কলকাতায় এসে ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, গোবিন্দার সঙ্গে সম্পর্ক, সাম্প্রতিক বিতর্ক এবং আগামী দিনের কাজ নিয়ে খোলামেলা কথা বললেন সুনীতা আহুজা।
বলিউড অভিনেতা গোবিন্দার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ দাম্পত্য জীবন নিয়ে বরাবরই স্পষ্টবাদী সুনীতা আহুজা। ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক, পরিবার, সন্তানদের মানুষ করা থেকে শুরু করে গোবিন্দাকে ঘিরে বিভিন্ন বিতর্ক—কোনও বিষয়েই নিজের বক্তব্য রাখতে পিছপা হন না তিনি। সম্প্রতি কলকাতায় এসে একটি সাক্ষাৎকারে নিজের জীবন ও সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন সুনীতা।
সাক্ষাৎকারে সুনীতা আহুজার কথায় উঠে এসেছে তাঁর দীর্ঘ ৪০ বছরের সম্পর্কের কথা। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, একজন সুপারস্টারের স্ত্রী হিসেবে জীবনযাপন করা মোটেই সহজ নয়। বরং তাঁর মতে, একজন তারকার স্ত্রীকে জীবনের নানা পরিস্থিতিতে অত্যন্ত শক্ত থাকতে হয়। নিজের পরিচয় নিয়েও স্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে তাঁর। তিনি জানিয়েছেন, গোবিন্দার স্ত্রী হিসেবে পরিচিত হওয়া তাঁর কাছে খারাপ লাগার বিষয় নয়, কারণ এটি তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি সম্পর্ক। তবে এর পাশাপাশি নিজের একটি আলাদা পরিচয়ও তৈরি করেছেন তিনি।
সুনীতার বক্তব্য অনুযায়ী, জীবনে তিনি কখনও মিথ্যা বলেননি। তাঁর বিশ্বাস, সত্যি কথা বলার মানুষকে অনেক সময় সমালোচনা ও গালমন্দের মুখে পড়তে হয়। অন্যদিকে মিথ্যা বলা মানুষ অনেক সময় সহজেই তা মেনে নেয়। বর্তমান সময়ে সত্যি কথা বললেও অনেকের কাছে তা ভুলভাবে পৌঁছয় বলে মনে করেন তিনি। সেই কারণেই তাঁকে বিভিন্ন সময়ে ট্রোলিংয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রোল বা মানুষের মন্তব্য নিয়ে তিনি খুব একটা মাথা ঘামান না বলেও জানিয়েছেন।
নিজের বয়স এবং জীবনযাপন নিয়েও আত্মবিশ্বাসী সুনীতা। ৫৬ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও নিজের মতো করে বাঁচতে চান তিনি। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, বয়স তাঁর কাছে নিজের জীবনকে নতুনভাবে উপভোগ করার ক্ষেত্রে কোনও বাধা নয়। দীর্ঘদিন পরিবারকে সময় দেওয়ার পর এখন নিজের পছন্দ, নিজের পরিচয় এবং নিজের জীবন নিয়েও ভাবতে চান তিনি।
সাক্ষাৎকারে উঠে আসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—নিজের কেরিয়ার নিয়ে যদি আগে আলাদা করে ভাবতেন, তাহলে কি জীবনটা অন্যরকম হতে পারত? এই প্রশ্নের উত্তরে সুনীতা জানান, তিনি নিজের জীবন নিয়ে কখনও আফসোস করেন না। তাঁর কাছে সন্তানদের মানুষ করাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সন্তানদের ভালো মূল্যবোধ দিয়ে বড় করে তোলাকে তিনি নিজের জীবনের অন্যতম প্রধান কাজ হিসেবে দেখেছেন।
সুনীতার মতে, বাবা-মা দু’জনেই যদি সবসময় নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সেই কারণেই তিনি সন্তানদের বড় করার সময়ে তাঁদের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানো, তাঁদের মূল্যবোধ শেখানো এবং পরিবারকে গুরুত্ব দেওয়া—এই বিষয়গুলিকেই তিনি জীবনের অগ্রাধিকার হিসেবে দেখেছেন।
তিনি আরও জানান, সন্তানদের মানুষ করার সময় তিনি সবসময় চেষ্টা করেছেন যাতে তাঁরা ভালো মূল্যবোধ নিয়ে বড় হন। জীবনে সাফল্য বা পরিচয়ের পাশাপাশি পরিবারের শিক্ষা ও মূল্যবোধও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। তাঁর কথায়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ তৈরি করার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাক্ষাৎকারে কর্মফল নিয়েও নিজের বিশ্বাসের কথা জানিয়েছেন সুনীতা আহুজা। তিনি বলেন, কর্মফলে তিনি একশো শতাংশ বিশ্বাস করেন। তাঁর বিশ্বাস, কারও সঙ্গে খারাপ কিছু করলে একদিন না একদিন সেই কাজের ফল নিজের কাছেই ফিরে আসে। তাই কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার প্রয়োজন নেই বলেই মনে করেন তিনি। জীবনের বিভিন্ন ঘটনায় তিনি সবকিছু ঈশ্বরের হাতে ছেড়ে দেওয়ার নীতিতেই বিশ্বাসী।
