Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

অতিরিক্ত তেলে রান্না শরীরের বড় ক্ষতির কারণ সহজ উপায়ে কমান তেল খাওয়ার অভ্যাস

খাবারে বেশি তেল মানেই বেশি স্বাদ এই ধারণা ভুল অতিরিক্ত তেল শরীরে নানা স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে তাই সচেতনভাবে তেল কমিয়ে খাওয়াই সুস্থ থাকার সঠিক উপায়

আজকের দ্রুতগতির জীবনযাপন মানুষের খাদ্যাভ্যাসকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে এসেছে যেখানে স্বাস্থ্য সচেতনতার চেয়ে স্বাদের প্রতি আকর্ষণ অনেক বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। অফিসের চাপ সময়ের অভাব এবং সহজলভ্য ফাস্ট ফুডের কারণে অধিকাংশ মানুষই এমন খাবারের দিকে ঝুঁকছে যেখানে তেলের পরিমাণ বেশি থাকে। অনেকেই মনে করেন বেশি তেল মানেই বেশি স্বাদ এবং খাবার আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে কিন্তু বাস্তবে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। অতিরিক্ত তেল ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটায় যা প্রথমে বোঝা না গেলেও পরবর্তীতে মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে অতিরিক্ত তেল গ্রহণের ফলে শরীরে অপ্রয়োজনীয় ক্যালোরি জমা হতে থাকে যা ধীরে ধীরে স্থূলতার দিকে নিয়ে যায়। স্থূলতা শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের সমস্যা নয় এটি শরীরের ভেতরের নানা জটিল রোগের মূল কারণ। যখন শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমা হয় তখন তা হৃদযন্ত্রের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে যার ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। একই সঙ্গে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি পায় যা ধমনীতে ব্লক তৈরি করতে পারে এবং হার্ট অ্যাটাকের মতো গুরুতর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।

শুধু হৃদরোগ নয় অতিরিক্ত তেল ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বাড়িয়ে তোলে। নিয়মিত বেশি তেলযুক্ত খাবার খেলে শরীরের ইনসুলিন কার্যকারিতা কমে যেতে পারে যার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয় যা পরবর্তীতে টাইপ টু ডায়াবেটিসে পরিণত হতে পারে। তাই যারা সুস্থ থাকতে চান তাদের জন্য তেলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি।

জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন সহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই পরিমিত তেল ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে আসছে। তারা বলছে আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে সামান্য কিছু পরিবর্তন আনলেই আমরা অনেক বড় ধরনের রোগ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ রান্নার সময় বোতল থেকে সরাসরি তেল ঢালার পরিবর্তে চামচ ব্যবহার করা একটি খুবই সহজ কিন্তু কার্যকর পদ্ধতি। এতে করে আমরা বুঝতে পারি কতটা তেল ব্যবহার করছি এবং অজান্তেই অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে পারি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভাজা খাবারের পরিমাণ কমিয়ে আনা। পকোড়া পুরি চপ কিংবা বিভিন্ন ধরনের ডিপ ফ্রাই খাবার আমাদের কাছে খুবই প্রিয় হলেও এগুলিতে প্রচুর পরিমাণে তেল থাকে যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এর পরিবর্তে যদি আমরা ভাপে সেদ্ধ রোস্ট করা বা গ্রিল করা খাবারের দিকে ঝুঁকি তাহলে শরীর অনেক বেশি উপকৃত হবে। এই ধরনের খাবারে তেলের ব্যবহার কম হয় এবং খাবারের আসল পুষ্টিগুণ বজায় থাকে।

বাড়িতে রান্না করার সময় হালকা তেল ব্যবহার করা এবং রান্নার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা খুবই জরুরি। অনেকেই অভ্যাসবশত একই ধরনের তেল ব্যবহার করেন কিন্তু বিভিন্ন ধরনের তেলের মধ্যে পুষ্টিগুণের পার্থক্য রয়েছে। তাই মাঝে মাঝে তেলের ধরন পরিবর্তন করা এবং কম পরিমাণে ব্যবহার করা ভালো। একই সঙ্গে সবজি মাছ ডাল ইত্যাদি পুষ্টিকর খাবার খাদ্যতালিকায় বেশি করে রাখা উচিত যাতে শরীর প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেল পায়।

স্থূলতা যে কতটা মারাত্মক সমস্যা তা আমরা অনেক সময় বুঝতে পারি না। এটি শুধু ওজন বাড়ায় না বরং উচ্চ রক্তচাপ জয়েন্টের ব্যথা লিভারের সমস্যা এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। এই সব সমস্যার পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বিশেষ করে অতিরিক্ত তেল গ্রহণ। তাই সময় থাকতে সতর্ক হওয়া খুবই প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন গড়ে তুলতে হলে শুধু তেল কমানোই যথেষ্ট নয় এর সঙ্গে নিয়মিত শরীরচর্চাও জরুরি। প্রতিদিন কিছুটা সময় হাঁটা দৌড়ানো বা হালকা ব্যায়াম করলে শরীরের অতিরিক্ত ক্যালোরি বার্ন হয় এবং শরীর সুস্থ থাকে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং পর্যাপ্ত ঘুমও শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। বিশেষ করে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই কম তেলযুক্ত খাবারের প্রতি অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। তারা যদি ছোট থেকেই স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস গড়ে তোলে তাহলে ভবিষ্যতে তাদের মধ্যে স্থূলতা বা অন্যান্য রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে।

