কিন্তু এটি হামামের উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলেও এখনও এটি তদন্তনির্ভর দাবি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই তথ্য এসেছে তদন্ত সূত্রের বরাত দিয়ে।
যদি তদন্তে বিষয়টি নিশ্চিত হয়, তাহলে বোঝা যাবে যে হামাম নাকি নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট রুট এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে কোনও ব্যক্তির উদ্দেশ্য বা মানসিক অবস্থার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত শেষ হওয়ার আগে দেওয়া উচিত নয়।
এখন তদন্তকারীদের সামনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—
১. হামাম কখন থেকে এই পরিকল্পনা করেছিলেন?
২. ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেওয়ার আগে তাঁর উদ্দেশ্য কী ছিল?
৩. জুলাইয়ের পরিকল্পনার সত্যতা কতটা?
৪. কোনও ক্রু সদস্যের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের কারণে কি পরিকল্পনা বাতিল হয়েছিল?
৫. তাঁর পূর্ববর্তী কর্মস্থলের নিরাপত্তা সতর্কতা নতুন সংস্থাকে জানানো হয়েছিল কি না?
৬. তিনি একাই পরিকল্পনা করেছিলেন, নাকি অন্য কারও সহায়তা পেয়েছিলেন?
৭. তাঁর অনলাইন কার্যকলাপ ও বাস্তব জীবনের যোগাযোগের মধ্যে কোনও যোগসূত্র ছিল কি না?
৮. আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোথায় ফাঁক ছিল?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর পাওয়া গেলেই পুরো ঘটনার একটি পরিষ্কার ছবি সামনে আসবে।
বিমান ছিনতাই বা ককপিটে হামলার ঘটনা সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক তৈরি করে। তবে বিমান চলাচল ব্যবস্থায় ককপিট নিরাপত্তা, ক্রু যাচাই, জরুরি প্রোটোকল এবং আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়ের জন্য একাধিক স্তরের ব্যবস্থা রয়েছে।
ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনাটি সেই ব্যবস্থাগুলিকে নতুন করে পর্যালোচনা করার সুযোগ তৈরি করেছে। কোনও বিমান সংস্থার পাইলট নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা নয়, নিরাপত্তা যাচাইও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক রুটে কাজ করা পাইলটদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
হামাম আল-হাম্মামিকে ঘিরে যে তথ্যগুলি প্রকাশ্যে এসেছে, তার কিছু সরাসরি সরকারি বক্তব্য থেকে এসেছে, আবার কিছু এসেছে তদন্ত সূত্র এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের মাধ্যমে। তাই কোন তথ্য চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত এবং কোনটি এখনও অভিযোগ বা তদন্তাধীন—এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে জুলাই মাসে হামলার পরিকল্পনা এবং ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্য সম্পর্কিত তথ্য এখনো তদন্তের অংশ। ফলে এই দাবিগুলিকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে না দেখে ‘তদন্ত সূত্রের দাবি’ হিসেবে দেখা উচিত।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—৩০ সেপ্টেম্বরের FZ1073 ঘটনার পর আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একজন কো-পাইলটের বিরুদ্ধে মাঝআকাশে ক্যাপ্টেনকে আক্রমণ এবং বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। দ্রুত পদক্ষেপের কারণে বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করতে পেরেছে এবং বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
ফ্লাইদুবাই FZ1073-এর ঘটনা এখন শুধু একটি বিমানে মাঝআকাশের হামলার তদন্ত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পাইলট নিয়োগ, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা যাচাই, উগ্রপন্থার সম্ভাব্য প্রভাব, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং বিমান চলাচলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
হামাম আল-হাম্মামির বিরুদ্ধে বিমান ‘ক্র্যাশ’ করানোর পরিকল্পনার অভিযোগ, ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্য এবং জুলাইয়ে হামলার পরিকল্পনা বাতিল করার দাবি—সবকিছুই এখন তদন্তের আওতায়। প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, জুলাইয়ের পরিকল্পনা নাকি এক ক্রু সদস্যের সঙ্গে বন্ধুত্বের কারণে শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়েছিল। পরে ৩০ সেপ্টেম্বরের ফ্লাইটে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়।
তদন্ত শেষ হলে হয়তো জানা যাবে, এই পরিকল্পনা কত আগে থেকে তৈরি হয়েছিল, হামামের উদ্দেশ্য কী ছিল এবং তাঁর অতীতের কোন তথ্য বিমান সংস্থাগুলির কাছে পৌঁছেছিল। আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—ঘটনার প্রতিটি তথ্য যাচাই করা এবং ভবিষ্যতে যাতে কোনও সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়োগ বা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের ব্যবস্থার ফাঁক গলে যেতে না পারে, সেই ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা।