Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

চিংড়িঘাটা জট কাটতেই বড় পদক্ষেপ! বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত পরীক্ষামূলক রেক চালাল মেট্রো, কবে শুরু পরিষেবা?

চিংড়িঘাটা জট কাটার পর মেট্রো প্রকল্পে আরও এক ধাপ এগোল কলকাতা মেট্রো। বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হল মেট্রোর রেক। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এই রুটে কবে থেকে শুরু হবে বাণিজ্যিক পরিষেবা, তা নিয়ে বাড়ছে যাত্রীদের আগ্রহ। নতুন এই অগ্রগতি কলকাতার যাতায়াত ব্যবস্থায় কতটা গতি আনবে, এখন সেদিকেই নজর।

চিংড়িঘাটার জট কাটতেই বড় অগ্রগতি! বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত মেট্রোর সফল ট্রায়াল রান, কবে শুরু হবে যাত্রী পরিষেবা?

কলকাতার মেট্রো যোগাযোগ ব্যবস্থায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। দীর্ঘদিন ধরে চিংড়িঘাটা মোড়ে নির্মাণকাজের জটিলতার কারণে আটকে থাকা অরেঞ্জ লাইনের সম্প্রসারণের কাজ এবার নতুন গতি পেল। মহালয়ার দিন বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে মেট্রোর রেক চালানো হয়েছে। এই ট্রায়াল রান সফল হওয়ার খবর সামনে আসতেই কলকাতার মেট্রো যাত্রীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে সল্টলেক সেক্টর ফাইভের তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরত মানুষজন এই পরিষেবা চালু হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

এতদিন নিউ গড়িয়া থেকে বেলেঘাটা পর্যন্ত অরেঞ্জ লাইনে মেট্রো চলাচল করলেও বেলেঘাটার পরের অংশে যাত্রী পরিষেবা শুরু করা সম্ভব হয়নি। চিংড়িঘাটা এলাকার অসমাপ্ত নির্মাণকাজ ছিল এই সম্প্রসারণের অন্যতম বড় বাধা। সেই সমস্যার সমাধানের পর এবার বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত রেক চালিয়ে পরীক্ষা করা হল। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সব কিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে এই অংশে যাত্রী পরিষেবা চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট উদ্বোধনের দিন এখনও নিশ্চিত নয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং রেলওয়ের নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুমোদনের উপরেই পরিষেবা শুরুর বিষয়টি নির্ভর করবে।

চিংড়িঘাটার জট কাটতেই কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল এই ট্রায়াল রান?

কলকাতার মেট্রো প্রকল্পগুলির মধ্যে কবি সুভাষ থেকে জয় হিন্দ বিমানবন্দর পর্যন্ত অরেঞ্জ লাইন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। এই করিডর চালু হলে দক্ষিণ কলকাতা, পূর্ব কলকাতা এবং বিমানবন্দরমুখী যাতায়াতের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ না হওয়ায় গোটা রুটে পরিষেবা চালু করা সম্ভব হয়নি।

বিশেষ করে চিংড়িঘাটা মোড়ের কাছে মেট্রোপথের একটি অংশের কাজ দীর্ঘদিন ধরে আটকে ছিল। ওই এলাকার ব্যস্ত সড়কে নির্মাণকাজের জন্য যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন ছিল। ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা, নির্মাণকাজের অনুমতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। ফলে মেট্রোপথের বাকি অংশের কাজ শেষ করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

এই পরিস্থিতিতে চিংড়িঘাটার কাজ সম্পূর্ণ হওয়া অরেঞ্জ লাইনের সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ট্র্যাকের কাজ এগোনোর পর পরিদর্শন এবং অন্যান্য প্রস্তুতির ধাপ পেরিয়ে এবার রেক চালিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে।

এই পরীক্ষামূলক যাত্রা শুধু একটি ট্রেন চালানোর ঘটনা নয়। এটি নতুন অংশে রেলপথ, পরিকাঠামো এবং ট্রেন পরিচালনার ব্যবস্থাগুলি যাচাই করার প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরবর্তী পর্যায়ে প্রযুক্তিগত পরীক্ষা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাজ সম্পূর্ণ হলে যাত্রী পরিষেবা শুরুর পথ আরও পরিষ্কার হবে।

বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত ট্রায়াল রান

২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর, মহালয়ার দিন, বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত অরেঞ্জ লাইনের সম্প্রসারিত অংশে পরীক্ষামূলকভাবে মেট্রোর রেক চালানো হয়। নির্মাণকারী সংস্থা রেল বিকাশ নিগম লিমিটেড বা RVNL-এর উদ্যোগে এই পরীক্ষা সম্পন্ন হয় বলে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

এর আগে ওই অংশে ট্র্যাক ও পরিকাঠামো পরিদর্শনের কাজ করা হয়েছিল। পুশ ট্রলি ব্যবহার করে রেলপথ পরীক্ষা করার পর রেক চালিয়ে পরীক্ষা প্রকল্পের অগ্রগতিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ যোগ করল।

প্রথম ট্রায়াল রান সফল হওয়ার অর্থ এই নয় যে পরের দিন থেকেই সাধারণ যাত্রীদের জন্য পরিষেবা শুরু হয়ে যাবে। নতুন রেলপথে ট্রেন চালানোর আগে একাধিক প্রযুক্তিগত বিষয় খতিয়ে দেখতে হয়। ট্র্যাকের অবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, সিগন্যালিং ব্যবস্থা, ট্রেন নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদ পরিচালনার ব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, সেগুলি যাচাই করা জরুরি।

এই কারণেই ট্রায়াল রানের পরে আরও পরীক্ষা চালানো হতে পারে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত সাধারণ যাত্রীদের নিয়ে নিয়মিত পরিষেবা শুরু করা যায় না।

প্রকল্পের এই অগ্রগতি তাই গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনই নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

কবে থেকে শুরু হবে বেলেঘাটা-আইটি সেন্টার মেট্রো পরিষেবা?

এই মুহূর্তে যাত্রীদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত মেট্রো পরিষেবা কবে চালু হবে?

প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সব কাজ পরিকল্পনামাফিক এগোলে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে এই অংশে বাণিজ্যিক মেট্রো পরিষেবা চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি সম্ভাব্য সময়সীমা, নিশ্চিত উদ্বোধনের তারিখ নয়।

ট্রায়াল রানের পরেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বাকি থাকতে পারে। বিশেষ করে কমিউনিকেশন বেসড ট্রেন কন্ট্রোল বা CBTC ব্যবস্থার পরীক্ষা, সিগন্যালিংয়ের সমন্বয়, ট্রেন পরিচালনার বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পরিদর্শন সম্পন্ন করতে হবে।

এরপর সংশ্লিষ্ট রেলওয়ে নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পেলে তবেই যাত্রী পরিষেবা চালুর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।

কোনও পরীক্ষায় সমস্যা দেখা দিলে তা সংশোধন করে পুনরায় পরীক্ষা চালানোর প্রয়োজন হতে পারে। আবার সমস্ত কাজ নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন হলে পরিষেবা চালুর প্রক্রিয়াও এগিয়ে যেতে পারে।

অর্থাৎ, এখনই নির্দিষ্ট দিন বা সময় ঘোষণা করার পরিবর্তে বলা যায়, বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত মেট্রো চালানোর প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যাত্রীদের সরকারি ঘোষণা এবং কলকাতা মেট্রোর আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির দিকে নজর রাখা উচিত।

অরেঞ্জ লাইন প্রকল্পটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

কবি সুভাষ থেকে জয় হিন্দ বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রস্তাবিত অরেঞ্জ লাইন কলকাতার পরিবহণ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর। প্রকল্পটির মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩২ কিলোমিটার এবং এটি একাধিক পর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

এই রুটের উদ্দেশ্য শুধু কয়েকটি নতুন স্টেশন চালু করা নয়। বরং শহরের দক্ষিণাংশের সঙ্গে পূর্ব কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্র এবং বিমানবন্দর এলাকার যোগাযোগ আরও উন্নত করা।

