শরীরজুড়ে একাধিক আঘাতের চিহ্ন নিয়ে পূর্ব দিল্লির বসুধরা এনক্লেভের একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় অধ্যাপিকা দেবস্মিতার দেহ। ঘটনার পর চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়লেও মাত্র তিন দিনের মধ্যেই রহস্যের জট খুলে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপিকা দেবস্মিতা পাল খুনের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে দেশজুড়ে। রাজধানীর একটি আবাসনের ফ্ল্যাট থেকে তাঁর রক্তাক্ত দেহ উদ্ধারের মাত্র তিন দিনের মধ্যেই তদন্তে বড় সাফল্য পেয়েছে পুলিশ। এই ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান থেকে এক দম্পতিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ থেকেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। আরও চাঞ্চল্যকর বিষয় হল, সন্দেহ এড়াতে অভিযুক্তরা নিজেদের সন্তানকেও সঙ্গে নিয়ে দিল্লিতে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার পূর্ব দিল্লির বসুধারা এনক্লেভ এলাকার সত্যম অ্যাপার্টমেন্টে নিজের ফ্ল্যাটে খুন অবস্থায় উদ্ধার হন দেবস্মিতা পাল। তাঁর দিদি দেবারতি পাল দীর্ঘ সময় ধরে ফোনে যোগাযোগ করতে না পেরে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে ফ্ল্যাটে গিয়ে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ দেখতে পান তিনি। বহুবার ডাকাডাকি করেও কোনও সাড়া না মেলায় প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করেন। তখনই মেঝেতে পড়ে থাকা দেবস্মিতার রক্তাক্ত দেহ দেখতে পান।
ঘটনাস্থলের দৃশ্য ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। পুলিশ জানায়, দেবস্মিতার মাথায় গভীর আঘাতের চিহ্ন ছিল। এছাড়া তাঁর হাতের শিরা কাটা অবস্থায় পাওয়া যায়। ঘরের বিভিন্ন জায়গায় রক্তের দাগও মিলেছে। তবে আশ্চর্যের বিষয়, ফ্ল্যাট থেকে কোনও মূল্যবান সামগ্রী, টাকা বা গয়না খোয়া যায়নি। সেই কারণেই তদন্তের শুরু থেকেই পুলিশের ধারণা ছিল, এটি সাধারণ চুরি বা ডাকাতির ঘটনা নয়। বরং ব্যক্তিগত শত্রুতা, প্রতিহিংসা কিংবা সম্পত্তি সংক্রান্ত বিবাদের জেরেই এই খুন সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে।
দেবস্মিতা পাল দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ শিবাজী কলেজের সহকারী অধ্যাপিকা ছিলেন। কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি দিল্লিতে একা থাকতেন। ব্যক্তিগত জীবনেও নানা টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল তাঁকে। ২০২২ সালে, বিয়ের পাঁচ বছর পর স্বামীর সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়। বর্তমানে বিবাহবিচ্ছেদের আইনি প্রক্রিয়াও চলছিল বলে জানা গিয়েছে। তাঁর প্রাক্তন স্বামী বেঙ্গালুরুতে থাকেন। ফলে তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর স্বামীকেও সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছিল।
তদন্তকারীরা দেবস্মিতার ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং আর্থিক সম্পর্কের খোঁজখবর নিতে শুরু করেন। সেই সময় উঠে আসে বর্ধমানে অবস্থিত তাঁর পৈতৃক সম্পত্তির বিষয়টি। জানা যায়, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একটি বাড়ি ছিল দেবস্মিতার নামে। সেই বাড়িতেই দীর্ঘদিন ধরে ভাড়াটে হিসেবে বসবাস করছিলেন বর্তমানে গ্রেফতার হওয়া দম্পতি।
পুলিশের দাবি, ওই সম্পত্তি নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছিল। দেবস্মিতা বারবার বাড়ি খালি করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন বলে অভিযোগ। অন্যদিকে অভিযুক্তরা ওই সম্পত্তির উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাইছিলেন। তদন্তে এমন তথ্যও উঠে এসেছে যে, তাঁরা নাকি ধীরে ধীরে সম্পত্তি নিজেদের দখলে নেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। এই বিরোধই শেষ পর্যন্ত হত্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
ঘটনার তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে সিসিটিভি ফুটেজ। সত্যম অ্যাপার্টমেন্ট এবং আশপাশের এলাকার একাধিক ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে পুলিশ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পায়। ফুটেজে দেখা যায়, ঘটনার দিন এক দম্পতি মুখে মাস্ক পরে আবাসনে প্রবেশ করছেন। তাঁরা লিফট ব্যবহার না করে সিঁড়ি দিয়ে সাত তলায় ওঠেন, যেখানে দেবস্মিতার ফ্ল্যাট অবস্থিত।
পুলিশের মতে, অভিযুক্তরা পরিকল্পনা করেই এমন পথ বেছে নিয়েছিলেন যাতে নজর এড়ানো যায়। সিসিটিভিতে দেখা যায়, প্রায় আধ ঘণ্টা তাঁরা ফ্ল্যাটের ভিতরে ছিলেন। এরপর পোশাক বদলে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তাঁদের আচরণ ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক, যেন কিছুই ঘটেনি। আবাসনের বাইরে আগে থেকেই একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। সেই গাড়িতে চেপেই তাঁরা দ্রুত এলাকা ছেড়ে চলে যান।
তদন্তের শুরুতে সেই গাড়িটিকেই সূত্র হিসেবে ধরে এগোয় পুলিশ। গাড়ির নম্বর এবং চলাচলের তথ্য সংগ্রহ করে চালককে চিহ্নিত করা হয়। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তকারীরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পান। চালকের বয়ান থেকেই ধীরে ধীরে সন্দেহের তীর ঘুরে যায় বর্ধমানের ওই দম্পতির দিকে।
পুলিশ জানিয়েছে, খুনের জন্য ব্যবহৃত অস্ত্রও অভিযুক্তরা নিজেদের সঙ্গে করেই নিয়ে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত। হঠাৎ রাগের মাথায় বা আকস্মিক ঝগড়ার জেরে এই খুন হয়নি বলে তদন্তকারীদের ধারণা। বরং বহুদিন ধরে পরিকল্পনা করে, সুযোগ বুঝে দিল্লিতে গিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
এই মামলার তদন্তে দিল্লি পুলিশ ব্যাপক তৎপরতা দেখায়। আবাসনের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রায় ২০০ জন যাতায়াতকারীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর তাঁদের মধ্যে থেকে ১৩ জনকে সম্ভাব্য সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রত্যেকের গতিবিধি, মোবাইল ফোনের অবস্থান, যোগাযোগের তথ্য এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়।
তদন্তে সাহায্যের জন্য বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছিল। গত দু’দিনে দিল্লি পুলিশের সাতটি পৃথক দল চারটি রাজ্যে তল্লাশি চালায়। সম্ভাব্য সূত্র খুঁজতে একাধিক জায়গায় অভিযান চালানো হয়। বহু ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এমনকি দেবস্মিতার প্রাক্তন স্বামীকেও তদন্তের আওতায় এনে তাঁর বক্তব্য রেকর্ড করা হয়।
অবশেষে সমস্ত তথ্য-প্রমাণ, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং মানবসূত্রের তথ্য একত্র করে তদন্তকারীরা বর্ধমানে পৌঁছন। রবিবার সেখানে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত দম্পতিকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাঁদের দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, এই হত্যাকাণ্ডে অন্য কারও ভূমিকা ছিল কি না এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ কতটা গভীর ছিল।
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, অভিযুক্তরা খুনের আগে এবং পরে নিজেদের অবস্থান গোপন করার জন্য নানা কৌশল নিয়েছিলেন। মোবাইল ফোনের ব্যবহার সীমিত রাখা, মুখ ঢেকে চলাফেরা করা, পোশাক বদলানো এবং সন্তানকে সঙ্গে রাখা—সবই ছিল সন্দেহ এড়ানোর পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। তবে তদন্তকারীরা এখনও সব দিক খতিয়ে দেখছেন।
এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে, সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। একজন শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত অধ্যাপিকার জীবনের এমন করুণ পরিণতি সমাজকে নাড়া দিয়েছে। সহকর্মী, ছাত্রছাত্রী এবং পরিচিত মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেকেই দাবি করেছেন, দেবস্মিতা অত্যন্ত মেধাবী এবং শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তাঁর এমন মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় মহলেও এই ঘটনা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শিক্ষক সংগঠনগুলি দ্রুত বিচার এবং কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছে। কলেজের ছাত্রছাত্রীরাও শোকপ্রকাশ করেছেন। সামাজিক মাধ্যমেও ন্যায়বিচারের দাবিতে সরব হয়েছেন বহু মানুষ।
তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। পুলিশ খুনের অস্ত্র উদ্ধার, আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ এবং অভিযুক্তদের বক্তব্য যাচাইয়ের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আদালতে পেশ করার জন্য আরও শক্তিশালী প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। তদন্তকারীদের বিশ্বাস, জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্র শীঘ্রই সামনে আসবে।
মাত্র তিন দিনের মধ্যে এই জটিল মামলার কিনারা করে দিল্লি পুলিশ যে দ্রুততা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, তা ইতিমধ্যেই প্রশংসিত হয়েছে। তবে দেবস্মিতা পালের পরিবার এখনও শোকাহত। তাঁদের একটাই দাবি—দোষীদের কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে এমন অপরাধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
দিল্লি থেকে বর্ধমান, প্রায় ১৪০০ কিলোমিটার দূরত্ব পেরিয়ে গড়ে ওঠা এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য এখন অনেকটাই স্পষ্ট। কিন্তু কেন একজন অধ্যাপিকাকে এত নৃশংসভাবে হত্যা করা হল, সেই প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর পেতে এখনও তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে গোটা দেশ।তদন্তকারীদের মতে, অভিযুক্ত দম্পতির গত কয়েক মাসের কর্মকাণ্ডও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সম্পত্তি সংক্রান্ত কোনও নথি জাল করার চেষ্টা হয়েছিল কি না, কিংবা অন্য কারও সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি না, তা জানার চেষ্টা চলছে। পুলিশ মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন এবং ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করছে। অন্যদিকে, দেবস্মিতার পরিবার এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে দ্রুত বিচার দাবি করেছে। তাঁদের বক্তব্য, একজন শিক্ষিত ও স্বনির্ভর মহিলাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে, তাই দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আদালতে মামলার শুনানির দিকে এখন নজর রয়েছে সকলের।