অনেক সময় আমরা বাইরে খাওয়ার সময় তেলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না কারণ রেস্টুরেন্টের খাবারে সাধারণত বেশি তেল ব্যবহার করা হয়। তাই বাইরে খাওয়ার পরিমাণ কমানো এবং যতটা সম্ভব বাড়িতে রান্না করা খাবার খাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। এতে আমরা নিজেরাই তেলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি এবং খাবারের গুণগত মান সম্পর্কে নিশ্চিত থাকতে পারি।

news image
আরও খবর

খাবারের স্বাদ বাড়ানোর জন্য তেলের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন মসলা লেবু ধনেপাতা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে খাবার সুস্বাদু হয় আবার তেলের প্রয়োজনও কমে যায়। এই ধরনের ছোট ছোট পরিবর্তনই ধীরে ধীরে আমাদের জীবনযাত্রাকে স্বাস্থ্যকর করে তুলতে পারে।

সবশেষে বলা যায় যে সুস্থ জীবনযাপনের জন্য খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্ব অপরিসীম অতিরিক্ত তেল আমাদের শরীরের জন্য নীরব শত্রুর মতো কাজ করে যা ধীরে ধীরে নানা রোগের জন্ম দেয় তাই এখনই সচেতন হওয়া প্রয়োজন এবং দৈনন্দিন জীবনে তেলের ব্যবহার সীমিত করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা নিজেদের এবং পরিবারের সদস্যদের একটি সুস্থ সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে পারি।

এই পরিবর্তন আনার জন্য প্রথমে আমাদের মানসিকতা বদলানো জরুরি কারণ আমরা অনেক সময় স্বাদের জন্য স্বাস্থ্যকে অবহেলা করি অথচ সুস্থ শরীর ছাড়া জীবনের কোনো আনন্দই উপভোগ করা সম্ভব নয় তাই প্রতিদিনের খাবারের তালিকা তৈরি করার সময় সচেতনভাবে এমন খাবার বেছে নিতে হবে যাতে তেলের পরিমাণ কম থাকে এবং পুষ্টিগুণ বেশি থাকে।

রান্নার সময় তেল কম ব্যবহার করার পাশাপাশি রান্নার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা দরকার যেমন ভাজা খাবারের বদলে সেদ্ধ রোস্ট বা হালকা ভাজা খাবার বেছে নেওয়া যেতে পারে এতে শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি জমে না এবং হজম প্রক্রিয়াও ভালো থাকে নিয়মিত এই অভ্যাস গড়ে তুললে ধীরে ধীরে শরীর নিজেই পরিবর্তন অনুভব করতে শুরু করবে।

এছাড়াও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ফল এবং সবজির পরিমাণ বাড়ানো উচিত কারণ এগুলো শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগায় এবং তেলের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেয় বিশেষ করে সবুজ শাকসবজি এবং মৌসুমি ফল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে ফলে নানা ধরনের অসুখ থেকে সহজেই দূরে থাকা যায়।

পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে এই বিষয়ে সচেতন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ একা একজন সচেতন হলে পুরো পরিবারের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা কঠিন হয়ে পড়ে তাই সবাই মিলে একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিলে এই পরিবর্তন আনা অনেক সহজ হয়ে যায় বিশেষ করে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই কম তেলযুক্ত খাবারের প্রতি অভ্যস্ত করে তুললে তারা ভবিষ্যতে সুস্থ জীবনযাপনের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।

খাবারের পাশাপাশি জীবনযাপনের অন্যান্য দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন যেমন নিয়মিত শরীরচর্চা পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং মানসিক চাপ কম রাখা এই সবকিছু মিলিয়েই একটি সুস্থ জীবন গড়ে ওঠে তেল কম খাওয়া এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা শরীরকে ভেতর থেকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

অনেকেই মনে করেন হঠাৎ করে তেল কমিয়ে দেওয়া কঠিন কিন্তু ধীরে ধীরে এই পরিবর্তন আনলে তা সহজ হয়ে যায় প্রথমে অল্প পরিমাণে তেল কমিয়ে শুরু করা যেতে পারে তারপর ধীরে ধীরে সেই পরিমাণ আরও কমানো যায় এতে স্বাদের সাথে আপস করতে হয় না আবার শরীরও সুস্থ থাকে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়মিততা কারণ একদিন বা দুদিন তেল কম খেলে কোনো বড় পরিবর্তন দেখা যাবে না কিন্তু যদি এটি অভ্যাসে পরিণত করা যায় তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল পাওয়া সম্ভব শরীর হালকা অনুভব হবে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও অনেকটাই কমে যাবে।

এইভাবে ধাপে ধাপে সচেতনতা এবং সঠিক অভ্যাস গড়ে তুলেই আমরা নিজেদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারি সুস্থ শরীরই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাই তাকে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব এবং এই দায়িত্ব পালনের অন্যতম সহজ উপায় হলো তেলের ব্যবহার সীমিত করা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা।

Preview image