সুনীতার এই বক্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। তাঁর মতে, অন্যায় বা কষ্টের জবাব সবসময় নিজেকে দিতে হয় না। সময় এবং কর্মফল অনেক কিছুর উত্তর দিয়ে দেয়। তাই জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি ঈশ্বরের ওপর ভরসা রাখার কথা জানিয়েছেন।
তবে সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলির মধ্যে রয়েছে গোবিন্দার সঙ্গে রানি স্বর্ণকারকে ঘিরে প্রসঙ্গ। সম্প্রতি গণেশ পুজোয় গোবিন্দার সঙ্গে রানি স্বর্ণকারকে দেখা যাওয়ার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে সুনীতা জানান, তাঁর চোখ কিছুই এড়ায়নি এবং তিনি সবকিছুই জানেন।
এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সুনীতা অতীতের একটি সময়ের কথাও উল্লেখ করেন, যখন তিনি নিজের বক্তব্য প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, তখন তাঁকে ট্রোল করা হয়েছিল। বর্তমানে মানুষ নিজেরাই বিভিন্ন বিষয় দেখতে পাচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে গোবিন্দাকে নিয়ে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য—তিনি চান গোবিন্দা ভালো থাকুন এবং নিজের মতো করে জীবনযাপন করুন।
সুনীতার বক্তব্যে একই সঙ্গে অভিমান, দূরত্ব এবং নিজের অবস্থানে দৃঢ় থাকার বিষয়টি ফুটে উঠেছে। তিনি জানিয়েছেন, তিনি নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন এবং নিজের জীবনকে নিজের মতো করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। গোবিন্দাকে নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা বা বিতর্ক থাকলেও তিনি নিজের জীবনকে থামিয়ে রাখতে চান না।
এরপরই আসে ক্ষমা প্রসঙ্গ। সুনীতার বক্তব্য, তাঁর ডিকশনারিতে ‘ক্ষমা’ বলে কোনও শব্দ নেই। এই মন্তব্য ঘিরেও স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা। তবে একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, তিনি চুপচাপ নিজের কাজ করে যাচ্ছেন। অর্থাৎ প্রকাশ্যে প্রতিশোধ নেওয়া বা কারও বিরুদ্ধে ক্রমাগত মন্তব্য করার পরিবর্তে নিজের জীবন ও কাজের দিকেই মন দিতে চান তিনি।
সুনীতা আরও বলেন, আজ যাঁরা তাঁর চোখের জলের মূল্য দিচ্ছেন না, একদিন তাঁরা সেই সমস্ত কিছুর ফল পাবেন বলেই তাঁর বিশ্বাস। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি মূলত কর্মফলের ওপর নিজের বিশ্বাসের কথাই আবারও তুলে ধরেছেন।
সাক্ষাৎকারের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সন্তানদের সঙ্গে গোবিন্দার সম্পর্ক। পারিবারিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, সন্তানদের বাবাকে অসম্মান করার শিক্ষা তিনি দেননি বলে জানিয়েছেন সুনীতা। তাঁর মতে, সন্তানরা নিজেদের মতো করে তাঁদের বাবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখে।
এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়কে তিনি সন্তানদের সঙ্গে তাঁদের বাবার সম্পর্কের থেকে আলাদা করে দেখতে চান। সন্তানদের কাছে বাবা হিসেবে গোবিন্দার জায়গাকে অসম্মান না করার শিক্ষা দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
গোবিন্দা এবং সুনীতা আহুজার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বলিউডের অন্যতম পরিচিত তারকা-দম্পতির সম্পর্ক হিসেবে আলোচিত। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে তাঁদের নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কখনও এসেছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রসঙ্গ, কখনও পরিবার, কখনও বা গোবিন্দার পেশাগত জীবনকে ঘিরে নানা আলোচনা। তবে সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে সুনীতার বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তাঁর নিজের জীবনদর্শন।