প্রকল্পের প্রথম অংশে কবি সুভাষ থেকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় স্টেশন পর্যন্ত মেট্রো পরিষেবা চালু হয়েছে। পরবর্তী অংশে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থেকে বেলেঘাটা পর্যন্ত যাত্রীরা মেট্রো ব্যবহার করতে পারছেন। এবার বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত অংশ চালু হলে অরেঞ্জ লাইনের কার্যকর রুট আরও সম্প্রসারিত হবে।

এই সম্প্রসারণের ফলে দক্ষিণ কলকাতা থেকে সল্টলেক সেক্টর ফাইভের দিকে যাতায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প তৈরি হতে পারে। প্রতিদিন কাজের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় এমন যাত্রীদের কাছে এই পরিষেবা বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে।

এ ছাড়া মেট্রোর বিভিন্ন লাইনের মধ্যে সংযোগ বাড়লে যাত্রীরা নিজেদের গন্তব্য অনুযায়ী আরও সুবিধাজনক পথে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন।

কোন কোন স্টেশন যুক্ত হবে এই অংশে?

বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত সম্প্রসারিত অংশে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি স্টেশন রয়েছে।

প্রথমত, গৌরকিশোর ঘোষ স্টেশন, যা চিংড়িঘাটা এলাকার সঙ্গে সম্পর্কিত। দ্বিতীয়ত, নলবন স্টেশন, যা নিক্কো পার্ক ও সংলগ্ন এলাকার যাতায়াতের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তৃতীয়ত, আইটি সেন্টার স্টেশন, যা সল্টলেক সেক্টর ফাইভের তথ্যপ্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক এলাকার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এই তিনটি স্টেশন চালু হলে অরেঞ্জ লাইনের বর্তমান বেলেঘাটা টার্মিনাসের পরেও যাত্রীরা মেট্রোয় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।

তবে কোনও স্টেশনে ঠিক কবে থেকে যাত্রী ওঠানামা করতে পারবেন, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট অংশের নিরাপত্তা অনুমোদন এবং পরিষেবা শুরুর আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের উপর।

সল্টলেক সেক্টর ফাইভের অফিসযাত্রীদের জন্য কেন বড় খবর?

সল্টলেক সেক্টর ফাইভ কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। প্রতিদিন বহু কর্মী এই এলাকায় অফিস করতে আসেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই দক্ষিণ কলকাতা, নিউ গড়িয়া, রুবি, মুকুন্দপুর এবং আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যাতায়াত করেন।

বর্তমানে এই যাত্রার জন্য বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, বাইক, অ্যাপভিত্তিক ক্যাব এবং অন্যান্য পরিবহণের উপর নির্ভর করতে হয়। ব্যস্ত সময়ে রাস্তায় যানজট তৈরি হলে অফিসে পৌঁছতে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে।

বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত মেট্রো পরিষেবা চালু হলে এই যাত্রীদের জন্য নতুন বিকল্প তৈরি হবে। অরেঞ্জ লাইনের মাধ্যমে দক্ষিণ কলকাতার দিক থেকে মেট্রোয় এসে সরাসরি আইটি সেন্টার স্টেশনে পৌঁছনোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে রাস্তায় যানজট এড়িয়ে নির্দিষ্ট মেট্রো রুট ব্যবহার করার সুবিধা অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

যাঁদের প্রতিদিন অফিসের জন্য যাতায়াত করতে হয়, তাঁদের মাসিক পরিবহণ খরচ, যাত্রার সময় এবং যাতায়াতের পরিকল্পনায়ও পরিবর্তন আসতে পারে। তবে প্রকৃত সময় ও খরচ কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে মেট্রোর সময়সূচি, ভাড়া, ট্রেনের ব্যবধান এবং যাত্রীদের যাত্রার শুরু ও শেষের অবস্থানের উপর।

মেট্রো চালু হলে কি যানজট কমবে?

কলকাতার ব্যস্ত সড়কগুলিতে যানজট একটি পরিচিত সমস্যা। বিশেষ করে ইএম বাইপাস, চিংড়িঘাটা, রুবি এবং সল্টলেকের দিকে অফিসযাত্রার সময় গাড়ির চাপ বাড়ে।

নতুন মেট্রো সংযোগ চালু হলে ব্যক্তিগত গাড়ি বা ক্যাবের পরিবর্তে কিছু যাত্রী গণপরিবহণ ব্যবহার করতে উৎসাহিত হতে পারেন। এর ফলে সংশ্লিষ্ট রাস্তায় যানবাহনের চাপ কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে।

তবে মেট্রো চালু হলেই সমস্ত যানজট দূর হয়ে যাবে, এমন দাবি করা ঠিক নয়। যানজটের মাত্রা নির্ভর করে বাস পরিষেবা, রাস্তার ধারণক্ষমতা, ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা, অফিসের সময় এবং যাত্রীদের পরিবহণ বেছে নেওয়ার প্রবণতার উপর।

মেট্রোর সঙ্গে বাস ও অন্যান্য গণপরিবহণের কার্যকর সংযোগ তৈরি করা গেলে এই নতুন রুটের সুবিধা আরও বাড়তে পারে।

চিংড়িঘাটার মতো ব্যস্ত এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি নির্মাণকাজের সমস্যা কাটিয়ে প্রকল্পের অগ্রগতি হওয়ায় যাতায়াতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

CBTC প্রযুক্তির পরীক্ষা কেন জরুরি?

বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত ট্রায়াল রানের পরে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলির মধ্যে রয়েছে CBTC ব্যবস্থার পরীক্ষা। CBTC-এর পুরো নাম Communication-Based Train Control।

এটি এমন একটি আধুনিক ট্রেন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যেখানে ট্রেনের অবস্থান এবং চলাচলের তথ্যের ভিত্তিতে ট্রেন পরিচালনা ও সিগন্যালিংয়ের কাজ সমন্বিতভাবে করা হয়।

news image
আরও খবর

এই ধরনের প্রযুক্তির সাহায্যে ট্রেনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, ট্রেনগুলির মধ্যে নিরাপদ ব্যবধান বজায় রাখা এবং নির্দিষ্ট পরিচালন পদ্ধতি অনুসরণ করা সম্ভব হয়। তবে বাস্তবে কোনও নির্দিষ্ট লাইনে এই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করে তার নকশা, যন্ত্রপাতি, সফটওয়্যার, পরীক্ষা এবং অনুমোদনের উপর।

নতুন রেলপথে শুধু ট্রেন চালিয়ে দেখা যথেষ্ট নয়। সিগন্যালিং ও ট্রেন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হয়।

এই কারণেই ট্রায়াল রানের পরে প্রযুক্তিগত পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষ হলে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিলে তবেই নিয়মিত পরিষেবা শুরুর পথ খুলবে।

যাত্রী পরিষেবা চালুর আগে কী কী কাজ বাকি থাকতে পারে?

একটি নতুন মেট্রো রুট সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়ার আগে একাধিক ধাপ সম্পূর্ণ করা প্রয়োজন।

প্রথমত, ট্র্যাক ও সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামোর নিরাপত্তা যাচাই করতে হয়। রেলপথের বিভিন্ন অংশে কোনও ত্রুটি রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ট্রেনের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাগুলি ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হয়।

তৃতীয়ত, সিগন্যালিং ও ট্রেন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ট্রেনের চলাচল, সিগন্যালের প্রতিক্রিয়া এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সমন্বয় যাচাই করা হয়।

চতুর্থত, প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন গতিতে পরীক্ষামূলক রেক চালিয়ে দেখা হতে পারে। এর মাধ্যমে ট্রেনের চলাচল এবং পরিকাঠামোর কার্যকারিতা যাচাই করা যায়।

পঞ্চমত, স্টেশনগুলিতে যাত্রীদের ওঠানামার ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমন, নিরাপত্তা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো প্রস্তুত থাকতে হয়।