তিনি স্পষ্ট করেছেন, শুধু গোবিন্দার স্ত্রী হিসেবে পরিচিত হওয়াই তাঁর একমাত্র পরিচয় নয়। দীর্ঘ ৪০ বছরের সম্পর্ককে অস্বীকার করার কোনও প্রশ্ন নেই, কিন্তু একই সঙ্গে নিজের একটি পরিচয়ও তিনি তৈরি করেছেন। ৫৬ বছর বয়সেও নিজের মতো করে বাঁচার ইচ্ছা তাঁর কথায় স্পষ্ট।
সুপারস্টারের স্ত্রী হওয়ার চাপ নিয়েও তাঁর মন্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণ মানুষের কাছে তারকার জীবন যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়, সেই জীবনের সঙ্গে যুক্ত পরিবারের সদস্যদের জন্য পরিস্থিতি সবসময় একই রকম সহজ হয় না—সুনীতার বক্তব্যে এমনই একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাঁর মতে, সুপারস্টারের স্ত্রীদের অত্যন্ত শক্ত থাকতে হয়।
নিজের জীবন নিয়ে আফসোস না করার বিষয়টিও সাক্ষাৎকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। কেরিয়ারকে কেন্দ্র করে অন্য কোনও পথ বেছে নিলে জীবন অন্যরকম হতে পারত কি না—এই প্রশ্ন থাকলেও তিনি অতীত নিয়ে আক্ষেপ করেন না। বরং সন্তানদের সময় দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তিনি নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেন।
বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও তারকা বা তারকার পরিবারের সদস্যকে নিয়ে মন্তব্য, সমালোচনা এবং ট্রোলিং খুব সাধারণ ঘটনা। সুনীতা আহুজাও এই অভিজ্ঞতার বাইরে নন। তিনি জানিয়েছেন, সত্যি কথা বলার পরও অনেক সময় মানুষ ভুল বোঝেন এবং সেই কারণেই তাঁকে ট্রোল করা হয়। কিন্তু এই ট্রোলিং তাঁর জীবনযাত্রা বা সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করে না।
সুনীতার বক্তব্যে বারবার ফিরে এসেছে সত্যি কথা বলা, কর্মফল, ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস এবং নিজের মতো করে বাঁচার বিষয়গুলি। তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি এই দৃষ্টিভঙ্গিই সাক্ষাৎকারটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
গোবিন্দার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের আলোচনা হলেও সুনীতা জানিয়েছেন, এই সম্পর্ক তাঁর জীবনের প্রায় ৪০ বছরের অংশ। তাই ‘গোবিন্দার স্ত্রী’ পরিচয়কে তিনি অস্বীকার করেন না। একই সঙ্গে নিজের পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন।
রানি স্বর্ণকার প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে সাক্ষাৎকারে সুনীতা কোনও বিস্তারিত ব্যাখ্যার বদলে নিজের অবস্থান এবং অনুভূতির কথাই জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তিনি সবকিছু জানেন এবং তাঁর চোখ কিছুই এড়ায়নি। একই সঙ্গে গোবিন্দার ভালো থাকাটাই তিনি চান বলেও জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে সুনীতা আহুজার এই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে একজন তারকা-পরিবারের সদস্যের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, দীর্ঘ দাম্পত্য সম্পর্ক, মাতৃত্ব, সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব, ট্রোলিংয়ের অভিজ্ঞতা, কর্মফল সম্পর্কে বিশ্বাস এবং নিজের পরিচয় তৈরি করার আকাঙ্ক্ষা। গোবিন্দাকে ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচনার পাশাপাশি তাঁর নিজের জীবনদর্শনও এই সাক্ষাৎকারে বিশেষভাবে সামনে এসেছে।
সুনীতার কথায়, জীবনের অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি নিজের মতো করে এগিয়ে যেতে চান। সন্তানদের মূল্যবোধ শেখানো, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন এবং নিজের জীবনকে নিজের মতো করে পরিচালনা করার বিষয়গুলি তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বাস করেন, জীবনে করা কাজের ফল একদিন না একদিন ফিরে আসে।
গোবিন্দার স্ত্রী হিসেবে দীর্ঘ পরিচয়কে সম্মান করার পাশাপাশি নিজের পরিচয়ও তৈরি করেছেন—সুনীতার বক্তব্যের এই দুই দিকই সাক্ষাৎকারের মূল বিষয়। ৫৬ বছর বয়সেও নিজের মতো করে বাঁচার ইচ্ছা এবং অতীত নিয়ে আফসোস না করার বক্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত অবস্থানকে স্পষ্ট করেছে।