সবশেষে, সংশ্লিষ্ট রেলওয়ে নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় পরিদর্শন ও অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

এই সমস্ত ধাপের অগ্রগতি এবং ফলাফলের উপরেই নির্ভর করবে বেলেঘাটা-আইটি সেন্টার অংশে বাণিজ্যিক পরিষেবা চালুর সময়সীমা।

ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর সঙ্গে সংযোগের সম্ভাবনা

আইটি সেন্টার স্টেশন চালু হওয়ার সম্ভাব্য সুবিধাগুলির মধ্যে অন্যতম হল সল্টলেক সেক্টর ফাইভের মেট্রো নেটওয়ার্কের সঙ্গে যাত্রী যোগাযোগ আরও সহজ হওয়া।

সেক্টর ফাইভ কলকাতার কর্মসংস্থান ও বাণিজ্যিক কার্যকলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো বা গ্রিন লাইনের পরিষেবা রয়েছে। ফলে অরেঞ্জ লাইনের আইটি সেন্টার স্টেশন চালু হলে দুই করিডরের মধ্যে যাত্রী সংযোগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এর ফলে দক্ষিণ কলকাতা থেকে সেক্টর ফাইভে আসা যাত্রীদের যাত্রাপথ পরিকল্পনা করা সহজ হতে পারে। একইভাবে সল্টলেক থেকে অন্য মেট্রো রুটে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে স্টেশন থেকে স্টেশনে যাতায়াতের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা, সংযোগপথ, প্রবেশ ও প্রস্থানের দিক এবং যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত নির্দেশিকা পরিষেবা চালুর সময় প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই করা উচিত।

নতুন রুটের সম্পূর্ণ সুবিধা পেতে স্টেশনগুলির মধ্যে নিরাপদ ও সহজ সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিমানবন্দর পর্যন্ত মেট্রো চালুর ক্ষেত্রে এর ভূমিকা

অরেঞ্জ লাইনের বৃহত্তর পরিকল্পনা কবি সুভাষ থেকে জয় হিন্দ বিমানবন্দর পর্যন্ত মেট্রো যোগাযোগ গড়ে তোলা। ফলে বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত অংশ চালু হওয়া প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এই অংশ চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গোটা রুটে বিমানবন্দর পর্যন্ত মেট্রো পরিষেবা চালু হয়ে যাবে, এমন নয়। প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে কাজ, পরীক্ষা ও অনুমোদনের অগ্রগতি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হয়।

বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত পরিষেবা শুরু হলে অরেঞ্জ লাইনের কার্যকর রুট আরও সম্প্রসারিত হবে। এর পরে বাকি অংশের নির্মাণ ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার ভিত্তিতে পরবর্তী সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।

কলকাতার মেট্রো নেটওয়ার্ক যত বিস্তৃত হবে, শহরের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বিকল্প যাতায়াতের সুযোগও তত বাড়বে। তবে প্রকল্পের নির্দিষ্ট সময়সীমা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে সরকারি ঘোষণা অনুসরণ করা জরুরি।

সাধারণ যাত্রীদের কী কী সুবিধা হতে পারে?

বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত মেট্রো পরিষেবা চালু হলে সম্ভাব্য সুবিধাগুলি একাধিক ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে।

১. অফিসযাত্রায় নতুন বিকল্প: সল্টলেক সেক্টর ফাইভে কর্মরত ব্যক্তিরা দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মেট্রো ব্যবহার করে যাতায়াতের সুযোগ পেতে পারেন।

২. যানজটের উপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ: সড়কপথে যানজট থাকলেও মেট্রো নির্দিষ্ট রেলপথে চলাচল করে। ফলে যাত্রীদের যাত্রা পরিকল্পনায় বিকল্প তৈরি হতে পারে।

৩. সময় ব্যবস্থাপনা সহজ হওয়া: মেট্রোর সময়সূচি ও ট্রেনের ব্যবধান জানা থাকলে অফিসযাত্রীদের যাত্রা পরিকল্পনা আরও সহজ হতে পারে।

৪. গণপরিবহণের ব্যবহার বৃদ্ধি: নতুন সংযোগ চালু হলে কিছু যাত্রী ব্যক্তিগত গাড়ি বা ক্যাবের পরিবর্তে মেট্রো বেছে নিতে পারেন।

৫. একাধিক মেট্রো করিডরে যাতায়াতের সম্ভাবনা: আইটি সেন্টারের সঙ্গে অন্যান্য মেট্রো রুটের সংযোগ কার্যকর হলে শহরের বিভিন্ন অংশে যাতায়াতের সুযোগ বাড়তে পারে।

৬. দীর্ঘমেয়াদি পরিবহণ পরিকল্পনায় সুবিধা: নতুন স্টেশন চালু হলে আশপাশের এলাকার বাসিন্দা, কর্মী এবং ব্যবসায়ীদের যাতায়াতের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসতে পারে।

অবশ্য এই সুবিধাগুলি বাস্তবে কতটা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে পরিষেবা চালুর পর ট্রেনের সময়সূচি, ভাড়া, স্টেশন সংযোগ এবং যাত্রীদের ব্যবহারের উপর।

কলকাতার পরিবহণ ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষা

কলকাতার মেট্রো নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরেই শহরের গণপরিবহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন রুটের সম্প্রসারণের ফলে শহরের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাতায়াতের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।

অরেঞ্জ লাইনের সম্প্রসারণও সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ। বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত পরীক্ষামূলক রেক চালানো প্রমাণ করে যে এই অংশের কাজ পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

চিংড়িঘাটার নির্মাণকাজ ঘিরে দীর্ঘদিনের জটিলতার কারণে যে অংশে অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল, সেখানে এখন ট্রায়াল রান হওয়া নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

তবে প্রকল্পের সাফল্য শুধু ট্রায়াল রান সম্পন্ন হওয়ার উপর নির্ভর করে না। নিয়মিত, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য যাত্রী পরিষেবা চালু করাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

সেই কারণে আগামী দিনে CBTC-সহ প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত পরীক্ষা, নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরিদর্শন এবং অনুমোদনের অগ্রগতির দিকে নজর থাকবে।

কবে মিলবে চূড়ান্ত ঘোষণা?

বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত পরীক্ষামূলক রেক চালানোর পর এখন নজর রয়েছে পরবর্তী পরীক্ষার দিকে। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুমোদন সম্পূর্ণ হলে পরিষেবা শুরুর বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলিতে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে পরিষেবা চালুর সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। তবে এই সময়সীমাকে নিশ্চিত সূচি হিসেবে দেখা উচিত নয়। কাজের অগ্রগতি, পরীক্ষার ফল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই প্রকৃত উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারিত হবে।

যাত্রীদের উচিত কলকাতা মেট্রোর আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি অনুসরণ করা। পরিষেবা শুরু হলে স্টেশনভিত্তিক সময়সূচি, ভাড়া, ট্রেন চলাচলের ব্যবধান এবং যাত্রীদের জন্য প্রযোজ্য নির্দেশিকাও জানা যাবে।

সব মিলিয়ে, চিংড়িঘাটার জট কাটার পরে বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত সফল ট্রায়াল রান কলকাতা মেট্রোর অরেঞ্জ লাইনের সম্প্রসারণে বড় পদক্ষেপ। সল্টলেক সেক্টর ফাইভের অফিসযাত্রী থেকে শুরু করে দক্ষিণ কলকাতার সাধারণ মানুষ—অনেকেই এখন অপেক্ষা করছেন কবে এই রুটে নিয়মিত মেট্রো চলাচল শুরু হবে।

যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী বাকি কাজ ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, তবে এই নতুন সংযোগ কলকাতার দৈনন্দিন যাতায়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পরীক্ষার পরবর্তী ধাপগুলি নির্বিঘ্নে শেষ করে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিষেবা চালু করা।

Preview image